নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সাহিত্য, সংস্কৃতি, কবিতা এবং সমসাময়িক সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে গঠনমুলক লেখা লেখি ও মুক্ত আলোচনা

ডঃ এম এ আলী

সাধারণ পাঠক ও লেখক

ডঃ এম এ আলী › বিস্তারিত পোস্টঃ

যেখানে খোদা নেই; সেই ঠিকানার সন্ধানে( একটি দীর্ঘ সুফি দার্শনিক আত্মজিজ্ঞাসা)

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:১৮


প্রথমেই জানাই আমার এই লেখাটি ব্লগার মরুভুমির জলদস্যুর লেখা “শরাব পিনে দে”
হতে উৎসারিত, তাই তাঁর প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা ।

সেই লেখাটিতে তিনি মির্জা গালিব এর বিখ্যাত শেরটি শোনান যা এখানে মির্জা গালিবের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে দিয়ে আলোচনা শুরু করব ।
ছবি-১ - মোঘল রাজদরবারে উর্দূ কবি মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ(১৮৬৮ এ মির্জা গালিব) মির্জা গালিব নামে অধিক পরিচিত

মির্জা গালিবের বিখ্যাত শের-
জাহিদ শরাব পিনে দে মসজিদ মে ব্যায়ঠ কর,
ইয়া ওহ জাগা বাতা দে যাঁহা খুদা নেহি।

ভাবানুবাদ
(খোদার ঘরে বসেই আমায় পান করতে দাও শরাব,
নয়তো এমন জায়গা দেখাও, যেখানে নাই আমার রব।)
এমন জায়গা দেখাও, যেখানে খোদা নেই…

কী আশ্চর্য এক প্রশ্ন!এ যেন কোনো কবির মুখ থেকে উচ্চারিত সাধারণ বাক্য নয় এ যেন একজন পথিকের হাতে তুলে দেওয়া এমন একটি প্রদীপ, যার আলো বাইরে পড়ার আগে নিজের মুখটিকেই আলোকিত করে।

মির্জা গালিবের এই শেরকে যদি কেবল মদ্যপানের পক্ষে একটি রসিক যুক্তি হিসেবে পড়ি, তবে আমরা হয়তো শব্দের শরীরটুকু দেখব; কিন্তু তার অন্তর্নিহিত রহস্যের দরজা খুলবে না।

কারণ সুফি কাব্যের জগতে শরাব সবসময় শরাব নয়, মসজিদ সবসময় মসজিদ নয়, কাফের সবসময় কাফের নয়, আর জান্নাতও কেবল কোনো দূরবর্তী বাগান নয়।
এসব কখনো কখনো মানুষের অন্তর্জগতের প্রতীক।
শরাব -ইশ্‌কের নেশা।
সাকি -রহমতের বাহক।
মসজিদ -অন্তরের মেহরাব।
কাবা -হৃদয়ের কেন্দ্র।
কাফের -অজ্ঞাত নফস।
জান্নাত -বিচ্ছিন্নতার অবসান।
আর খোদা -সেই হকিকত, যার বাইরে আর কোনো হকিকত নেই।


তখন গালিবের প্রশ্নটি হঠাৎ অন্যরকম হয়ে যায় এমন কোনো জায়গা দেখাও, যেখানে তিনি নেই।
মানুষের এক অদ্ভুত স্বভাব আছে সে জানতে চায় খোদার ঠিকানা কোথায়?

সে আকাশের দিকে তাকিয়ে স্রষ্টাকে খোঁজে, পাহাড়ে যায়, মরুভূমিতে যায়, মসজিদে যায়, খানকাহে যায়, দরগাহে যায়, কাবার দিকে মুখ ফেরায়, তসবিহ গোনে, জিকির করে, কিতাব পড়ে।সবই সুন্দর।কিন্তু কখনো কখনো সে নিজের হৃদয়ের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়তে ভুলে যায়।

