নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

ভাবনাহীন ভাবনাগুলো

মাহের ইসলাম

মাহের ইসলাম › বিস্তারিত পোস্টঃ

যেখানে শুধু কুকুরই বেঁচে ছিল!

০২ রা জুন, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:১৯



পৃথিবীর সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ছবি কোনটি ?
অথবা পৃথিবীর সবচেয়ে করুণ ছবি কোনটি?
মস্তক বিচ্ছিন্ন করা এক মহিলার কোলে স্তন্যপানরত এক মৃত শিশু– ছবিটি কেমন হতে পারে?

প্রশ্নের উত্তর বের করতে গিয়ে গুগলে সার্চ দিয়ে অনেক ধরণের ছবি পেলাম। সেগুলোর বর্ণনা বা ব্যাখায় না গিয়ে কেন এই ধরণের ছবির অনুসন্ধান প্রয়োজন হলো, সেটা ব্যক্ত করাই বেশী প্রাসঙ্গিক।

পার্বত্য অঞ্চলের বিষয়াদির প্রতি ব্যক্তিগত আগ্রহের কারণে সোশ্যাল মিডিয়াতে এ সংক্রান্ত কিছু থাকলে মনোযোগ দিয়ে পড়া হয়। যার ধারাবাহিকতাই, সর্বশেষ যে ঘটনা নজর কেড়েছে, তা হল – বরকল এলাকার ভূষণছড়ার গণহত্যা। পার্বত্য চট্টগ্রামে সবচেয়ে বড় গণহত্যা বলে অভিহিত করা হয় এই হত্যাকাণ্ডকে।

এই গণহত্যা সংক্রান্ত একটা লেখা পড়েই, আমার মনে উপরোক্ত প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। তাই আরো কিছু তথ্যের জন্যে কিছুটা ঘাটাঘাটি করতে রীতিমত বাধ্য হয়েছি। এই ঘটনা নিয়ে বেশী পোস্ট এবং লেখা পেয়েছি পাহাড়িদের সমর্থক বা সমমনা বেশ কিছু কিছু পেজে। যেখানে বক্তব্য প্রায় একই– ৩১ মে বাঙ্গালী, সেটলার, সেনাবাহিনী এবং তৎকালীন বিডিআর এর সহায়তায় নারী ও শিশুসহ প্রায় ৪০০ পাহড়িকে হত্যা করা হয়; শুধু তাই নয়, অনেক নারী গণধর্ষণের শিকার এবং অনেক শিশুও নারকীয় অত্যাচারের শিকার পর্যন্ত হয়েছিল।

এমনি এক লেখায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. আমেনা মোহসিনের দ্য পলিটিক্স অব ন্যাশনালিজম বইয়ের সুত্র উল্লেখ করা হয়েছে। সঙ্গত কারণেই, বইটি খুঁজে দেখা হলো, সত্যিই, বইয়ের পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, “এতে ১১০ জন পাহাড়ি শিশু ও নারী-পুরুষ নিহত হন। অনেক পাহাড়ি নারীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।” ( আমেনা মহসিন, দি পলিটিক্স অফ ন্যাশনালিজম – দি কেস অফ চিটাগং হিল ট্রাক্টস বাংলাদেশ, প্রকাশ ১৯৯৭, পৃষ্ঠা- ১৮২ দ্রষ্টব্য) ।

উল্লেখ না করে পারছি না যে, এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর সংগৃহিত তালিকা অনুযায়ী এই হামলায় শিশুসহ সর্বমোট ৬৭ জন উপজাতীয় নিহত হয়েছিল। (এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ১৯৮৬, পৃষ্ঠা-১৩-১৯।)

অর্থাৎ, পাহাড়িদের বর্তমানকালের তরুণ এবং শিক্ষিত প্রজন্মের কাছে ৩১ মে’র দিনটি একটি ভয়াবহ দিন হিসেবেই চিহ্নিত হতে থাকবে। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই বাঙ্গালীদের প্রতি ঘৃণা আর বিদ্বেষ নিয়েই এই প্রজন্ম বড় হতে থাকবে। কারণ, আপাতদৃষ্টিতে যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ, যার সবচেয়ে বড় উৎস সোশ্যাল মিডিয়া, এই দিনের বিষয়ে তাতে বাঙ্গালী কর্তৃক পাহাড়িদের উপর অত্যাচারের সাক্ষ্যই বহন করছে।
মুদ্রার যেমন অন্য পিঠ আছে, এই ঘটনারও আরেকটা ভার্সন আছে। যা পাওয়া যাবে যৎসামান্যই। কারণ, এই ঘটনার উপর সামান্য কিছু পোস্ট চোখে পড়েছে বাঙ্গালীদের সমর্থক বা সমমনা কিছু পেজে।

অপ্রয়োজনীয় তর্ক এড়ানোর জন্যে মাত্র দুইটি সুত্র উল্লেখ করা হবে, দুইজন ব্যক্তির দুটি বই, যেখানে ভূষণছড়ার গণহত্যার বিবরণ পাওয়া যায়।

