নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

নিজের মন থেকেই লিখি। কাউকে হেয় করার জন্যও না কাউকে উদ্দেশ্য করেও না। মানুষ মাত্রই ভুল, ভুল হলে শোধরিয়ে দিবেন; আশা করি।

রেযা খান

রেযা খান › বিস্তারিত পোস্টঃ

ভয়ংকর অভিজ্ঞতা, দুঃসহ স্মৃতি!

১৩ ই জুন, ২০১৮ বিকাল ৩:৫৮


গতকাল ১২/০৬/২০১৮ খ্রিঃ সকাল ৮.২০ টায় খাগড়াছড়ি শান্তি পরিবহনের কাউন্টারে গেলাম। উদ্দেশ্য লায়লাতুর ক্বদর গ্রাম এসে পালন করা।কাউন্টারে প্রবেশের পূর্বে আব্দুর রহমান ভাইকে পেলাম ( আমার পাশের গ্রামের, ডিফেন্সে চাকুরী করেন)। তিনি সকাল ৮.০০ টার টিকিট করেছেন, যদিও এখনও গাড়ির কোন সাক্ষাৎ তিনি পানিনি। কাউন্টারে গিয়ে টিকিট চাইলাম! কর্তব্যরত ম্যান বললেন, গাড়ি যাচ্ছে না। টানা তিনদিন বর্ষনের ফলে পাহাড় ধ্বস এবং পানিতে রাস্তা তলিয়ে যাওয়াই এর মূল কারণ। মনের মধ্যে পেরাশানি নিয়ে বাসায় ফিরে গেলাম। গিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে রাখলাম, সুযোগ হলেই যাতে রওনা দিতে পারি।
বিদ্যুৎ পূর্বরাত থেকেই ছিলো না বলেই অফিসে তেমন কাজ নেই।সকাল ৯.০০ টার দিকে আব্দুর রহমান ভাইকে অবস্থা জানার জন্য কল দিলাম । বললেন,গাড়ি আসেনি তাই তিনি লোকালে যাচ্ছেন। ১১.৩০ নাগাদ ডিডি স্যারকে বললাম, স্যার! আমি কাউন্টারে গিয়ে দেখি, যদি গাড়ি পাই চলে যাবো। স্যার ও সম্মতি দিলেন।
কাউন্টারে গিয়ে ১২.০০টার টিকিট পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।অনেক আগ্রহ নিয়ে গাড়িতে চড়ে বসলাম, দুপুর ১২.৩০ হয়েছে গাড়ি ছাড়ার কোন আলামত নেই। কিছুক্ষণ পর ড্রাইভার এসে বললো এই গাড়ি যাবে না, অন্য গাড়িতে আমাদের সিফট করে দিবেন। যায় হোক যেতে পারলেই হলো।দুপুর ১২.৪৫ এর দিকে অন্য গাড়িতে করে রাওনা দিলাম।
ঝুম ঝুম বৃষ্টি আর পাহাড়ের কান্না ভালোই লাগছে। দূরে থাকাতে মনে হচ্ছে! আকাশ, মেঘ, বৃষ্টি আর পাহাড় একে অপরকে আলিঙ্গন করছে। একদিকে খাগড়াছড়ির ঝুঁকিপূর্ণ রোড, অন্যদিকে অল্প অল্প পাহাড় ধ্বসে রাস্তার মাঝে মাটির স্তুপ, ড্রাইভারকে ভালোই পীড়া দিয়েছে। না বললে নয়, ড্রাইভার সাহেব খুবই ভাললোক ছিলেন,তার সাহস এবং ধৈর্য কখনো ভুলার নয়।
মহামুনি মানিকছড়িতে ৫ মিনিটের যাত্রা বিরতী ! অতিবৃষ্টি এবং রোজার কারণে সময়টা যাত্রীরা নেয়নি। কালক্ষেপণ না করে গাড়ি পুনঃরায় যাত্রা শুরো করলো। খাগড়াছড়ি সীমা (মানিকছড়ি) শেষ হতেই বাঁধা হয়ে দাড়ালো রাস্তায় হাঁটুপর পানি। অনেক গাড়ি আটকা পড়েছে, সামনে এগিয়ে যাওয়ার কেউ সাহস করছে না। আমাদের ড্রাইভার ইঞ্জিন বক্স খোলে চেলেঞ্জারের লাইন খোলে দিলেন। কেউ জানতে চাইলে বলেন, ইঞ্জিনে পানি না ঢুার জন্য এই ব্যবস্থা । পানির মধ্যেই যাত্রা শুরু করলে, এক কৃষি অফিসার তার প্রাইভেট গাড়ি বিদায় করে সঙ্গী-সাথী নিয়ে আমাদের গাড়িতে উঠলেন, যাত্রী কিছু কম থাকায় তিনিও সিট পেলেন।
