নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

পুরো নাম মুহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম রনি, জন্ম- যশোর, পৈত্রিক নিবাস- ঝিনাইদহ। পড়ালেখা করছি বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এ। ঠিকানা- https://www.facebook.com/nasirul.rony

এন ইসলাম রনি

এন ইসলাম রনি › বিস্তারিত পোস্টঃ

মনজংশন

১৪ ই মার্চ, ২০২০ রাত ১১:৪৮

আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে দেখে মজিদ দ্রুত প্যাডেল করার চেষ্টা করলো। কিন্তু আঁকাবাঁকা গ্রামের রাস্তায় সে যতটা দ্রুত চালাতে চাইছে তা হচ্ছে না। কিছুদূর পরপর এক একটা বাঁক পিচ কালো চিকন রাস্তাটাকে একেঁবেঁকে চলা একটা সাপের আকৃতি দিয়েছে। মজিদ সাইকেলের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখতে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছে। সাইকেল সে যে নতুন চালাতে শিখেছে তা নয়। সাইকেল টা সে বিয়েতে শ্বশুর বাড়ি থেকে পেয়েছে। না সে কোন যৌতুক চায়নি। রহিমাকে বিয়ের সময় খাট আলনা বড় একটা টিনের সাববাক্সের সাথে সাইকেলটাও শ্বশুর বাড়ি থেকেই এসেছে, সে শুধু না করেনি। প্রথমে মামাশ্বশুর মোটরসাইকেল দেওয়ার কথা বললেও শেষে তারা এই সাইকেলটাই দিয়েছে। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা হয়তো পরে ভেবে দেখেছে মোটরসাইকেল থেকে মজিদের জন্য সাইকেলই ঠিক হবে। মজিদের এ নিয়ে কোন দুঃখ নেই। জীবনে এ পর্যন্ত একবারও সে রহিমাকে এব্যাপারে কিছু বলেনি। বীমা অফিসের এইট পাস পিওনের মোটরসাইকেলেরই বা কি দরকার? অফিসে সে তো আর বাবু সেজে মোটরসাইকেল চালিয়ে যেতে পারতো না। কে জানে অফিসের বড় স্যার সেটা হয়তো ভালোচোখে দেখতোও না। তাছাড়া মোটরসাইকেলের তেলের যা দাম! এই বাড়তি খরচ সে কোথা থেকে মেটাতো? তার জন্য এই সাইকেলই ভালো।

একা থাকলে এইসব পুরনো কথা মজিদের মাথায় ঘুরপাক খায়। মজিদ এই সব কথা নিজের মনে ভাবে, কারো কাছে প্রকাশ করে না কখনো। কিন্তু আজ এসব কথা তার মাথায় জায়গা দেওয়ার একদম সময় নেই। দ্রুত বাড়ি ফেরা দরকার। উত্তরদিকের আকাশ টা পিচের রাস্তার মতই কালো। সামনে জয়রামপুর গ্রামের গাছ গুলো বাঁধের মতো একটা ধূসরসবুজ রেখা টেনে আছে, ওটা না থাকলে রাস্তাটাকে মেঘের ই অংশ মনে হতো। যেন মেঘ থেকে চুইয়ে চুলের মতো কোন একটা মিশ কালো নদী নেমে এসেছে।


সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে রাখা মজিদের দু হাতের তালু ঘামে ভিজে জবজব করছে। ঝড় শুরু হয়ে গেলে সে যে কোথাও আশ্রয় নেবে সে উপায়ও নেই। পথের দু পাশেই ফাঁকা মাঠ খা খা করছে। ধান কাটার পর বছরের এইসময়টা পানির অভাবে অধিকাংশ জমি ফাঁকা পড়ে থাকে। কাজ নেই বলে মাঠে একজন মানুষ ও নেই। পেছনে ফেলে আসা বটতলার ময়না মিয়ার চায়ের দোকানটা পর্যন্ত বন্ধ। আকাশের যা অবস্থা ঝড়ের আগে বাড়ি পৌঁছানো মজিদের জন্য প্রায় অসম্ভব। মজিদ বটতলার দিকে ফিরে যাবে কিনা ভাবছে। ঝড়ের সময় বড় গাছের আশেপাশে নাকি থাকা ঠিক না। তারপরও এই ন্যাড়া মাঠের মাঝখানে ঝড়ের কবলে পড়ার থেকে ময়না মিয়ার দোকানের সামনে চাটায়ের তলে দাঁড়িয়ে থাকাই ভালো ছিলো।
হাটের দিন ছাড়া ময়না মিয়া দোকান খোলে না। এটা তার একরকম শখের ব্যবসা। তাকে দেখে মনেহয় বেচা বিক্রি থেকে হাটে আসা লোকদের সাথে গল্প করাই তার আসল কাজ।
ময়না বড় ছেলে কে সৌদি আরব পাঠিয়ে ক্ষেতসব লিজ দিয়ে একরকম পায়ের উপর পা তুলে বসে খাচ্ছে। গতবছর দুই কামরার টিনের নতুন ঘর তুলেছে। গ্রামে জোড় গুজব সামনে বছর পাকা দালান তুলবে। ময়না মিয়ার আগের সেই দিন অবস্থা আর নেই। এখন সে স্ত্রি করা পাঞ্জাবি পরে, চোখে সুরমা দেয়, আতরে ভিজিয়ে তুলো কানের ভেতর গুঁজে রাখে। এই বয়সে আবার দ্বিতীয় বিয়েও করেছে। আজকাল আবার হাটের দিন তার দোকানে আসা সবার হাত দুহাতে ধরে ময়না মিয়া বলে, ভাইসাব মাফ করে দিয়েন কখনো আপনের মনে কুনু দুখখু দিলি কিছু মনে রাইখেন না। এবার হজ্জে যাবো। ছেলে চাইপা ধরছে বাপরে বেহস্তে পাঠাবে। বলেন দেখি কি একটা অবস্থা দোয়াদরুদ কিছু জানি না বশির মুন্সির পেছনে পাঁচওয়াক্ত খালি উঠবস করি।...বলেই সে হাসতে থাকে যেন খুব মজার কোন কথা বলে ফেলেছে.........