প্রথমজন হলেন, সৈয়দ মুরতজা আলী যার সাংবাদিকতায় হাতে খড়ি হয় ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনাকালীন সময়ে সেখানকার স্থানীয় পত্রিকা ‘ডন’ এ যোগদানের মাধ্যমে। বাংলাদেশ অবজারভার এর সাথে কাজ করার সময় একজন জেলের ছদ্মবেশে তিনি ভূষণছড়ায় গিয়েছিলেন ১৯৮৪ সালের ৩ জুন। ভূষণছড়ার গণহত্যার পরবর্তী তিনিই ছিলেন প্রথম সাংবাদিক যিনি ঐ স্থানে গিয়েছিলেন। তবে যেতে পেরেছিলেন, ঘটনার তিনদিন পরে।

১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘ দি হিচ ইন দি হিলস’ বইয়ে সৈয়দ মুরতজা আলী তার সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। যেহেতু সরকারী কর্তৃপক্ষ ভূষণছড়ার গণহত্যার ঘটনাটি সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করতে চাচ্ছিলেন না, তাই কোন সাংবাদিকের ঐখানে যেতে পারছিলেন না।

কাগজ, কলম, মিনি রেকর্ডার আর কিছু ব্যক্তিগত জিনিস পত্র পলিথিনে পেঁচিয়ে নৌকার পাটাতনের তলায় লুকিয়ে, তিনি জেলের ছদ্মবেশে ময়লা গেঞ্জি আর ছেড়া লুঙ্গি পরে গিয়েছিলেন। কাপ্তাই লেকের জায়গায় জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্ট ফাঁকি দিয়ে যাওয়ার আর কোন উপায় ছিল না। তিনি যেদিন পৌঁছেছিলেন, সেদিন সেখানে তিনটি হেলিকপ্টার এসেছিল। যার একটাতে ছিলেন, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদ।

ঘটনার তিনদিন পরে গিয়েও তিনি অনেক মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন। এগুলো পড়ে ছিল, কারণ এগুলোর দাফন কার্যের জন্যে কোন নিকটজনকে পাওয়া যাচ্ছিল না। আব্দুল করিম নামের ৬৮ বছর বয়স্ক এক ব্যক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানিয়েছেন যে, সেহেরী খেয়ে লোকজন তখনো একটু ঘুমের জন্য বিছানায়, এমন সময় হঠাৎ গুলির শব্দ চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে খান খান করে দেয়। কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই শান্তিবাহিনীর গুলি আর যুদ্ধের হুংকার শুনতে পেল তারা। শান্তি বাহিনীর গুলি বিদীর্ণ করে দেয় ভয়ে কম্পমান এমনকি পলায়নরত বাঙ্গালীদেরকেও। অনেক বাঙালিকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে, আবার অনেকের মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। এমনকি, শিশুদেরকে হত্যার জন্যে টেনে টুকরো করে ফেলে পর্যন্ত।

বীভৎস আর লোমহর্ষক কিছু দৃশ্যের বর্ণনার পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন যে, ৩৪ জন নারী, ২৬ জন শিশুসহ ঐ ঘটনায় ১২০ জনকে হত্যা করা হয়, আহত হয়েছিল প্রায় ২০০ জনের মত। তখন পর্যন্ত ৩৫ জন নিখোঁজ ছিল। প্রস্থানের পূর্ব মুহূর্তে, শান্তি বাহিনী বাঙ্গালীদের বাড়ীঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে যায়, ফলে ২০০ পরিবার গৃহহীন হয়ে পরে। অগণিত গৃহপালিত পশু-পাখি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। (সৈয়দ মুরতজা আলী, দি হিচ ইন দি হিলস, প্রকাশ ১৯৯৬, পৃষ্ঠা-৫৩-৫৬ দ্রষ্টব্য)

দ্বিতীয়জন হলেন, পার্বত্য গবেষক জনাব আতিকুর রহমান। যিনি দীর্ঘদিন পার্বত্য চট্রগ্রাম নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং শুধুমাত্র পার্বত্য চট্রগ্রামের উপরেই যার ১০টির উপরে বই আছে। পার্বত্য তথ্য কোষ, তৃতীয় খণ্ডে ভূষণছড়া গণহত্যার উপর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তিনি এই গণহত্যার মর্মন্তুদ ও হৃদয়বিদারক চিত্র তুলে ধরেছেন।

‘‘কলা বন্যা, গোরস্থান, ভূষণছড়া, হরিণা হয়ে ঠেগামুখ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিরাট এলাকা জুড়ে সন্ধ্যা থেকে আপতিত হয় ভয়াল নিস্তদ্ধতা। কুকুর শিয়ালেরও সাড়া শব্দ নেই। আর্মি, বিডিআর, ভিডিপি সদস্যরাও ক্যাম্পে বন্দি। অতর্কিতে বাহির দিক থেকে …… ধ্বনিত হয়ে উঠল …… ঐ গুলির শব্দটি।

তৎপরই ঘটনাবলীর শুরু। চুতর্দিকে ঘর-বাড়ীতে আগুন লেলিহান হয়ে উঠতে লাগল। উত্থিত হতে লাগল আহত নিহত অনেক লোকের ভয়াল চিৎকার এবং তৎসঙ্গে গুলির আওয়াজ , জ্বলন্ত গৃহের বাঁশ ফোটার শব্দ, আর আক্রমণকারীদের উল্লাস মূখর হ্রেসা ধ্বনি। এভাবে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, আর্তচিৎকার ও উল্লাসের ভিতর এক দীর্ঘ গজবি রাতের আগমন ও যাপনের শুরু। চিৎকার, আহাজারী ও মাতমের ভিতর সুর্যোদয়ে জেগে উঠলো পর্য্যুদস্ত জনপদ।

