নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভাবছি ব্যবসা করবো। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

রাজীব নুর

আমি একজন ভাল মানুষ বলেই নিজেকে দাবী করি। কারো দ্বিমত থাকলে সেটা তার সমস্যা।

রাজীব নুর › বিস্তারিত পোস্টঃ

ধাবমান কালো চোখে আলো নাচে- ১৯ (ধারাবাহিক উপন্যাস)

০৬ ই মে, ২০১৮ বিকাল ৪:৩২



দিন শেষে নেমেছে সন্ধ্যা। গভীর হতে শুরু করেছে রাত। তখনো কেউ জানে না কী ভয়ঙ্কর, নৃশংস ও বিভীষিকাময় রাত আসছে বাঙালির জীবনে। ব্যস্ত শহর ঢাকা প্রস্তুতি নিচ্ছে ঘুমের। ঘরে ঘরে অনেকে তখন ঘুমিয়েও পড়েছে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে গজব নেমেছে। গুলির শব্দ আসছে। দেখা যাচ্ছে আগুনের ধোয়া। এক আকশ ভয়ে ওমর আলী তার পরিবার নিয়ে খাটের নিচে অবস্থান নিয়েছেন। পুরো বাড়ি অন্ধকার। শুধু ওমর আলীর বাড়ি না পুরো শহিদবাগ, শাহজাহানপুর এলাকা অন্ধকার। ভয়ে কেউ বাতি জ্বালায়নি। পুষ্প তার বাবাকে জিজ্ঞেস করছে বাবা আমরা খাটের নিচে লুকিয়ে আছি কেন? কি হয়েছে? এত বিকট শব্দ কেন? টাইগার একটু পরপর সরলা বিবি আর অমর আলীর নিষেধ অমান্য করে জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, শোনা যাচ্ছে- মুহুর্মুহ কামানের গর্জন, বিকট শব্দের তাণ্ডব। দালান-কোঠা মানুষজন সব গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির মতো চলছিল গোলাগুলি, আগুনের ফুলকি ছড়াচ্ছিল চতুর্দিকে।

এই ভয়াবহ অবস্থার মধ্যেও ক্ষুধা ঠিকই জানান দেয়। পুষ্প ক্ষুধা লাগছে, ক্ষুধা লাগছে, বলতে বলতে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। সরলা বিবি অন্ধকারের মধ্যেই রাতের খাবারের ব্যবস্থা করেন। আলু ভর্তা আর ভাত। খাটের নিচেই তারা অন্ধকারে রাতের খাবার শেষ করেন। খাওয়া শেষে দেখা গেল, তাদের সবার দাঁতে তেলাপোকার পা লেগে আছে। সরলা বিবি অন্ধকারে আলু ভর্তা করতে গিয়ে আলুর সাথে একটা তেলাপোকাও মিশে যায়। সেই তেলাপোকার পা দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকে।

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ। রাত সাড়ে ন'টা।
পাকিস্তানি সেনারা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নাম দিয়ে নিরীহ বাঙালী বেসামরিক লোকজনের ওপর গণহত্যা শুরু করে। গণহত্যার নির্দেশ দিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া গোপনে করাচির পথে ঢাকা ত্যাগ করেন। বাইরের পৃথিবী থেকে ঢাকা বিচ্ছিন্ন হলো। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বেতারের প্রচারও। কেউ বুঝতেই পারেনি কিন্তু ততক্ষণে খুলে গেছে নরকের দরজা। বাঙ্গালী হত্যা পুরো দেশজুড়ে চালানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো ছিল তাদের বিশেষ লক্ষ। একমাত্র হিন্দু আবাসিক হল - জগন্নাথ হল পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
পৃথিবীর জঘন্যতম এই গণহত্যার যেন কোন সাক্ষী না থাকে সেজন্য বিদেশী সাংবাদিকদের ২৬ মার্চ সকালে ঢাকা থেকে বের করে দেয়া হয়। সাংবাদিকদের সকল আলোকচিত্র, প্রতিবেদন ও নোট বই আটক করে একটি বিমানে তুলে দেয়া হয়। তারপরও সাইমন ড্রীং নামে এক সাংবাদিক ঢাকায় লুকিয়ে থেকে গোপনে ছবি ও প্রতিবেদন বিদেশে প্রেরণ করলে ওয়াশিংটন পোস্টের মাধ্যমে সারা পৃথিবীর মানুষ এই গণহত্যার সর্ম্পকে জানতে পারে। হৈ চৈ পড়ে যায় বিশ্বব্যাপী। কিন্তু পাকিস্তান সামরিক জান্তার অপর্কম আড়াল করার জন্য দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা বলে; এগুলো কোন গণহত্যার ছবি নয়,’ ৭০ এর ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের যে অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয় ঘটেছিল এগুলো তারই ছবি। (‘অপারেশন সার্চলাইট’ সম্পর্কে পাকিস্তানি পরিকল্পনার কথা জানা যায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানে ইস্টার্ন কমান্ডের জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক লিখিত ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থ থেকে।)

জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো বাঙালিদের দমনের অভিযান অপারেশন সার্চ লাইট শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। শুধুমাত্র পঁচিশে মার্চ রাতেই বাংলাদেশে প্রায় এক লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, যা গণহত্যার ইতিহাসে এক জঘন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। তিন হাজারের বেশি লোককে গ্রেফতার করা হয়। অসংখ্য ঘরবাড়ি, দোকান পাট আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। লুটপাট করা হলো মূল্যবান জিনিসপত্র। রক্ষা পায়নি রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও। মর্টার সেল ছুঁড়ে একে একে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ, জাতীয় প্রেসক্লাব ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। হানাদাররা চলার পথে রাস্তার দুই পাশে ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলে অসংখ্য নিরীহ, গরিব মানুষকে। মানুষের কান্না ও আর্তচিত্কারে ভারি হয়ে ওঠে শহরের আকাশ।
মধ্যরাতে ঢাকা পরিণত হলো লাশের শহরে। ঢাকার প্রায় ১০ লাখ ভয়ার্ত মানুষ গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেয়। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের এই পরিকল্পনাটি কার্যকর করার দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার টিক্কা খান। পরের দিন সকালে শহরের বেঁচে যাওয়া মানুষজন পালানোর স্থান ও প্রথম নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসাবে বুড়িগঙ্গা নদীর অপর পাড়ে অবস্থিত জিঞ্জিরার দিকে যাত্রা করে। সেখানেও গিয়েও হানাদার বাহিনী তাদের নির্মম ভাবে হত্যা করে।

রাত সোয়া ১টার দিকে এক দল সৈন্য শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। তারা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে। তখন শেখ মুজিব বীরের মতো দোতলার ঝুল বারান্দায় এসে দাঁড়ান। রাত ১টা ২৫ মিনিটের দিকে এ বাড়ির টেলিফোনের লাইন কেটে দেয়া হয় এবং শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় হায়েনার দল। অবশ্য গ্রেফতার হওয়ার আগেই ২৫ মার্চ মধ্যরাতের পর অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে শেখ মুজিব তত্কালীন ইপিয়ারের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতা ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দেন। আর এই ওয়্যারলেস বার্তা চট্টগ্রাম ইপিআর সদর দফতরে পৌঁছে। চট্টগ্রাম উপকূলে নোঙ্গর করা একটি বিদেশি জাহাজও এ বার্তা গ্রহণ করে। তখন চট্টগ্রামে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক জহুর আহমেদ চৌধুরী শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা সেই রাতেই সাইক্লোস্টাইল করে শহরবাসীর মধ্যে বিলির ব্যবস্থা করেন। ''এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উত্খাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক।''