সে জানতে চায় আল্লাহ কোথায়?কিন্তু খুব কম মানুষ প্রশ্ন করে আমার অন্তর কোথায়?
আমার অন্তর কি সত্যিই তাঁর দিকে মুখ করে আছে? নাকি কেবল আমার শরীর সিজদায় যায়, আর আমার নফস দাঁড়িয়ে থাকে অহংকারের মসনদে?আমি কি সত্যিই তাঁকে চাই?নাকি তাঁর কাছ থেকে শুধু তাঁর দানগুলো চাই?আমি কি তাঁকে ভালোবাসি? নাকি তাঁর দেওয়া জান্নাতকে ভালোবাসি?আমি কি তাঁর সন্তুষ্টি চাই?নাকি মানুষের চোখে ধার্মিক হওয়ার সম্মান চাই?
এই প্রশ্নগুলোই সুফির পথের শুরু।

কারণ শরিয়ত মানুষকে পথ দেখায়, তরীকত তাকে পথে হাঁটায়, মারিফাত তাকে পথের অর্থ বোঝায়, আর হকিকত তাকে দেখায় পথিক, পথ ও গন্তব্যের রহস্য কত গভীর।
মসজিদ বাইরে, মেহরাব ভেতরে, মসজিদ অবশ্য অবশ্যই পবিত্র স্থান।সিজদা সেও অবশ্যই পবিত্র।ইবাদতের স্থান অবশ্যই সম্মানের।

কিন্তু সুফি প্রশ্ন করেন যে হৃদয় সিজদা করছে, সেই হৃদয়টির অবস্থা কী?কারণ মানুষ মসজিদের মেঝে পরিষ্কার করতে পারে, কিন্তু নিজের অন্তরের ধুলো পরিষ্কার করা অনেক কঠিন।সে অজু করতে পারে পানিতে, কিন্তু নফসের অহংকার ধুতে পারে কি?সে কিবলার দিকে মুখ করতে পারে,কিন্তু নিজের স্বার্থপরতার দিক থেকে মুখ ফিরাতে পারে কি?সে কোরআন পড়তে পারে,কিন্তু কোরআনের আয়না নিজের ওপর ধরতে পারে কি?সে তসবিহ গুনতে পারে,কিন্তু এমন একটি মুহূর্ত আসে কি, যখন তসবিহের দানা গোনা বন্ধ হয়ে যায় এবং হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনই জিকির হয়ে ওঠে?এইখানেই বাহ্যিক ইবাদত আর অন্তরের ইহসান একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়।

নফস অন্তরের সবচেয়ে গোপন পর্দা সুফি সাধনায় সবচেয়ে বড় শত্রু অনেক সময় বাইরে নয়।সে বসে আছে ভেতরে।তার নাম নফস।নফস সবসময় বলে আম আমি জ্ঞানী, আমি ধার্মিক, আমি পবিত্র, আমি সত্যের মালিক, আমি অন্যদের চেয়ে ভালো,আমি জানি কে কাফের, আমি জানি কে মুমিন, আমি জানি কে পাপী, আমি জানি কে জান্নাতে যাবে।

কিন্তু মারিফাতের দরজায় এসে মানুষ যখন সত্যিই নিজের দিকে তাকায়, তখন সে বুঝতে শুরু করে সবচেয়ে বড় অজ্ঞতা অন্যকে না চেনা নয়;নিজেকে না চেনা।লালনের ভাবনার সঙ্গে এখানেই সুফি পথের আশ্চর্য মিল।লালন বলেন মনের মানুষ কে খুঁজতে হলে আগে নিজের মনকে চিনতে হবে।
কারণ যে নিজের ঘর চেনে না, সে কীভাবে পরমের ঠিকানা চিনবে? আমরা সারাজীবন খোদা শব্দটি উচ্চারণ করি, কিন্তু যে আমি শব্দটি উচ্চারণ করে খোদাকে ডাকছি সেই ‘আমি’ কে?
এই প্রশ্নের মধ্যে ঢুকতে ঢুকতেই শুরু হয় নফসের পর্দা সরানোর কাজ।

ইশ্‌ক যেখানে যুক্তির প্রদীপ নিভে যায় রুমি-প্রেরিত সুফি ভাবনার সবচেয়ে উজ্জ্বল শব্দগুলোর একটি ইশ্‌ক।
ছবি : তুরস্কের বুকাতে রুমির ভাস্কর্য

মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি ১৩শ শতাব্দীর একজন ফার্সি সুন্নি মুসলিম, কবি,
আইনজ্ঞ, ইসলামি ব্যক্তিত্ব, ধর্মতাত্ত্বিক, অতীন্দ্রিয়বাদী এবং সুফী ছিলেন

