নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

রাত বাড়ে, মাথার কাছের দেবদারু হয় অশ্বথ বৃক্ষ ..

রিম সাবরিনা জাহান সরকার

ভিনদেশী শহর ঘেরা স্ফটিকের দেয়াল// আটকে পড়া আমার হাজারো খেয়াল...।

রিম সাবরিনা জাহান সরকার › বিস্তারিত পোস্টঃ

হঠাৎ স্বর্ণকেশী! - ১

০৫ ই জুলাই, ২০১৮ রাত ২:১৭


আমি অনিক। সাদামাটা বৈচিত্রহীন। একঘেয়ে চরিত্র। তার উপর চেহারায় ভবঘুরে ভাব প্রকট। শুধু ভাবে নয়, আমি আসলেই ভবঘুরে। টাঙ্গাইলের ছেলে। স্কুল পেড়িয়েই ঘরছাড়া। ঢাকায় এসে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি মেসে থেকে নটরডেমে পড়েছি। তারপর বুয়েট আর বাউন্ডুলে হলজীবন। মাস্টার্সের সুযোগে আবারো নতুন করে ভবঘুরের ঝোলা কাঁধে জার্মানির মিউনিখে উড়াল দেয়া। সেই পড়াশোনার পাটও চুকে গেছে দিনকয়েক হল। ভিনদেশী এই শহরে কপালগুনে একটা চাকরিও জুটিয়ে ফেলা হয়েছে। সামনের মাস থেকে কাজ শুরু। এ মাসটা তাই বেকার।

সময়ের অভাবে পড়ে থাকা কাজের একটা লিস্ট বানিয়েছি। লিস্টের তিন নাম্বারে আছে দাঁতের ডাক্তার দেখানো। আজকে সকাল সাড়ে দশটায় টারমিন। টারমিন মানে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। জার্মানি আসা অবধি টারমিনে টারমিনে জীবন অতীষ্ঠ। ইউনিভার্সিটিতে থিসিসের প্রফেসরের সাথে দুই মিনিট কথা বলব। অফিসের দরজায় কড়া নেড়েই সেরে নেয়া যায়। কিন্তু না, তার জন্যেও টারমিন লাগবে। অতিমানবীয় প্রফেসর তার অতি ব্যস্ত ক্যালেন্ডার থেকে সপ্তাহদুয়েক পর দয়া করে সময় দিলেও দিতে পারেন। কিংবা নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, খুলবো, সবচেয়ে কাছের টারমিনই তিন সপ্তাহ পর। ঘোড়ার ডিম! মাঝে মাঝে খুব রাগ হয়।