হতভাগা জীবিতরা আর্তনাদে ভরিয়ে তুললো গোটা পরিবেশ। অসংখ্য আহত ঘরে ও বাহিরে । লাশে লাশে ভরে আছে পোড়া ভিটা, পথ ঘাট ও পাড়া। সবাই ভীত বিহবল। এতো লাশ, এতো রক্ত আর এতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, এক অর্ধরাতের ভিতর এলাকাটি বিরান।

অদৃষ্টপূর্ব নৃশংসতা। অভাবিত নিষ্ঠুরতা। ওয়ারলেসের মাধ্যমে এই ধ্বংসাত্মক দুর্ঘটনার কথা স্থানীয় বিডিআর ও আর্মি কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বমহলে অবহিত করেন। শুরু হয় কর্তৃপক্ষীয় দৌড়ঝাঁপ, আগমন ও পরিদর্শন । চললো লাশ কবরস্থ করার পালা ও ঘটনা লুকানোর প্রক্রিয়া।

ঘটনাটি যে কত ভয়াবহ, মর্মন্তুদ আর অমানবিক এবং শান্তিবাহিনী যে কত হিংস্র পাশবিক চরিত্র সম্পন্ন মানবতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক সংগঠন তা প্রচারের সুযোগটাও পরিহার করা হলো। খবর প্রচারের উপর জারি করা হলো নিষেধাজ্ঞা। ভাবা হলো: জাতীয়ভাবে ঘটনাটি বিক্ষোভ ও উৎপাতের সূচনা ঘটাবে। দেশ জুড়ে উপজাতীয়রা হবে বিপন্ন।

ঘটনার ভয়াবহতা আর সরকারী নিস্ক্রিয়তায় ভীত সস্ত্রস্ত অনেক সেটেলারই স্থান ত্যাগ করে পালালো। পলাতকদের ঠেকাতে পথে ঘাটে, লঞ্চে, গাড়িতে, নৌকা ও সাম্পানে চললো তল্লাশী ও আটকের প্রক্রিয়া। তবু নিহত আর পলাতকরা মিলে সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হলো ঐ জনপদ থেকে লাপাত্তা। শুরু হলো জীবিতদের মাধ্যমে লাশ টানা ও কবরস্থ করার তোড়জোড়। খাবার নেই, পরার নেই, মাথা গোঁজার ঠাই নেই, চারিদিকে কেবল পঁচা লাশের দুর্গন্ধ, পালাবারও পথ নেই। নিরুপায় জীবিতরা। লাশ গোজানো ছাড়া করার কিছু নেই । দয়া পরবশ কর্তৃপক্ষ, কিছু আর্থিক সহযোগিতায় এগিয়ে এলেন । এটাকে দয়া বলা ছাড়া উপায় কি?”

“ ভূষণ ছড়া গণহত্যা পরিদর্শনে প্রেসিডেন্ট এরশাদ স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। ওসি, ডিসি, এস,পি, ব্রিগেডিয়ার, কমিশনার, ডি আই জি, জিওসি ইত্যাদি কর্মকর্তারাও হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। কিন্তু সবাই তৎপর ছিলেন ঘটনাটি চাঁপা দিতে ও লাশ লুকাতে।

কয়েকদিন যাবৎ একটানা গণকবর রচনার প্রক্রিয়া চলেছে। তজ্জন্য জীবিত সেটেলারদের আহার, নিদ্রা ও বিশ্রামের ফুরসত ছিলো না। গর্তে গর্তে গণকবর রচনা করে, একেক সাথে ৩০/৪০টি লাশকে চাপা দেয়া হয়েছে। এভাবে লোকালয়গুলো পচা লাশ ও দুর্গন্ধ থেকে মুক্ত হলেও, পাহাড়ে ও বনে অবস্থিত বিক্ষিপ্ত লাশগুলো দাফন কাফনহীন অবস্থায় পচতে থাকে ও শিয়াল কুকুরের খাদ্য হয়। দুর্গত পরিবারগুলো পোড়া ভিটায় খাদ্য ও আচ্ছাদনহীন দিনযাপনে বাধ্য হয়।”

ঘটনার একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সাহায্য নিয়ে, তিনি মোট ৩৭০ জন নিহত ব্যক্তির তালিকা উক্ত বইয়ে সন্নিবেশিত করেছেন। তিনি আরো জানিয়েছেন যে, গুরুতর আহত ৮৫ জনকে চিকিৎসার জন্যে চট্রগ্রামের সি এম এইচে পাঠানো হয়েছিল।( পার্বত্যকোষ, তৃতীয় খণ্ড, আতিকুর রহমান, প্রকাশ ২০০৭, পৃষ্ঠা-১৪৬-১৫৪ দ্রষ্টব্য)।


উল্লেখ না করে পারছি না যে, এক অনুসন্ধানী ও তথ্যবহুল ফিচারে সাংবাদিক সৈয়দ ইবনে রহমত, জুলাই ১, ১৯৮৪ তারিখে বাংলাদেশ ইকোনোমিস্ট এ প্রকাশিত মইনুদ্দিন নাসেরের ‘ম্যাসাকার এট ভূষণছড়া’ শীর্ষক প্রতিবেদনকে সুত্র হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছেন, “Nasser সাহেবের রিপোর্টের সাথে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায় অগ্নিদগ্ধ বিরান ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাত্র কুকুর। আর ছবির ক্যাপশন এ লেখা আছে-

Bhushanchara: Only the Dog was left Alive.”