পানির মধ্যে গাড়ি চলছে, রাস্তার পাশে লোকেরা মাছ ধরছে। পানির উচ্চতা কোথাও বেশী আবার কোথাও কম। এভাবে প্রায় ৩ কিলোমিটার (ফায়ার সার্বিস পর্যন্ত ছিলো) পানি পথ পাড়ি দিয়ে ফটিকছড়ি বিবির হাট এসে পৌঁলাম। । গাড়ির সবাই স্বঃস্তিবোধ করলো এই যেন মহাসাগর পাড়ি দিয়েছে। ফাটিছড়ি বৈয়রিয়ার হাট এসে দেখি তীব্র যানজট, সামেন গাড়ি যাচ্ছে না। ড্রাইভার নেমে দেখলো সামনে পানি , গাড়ি আর যাবে না। মহাসাগর পাড়ি দেওয়া বীর তো পানি দেখে ভয় পাওয়ার কথা না। আমরাও নেমে দেখলাম সত্যিই অনেক পানি যাওয়া যাবে না। একটু কমুক তারপর যাওয়া যাবে।
সময় তখন বিকাল ৩.৪০ হবে। পাশের দোকানে গিয়ে মোবাইলে চার্জ দিলাম, ভাগ্য ভালো চার্জার সাথে রেখেছি না হয় তাও হতো না। কিছু ইফতার কিনে নিলাম; বলা তো যায় না, কিছুক্ষণ পর যদি পাওয়া না যায় ! একদাগ চার্জ দিয়ে গাড়িতে ফিরে এলাম। যাওয়ার কোন ইঙ্গিত নেই। পরিবারের সাথে যোগাযোগ করলাম, বাবা বললো এক আত্মীয় মারা গেছে মাগরিবের পর জানাজায় অংশ গ্রহণ করতে হবে, সম্মতি দিলাম। শাহাদাত স্যার আর এরশাদ ভাইকে কল দিলাম।এরশাদ ভাইয়ের বাড়ি চারিয়া। জানি, এতো পানির মধ্যে কিছু করা যাবে না। তারপরও নিজের অবস্থান জানিয়ে রাখা ভালো।রহমান ভাইয়ের দেখা হলো, তিনি ৯.০০ টার গাড়িতে চড়লেও এখনো আটকা পড়ে আছে। পরবর্তীতে তিনি ও তার গাড়ি খাগড়াছড়িতে ফিরে গেছে।
মাগরিবের সময় হলো, গাড়িতে ইফতার করলাম। এখনো পানি কমছে না, গাড়িও চাড়ছে না। এশারের আযান হলো, আমাদের অবস্থান এখনো অনড়। মনের মধ্যে শূন্যতা অনুভব করলাম। হায় ! আজ ক্বদর রাত্রি, নামাযে শরিক হতে পারলাম না। আসে পাশে যে মসজিদ আছে তাও পানিতে তলিযে গেছে শোনেছি। রাত ১১.৩০, দুইজন ভাইকে সাথে নিয়ে ১০ টাকা করে সি.এন.জি ভাড়া দিয়ে উল্টো পথে বিবির হাট গিয়ে ফোর স্টার জামান হোটেল খাবার খেলাম। মান এবং খাবারের তুলনায় সাশ্রয়ী বলতে হয়।
অনেকেই গন্তব্য ত্যাগ করে, আবাসিক হোটেলে আশ্রয় নিয়েছে।গাড়িতেই যেহেতু রাত যাপন করার ইচ্ছে, আসার সময় একটা মশার কয়েলও নিলাম। এই দিকে শাহাদাত স্যার, এরশাদ ভাই, মা-বাবা,চাচ্চু,ছোটভাই সবাই মোবাইলে যোগাযোগ করে আমার অবস্থান জানতে চেয়েছে। তাদেরকে বলেছি ৩.০০টার সময় যেখানে আছি , এখনও সেখানেই অবস্থান করছি। মোবাইলে চার্জ কম হওয়ার কারণে মাঝে মাঝে মোবাইল বন্ধ রেখে তাঁদের চিন্তা আরো বৃদ্ধি করেছি। কিন্তু কি আর করা মোবাইল বন্ধ হলেতো যোগযোগই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তাই মাঝে মাঝে অন করে সবাইকে আমার অবস্থান জানিয়েছি। গাড়ির দরজা বন্ধ করে কয়েল জ্বালিয়ে সবাই একটু ঘুমিয়েছি। গাড়ির ভিতর প্যান্ট পাল্ঠিয়ে লুঙ্গিও পড়েছি।