ভয় ভয় লাগছে। দাঁতের ডাক্তারের প্রতি সহজাত ভীতি কাজ করে। বছর দুয়েক আগে একরকম বাধ্য হয়ে গেলাম ডেন্টিস্টের কাছে। চারটা আক্কেল দাঁত একসাথে পাল্লা দিয়ে মাড়ি ফুরে ভীষণ বেকায়দায় বেড়িয়ে আসছে। পুরো আক্কেলগুড়ুম হয়ে গেলাম। এই ছাব্বিশ বছর বয়সে এত আক্কেল আমি কই রাখি, মাননীয় স্পিকার? যাহোক, ঠিক হল, দুই দফায় দুই দিনে দুটো করে দাঁত তোলা হবে। তো প্রথম দফার দিনে হাশিখুশি সরল চেহারার ডাক্তারমশাই সাঁড়াশীর মত দেখতে কলিজা হিম করা বস্তুটা মাত্র হাতে নিয়েছে আর সাথে সাথে আমি গাঁক গাঁক করে অস্ফুট স্বরে ইংরেজীতে আপত্তি জানালাম। সবে তখন জার্মানিতে এসেছি। জার্মান জ্ঞান বলতে ওই গুটেন মর্গেন পর্যন্তই। জার্মান ডাক্তার আমার চিঁ চিঁ শুনে থমকে গেল। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে বলল, ''দেখো, তুমি কি বলছো, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমার ইংরেজী বেশী সুবিধের না। আমি আসলে ঘোড়ার ডাক্তার।'' এই পর্যায়ে আমি চরম অবিশ্বাস নিয়ে তার দিকে তাকালাম। কোন মতে বললাম, কি বল তুমি; ঘোড়ার ডাক্তার মানে কি?? উত্তরে সে হড়বড় করে বলল, ''আমি আসলে ঘোড়ার দাঁতের উপর বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। মাত্র কয়েক বছর হল আরো পড়াশোনা আর ডিগ্রি যোগ করে মানুষের দাঁতের ডাক্তারির লাইসেন্স নিয়েছি। এখনো সপ্তাহে তিন দিন মিউনিখের আশেপাশের খামারগুলিতে ঘুরে ঘুরে ঘোড়ার দাঁত তুলি। আর বাকি দুইদিন এই চেম্বারে বসি। ঘোড়ার সাথে তো আমার জার্মান, ইংরেজী কোনটাই বলতে হয় না। কিন্তু এখন তোমার মত অনেক বিদেশী রোগী আসে। আমার খুব সমস্যা হয় কথা বুঝতে। তুমি কি আমাকে কোন উপদেশ দিতে পারো যে কেমন করে আমি আরেকটু ভালো ইংরেজী শিখতে পারি? আর হ্যাঁ, কি যেন বলছিলে তুমি, আবার বল তো? কোন সমস্যা?'' আমার মনে হল ঝেড়ে একটা দৌড় দেয়া উচিত। একদম পেছন ফেরা যাবে না। কিন্তু আত্মায় কুলালো না। তার বদলে আমি দাঁত তোলার উঁচু চেয়ারের প্রখর আলোর নিচে তবদা খেয়ে ঝিম মেরে বসে থাকলাম।

সেই রোমহর্ষক ঘটনাই এখন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ভাবছি, যাব নাকি থাক আজকে? ডাক্তার যদি দাঁত ধরে নাড়াচাড়া দিয়ে অবস্থা আরো বেগতিক করে দেয়? শক্ত একটা যবের রুটি খেতে গিয়ে নিচের দাঁতের আনুবীক্ষনিক একটা অংশ ভেঙে গেছে। জার্মান রুটিও বটে। মাথায় মারলে মাথা ফেটে যেতে পারে। বাঙ্গালির ছেলে, কেন যে পাউরুটি ফেলে কাঠের টুকরা চিবাতে গেলাম! বাংলা ভাষার ব-বর্গীয় একটা গালি মনে আসছে। মেসে-হলে থাকার সুবাদে বঙ্গীয় ব- আর চ-বর্গীয় বিশেষ শব্দভান্ডারের ওপর ভালো দখল আছে। ঢোঁক গিলে বিশাল শক্তিশালী বাংলা গালিটা গিলে ফেললাম। বাইরে থেকে দাঁতটা দেখলে বোঝার উপায় নেই। কিন্তু জিভের ডগায় একটা অস্বস্তিকর অমসৃণতা সারাক্ষন উপস্থিতি জানান দিয়ে যাচ্ছে। নাহ, যাই; কারণ, এই টারমিন নেয়া হয়েছে তেরো দিন আগে। আজ না গেলে দেখা গেল তিন মাস পর আবার টারমিন পাওয়া যাবে। ততদিনে দেখা যাবে টিস্যু পেপারে মুড়ে দাঁত হাতে নিয়ে ঘুরছি। সুতরাং, যা থাকে কপালে, যাই আজকে। হক মাওলা!

ডাক্তারের চেম্বার বাসা থেকে খুব একটা দূরে না। লিন্ডউর্ম ষ্ট্রাসে ৫২। ষ্ট্রাসে মানে স্ট্রীট বা রাস্তা আর কি। মিনিট বিশেকের হাঁটা পথ। মাথার উপর এক আকাশ রোদ। হেঁটে যেতে খারাপ লাগবে না। আর সমস্যা তো দাঁতে, পায়ে তো নয়, প্রবোধ দিলাম নিজেকে। কানে হেডফোনটা গুঁজে বেরিয়ে পড়লাম। ধীর লয়ে বেজে চলছে এড শীরান। গানের নাম ফটোগ্রাফ। গানটার ভেতর এক ধরনের বিভ্রম আছে। বিভ্রম আমার ভালো লাগে।