রুমির মরমি কাব্যের সেই চিরন্তন সুর
ইশ্‌কের কসাইখানায়
কেবল শ্রেষ্ঠরাই নিহত হয়;
দুর্বলদের জন্য সেখানে কোনো স্থান নেই।
প্রেমের এই মৃত্যুকে ভয় পেয়ো না-
যে প্রেমে নিহত হয়নি,
সে তো এখনও সত্যিকার অর্থে বাঁচেনি।

এখানে ‘মৃত্যু’ দেহের মৃত্যু নয়; এটি নফসের মৃত্যুঅহংকারের মৃত্যু, পৃথক আমি’-র মৃত্যু। সুফির কাছে এটাই ফানা নিজেকে হারিয়ে ফেলা সেই পরম প্রেমে, যার মধ্যে হারিয়েই আবার বাকা বা নতুন অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায়।
তাই রুমির ইশ্‌ক যেন বলে-
তুমি প্রেমকে পেতে যেও না;
প্রেমের হাতে নিজেকে সমর্পণ করো।
কারণ প্রেম যখন সত্যিই আসে,
সে তোমাকে তোমার কাছ থেকেই নিয়ে যায়।
আর তখন প্রশ্ন থাকে না;
আমি কোথায় তাঁকে খুঁজব?
কারণ ইশ্‌কের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ আবিষ্কার করে;
যাঁকে এতদিন বাইরে খুঁজেছি,
তাঁরই নূর আমার অন্তরের গভীরে
নীরবে জ্বলে ছিল।


তাই ইশ্‌ক কেবল ভালোবাসা নয়।এ এমন আগুন, যেখানে প্রেমিকের পুরোনো পরিচয় পুড়ে যায়।ইশ্‌ক বলে তুমি যতক্ষণ বলছ আমি, ,ততক্ষণ তুমি দূরে।যেদিন তোমার আমি ধীরে ধীরে গলে গিয়ে শুধু তুমি থাকে সেদিন দূরত্বের অর্থ বদলে যায়।
রুমি-সুলভ সেই প্রেমে মানুষ খোদাকে ভালোবাসতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের অহংকারকে হারায়।
এ কারণেই সুফি পথের প্রেম কখনো আরামদায়ক নয়।এ প্রেম নীজকে ভেঙে দেবে।নীজ অহংকার ভাঙবে।নীজের মিথ্যা নিরাপত্তা ভাঙবে। নিজের সম্পর্কে বানানো গল্প ভাঙবে।

মানুষ যে নিজেকে এতদিন খুব ধার্মিক, খুব জ্ঞানী, খুব ভালো মানুষ মনে করেছিলে ইশ্‌ক এসে সেই আয়নাটি তার সামনে ধরে বলবে এবার নিজের সত্যিকারের মুখটি দেখো।
শরাব কোন নেশার কথা বলে কবি? হাফিজের কাব্যজগৎ আমাদের শেখায়, সুফি কবিতার “মদ”কে আক্ষরিক অর্থে পড়লে তার বহুস্তরীয় প্রতীকী ভাষা হারিয়ে যায়।সেখানে ময়খানা হতে পারে অন্তরের গোপন আঙিনা।সাকি হতে পারে রহমতের বার্তাবাহক।
ছবি : হাফেজ শিরাজি, মহাকবি হাফেজ

হাফেজ শিরাজি, মহাকবি হাফেজ, আসল নাম শামসুদ্দিন মোহাম্মদ হলেন একজন ইরানী বা ফার্সি কবি যিনি বুলবুল-ই-শিরাজ উপাধিতে ভূষিত হন।