“Nasser সাহের তার রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৮৬ জনের লাশ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আবার তিনি আশঙ্কা করেন যে মৃতের সংখ্যা কোনভাবেই ৪ শতের কম হবে না। কেননা বরকলের ১৬০০ পরিবারের মধ্যে তিন শতাধিক পরিবার সেদিন আক্রান্ত হয়েছে। আর আক্রান্তদের মধ্যে ১০০টি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।“ (ঐতিহাসিক ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস আজ, পার্বত্যনিউজ, ৩১ মে, ২০১৪)।

স্মরণযোগ্য যে, প্রাক্তন বিডিআর মহাপরিচালক, মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান (অবসরপ্রাপ্ত) ঐ এলাকায় জোন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। তার ভাষ্যমতে, “ ১৯৮৪ সালের ৩১মে শান্তিবাহিনীর প্রীতি গ্রুপের মেজর মণিস্বপনের নেতৃত্বে একশত পঞ্চাশ জনের একটি আর্মড গ্রুপ ভোর চারটার দিকে ভূষণছড়ার বাঙালি বসতি এবং জারুলছড়ির বিডিআর ক্যাম্প আক্রমণ করে। শান্তিবাহিনীর এই আক্রমণে বিডিআরসহ চারশত জন নিহত এবং পাঁচশতের মতো আহত হয় । (পার্বত্য চট্রগ্রামে আমার অভিজ্ঞতা- ২২, পার্বত্যনিউজ, ২৪ অক্টোবর ২০১৬ দ্রষ্টব্য)।

প্রাসঙ্গিক মনে করে স্মরণ করিয়ে দিতে হচ্ছে যে, ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত আমেনা মোহসিনের পূর্বোক্ত বইয়ে, পাহাড়ি ও সমমনা সুত্রের বরাতে ১৯৮০ হতে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত (১৫ বছর) মোট ১১টি গণহত্যার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হয়েছে, যেখানে ৯২৯ জনের বেশী (কিছু ক্ষেত্রে আনুমানিক সংখ্যা ব্যবহার করা হয়েছে) পাহাড়ী নিহত হয়েছে। লেখিকার ভাষ্য মোতাবেক, এগুলোর সবই বাঙ্গালী সেটলার ও নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত হয়েছে। অপরপক্ষে, তিনি শুধু এক লাইনে উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৮০ – ১৯৯১ সালে (১১ বছর) শান্তিবাহিনী ৯৫২ জন বাঙ্গালী ও ১৮৮ জন পাহাড়িকে হত্যা করে (নির্দিষ্ট সংখ্যা ব্যবহার করা হয়েছে)। কোন এক অজ্ঞাত কারণে তিনি কোন ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিতে পারেন নি, এমন কি ভূষণছড়ার বাঙ্গালী গণহত্যারও নয়। (আমেনা মহসিন, দি পলিটিক্স অফ ন্যাশনালিজম, দি কেস অফ চিটাগং হিল ট্রাক্টস বাংলাদেশ, প্রকাশ- ১৯৯৭, পৃষ্ঠা: ১৮২-১৮৫ দ্রষ্টব্য)।

সৈয়দ মুরতজা আলীর লেখায় উল্লেখ আছে যে, তিনি ফিরে আসার পরে শুনেছিলেন যে, বাঙ্গালী সেটলাররা প্রতিশোধের স্পৃহায় ঐ এলাকার ১০০ হতে ২০০ পাহাড়িকে হত্যা করেছে। ( সৈয়দ মুরতজা আলী, দি হিচ ইন দি হিলস, প্রকাশ ১৯৯৬, পৃষ্ঠা-৫৬ দ্রষ্টব্য)।

শরদিন্দু শেখর চাকমা’র ‘পার্বত্য চট্রগ্রামের একাল সেকাল’ বইয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৮৪ সালের ৩১ মে হতে ৭ জুন পর্যন্ত সেনাবাহিনী, বি,ডি,আর এবং নতুন বসতিকারিগণ মিলে ভূষণছড়া ও ছোট হরিনায় পাহাড়ি গ্রামগুলো আক্রমণ করে। ”ঐ আক্রমনে ৬২ জন পাহাড়ি নিহত এবং ১৩ জন আহত হয়।” (শরদিন্দু শেখর চাকমা, পার্বত্য চট্রগ্রামের একাল সেকাল, অংকুর প্রকাশনী, ঢাকা, প্রকাশ ২০০২, পৃষ্ঠা- ৬৫-৬৬ দ্রষ্টব্য)।

অন্যদিকে, ‘বিদ্রোহী পার্বত্য চট্রগ্রাম ও শান্তি চুক্তি’ বইয়ে মাহফুজ পারভেজ উল্লেখ করেছেন যে, ৩১ শে মে তারিখে “বরকলের ভূষণছড়ায় ১৮৬ বাঙ্গালীকে হামলা চালিয়ে হত্যা করে শান্তিবাহিনী।“ (মাহফুজ পারভেজ, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্রগ্রাম ও শান্তি চুক্তি, সন্দেশ ঢাকা, প্রকাশ ১৯৯৯, পৃষ্ঠা-১১২)।