সময় রাত ১.৩০, পানি একটু কমেছে! দূর থেকে ভেসে আসছে হুজুরের নাতের কন্ঠ। সালাতু সালাম দিচ্ছে অনেকেই। ক্বদর রাত্রি বলে কথা। কেউ কেউ সাহরীর জন্য ডাকছে। চেহেরী খাওয়া হলো না। পানি খেয়েই নিজেকে শান্ত রেখেছি। সময় রাত ২.৩০, সবাই ড্রাইভারকে বললাম, ভাই পানি অনেক কমেছে। এখন যেতে না পারলে আর হবে না। কিছুক্ষণ পর জোয়ার শুরু হলে, যাওয়া হবে না। সবাই উৎসাহ দিলাম। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিলেন, কিছুক্ষণ ইঞ্জিন গরম করলেন। তারপর রওনা দিলাম।
পানি একটু কমেছে দেখা যায়, রাস্তায় অনেক মানুষ মাছ ধরছে। আমরাও গাড়ির লাইটের আলোতে অনেক মাছ দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু ধরতে পারছি না! কিছু স্থানে তীব্র স্রোত! কিছু জায়গায় পানি বেশী। গাড়ির সবাই প্রার্থনা করছে। প্রায় ৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছি। এখন রাস্তায় পানি নেই। গাড়ির চলছে, কিছু দূর এগোতেই আবার পানি শুরু। অনেক পানি, আগের তুলনায় অনেক বেশী। ড্রাইভার ধৈর্য্য সহকারে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। পানির পরিমাণ বাড়ছে, গাড়ির লাইট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, যাত্রীদের থেকে একটা লাইট নিয়ে হ্যাল্পার সামনে ধরে রেখেছে, ড্রাইভার তার কৌশলে এগিয়ে যাচ্ছ্ েমাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, নৌকাতে ছড়ছি। সামনে দেখলাম একটা গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে আছে। চিন্তা আরো বেড়ে গেলো। সবাই উদ্বিগ্ন। বুক ধুরুহ ধুরুহ করছে। সবার মুখে আল্লাহ আল্লাহ জপ। সামনে রাস্তার মাঝখানে লাল বাতি দেখা যাচ্ছে, এগিয়ে যেতে দেখা যায় একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাকটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ কিংবা সাহস কোনটায় আমাদের নেই। যতই এগোচ্ছি, ট্রাক এ থাকা মানুষ গুলো হাত দিয়ে বাম দিকে ইশারা করছে। আমাদের ভয় আরো বেড়ে গেলো। কারণ বাম দিকে যাওয়ার মতো রাস্তা নেই। তারপরও দেখলাম ড্রাইভার বাম দিকে গাড়ি ঢুকিয়ে দিলো, একটু উঁচু স্থান হওয়াতে গাড়ির লাইট পানির উপর উঠাতে দেখলাম আমরা একটা ফিলিং স্টেশনে ঢুকে পড়েছি। ফিলিং স্টশনের (স্থানটার নাম ঝংকার) ভিতর দিয়ে গাড়ি ঘুরে আবার রাস্তায় নামলো। ঠিক আগের মতোও লাইট পানিতে তলিয়ে গেলো। কিছু দেখা যাচ্ছে না, চার্জ লাইটের আলোও কমে গেছে, সামনে দেখা যাচ্ছে না তেমন। ড্রাইভার বললো চার্জ লাইটটা একটু উঁচু করে ধরতে, যাতে পানিতে লাইটের প্রতিচ্ছবি পড়ে। সামনে এগিয়ে যেতে লাগলাম, পানি একবারে আমদের গাড়ির ভিতর প্রবেশ করেছ। শুধু আমাদের পায়ে লাগা বাকী। সবাই প্রর্থনা করছে, ড্রাইভারও আল্লাহ আল্লাহ করছে! ড্রাইভারের অবস্থা দেখে আমাদের ভয় আরো বেড়ে গেলো।আমি দোয়াই ইউনুস পড়ছি, আর বলছি, ইয়া গাউছে ভান্ডারী আল মাদাদ। ইয়া গাউছে জিলানী আল মাদাদ।
একটু সামনে এগোতে দেখি পানি একটু কমেছে। যতোই এগোচ্ছি ততোই পানি কমছে, অবশেষে আমরা পেড়েছি। সবাই আল্লাহামদুল্লিাহ বললো।