আমাদের আলোচনার ইশ্‌ক, মদ, সাকি, প্রিয়তম এবং বাহ্যিক ধর্মের সীমা অতিক্রম করে অন্তরের সত্যের সন্ধান এই ধারার সঙ্গে হাফিজের একটি বিখ্যাত গজল বিশেষভাবে মানানসই। এটি তাঁর দেওয়ান-এর অন্যতম প্রসিদ্ধ গজল, যার প্রথম পংক্তি শুরু হয় শিরাজের তুর্ক যদি আমার হৃদয় জয় করে… দিয়ে।
হাফিজের গজল যদি সেই শিরাজি তুর্ক…
اگر آن ترک شیرازی به دست آرد دل ما را
به خال هندویش بخشم سمرقند و بخارا را
بده ساقی می باقی که در جنت نخواهی یافت
کنار آب رکن آباد و گلگشت مصلی را
ز عشق ناتمام ما جمال یار مستغنی است
به آب و رنگ و خال و خط چه حاجت روی زیبا را
حدیث از مطرب و می گو و راز دهر کمتر جو
که کس نگشود و نگشاید به حکمت این معما را
এর একটি ভাবানুবাদ হতে পারে-
হাফিজের ইশ্‌ক প্রিয়তমের কাছে সবকিছু বিসর্জন
যদি সেই শিরাজি তুর্ক আমার হৃদয়টি জয় করে নেয়,
তার মুখের একটি কালো তিলের বিনিময়ে
আমি দিয়ে দেব সমরকন্দ ও বুখারা।

হে সাকি, ঢেলে দাও সেই অবশিষ্ট মদ-
কারণ স্বর্গেও তো পাওয়া যাবে না
রুকনাবাদের তীর,
মুসাল্লার সেই ফুলে-ভরা পথ।
আমাদের অসম্পূর্ণ প্রেমের তো
প্রিয়তমের সৌন্দর্যের কোনো প্রয়োজনই নেই;
এত সুন্দর যে মুখ,
তার আবার রং, অলংকার, তিল কিংবা রেখারই বা কী প্রয়োজন?
তাই আজ গায়ক আর মদের কথা বলো,
জগতের রহস্যের হিসাব কষো না এত;
কারণ এই মহারহস্য
বুদ্ধির দ্বারা কেউ খুলতে পারেনি,কেউ পারবেও না।

হাফিজের কবিতার বিশেষ সৌন্দর্য এখানেই প্রিয়তমএকই সঙ্গে মানবপ্রেমের এবং সুফি-ভাবনায় পরম প্রিয়তমের প্রতীক হতে পারে। তাঁর “মদ”ও তাই কেবল পানীয় হিসেবে পড়লে কবিতার একটি স্তর ধরা পড়ে; সুফি পাঠে তা ইশ্‌কের নেশা ও আত্মবিস্মৃতির প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যাত হয়েছে। তবে হাফিজের কবিতাকে সম্পূর্ণভাবে কেবল সুফি রূপক হিসেবে পড়া নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে।

আর আমাদের আগের ইবনুল আরাবি–রুমি–লালন প্রসঙ্গে সবচেয়ে সুন্দর সংযোগটি সম্ভবত এই জায়গায়:
ইবনুল আরাবির কাছে হৃদয় হয়ে ওঠে এমন এক স্থান, যেখানে অসংখ্য রূপে তাজাল্লি ঘটে; রুমির কাছে ইশ্‌ক মানুষকে তার ‘আমি’ থেকে মুক্ত করে; আর হাফিজের কাছে প্রেম এমন এক আগুন, যেখানে সমরকন্দ-বুখারার মতো সমগ্র জগতের মূল্যও প্রিয়তমের এক বিন্দু সৌন্দর্যের কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়।[/sb
অর্থাৎ তিনজনের ভাষা আলাদা হলেও অন্তর্গত প্রশ্নটি একই-

যাকে ভালোবেসেছি, তার কাছে আমি শেষ পর্যন্ত কী রেখে দিব আমার সম্পদ, আমার অহংকার, নাকি আমার ‘আমি’-টুকুও?
শরাব হতে পারে ইশ্‌কের সুধা।আর নেশা হতে পারে আত্মবিস্মৃতি।কিন্তু কেমন আত্মবিস্মৃতি?দুনিয়া ভুলে যাওয়ার নয়-
নিজের অহংকার ভুলে যাওয়ার যে নেশায় মানুষ অন্যকে তুচ্ছ করতে শেখে, তা নফসের নেশা।যে নেশায় মানুষ নিজের অহংকার ভুলে গিয়ে অন্যের জন্য কাঁদতে শেখে, তা ইশ্‌কের নেশা।এক নেশা মানুষকে অন্ধ করে।আরেক নেশা মানুষের অন্তরের চোখ খুলে দেয়।এক নেশা বলে আমি। অন্য নেশা বলে তুমি।আর ইশ্‌কের সর্বোচ্চ মুহূর্তে আমি আরতুমি। -র ব্যবধানও যেন এক রহস্যে বিলীন হতে থাকে।