ফুটপাথ ধরে পাশেই হাঁটছে আরেকজন। অল্পবয়সী এক তরুনী। বয়স পঁচিশেক হবে হয়তো। আমি অন্যমনস্ক। কিন্তু তার খুঁড়িয়ে চলা আমার দৃষ্টি এড়ালো না। ডান পায়ে অতিকায় প্লাস্টার। প্লাস্টার নিয়ে হাঁটাচলার সুবিধার জন্যে হাঁটু পর্যন্ত বিশেষ জুতা। আন্দাজ করার চেষ্টা করলাম, প্লাস্টার আর মেডিকেল বুট, সব মিলিয়ে এই তরুনীর ডান পায়ের ওজন কত হতে পারে। পাঁচ, দশ, নাকি পনেরো? আমার পায়ের হাল্কা স্নিকার্সের তুলনায় তো নিশ্চিত বেজায় ভারী। কিন্তু হাঁটার গতিতে আমরা সমান। আমার তাড়া নেই, তাই কচ্ছপ গতিতে হাঁটছি।

(চলবে)
২৯.০৬.২০১৮
মিউনিখ, জার্মানি

মন্তব্য ৮ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (৮) মন্তব্য লিখুন

১| ০৫ ই জুলাই, ২০১৮ ভোর ৪:১৮

কাওসার চৌধুরী বলেছেন: শুভেচ্ছা রইলো,


আপনার গল্প পড়ে হাসলাম। :-B এটি গল্প নাকি উপন্যাস হবে জানি না; তবে গল্পে যথেষ্ট রম্য আছে। গল্প বলার ভঙ্গি চমৎকার লেগেছে। জার্মান টারমিন শব্দটা পড়ে লন্ডনের অপারেশনের এপয়েন্টমেন্টের কথা মনে পড়ে গেল। লন্ডনে অপারেশনের জন্য এপয়েন্টমেন্ট পেতে বেশ বেগ পেতে হয়। কখনো ২-৩ মাস পর্যন্ত লাগে। :((

যাক ঘোড়ার ডাক্তার শেষ পর্যন্ত কেমন ট্রিটমেন্ট করে দেখা যাক; :( বিষয়টি interesting হবে।

০৬ ই জুলাই, ২০১৮ রাত ১০:০৭

রিম সাবরিনা জাহান সরকার বলেছেন: ধন্যবাদ উৎসাহের জন্যে। উত্তর দিতে দেরী হল, তাই ক্ষমাপ্রার্থী। এটাকে গল্পতেই শেষ করব।

২| ০৫ ই জুলাই, ২০১৮ সকাল ৯:০৯

লাবণ্য ২ বলেছেন: সুন্দর।

০৬ ই জুলাই, ২০১৮ রাত ১০:০৮

রিম সাবরিনা জাহান সরকার বলেছেন: ধন্যবাদ আপনাকে অনেক।

৩| ০৫ ই জুলাই, ২০১৮ সকাল ৯:১৩

পদ্ম পুকুর বলেছেন: আর্জেন্টিনা হারার পর থেকে থেকে মন্তব্য খরায় ভুগছি... :-B

০৬ ই জুলাই, ২০১৮ রাত ১০:১০

রিম সাবরিনা জাহান সরকার বলেছেন: উত্তর দিতে দেরী হল, তাই ক্ষমাপ্রার্থী। নতুন চাকরি। দৌড়ের উপর। ধন্যবাদ সময় নিয়ে পড়ার জন্যে।

৪| ০৫ ই জুলাই, ২০১৮ সকাল ১০:২০

রাজীব নুর বলেছেন: অনিক ভাই আপনার জন্য অনেক শুভ কামনা।
পুরান ঢাকা থেকে এখন আপনি আছেন জার্মান।
গ্রেট।
ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন।

০৬ ই জুলাই, ২০১৮ রাত ১০:১২

রিম সাবরিনা জাহান সরকার বলেছেন: আমিও ভাবছি অনিক মিয়া সামনে কি তেলেসমাতি কাণ্ড ঘটাবে। কলম নিয়ে বসলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.