মেজর জেনারেল ইব্রাহিম (অব.) এর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, উত্তেজিত বাঙালিরা ৩১ মে এবং তার পরদিন বরকল এলাকার ভূষণছড়া ও অন্যান্য কিছু গ্রামে উপজাতীয় পরিবারগুলোর উপর হামলা চালায়। তিনি এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর সুত্রে উক্ত ঘটনায় ৬৭ জন উপজাতীয় নিহত হয় বলে জানিয়েছেন।( মেজর জেনারেল )অব.) ইব্রাহিম, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ-পরিস্থিতির উপর মূল্যায়ন, মাওলা ব্রাদার্স, প্রকাশ-২০১১, পৃষ্ঠা ২০১১ দ্রষ্টব্য।)

অর্থাৎ, পাহাড়িদেরকে হত্যা করা হয়েছে বাঙ্গালীরা হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পরে, প্রতিশোধের স্পৃহায়, উত্তেজিত হয়ে; শান্তিবাহিনীর মত পরিকল্পিতভাবে, ঠাণ্ডা মাথায় নয়। যদিও, যে পরিস্থিতিতেই করা হোক না কেন – কোন হত্যাকাণ্ডই সমর্থন যোগ্য নয়; বরং যে কোন হত্যাকাণ্ডই ঘৃণ্য এবং শাস্তিযোগ্য। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে, প্রায় সব লেখাতেই শুধুমাত্র হয় পাহাড়ি নতুবা বাঙ্গালীদের হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দেয়া আছে– দুই দুইটা হত্যাকাণ্ড যে এখানে ঘটেছে, সেটা উল্লেখ করা হয়নি।

স্বাভাবিক ভাবেই, ব্যথিত হয়েছি এই ভেবে যে, পাহাড়ের এই তরুণ সমাজ হয়ত কোনদিনও জানতে পারবে না যে, তাকে জন্মের পর হতেই ব্রেইন ওয়াশ করা হয়েছে, প্রকৃত সত্য আড়াল করে বা ঘটনার একপেশে বিবরণে কিংবা আংশিক বা পুরোপুরি মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে। তাই, অজ্ঞাতসারেই তাদের বাংলাদেশ বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠছে এবং তাদের একাংশ ক্রমেই বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী মনোভাব পোষণ ও কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে দ্বিধাবোধ করছে না।

অন্যদিকে, দেশ ও সমাজের বেশীরভাগ মানুষেরই অগোচরেই পাহাড়ের তরুণ প্রজন্মের মনে আজ জাতীয় চেতনা, জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেম বিরোধী ও বাঙালি বিদ্বেষের বীজ রোপণ করা হচ্ছে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতায়, অত্যন্ত সুচতুরতার সাথে, কৌশলে। একারণেই, পাহাড়িদের আপন করে নেয়ার অভিপ্রায়ে দেশের সাধারণ মানুষের উদারতা আর তাদের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্যে সরকারের আন্তরিক প্রচেস্টার পরেও কিছু কিছু পাহাড়ির দেশ ও সমাজ বিরোধী কার্যকলাপ দেখে অনেকে হতাশ হয়ে ভাবে- মানুষ এত অকৃতজ্ঞ কী করে হতে পারে! ফলশ্রুতিতে, একদিকে আমাদের সমাজে ক্রমান্বয়ে ঘৃণা আর বিদ্বেষ বাড়ছে, আর অপরদিকে বিভেদের বেড়াজালে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

এরকম আরো অনেক ঘটনা আছে যেখানে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ধোঁকা দেয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এ ধরণের ভয়াবহ রকমের মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে যে মিথ্যাচার করা হচ্ছে; সেই মিথ্যাচারের দায়ভার, পাপাচারের দায়ভার (দুনিয়ার কোন ধর্মই মিথ্যাচার সমর্থন করেনি) এবং এই পশুসুলভ মানসিকতার দায়ভার যে উদ্দেশ্যেই করা হোক না কেন; এতে আর যাই হোক, ভালো কিছু হবে না। মিথ্যা আর পাপ কখনো, কারো জন্যে, কোথায়ও মঙ্গল বয়ে আনেনি। বরং সত্যই সর্বদা জয়ী হয়েছে।

তথ্য সুত্রঃ
International, A. (1986). Amnesty International 1986, Bangladesh: Unlawful Killings and Torture in The Chittagong Hill Tracts. London: Amnesty International.
আলী, স. ম. (১৯৯৬). দি হিচ ইন দি হিলস. চট্রগ্রাম: দিল মনোয়ারা বেগম.
ইব্রাহিম, ম. জ. (২০১১). পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন. ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স.
চাকমা, শ. শ. (২০০২). পার্বত্য চট্রগ্রামের একাল সেকাল. ঢাকা: অংকুর প্রকাশনী.
পারভেজ, ম. (১৯৯৯). বিদ্রোহী পার্বত্য চট্রগ্রাম ও শান্তি চুক্তি. ঢাকা: সন্দেশ.
মহসিন, আ. (১৯৯৭). দি পলিটিক্স অফ ন্যাশনালিজম - দি কেস অফ চিটাগং হিল ট্রাক্টস বাংলাদেশ. ঢাকা: দি উনিভারসিটি প্রেস লিমিটেড.
রহমান, আ. (২০০৭). পার্বত্য তথ্য কোষ (Vol. তৃতীয় খণ্ড). সিলেট: পর্বত প্রকাশনী.