ফানা-আমি কোথায় গেলাম? সুফি দর্শনের একটি গভীর শব্দ ফানা।ফানা মানে নিছক অস্তিত্বের ধ্বংস নয়।আধ্যাত্মিক অর্থে এটি অনেক বেশি সূক্ষ্ম অহংকারের বিলয়, পৃথকত্বের দাবির ক্ষয়, নিজের ‘আমি’-কেন্দ্রিকতার অবসান।যে মানুষ এতদিন বলত আমার জ্ঞান,আমার সম্পদ,আমার মর্যাদা, আমার ধর্মীয় পরিচয়, আমার সাধনা, আমার পুণ্য।একদিন সে বুঝতে শুরু করে কিছুই তো সত্যিকার অর্থে ‘আমার’ নয়।শ্বাসটিও ধার করা।

জীবনটিও আমানত।প্রতিভাটিও দান।সুযোগটিও দান।ভালোবাসার ক্ষমতাটিও দান।এমনকি তাঁকে খোঁজার আকাঙ্ক্ষাটিও তাঁরই দেওয়া।তখন মানুষ নিজের দিকে তাকিয়ে বলে আমি যে ‘আমি’কে এতদিন সত্য বলে ধরে রেখেছিলাম, সে আসলে কতটা ক্ষণস্থায়ী!এই উপলব্ধির আগুনেই নফসের অনেক পর্দা পুড়তে থাকে।

কিন্তু ফানার পরে? বাকা , সুফি পথ শুধু বিলীন হয়ে যাওয়ার কথা বলে না।আছে-
বাকা। অর্থাৎ সেই উপলব্ধির মধ্যে স্থিত হওয়া; এমনভাবে ফিরে আসা, যেখানে মানুষ পৃথিবী থেকে পালিয়ে যায় না, বরং পৃথিবীর মধ্যে থেকেই অন্যভাবে বাঁচতে শেখে।ফানার পরে মানুষ আর বলে না আমি সবার ওপরে।বরং বলে আমি সবার সেবক।ফানার পরে জ্ঞান অহংকার হয় না হয়ে ওঠে বিনয়।ধর্ম বিচার করার অস্ত্র হয় না হয়ে ওঠে করুণা।ইবাদত আত্মম্ভরিতা হয় না হয়ে ওঠে কৃতজ্ঞতা।আর মানুষ অন্যের ভুল দেখার আগে নিজের অন্তরের আয়না পরিষ্কার করে।

ইকবাল, ফারাজ ও সেই অন্তরের দরজা।

মুহাম্মদ ইকবাল বা আল্লামা/স্যার মুহাম্মদ ইকবাল

ধর্মীয় ও ইসলামী রাজনৈতিক দর্শনের জন্যও মুসলিম বিশ্বে বিশেষভাবে সমাদৃত
মির্জা গালিবের শের এর প্রেক্ষিতে ইকবালের জবাব-
মসজিদ খুদা কা ঘর হ্যায়, পিনে কি জাগা নেহি,
কাফির কে দিল মে যা, যাঁহা পার খুদা না হো।

ভাবানুবাদ
(মসজিদ খোদার ঘর, হেথা মদ্যপান মানা,
যাও কাফেরের দিলে, যেথায় খোদার নেই ঠিকানা)

এটি বাহ্যিক আদব ও পবিত্রতার কথা মনে করিয়ে দেয়।এটি গুরুত্বপূর্ণ।কারণ সুফিবাদ কখনো নৈতিকতা বা ধর্মীয় শৃঙ্খলার সম্পূর্ণ অস্বীকার নয়।

কিন্তু ফারাজের জবাব যেন আরেকটি জানালা খুলে দেয়।
ছবি : ফারাজ ওয়ারসি

ফারাজ ওয়ারসি তিনি একজন সুপরিচিত তরুণ সুফি কবি ও গীতিকার। Sufinama-এর মতো সুফি সাহিত্য প্ল্যাটফর্মে তাঁর আধ্যাত্মিক মনকবত, গজল এবং সুফি ঘরানার কালাম বেশ জনপ্রিয়।
কাফির কে দিল সে আয়া হুঁ মেঁ এ দেখ কার,
খুদা মওজুদ হ্যায় ওয়াহাঁ, পার উসে পতা নেহি।

ভাবানুবাদ
(কাফেরের মনে দিয়ে উঁকি এসেছি দেখে,
সেখানেও খোদা আছে, জানেই নেই কাফেরের।)
যাকে তুমি কাফের বলে দূরে সরিয়ে দিলে, তার হৃদয়ের গোপন কক্ষে হয়তো এমন এক নূর আছে, যার খবর সে নিজেও জানে না।কী গভীর কথা!