ফজরের আজান হচ্ছে, এই যেন অন্ধকার দূর হওয়ার পূর্ববাশ। কতোই না মিল, আমাদের বিপদও শেষ, ফজরের আজানও হচ্ছে। এর পরেও রাস্তায় পানি ছিলো। তবে আগের তুলনায় কম।চারিয়ায় এসে পানির পরিমান অরেকটু বাড়লো, তবে আগের তুলনায় তেমন আর কি! চোখে নিদ্রায় আসলো, ঘুম ভেঙ্গে দেখি আমরা চৌধুরী হাট এসেছি। কিছুক্ষণ পর অক্সিজেনে এসে পৌঁছলাম,সময় তখন ভোর ৪.৪৫। নামার সময় ড্রাইভারের সাথে হেন্ড শ্যাক করলাম। হাতে কিছু হাদিয়া দিলাম।নিতে চাইলো না। বললাম, খুশি হয়ে দিয়েছি। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, এগুলো দিয়ে ইফতার করবেন। অক্সিজেন থেকে বাসায় আসলাম ভোর ৫.০০( ১৩/০৬/২০১৮), এসে পরিষ্কার হয়ে, আল্লাহর শোকর আদায় করলাম।
চার ঘন্টার পথ, ১৭ ঘন্টায় পাড়ি, এই যেনআমার জীবনে দুঃসহ স্মৃতি, এবং ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ।

মন্তব্য ৯ টি রেটিং +৪/-০

মন্তব্য (৯) মন্তব্য লিখুন

১| ১৩ ই জুন, ২০১৮ বিকাল ৪:১১

ভুয়া মফিজ বলেছেন: সারা জীবন মনে রাখার মতোই অভিজ্ঞতা হয়েছে!

১৩ ই জুন, ২০১৮ বিকাল ৪:১৩

রেযা খান বলেছেন: হ্যাঁ দাদা। মনে থাকবে।

২| ১৩ ই জুন, ২০১৮ বিকাল ৪:২৫

কাইকর বলেছেন: অভিজ্ঞা

৩| ১৩ ই জুন, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:৩৪

বিচার মানি তালগাছ আমার বলেছেন: ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। আর কত বছর লাগবে মহাসড়ক পানি মুক্ত রাখতে?

১৩ ই জুন, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:১১

রেযা খান বলেছেন: আল্লাহ মালুম!

৪| ১৪ ই জুন, ২০১৮ সকাল ১০:২২

রাজীব নুর বলেছেন: দারুন এড ভেঞ্চার হয়েছে।

১৪ ই জুন, ২০১৮ সকাল ১১:৩৭

রেযা খান বলেছেন: হামমমম দাদা। ভয়ংকর অভিজ্ঞতা।

৫| ১৫ ই জুন, ২০১৮ রাত ১:২৫

মাহের ইসলাম বলেছেন: আপনার গল্প পড়তেই ভয় লাগছিল।
শুভ কামনা রইল।

১৯ শে জুন, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:২৭

রেযা খান বলেছেন: কৃতজ্ঞ

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.