অন্যমনস্ক হওয়ায় একটু হলে মজিদ সাইকেল সহ পড়েই যাচ্ছিলো। ময়না মিয়ার কথা মজিদ কেন ভাবছে! "ব্যাটা লাটসাহেব"...
মজিদ কারো উপর কখনো রাগ করে না। এজীবনে কারো সাথে উচ্চস্বরে কথা বলেছে এমন কথা মজিদ সম্পর্কে কেউ বলতে পারবে না। এই গত কালই তো রহিমা রাতে ভাত ধরিয়ে ফেললো। স্বামীকে পোড়া ভাত দিতে গিয়ে রহিমার কি সঙ্কজ। কিন্তু মজিদ চুপচাপ খেয়ে ফেললো। মুখে একটু ভৎসনাও নেই। সেই মজিদেরই আজ ময়না মিয়ার উপর নিজের সব রাগ উগড়ে দিতে ইচ্ছে করে। দোকান বন্ধ রেখে ময়না মিয়া আজ মজিদের সব ক্রোধের মালিকানা কিনে নিয়েছে যেন।

মজিদের হাত কাঁপছে। সাইকেলের প্যাডেল যেন আর ঘুরতেই চাইছে না।
চারপাশটা খড়রং হলুদ হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ আগে কিছু চিল মাথার উপর গোলহয়ে উড়ছিলো এখন তাদের আর দেখা যাচ্ছে না।
হাতেরতালু দুটো অসম্ভব ঘামছে, পায়ের তলাও ঘেমে একাকার। কোনভাবে প্যাডেল করা যাচ্ছে না, চামড়ার স্যান্ডল পা থেকে ফসকে যেতে চাইছে।
ঝড় বজ্রপাতে মজিদের অসম্ভয় ভয়। তার বাবার মৃত্যু হায়েছিলো বজ্রপাতে। তখন মজিদের বয়স দশ কিংবা বারো। ঝড় আসতে দেখে মাঠ থেকে গরু আনতে যেয়ে তার বাবা মারা যায়। মজিদ শুনেছে তার দাদার মৃত্যুও একই ভাবে। যদিও তখন তার জন্ম হয়নি। সেই থেকে বজ্রপাত কে তার বংশের উপর কোন অভিশাপ মনে করে মজিদ। গ্রামের বিভিন্ন জনের গুঞ্জন কানাকানি মায়ের বিলাপ সবকিছু তার এই ধারণাকে বিশ্বাসে পরিণত করেছে। ইতিমধ্যে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করেছে। তবে কি আজই মজিদের শেষ দিন? এখন তার কি করা উচিত মজিদ ভেবে পায় না। সে কি তওবা করবে নাকি কোন দোয়া দরুদ পড়বে? কোন দোয়াই তো এখন মজিদের মনে পড়ছে না! মজিদের কেমন যেন শীত শীত লাগছে, যেন কাঁপনি দিয়ে জ্বর আসবে।

উপর থেকে বাতাসের গো গো শব্দ ভেসে আসলেও ঝড় তেমন একটা হচ্ছে না। ছিঁটে ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। জোর বৃষ্টির ভেতর নাকি বজ্রপাত হয় না। তাহলে সে কি এ যাত্রা বেঁচে যাবে! নড়বড়ে পায়ে সাইকেল টা আর একটু জোড়ে চালাতে চেষ্টা করে মজিদ। ঐ তো জয়রামপুরের বুড়ো তালগাছ দুটো দেখা যাচ্ছে। আর একটু জোরে... আর একটু।
ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আকাশ এখন সম্পূর্ণ ছাইবর্ণ শুধু মাটি ছোয়ার আগে দিগন্ত রেখায় কেমন যেন আলো হয়ে আছে। মজিদ সাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারালো।
সাইকেল সহ পড়ে গিয়েই মজিদ ডুকরে কেঁদে উঠলো- আল্লাহ আজ না... আজ না। রহম করো আল্লাহ। প্রাণ ভিক্ষা দাও। ভিক্ষা দাও। আমার জানের বদলে তুমি রহিমার টা নাও..
কড়কড় শব্দে পরপর কয়েকটা বাজ পড়লো।