মন্তব্য ৬ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৬) মন্তব্য লিখুন

১| ০২ রা জুন, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:০৮

দপ্তরবিহীন মন্ত্রী বলেছেন: পাহাড়ীরা কেন বাংলাদেশকে আপন করতে পারছে না?

০২ রা জুন, ২০১৮ রাত ১১:৩১

মাহের ইসলাম বলেছেন: এই প্রশ্নের উত্তর লম্বা।
তবে, খুব সংক্ষিপ্ত করে বললে, বলতেই হবে যে, বাংলাদেশকে আপন করতে না পারার কারণ মূলত কিছু পাহাড়ি নেতার ব্যক্তি স্বার্থ এবং অদূরদর্শিতা, যা যুগে যুগে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনায় প্রকাশ পেয়েছে।

সত্যি বলতে কি, পাহাড়িদের একাংশ বাংলাদেশ সরকারের গৃহিত পদক্ষেপে কোন না কোন ভাবে এবং কোন না কোন সময়, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটা যেমন সত্যি, তেমনি এটাও সত্যি যে, পার্বত্য চট্রগ্রামে বাংলাদেশ সরকারের গৃহিত সকল পদক্ষেপের পিছনে যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণ ছিল- যা নেয়া হয়েছিল হয় দেশের বৃহত্তর স্বার্থে, আর নাহয় অনেক ক্ষেত্রেই পাহাড়িদের অনুসৃত নীতি ও কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষিতে – যার বেশিরভাগই নেয়া হয়েছিল কিছু পাহাড়ি নেতার ব্যক্তি স্বার্থে এবং নেতৃবৃন্দের হঠকারিতা ও অদূরদর্শিতায়।

উদাহরন দিলে অনেক লম্বা হয়ে যাবে, তাই শুধু তিনটা বড় ঘটনা তুলে ধরছি, যে তিনটি বিষয়কে পাহাড়িরা সাধারণত অশান্তির অন্যতম প্রধান কারণ মনে করেনঃ

১। কাপ্তাই বাঁধ। যে কোন উন্নয়নমুলক কাজেই মানুষ কোন না কোন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়,যেমন যমুনা ব্রিজের কারণে ফেরিঘাটের দোকানী আর কর্মচারীরা কর্মচ্যুত হয়েছে, অনেকেই ভিটেছাড়া হয়েছে। সরকার, তাদের জন্যে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে। পাকিস্তান সরকারও চাকমা রাজার নেতৃত্বে কমিটি গঠন করে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু, নেতাদের ব্যক্তি স্বার্থের কারণে অনেক সাধারণ পাহাড়ি যথাযথ ক্ষতিপূরণ পায়নি।

২। সেনাবাহিনী মোতায়েন। শান্তি বাহিনীর সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয় ১৯৭২ সাল থেকেই। ১৯৭৬ সালে শান্তি বাহিনী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে দেশের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে। স্বাভাবিক ভাবেই, সরকার বাধ্য হয় ১৯৭৭ সাল থেকে অস্থায়ী ভিত্তিতে পার্বত্য চট্ট্রগ্রামে সেনাবাহিনী মোতায়েনে। সরকার বাধ্য হয়েছে, পাহাড়ি কিছু নেতার হঠকারিতা ও অদূরদর্শিতায়।

৩। বাঙ্গালী পুনর্বাসন। সরকারী ভাবে বাঙ্গালীদের পুনর্বাসন শুরু হয় ১৯৭৯ সাল থেকে। “অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচী প্রনয়ন ও বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক সমাধান প্রচেষ্টা এবং পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক সামরিক, আধাসামরিক, পুলিশ ও আনসার বাহিনী মোতায়েনের পরও শান্তিবাহিনীর তৎপরতা বন্ধ না হওয়ায় সরকার পার্বত্য চট্রগ্রামে পাহাড়ি ও বাঙ্গালী জনসংখ্যার অনুপাতে ভারসাম্য আনয়নের মাধ্যমে বিচ্চিন্নতাবাধীদের মূল শক্তিকে দুর্বল করার চিন্তাভাবনা করেন।” এ লক্ষ্যে ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত বাঙ্গালী পুনর্বাসন করা হয়। শান্তিবাহিনীর তৎপরতা না থাকলে, বাঙ্গালীদেরকে পুনর্বাসনের প্রশ্নই উঠত না।

আপনার প্রশ্নের উত্তর একটু লম্বা হয়ে যাবে, তাই পার্বত্য চট্রগ্রাম নিয়ে এই ব্লগেই আমার আরো কিছু লেখা পড়ার বিনীত অনুরোধ করছি। আশা করছি, কিছু বিষয় বুঝতে সহজ হবে।

এছাড়াও, যদি সময় থাকে, তাহলে নিচের খন্ড খন্ড তথ্য দেখে নিতে পারেনঃ

১৯৪৭ সালে কিছু পাহাড়ি নেতা পার্বত্য চট্রগ্রামকে ভারতের অন্তর্ভুক্তির যারপরনাই প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, এমন কি তারা দেশ বিভাগের পরে রাঙামাটি তে ভারতের পতাকা উড়িয়েছিলেন এবং পাকিস্তানী বাহিনীকে সশস্ত্র প্রতিরোধের চেষ্টাও ছিল। আরো কিছু কারণে, পাকিস্তান সরকার পাহাড়িদের অবিশ্বাস করতে শুরু করে। যার পরিণতিতে, পাকিস্তান সরকার কিছু কিছু পদক্ষেপ নেয়, যেগুলো সাধারণ পাহাড়িদের জন্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুর্ভোগ বয়ে এনেছে।
একবার ভেবে দেখুন, ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্রগ্রাম ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলে দেশের মূল জনগোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ এবং সামগ্রিক উন্নয়ন কেমন হত ?

