নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

আইএমএফ কেন ঋণের কিস্তি আটকে দিতে চায় ?

১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:০৩


একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে: "যে ব্যক্তি অর্থনীতি বোঝে না, সে রাজনীতিও বোঝে না।" বাংলাদেশের গত কয়েক বছরের পরিস্থিতি দেখলে মনে হয়, এই প্রবাদটি শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়, আমাদের শাসকদের জন্যও সমানভাবে সত্য। গত কয়েক বছরে একের পর এক শাসনব্যবস্থা এসেছে, প্রত্যেকে নিজেদের মতো করে 'গেম চেঞ্জিং' সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আর দিনশেষে সেইসব এক্সপেরিমেন্টের বোঝা এসে পড়েছে সাধারণ মানুষের কাঁধে।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সাল থেকে, তখন শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তখন তলানিতে, ডলার সংকটে বাজার টালমাটাল। উপায়ান্তর না দেখে সরকার আইএমএফের ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তিতে সই করল। শর্ত ছিল কঠিন: কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে, ব্যাংকিং খাতের ক্ষত সারাতে হবে , ডলার বিনিময় হার বাজারের হাতে ছেড়ে দিতে হবে এবং জ্বালানির ভর্তুকি তুলে বাজারভিত্তিক দাম নির্ধারণ করতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম প্রতি তিন মাস অন্তর বাড়াতে শুরু করল। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও, নীতিগত দিক থেকে সেখানে অন্তত একটা ধারাবাহিকতা ছিল।

কিন্তু ব্যাংকিং খাতে? সেখানে আওয়ামী লীগের নীতি ছিল কার্যত 'লুটপাটের ছাড়পত্র'। এস আলম গ্রুপ একাই পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক থেকে এক লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে উধাও হলো। ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ৭৭ থেকে ৯৮ শতাংশে ঠেকলো। আইএমএফ যখন সংস্কারের কথা বলছিল, সরকার তখন রাজনৈতিক মিত্রদের বাঁচাতে দেখেও না দেখার ভান করছিল। ফলস্বরূপ, ২০১৫ সালে যে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৯.৬ শতাংশ, তা প্রতি বছর কমতে কমতে আইএমএফের লক্ষ্যমাত্রার উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করল।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব নিল, তখন অর্থনীতি ছিল খুবই নাজুক । পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকের ৯২ লাখ আমানতকারী আর ১৮ হাজার কর্মীকে বাঁচাতে সরকার বাজেট থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং সুকুক বন্ডের মাধ্যমে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা ঢাললো। সিদ্ধান্তটার পেছনে মানবিক যুক্তি ছিল, কোটি আমানতকারীকে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু আইএমএফ এটাকে দেখল সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখে।

আইএমএফ বলল তোমরা জনগণের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে ব্যাংক বাঁচাচ্ছ কেন। এটা করলে একটা ভয়ংকর বার্তা যাবে যে ব্যাংক মালিকরা যত খুশি লুটপাট করুক শেষমেশ সরকার ঠিকই বাঁচাবে। এই মরাল হ্যাজার্ড তৈরি হলে ব্যাংকিং খাত কোনোদিনও ঠিক হবে না। তারা বলেছিল ব্যাংকের নিজস্ব সম্পদ বিক্রি করে দাও কিন্তু বাজেটের টাকা ঢেলো না। সমস্যা হলো বাংলাদেশের ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স ফান্ড এত ছোট যে এত বড় সংকট সামলানোর ক্ষমতা তার নেই। তাই বাধ্য হয়েই বাজেট থেকে টাকা দিতে হয়েছে কিন্তু এই কাজ আইএমএফের ভালো লাগেনি।

আর শুধু ব্যাংক প্রসঙ্গে না, অন্তর্বর্তী সরকার আরও বেশ কিছু জায়গায় হোঁচট খেয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা দিয়েছে ভর্তুকির প্রশ্নে। আওয়ামী লীগ কষ্ট করে হলেও বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছিল, সেই ধারাবাহিকতাটুকু অন্তত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ১৮ মাস ক্ষমতায় থেকে একবারও দাম বাড়ায়নি। হয়তো ভেবেছিল মানুষ এমনিতেই কষ্টে আছে, দাম বাড়ালে আরও ক্ষেপবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের মূল্য কত বড় সেটা এখন পরিষ্কার, আইএমএফের সাথে যে শর্ত ছিল ২০২৬ সালের মধ্যে ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে নেওয়ার, সেটা এখন পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে একটা সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা NBR-কে দুই ভাগ করবে। একটা দেখবে কর নীতি, আরেকটা দেখবে কর আদায়। আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরে এটা চাইছিল, কারণ এই দুটো একসাথে থাকলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, দুর্নীতি বাড়ে, রাজস্ব আদায় কমে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত ঘোষণা হতে না হতেই শুরু হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। রাজস্ব ক্যাডারের কর্মকর্তারা বিক্ষোভ করলেন, ক্যাবিনেট ডিভিশন আপত্তি তুলল, একজন জয়েন্ট সেক্রেটারি পর্যন্ত আদালতে মামলা করলেন। শেষমেশ কাজটা সম্পূর্ণ না করেই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে গেল। আর যে রাজস্ব ঘাটতির কথা বলছিলাম, FY25-এ কর-জিডিপি অনুপাত নেমে এসেছে মাত্র ৬.৫৬ শতাংশে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রায় সর্বনিম্ন।

সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের কথা আজ খুব মনে পড়ছে। তিনি বলেছিলেন, ২০২৫-এর শেষে নির্বাচন দিয়ে দিলে সংস্কারগুলো নির্বাচিত সরকারের হাতে তুলে দেওয়া যেত। কিন্তু নির্বাচন হলো ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলো। আইএমএফ আশা করেছিল, এত বড় ম্যান্ডেট নিয়ে আসা সরকার কঠিন সংস্কারে হাত দেবে। কিন্তু প্রথম দুই মাসেই চিত্রটা ভিন্ন।

বিএনপি সরকার এমন দুটো সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা আইএমএফ ভালো চোখে দেখছে না।প্রথমটা হলো ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্সে ১৮ক ধারা যোগ করা। এই ধারায় বলা হয়েছে, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের পুরনো মালিকরা চাইলে মাত্র ৭.৫ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে ব্যাংকের মালিকানা আবার ফেরত নিতে পারবেন। মানে চিন্তা করুন, সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা ঢেলেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক হাজার হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে, আর এরপর এস আলম বা এই গোষ্ঠীর মতো যারা ব্যাংক ডুবিয়েছে, তারা মাত্র দেড়-দুই হাজার কোটি টাকা দিয়ে ব্যাংক ফেরত পেয়ে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই অভ্যন্তরীণভাবে এই ধারার বিরোধিতা করেছিল বলে জানা গেছে।

আইএমএফ সরাসরি বলেছে এই ধারা থাকলে সংস্কারের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে সরকার এই বিশাল দায় চিরদিন টানতে পারবে না তাই পুরোনো মালিকরা টাকা নিয়ে ফেরত আসলে সরকারের উপর চাপ কমবে। কিন্তু যারা একবার ব্যাংক ডুবিয়েছে তারা ফিরে এলে আবার একই কাজ করবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই । দ্বিতীয়টা হলো NBR বিভাজন। অন্তর্বর্তী সরকার যে কাজটা শুরু করে অসম্পূর্ণ রেখে গেছে, বিএনপি সরকার সেটাকে এগিয়ে নেওয়ার বদলে "NBR আধুনিকীকরণ"-এর কথা বলছে। ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের সাথে বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু NBR modernization-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু সেটা আসলে split করা হবে কিনা সেটা এখনও পরিষ্কার না। যারা এই সংস্কারকে সমর্থন করেছিল তারা মনে করছে এটা আরেকটা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পথে হাঁটছে।

এর মধ্যে ইরান ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে গেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে আমাদের সিংহভাগ জ্বালানি আসে যা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে বিএনপিকে কিছুটা সহানুভূতি দেওয়া যায় কিন্তু আইএমএফ সহানুভূতিতে ঋণ দেয় না। তারা বসন্তকালীন বৈঠকে পরিষ্কার বলে দিয়েছে জুন মাসের কিস্তি দেওয়া হবে না। রাজস্ব সংস্কার হয়নি আর ব্যাংকিং সংস্কারও পিছিয়ে গেছে তাই আইএমএফ আর নমনীয় হবে না।

সামনে কী হতে পারে? সেটা নিয়ে ভাবলে একটু শঙ্কা হয়। বিএনপি যদি আইএমএফের শর্ত মানতে রাজি হয়, তাহলে বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়বে, কর বাড়বে, ভর্তুকি কমবে, আর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ আরও বাড়বে। যে দলকে মানুষ পরিবর্তনের আশায় ভোট দিয়েছে, সেই দল যদি এই কঠিন সিদ্ধান্তগুলো নেয় তাহলে জনপ্রিয়তা ধাক্কা খাবে। আর যদি না মানে, তাহলে আইএমএফের ঋণ আটকে যাবে, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আরও তীব্র হবে, দেশের ক্রেডিট রেটিং নামবে, আর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আরও সরে যাবে। এই উভয়সংকট থেকে বের হওয়ার সহজ কোনো পথ নেই।


আর্থিক খাতের সংষ্কার ব্যর্থতায় বাংলাদেশকে ঋণ দিতে অস্বীকৃতি আইএমএফের- দি ঢাকা ডায়েরী
ফটো কার্ড কৃতজ্ঞতা: এনায়েত চৌধুরী
https://www.thedhakadiary.com/public/news/16451




মন্তব্য ২ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৫২

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: আইএমএফ এর পরামর্শ নিলে দেশে দ্রব্যমূল্যর দাম বাড়ে
.......................................................................................
বিদেশী সংস্হার প্রথম কথাই হলো ভূর্তকি দেয়া যাবেনা ।
তারা গন মানুষের কথা ভাবেনা ।
তারা বিনিয়োগ করে লাভের জন্য, কৃষকের দুর্দশা তাদের
হিসাবে আসেনা ।

১৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:১৯

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: আইএমএফ থেকে লোন নিতে হলে তাদের কথা শুনতেই হবে । সাবসিডি না কমালে , কর আদায় না বাড়লে কোনো দেশের ইকোনমি মাথা তুলে দাড়াতে পারে না । যখন আয় কমে যাবে তখন সাবসিডি চাইলেও দিতে পারবেন না । তাই ধাপে ধাপে সাবসিডি উঠিয়ে নেয়া উচিত ।

বাংলাদেশে করাপশনের কারণে electricity and energy তে বিপুল টাকা খরচ হয় কেনাকাটায় । এটার দায় সরকারগুলোকেই নিতে হবে । আপনার ১১ টাকা উৎপাদন খরচ হলে ৭ টাকায় কিভাবে electricity দিবেন সাবসিডি ছাড়া ? তাই কিভাবে কম দামে উৎপাদন করা যায় সেটার খোজ করতে হবে ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.