মজিদ বাড়ি ফিরলো মাগরিবের আজানের কিছু আগে। ততক্ষণে ঝড় থেমে গেছে বৃষ্টির গতিও কমে এসেছে। মজিদের বাড়ি ভর্তি লোক। বারান্দায় রহিমা শুয়ে আছে, তাকে ঘিয়ে মা চাচী গ্রামের মহিলারা। তাদের কেউ কেউ মজিদ কে দেখে নিজেদের ভেতর গুঞ্জন ভুলে চিৎকার করে কেঁদে উঠা তাদের দায়িত্ব মনে করলো। মুহূর্তে সে ক্রন্দন ও বিলাপ সন্ধ্যার অন্ধকার কে চিরে ছুঁটে গেলো চর্তুদিক। কিন্তু মজিদ নিরব। বজ্রপাতে রহিমার মৃত্যু হয়েছে শুনেও তার ভেতর কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। শোক দুঃখ সবকিছু যেন সে বিসর্জন দিয়ে এসেছে বটতলার মাঠে।
এশার কিছু পরেই রহিমার দাফন হয়ে গেল। সেই থেকে মজিদ কারো সাথে একটা কথাও বলেনি। মজিদ কে কেউ একবার কাঁদতেও দেখেনি। যারজন্য শক্ত পুরুষ বলে অনেকে তার মনবলের তারিফ করলো। গ্রামের অনেকে তাকে দিলো সান্তনা। মজিদের আর এমন কি বয়স বউ গেছে আবার বউ পাবে। তাছাড়া জমিজমা আছে আছে একটা চাকরিও। মজিদের জন্য মেয়ে পাওয়া কঠিন হবে না। কয়েকজন তো তাদের সন্ধানে থাকা বিবাহ উপযোগী মেয়ে নিয়েও নিজেদের ভেতর আলোচনা জুড়ে দিলো। এতো সব আলোচনার ভেতর এক মজিদ শুধু নিরুত্তর।
এখন অনেক রাত। আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মজিদ একা অন্ধকার ঘরে জেগে বসে আছে। রহিমার সাথে বিয়ের পর শেষ কবে সে একা থেকেছে মজিদ ভুলে গেছে। দীর্ঘ দশ বছরের দাম্পত্য জীবনে তাদের কোন সন্তান হয়নি। মজিদের বাড়িটা বরাবর ই নিরব আজ যেন রাজ্যের নিরবতা তাকে আরো চেপে ধরেছে। বৃষ্টির এই তুমুল শব্দের ভেতরও সে নিরবতা হিংস্র জন্তুর মতো সব শব্দের গলা চেপে ধরেছে যেন।
আজ ঘরে কেউ আলো জ্বালেনি, হারিকেন সলতেটা নামিয়ে দিয়ে কেউ বলেনি এবার ঘুমাও। ঘুমের ভেতর পিঠে কারো ঠান্ডা হাতের স্পর্শ আর পাওয়া যাবে না আজ। আজ এই রাতে সমগ্র পৃথিবীতে মজিদ ই যেন একমাত্র জীবিত মানুষ।
বাইরে অবিরাম বৃষ্টি পড়ছে। সে পতনের যেন শেষ নেই। মজিদ চমকে উঠলো। বারান্দায় কার যেন পায়ের শব্দ! ঐ তো কাঁচের চুড়ির শব্দ পেলো যেন মজিদ। “ রহিমা?” ক্ষণস্বরে ডেকে উঠলো সে। যদিও জানে কোন ডাকেই আজ আর রহিমা সারা দেবে না। কেও সারা দিলোও না। দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলো মজিদ, বারান্দা পেরিয়ে নেমে গেলো উঠনে। কিছুদূর যেয়েই হাঁটুভেঙে বসে পড়লো জলকাদার ভেতর, যেন পড়ে গেল! হ্যা, মজিদ কাঁদছে। তার দু চোখ বেয়ে নেমে আসা অশ্রু ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে রাতের এই অবিশ্রান্ত বারি ধারা।

মন্তব্য ২ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ১৫ ই মার্চ, ২০২০ রাত ১২:২৫

রাজীব নুর বলেছেন: অনেকদিন পর ব্লগে একটা ভালো গল্প পড়লাম।

২| ১৫ ই মার্চ, ২০২০ সকাল ১১:৫৪

নেওয়াজ আলি বলেছেন: বেশ ভালো লাগলো ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.