১৯৭১ সালেও নেতাদের ভুলে কিছু পাহাড়ি বিশেষ করে চাকমারা পাকিস্তান বাহিনীকে সক্রিয় সহযোগিতা করে। পরবর্তীতে, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর পরই পার্বত্য অঞ্চলের জন্যে স্বায়ত্তশাসন দাবী করে।

১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি শান্তি বাহিনী গঠিত হলেও, সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয় ১৯৭২ সাল থেকেই ১৯৭৩ – ১৯৭৪ সালে শান্তিবাহিনীর রিক্রুটিং এর সময় হাজার হাজার উপজাতীয় যুবক শান্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। ১৯৭৬ সালে শান্তি বাহিনী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে।

অনন্যোপায় হয়ে, বাংলাদেশের সরকার ১৯৭৭ সাল থেকে অস্থায়ী ভিত্তিতে পার্বত্য চট্ট্রগ্রামে দেশের অন্য স্থান হতে সেনাবিহিনী আনতে শুরু করে।

যারা বাঙ্গালীদের কে পাহাড়ের সমস্যার মূল কারণ বলে মনে করেন, তাদের হয়তো জানা নেই যে, সরকারী ভাবে বাঙ্গালীদের পুনর্বাসন শুরু হয় ১৯৭৯ সাল থেকে।

অর্থাৎ, অন্য যে কোন দেশের সরকারের মতই বাংলাদেশ সরকার দেশের অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্যে পদক্ষেপ নিয়েছিল।

এরই পাশাপাশি, সরকার নানা ধরনের উন্নয়ন মুলক কর্ম কান্ড ও বাস্তবায়ন করে, যেমনঃ

ব্যাপক অর্থনীতিক উন্নয়নের জন্য ১৯৭৬ সালে পার্বত্য চট্রগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হয়। এর পর থেকে এই বোর্ড পার্বত্য চট্রগ্রামের সার্বিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহন, তত্ত্বাবধান ও বাস্তবায়ন করে আসছে। ২০১৭ – ১৮ অর্থ বছরে উন্নয়ন বাজেট ৯১৫ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।

সরকারের সদিচ্ছা প্রমান করার জন্যে জিয়াউর রহমান পাকিস্তানে পালিয়ে যাওয়া চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের মা বিনীতা রায়কে উপদেস্টা নিয়োগ করেন।

পাহাড়ি জনগণের সেন্টিমেন্টকে গোপন তৎপরতা থেকে প্রকাশ্য রাজনীতির প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং অতপরঃ জাতীয় রাজনীতির মুল্ধারা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সাথে তাদেরকে সম্পৃক্ত করার উদ্দেশ্যে ১৯৭৭ সালে ট্রাইবাল কনভেনশন গঠিত হয়। সভাপতি ছিলেন – মং রাজা, সহসভাপতি ছিলেন – চাকমা রাজা ও বোমাং রাজা, আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন – চারু বিকাশ চাকমা। এই ট্রাইবাল কনভেনশন বাঙ্গালীদের পাহাড়ে পুনর্বাসন বন্ধ ও সন্ত লারমাকে মুক্তি দিতে সরকারকে রাজী করায়।

১৯৮৫ সালে পার্বত্য চট্রগ্রামকে বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা ঘোষণা করা হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল – অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল ধারায় পাহাড়ী ও বাঙ্গালীদের মধ্যে সং হতি প্রতিষ্ঠা।

কর্ম সংস্থানের লক্ষে,
সরকারী চাকুরিতে ৫% কোটা সংরক্ষণ।
এই কোটার বাইরে দুই দফায় মোট ১৮৪৩ জনকে বিভিন্ন সরকারী পদে চাকুরি দেয়া হয়।
১৯৮৪-৮৫ সালে আরো ৪৫০/৫৫০ জন পাহাড়িকে চাকুরির মাধ্যমে পুনর্বাসন করা হয়।
চাকুরির ক্ষেত্রে পাহাড়িদের বয়স সীমা ৫ হতে ১০ বছর পর্যন্ত শিথিল করা হয়।
শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করা হয়।
উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসন সংরক্ষিত করা হয়, যেমন – মেডিকেল কলেজে - ১২ টি আসন।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিশেষ সুবিধা প্রদান, যেমন – ২ লাখ টাকা পর্যন্ত সকল পার্বত্য উন্নয়ন প্রকল্প পাহাড়ি ঠিকাদারদের জন্য সংরক্ষিত, ২ লাখ টাকার অধিক প্রকল্পের ১০% পাহাড়ি ঠিকাদারদের জন্য সংরক্ষিত। এগুলো উন্মুক্ত প্রতিজোগিতার অতিরিক্ত।
ভারত প্রত্যাগতদের পুনর্বাসন করা হয়।
শান্তিবাহিনীর সদস্যদের পুনর্বাসন করা হয়।
শান্তিচুক্তির আগে, একাধিকবার শান্তি বাহিনীর প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়।
১৯৮৯ সালে তিন পার্বত্য জেলার জন্যে তিনটি পৃথক স্থানীয় সরকার পরিষদ গঠন করা হয়।
১৯৯০ সালে স্পেশাল এফেয়ারস বিভাগ তৈরি করা হয় , যা ১৯৯৭ সালের চুক্তির পরে পার্বত্য চট্রগ্রাম বিসয়ক মন্ত্রনালয়ে রূপান্তরিত হয়।

