নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ নামে দুপেয়ে দৈত্য-দানবের জন্যই;\nএকদিন মানুষকে মানুষ বলে ভাবতে লজ্জাবোধ করবে মানুষ।

আর্বনীল

আর্বনীল › বিস্তারিত পোস্টঃ

মুখোশের আড়ালে মুখোশ (রহস্য গল্প) – পর্ব – ২

২৭ শে জুলাই, ২০১৫ দুপুর ১২:০২



(এই গল্পের সমস্থ স্থান কাল চরিত্র এবং ঘটনার বর্ননা সম্পুর্ন কাল্পনিক। এড় সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই। গল্পের মুল পেক্ষাপট কিছুটা ভারতীয় চলচিত্র ‘জাতিস্বর’ থেকে অনুপ্রাণিত।)

‘বাবা বাড়িটা কেনার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই রাতে এটা ওটা স্বপ্ন দেখতেন। এবং সকালে ঘুম থেকে উঠেই সেসব স্বপ্নের দৃশ্য খুব সুক্ষভাবে ডায়রীতে লিখে রাখতেন। বাবার ঐ ডায়রীতেই একটা রাস্তার বর্ননা পড়েছিলাম মনে আছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে বাবার বর্ননা অনুযায়ী এই পাহাড়ি রাস্তাটা পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে। যে কারণে রাস্তাটা আমার কাছে খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। কিন্তু স্বপ্নের সাথে বাস্তবতা পুরোটা মিলে যায় কি করে? বাবাতো এর আগে এখানে কখনও আসেনি।’ এসব ভাবতে থাকে রোবেন। সে কিছুতেই কিছু মিলাতে পারছে না। ভাবতে হবে। প্রচুর ভাবতে হবে। আবীর বলল, পা’তো আর চলছে না বাপ! আর কতদূর? রোবেন বলল, আমরা খুব সম্ভবত চলে এসেছি। এখন কেউ একজনকে ডক্টর তাথৈ এর বাড়িটা কোথায় জিজ্ঞেস করে আগে ওখানে যেতে হবে। ‘ডক্টর তাথৈ! উনি আবার কে?’ রোবেন বলল, বাবা যার কাছ থেকে বাড়িটা কিনেছেন তিনিই ডক্টর তাথৈ। উনার সাথে একবার দেখা করা প্রয়োজন।

ডক্টর তাথৈ এর বাড়ি খুঁজে পেতে তেমন একটা বেগ পেতে হল না। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই বাড়ি পর্যন্ত পৌছে দিয়ে গেল। তাদেরকে এখন গেস্টরুমে বসানো হয়েছে। তাথৈয়ের সাথে এখনো দেখা হয়নি। আবীর বলল, আসে পাশেতো কোন পুরনো বাড়ি দেখিনি। তাছাড়া এই গ্রামে বাড়িঘর এবং লোকজনও বোধহয় কম। আসার পথে মাত্র দুজন লোক চোখে পড়েছে। আমার মনে হচ্ছে আমরা ভুল জায়গাতেই চলে এসেছি। ‘উহু ভুল হতে পারে না। আমরা ঠিক জায়গাতেই এসেছি’ রোবেন এ কথা বলতেই একজন মধ্যবয়সী মহিলা এসে ঘরে ঢুকল। আবীর রোবেনের কানের কাছে তার মুখটা এগিয়ে এনে বলল, উনিই কি ডক্টর তাথৈ? চেহারার সাথেতো নাম মিল খাচ্ছে না। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ‘সখিনা বানু’ টাইপ কোন নাম হবে। রোবেন জিজ্ঞেস করল, আপনিই মিস তাথৈ?
মহিলাটা বলল, না আমি মোমেনা। ডাক্তার আপার কাজকর্ম করি। উনি এখন একটু ব্যাস্ত আছেন। আপনারা অনেক দূর থেকে এসেছেন। হাত মুখ ধোয়ে খাওয়া-দাওয়া করে বিশ্রাম করুন। সন্ধ্যায় আপা আপনাদের সাথে কথা বলবেন।
আবীর বোধহয় কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই মহিলাটা রোবেনের হাতে একটা তোয়ালে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ঐ কোণায় বাথরুম আছে। আপনারা হাত মুখ ধোয়ে নিন। আমি খাবারের ব্যাবস্থা করছি।
রোবেন হাতে ঘড়ি দেখল ৩টা ৭মিনিট। সন্ধ্যা হতে আরো অনেক সময়। আবীর বলল, যাক বাবা শেষপর্যন্ত পেটের একটা ব্যাবস্থা হয়েছে। পেট ঠান্ডাতো দুনিয়া ঠান্ডা। হা হা হা।

সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট।
একটা অল্প বয়সী তরুনী চা নিয়ে ঘরে ঢুকল। মেয়েটা দেখতে অসম্ভব রুপতি। রোবেন একদৃষ্টিতে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল। যদিও মেয়েদের দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকার স্বভাব তার নেই। তবুও সে মেয়েটার চোখ থেকে চোখ সরাতে পারছে না। তার কেন জানি খুব জানতে ইচ্ছে করছে। মেয়েটা কি বিবাহিত? দেখে বুঝা যাচ্ছে না। হিন্দু মেয়েদের হাতে শাখা-পলা সিঁথিতে সিদুর এসব দেখে খুব সহজেই বুঝা যায়। কিন্তু মুসলমান মেয়েদের দেখে বুঝা যায়না। মেয়েটা চায়ের কাপ টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে একটা চেয়ারে বসল। আপনার বন্ধুকে দেখলাম বাইরে পায়চারী করছে। আচ্ছা! আপনাদের এখানে কোন সমস্যা হচ্ছেনা তো? রোবেন মাথা নেড়ে বলল, না আমাদের কোন সমস্যা হচ্ছে না।
মেয়েটা একটা চায়ের কাপ রোবেনের দিকে এগিয়ে দিল। আমি ডক্টর তাথৈ। আপনি নিশ্চয় রোবেন চৌধুরী। আপনার বাবার মুখে আপনার অনেক গল্প শুনেছি। নিন চা খান।
রোবেন চায়ের কাপে চুমুক দিল। আসলে আমি বাবার একমাত্র আপনজন ছিলাম কিনা। তাই হয়তো বাবা আপনাকে আমার সম্পর্কে একটু বাড়িয়েই বলেছে। তবে মজার ব্যাপার কি জানেন? বাবার মুখে যখন আপনার কথা প্রথম শুনেছিলাম। তখন মনে হয়েছিল আপনি মধ্যবয়স্ক একজন মহিলা হবেন। কিন্তু এখনতো দেখছি আপনি মোটামুটি একটা বাচ্চা মেয়ে। আপনার বোধহয় এখনও বিয়ে হয়নি। তাইনা?
তাথৈ হা হা হা করে হাসল। রোবেন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। মেয়েটার হাসিও সুন্দর। কিছু কিছু মেয়ে আছে যাদের দেখলেই ইচ্ছে করে অন্তত একবার এই মেয়েটার প্রেমে পরি। তাথৈও সেই মেয়েদের মধ্যে একজন।
তাথৈ বলল, অনেকদিন পর আজ এত হাসলাম। তাও আপনার জন্য। বাবা মা মারা গেছে আমার ১৬ বছর বয়সে। তারপর থেকে অনেকদিন আমি হাসি না। আর আমার বিয়ের কথা বলছেন! মাত্র কয়েকদিন আগেইতো ডাক্তারি পাশ করে বের হলাম। এখনই ওসব নিয়ে ভাবছিনা।
রোবেন বলল, তারমানে আপনি এখন মোটামুটি নিঃস্বঙ্গ জীবন যাপন করছেন। এ যাবত আমার দেখা মতে, নিঃস্বঙ্গ মানুষেরা কারো অল্প একটু সঙ্গ পেলে, তুচ্ছ কারনেও হাসে। আপনিও তাদের দলে। যাইহোক, আমরা ঐ বাড়িতে কখন যাচ্ছি?
হঠাৎ প্রশ্নটা শুনতেই তাথৈ এর হাসিমাখা মুখটা কেমন বিবর্ন হয়ে গেল। হালকা একটা ভয়ের ছাপও বোধহয় চোখে-মুখে ভেসে উঠেছে। রোবেন সাহেব! আপনার বাবা যাওয়ার পর প্রায় একটা বছর কেটে গেছে। উনি মারা গেছে জানিয়ে আপনি একটা চিঠিও দিয়েছেন আমাকে। তাই আমি ধরেই নিয়েছিলাম এই বাড়িতে আর বোধহয় কেউ আসবে না। কিন্তু আজ হঠাৎ মোমেনার মুখে যখন শুনলাম আপনারা এসেছেন। তখন একই সাথে আমি আনন্দিত এবং আপনাদের সামনের দিনগুলোর কথা ভেবে কিছুটা কষ্টও পাচ্ছি। তবে যাইহোক, আজ রাতটা আপনাদের এখানেই থেকে যেতে হবে। কাল সকালে চাচাকে দিয়ে আপনাদের যাওয়ার ব্যাবস্থা করব।
তাথৈ উঠে চলে গেছে। মেয়েটা কিছু একটা চেপে গেছে বুঝাই যাচ্ছে। এবং উনি কোন কারণে চাইছিলনা কেউ এই বাড়িটাতে আবার ফিরে আসুক। কিন্তু কেন? তাছাড়া সামনের দিনের কথা ভেবে কষ্ট হচ্ছে। এই কথাটাই বা কেন বলল? আর আমার দেয়া চিঠি! এই কথাটাই বা বলল কেন? উফ! পুরো ব্যাপারটা পরিস্কারতো হচ্ছে না-ই। বরং আরো ঘোলাটে রুপ ধারন করছে।