একটু পেছনে ফিরে যাই-
৫৬ ভাগ বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ হবার পরও বাঙালির ওপর ষড়যন্ত্র করে পাকিস্তানিরা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উদু চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। বাঙালি গর্জে ওঠে এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে। নিরস্ত্র বাঙালির ওপর অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাক সেনারা, ঝরেছিল রক্ত। সেই রক্তে ভেজা মাটি কঠিন থেকে কঠিনতর হয়েছিল। ইতিহাস রচিত হয়েছিল ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে। ৫৮-তে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে লড়াকু উচ্চারণে। ৬২’র হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে শিক্ষা-আন্দোলন। তা থেকে ৬৪’র নির্বাচন। ৬৫’তে পাক-ভারত যুদ্ধ। এরপর ৬৬’র ‘৬ দফা’ বাঙালির জীবনের ‘জীয়ন কাঠি’। ৬ দফা ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাঙালি খুঁজে পেল তার ঠিকানা। ‘পূর্ব বাংলা শ্মশান কেন’, ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা / তোমার আমার ঠিকানা’ এবং কালজয়ী স্লোগান ‘জয়বাংলা’র মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি পেল তার আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি। আওয়ামী লীগ ৭ মার্চ ১৯৭১ এ একটি গণসমাবেশের আয়োজন করে। এই সমাবেশ এতই সফল ছিল যে পাকিস্তান সরকার সেনাছাউনি ও পূর্বপাকিস্তানের সরকারি প্রতিষ্ঠান কার্যাবলী সীমিত করে দিতে বাধ্য হয়।

যে প্রজন্ম বিকৃত ও বিভ্রান্ত ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে, সে প্রজন্মকে সত্যানুসদ্ধানের পথ দেখানোর দূরহ কাজটি শুধু ইতিহাসবিদদের ওপর ছেড়ে দেয়া উচিত নয়। এক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমও হতে পারে দৃঢ় ও মজবুত হাতিয়ার। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনকে শুধুমাত্র নামসবর্স্ব চেতনায় লালন না করে প্রকৃত ইতিহাসের আলোয় উদ্ভাসিত করাও একটি জরুরি ও অপরিহার্য উদ্যোগ।

মন্তব্য ১১ টি রেটিং +৩/-০

মন্তব্য (১১) মন্তব্য লিখুন

১| ০৬ ই মে, ২০১৮ বিকাল ৪:৪১

প্রান্তর পাতা বলেছেন: ভাইয়া প্রথম কমেন্ট ও লাইক। :)

০৬ ই মে, ২০১৮ বিকাল ৪:৫৮

রাজীব নুর বলেছেন: সবাই চা কফি দেয়। তাই আমি আইসক্রীম দিলাম

২| ০৬ ই মে, ২০১৮ বিকাল ৪:৫১

আবু আফিয়া বলেছেন: আলোচনার জন্য ধন্যবাদ

০৬ ই মে, ২০১৮ বিকাল ৪:৫৯

রাজীব নুর বলেছেন: ভালো থাকুন।

৩| ০৬ ই মে, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:১১

চাঁদগাজী বলেছেন:


সেই রাতে রব, নুরে আলম সিদ্দিকী, মনি, তোফায়েল, সিরাজুল আলম খান প্রমুখরা কি ইউনিভার্সিটি হলে ছিলো?

০৭ ই মে, ২০১৮ সকাল ১০:৫৭

রাজীব নুর বলেছেন: না।

৪| ০৬ ই মে, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:৫৬

প্রামানিক বলেছেন: অনেক গুরুত্বপূর্ণ পোষ্ট। পড়ে খুব ভালো লাগল। ধন্যবাদ

০৭ ই মে, ২০১৮ সকাল ১০:৫৭

রাজীব নুর বলেছেন: ভালো থাকুন।

৫| ০৬ ই মে, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:২৭

কাওসার চৌধুরী বলেছেন: বাহ!! রাজিব ভাই। চমৎকার লেখনি। অনেক নতুন তথ্য জানতে পারলাম।

০৭ ই মে, ২০১৮ সকাল ১০:৫৮

রাজীব নুর বলেছেন: অনেক শুভ কামনা।

৬| ০৬ ই মে, ২০১৮ রাত ১০:০১

পবন সরকার বলেছেন: চমৎকার লেখনি। ধন্যবাদ

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.