শান্তি চুক্তি অনুযায়ী প্রদেয় সকল সুবিধাদি আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে সন্তু লারমা এবং অন্যান্য সকল পাহাড়িরা গত দুই যুগ ধরে ভোগ করছে।

এত কিছুর পরেও, পাহাড়িদের চাঁদাবাজি, হত্যা, অপহরণ, সশস্ত্র সন্ত্রাসী পালন থেমে নেই। অথচ, তারাই আবার বলে যে সরকার শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন করছে না, বা ধীরে বাস্তবায়ন করছে।

২| ০৩ রা জুন, ২০১৮ সকাল ১০:৪৫

রাজীব নুর বলেছেন: আহারে--
মর্মান্তিক ----

০৪ ঠা জুন, ২০১৮ রাত ১২:১২

মাহের ইসলাম বলেছেন:
মর্মান্তিক অবশ্যই।

সময় নিয়ে পড়ার জন্যে ধন্যবাদ।

৩| ০৬ ই জুন, ২০১৮ দুপুর ১২:৫৩

ঝড়ের পাখি বলেছেন: ধন্যবাদ এতো সুন্দর এবং তথ্যবহুল লেখার জন্য।

জাতি রাষ্ট্র ধারণার গণ্ডির ভিতর থেকেই আপনি বিশ্লেষণ করেছেন।
পাহাড়িদেরকে আলাদা আলাদা জাতি হিসেবে বিবেচনা করে বিশ্লেষণ করলে ভালো হতো।

প্রতিটা গণহত্যাই নিন্দনীয়!

তবে কি জানেন- যুদ্ধে ২ পক্ষই ক্ষতি গ্রস্থ হয়। আর ফলাফলে বিজয়ী দল সবসময় ন্যায় সংগত আর পরাজিত-অন্যায় এবং যুদ্ধাপরাধী, বিদ্রোহী হিসেবে বিবেচিত হয়।

পরিশেষে, "রাম যদি হেরে যেতো-
রামায়ন লেখা হতো
রাবণ দেবতা হতো সেখানে।

০৮ ই জুন, ২০১৮ রাত ১১:০৬

মাহের ইসলাম বলেছেন:
আপনার মন্তব্য আমার খুব ভাল লেগেছে।
আমি উত্তর দিতে দেরী করে ফেলায়, দুঃখিত।

পার্বত্য চট্রগ্রামে যদিও সামরিক দিক থেকে শান্তি বাহিনী পরাজিত হয়েছে, কিন্তু লেখালেখির দিক থেকে তারা বিজয়ী।
কারণ, সেনাবাহিনী প্রচার, প্রপাগান্ডা এবং লেখালেখিতে নাই। কালে ভদ্রে কিছু সাংবাদিক কে তারা তথ্য সরবরাহ করে, তারও বেশীরভাগ আবার আই এস পি আর এর মাধ্যমে।

পাহাড়ের অধিবাসীদের মধ্যে চাকমারা প্রায় ৭৭ % শিক্ষিত, বাংগালিরা মাত্র ২৩% (২০১১ সালের হিসেবে)। ফলে, বাংগালিরা কোন কালেও এই প্রচার কাজে বা ইতিহাস লেখার কাজে চাকমাদের ধারে কাছে আসতে পারেনি, পারবে বলে মনে হয় না।

এ কথা বলার উদ্দেশ্য হল, পার্বত্য চট্রগ্রামের ইতিহাস ও ঘটনাবলি নিয়ে যত লেখা পাবেন, একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, এগুলোর বেশীরভাগই হয় কোন পাহাড়ি, না হয় পাহাড়িদের সমমনা বা সহানুভুতিসম্পন্ন কোন বাঙ্গালী লিখেছেন।

এখানে আরো লক্ষ্যনীয় যে, দেশের যে কোন ঘটনাতেই যদি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যায়, তাহলে কিছুটা হলেও বেশি প্রচার পাওয়া যায়। ফলে, পার্বত্য চট্রগ্রামের অনেক লেখাই আবার পাহাড়িদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে লিখেছেন কেউ কেউ।

অথচ, অনেক সাধারণ পাহাড়ি বা বাঙ্গালীরা প্রতিনিয়তই পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের দ্বারা নিপীড়িত হয়েছে, কিন্তু খুব একটা লেখা বা প্রতিবাদ এগুলো নিয়ে চোখে পড়েনি।

যেমন ধরুন, গত ২৯ মে তারিখে ৪ চাকমা যুবক মহালছড়িতে তিন বান্ধবীকে ধর্ষণ করেছে। তিন জনই মারমা এবং একটা স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী। থানায় মামলাও হয়েছে। অথচ, কয়টা জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় এটা এসেছে?

অনুরূপ ঘটনায় যদি, বাঙ্গালী বা নিরাপত্তা বাহিনীকে জড়ানো যেত, তাহলে কি কি হত এই কয়দিনে তা বলার প্রয়োজন মনে করছি না।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.