রাত তেমন বেশী হয়নি। ১১টা ৭মিনিট। আবীর ঘুমিয়ে পরেছে। কিন্তু রোবেনের ঘুম আসছে না। সে ব্যাগ থেকে তার বাবার লেখা ডায়রীটা বের করল। তখন এই ডায়রীটাকে কেবলই একটা ডায়রী ভাবলেও। এখন এটা শুধুমাত্র একটা ডায়রী নয়। এই মুহুর্তে এটা খুবই গুরুত্বপুর্ন একটা জিনিসে পরিনত হয়েছে। যেহেতু এর ভেতরের বর্ননার সাথে এখানকার রাস্তার মিল পাওয়া গেছে। রোবেন টেবিল ল্যাম্পের নীচে ডায়রীটা মেলে ধরল। ডায়রীর প্রথম বেশ কয়টা পৃষ্টা খালি। লেখা শুরু হয়েছে ‘২-ফেব্রুয়ারী’ এই পৃষ্টা থেকে। ডায়রীতে বাবার প্রথম লেখাটা এমন –

‘‘দু-একদিন ধরে রাতে আমি বেশ অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখছি। অদ্ভুত বলছি কারণ হল স্বপ্নটা দেখছি আমি ধারাবাহিকভাবে। অনেকটা ধারাবাহিক নাটক বা সিরিয়ালের মত প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্ব এভাবে। যেমন প্রথম দিন স্বপ্নটা যতটুক দেখে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তারপর দিন ঠিক এরপর থেকেই স্বপ্নটা আবার শুরু হয়। আরো পরিস্কার করে বলা যায়, ‘স্বপ্নের শুরুটা হয়েছে একটা রাজপ্রাসাদে। আমি সেখানে রাজকীয় পোশাক পরে একটা সিংহাসনে বসে আছি। কেউ একজনকে সেখানে ধর্ষনের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এবং আমি সেই অভিযোগের বিচার কার্য পরিচালনা করছি’। প্রথমদিন এতুটুকু দেখতেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। দ্বিতীয় দিন স্বপ্নটা শুরু হয় প্রথমদিনের শেষ অংশটা থেকে। সাধারণত কোন স্বপ্ন দেখলে সকালে স্বপ্নের ঘটনাটা আমার মনে থাকেনা। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এই স্বপ্নটা আমি ভুলে যাচ্ছিনা। এমনকি নিজে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেও না। স্বপ্নের দৃশ্যগুলো বরং সারাক্ষণই আমার মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়। এবং একধরনের চিনচিনে ব্যাথার জন্ম দেয়।’’

এতটুকু পড়েই রোবেন ডায়রীটা বন্ধ করল। বাবার এমন ধারাবাহিক ভাবে স্বপ্ন দেখার ব্যাপারটা মোটেও স্বাভাবিক লাগছে না। মানুষ আজ একটা স্বপ্ন দেখেতো আরেকদিন অন্য একটা। কিন্তু ধারাবাহিক ভাবে দেখে যাওয়া…? আচ্ছা! স্বপ্ন বিষয়ক কোন বই পড়লে কি এ ব্যাপারে কোন তথ্য পাওয়া যাবে? হয়তো যাবে। কিন্তু এমন কোন বইতো সাথে করে আনা হয়নি। মিস তাথৈকে বলে যদি কোন একটা বই যোগার করা যায়। এছাড়া মাথায় আর কিছুই কাজ করছেনা। টেবিলের উপর থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে রোবেন বাইরে এল। আকাশ অন্ধকার! বাবা এই অন্ধকারের নাম দিয়েছিল ‘কাজলা দিদির রাত্রী’ এই রাত্রীতে নাকি কাজলা দিদিরা সব মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায়। বাবার যতসব ছেলেমানুষি কথাবার্তা। বলেই নিজ মনে হেসে উঠল রোবেন। তারপর একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ঠোঁটের ভাজে রাখতেই হঠাৎ তার মনে হল, বাবার লেখাটার মাঝে অনেকগুলো গুরুত্বপুর্ন তথ্য আছে। এগুলো ধরে সামনে এগুনো যেতে পারে। সে মনে মনে কয়টা লাইন পয়েন্ট আকারে লিখে নিল এভাবে –

I. স্বপ্নের ধরনঃ ধারাবাহিক। (আজ যেখানে শেষ কাল সেখান থেকে শুরু)
II. স্থানঃ একটা রাজবাড়ি।
III.সাধারণত স্বপ্নের ঘটনা মনে থাকে না। কিন্তু এই স্বপ্নটা মনে থাকছে। শুধু যে থাকছে তা না। খুব ভালো ভাবেই থাকছে।
IV. স্বপ্নের ঘটনাঃ বিচারকার্য পরিচালনা।
V. স্বপ্নে পরিহিত পোশাকঃ রাজকীয় পোশাক।

রোবেন সিগারেটে একের পর এক টান দিতে লাগল। আচ্ছা! এই তথ্যগুলো থেকে কোন ব্যাখ্যা কি দাঁড় কারানো সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব! তবে এখনই ব্যাখ্যা দাড় করিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না। আরো একটু সময় নিতে হবে।

চলবে…।।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.