মানুষ নিজেই কখনো কখনো নিজের ভেতরের নূর সম্পর্কে অজ্ঞ।তার মধ্যে যে করুণা আছে, সে জানে না।তার মধ্যে যে প্রেম আছে, সে জানে না।তার মধ্যে যে অনুতাপ আছে, সে জানে না। তার মধ্যে যে সত্যের ক্ষুধা আছে, সে জানে না।সে শুধু নিজের পরিচয়ের খোলসটুকু জানে।আর খোদা হয়তো খোলসের চেয়ে গভীরে তাকান।

তাজাল্লি হঠাৎ আলো এসে পড়ে ইবনে আরাবির( ১১৬৫ খৃষ্টাব্দে আন্দালুসিয়া বা বর্তমান স্পেনের মূর্সিয়া নগরী তে জন্ম গ্রহণ করায় তাকে আন্দালুসি ও আল-মূর্সি বলা হয়।) সুফিতত্ত্বে তার অনবদ্য অবদানের কারণে তিনি শেখ আল আকবর মুহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি নামেই সমধিক পরিচিত ।
ছবিঃ সুফি কবি ইবনে আরাবি


ভাবনার আলোয় তাজাল্লি পরম সত্যের প্রকাশ বা উদ্ভাসএক গভীর রহস্য।
ইবনুল আরাবির সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতাংশগুলোর একটি:
لَقَدْ صَارَ قَلْبِي قَابِلًا كُلَّ صُورَةٍ
فَمَرْعًى لِغِزْلَانٍ وَدَيْرٌ لِرُهْبَانِ
وَبَيْتٌ لِأَوْثَانٍ وَكَعْبَةُ طَائِفٍ
وَأَلْوَاحُ تَوْرَاةٍ وَمُصْحَفُ قُرْآنِ
أَدِينُ بِدِينِ الْحُبِّ أَنَّى تَوَجَّهَتْ
رَكَائِبُهُ فَالْحُبُّ دِينِي وَإِيمَانِي
এর একটি প্রচলিত ইংরেজি অনুবাদ হলো: My heart has become capable of every form…এবং শেষে: I follow the religion of Love… Love is my religion and my faith. এটি Tarjumān al-Ashwāq, কবিতা XI-এর ১৩–১৫ নম্বর পঙ্‌ক্তি হিসেবে সংরক্ষিত।
এর ভাবানুবাদ বাংলায় করলে দাঁড়ায়-
আমার হৃদয় এখন প্রত্যেক রূপ ধারণের উপযোগী-
সে কখনো হরিণের চারণভূমি, কখনো সন্ন্যাসীদের উপাসনালয়,
কখনো মূর্তির মন্দির, কখনো তীর্থযাত্রীর কাবা,
কখনো তাওরাতের ফলক, কখনো কুরআনের পবিত্র পৃষ্ঠা।
আমি প্রেমের ধর্ম অনুসরণ করি
প্রেমের উটের কাফেলা যেদিকে মুখ ফেরায়,
সেদিকেই আমার ধর্ম,
সেদিকেই আমার ঈমান।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ইবনুল আরাবির নিজের ব্যাখ্যার সঙ্গে এই পঙ্‌ক্তিগুলোকে পড়লে সব ধর্ম একই এমন সরলীকরণ করা ঠিক হবে না। তাঁর ব্যাখ্যায় ধর্ম-ই-ইশ্‌কমূলত আল্লাহর প্রতি প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার আধ্যাত্মিক অবস্থাকে নির্দেশ করে; তাঁর Dhakhā’ir al-A‘lāq-এর ব্যাখ্যার সঙ্গে এই পঙ্‌ক্তির সম্পর্কও গবেষণায় বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

মানুষ অনেক সময় ভাবে, আধ্যাত্মিক জ্ঞান মানে অনেক কিছু জানা।কিন্তু কখনো কখনো মারিফাত জ্ঞান সঞ্চয় নয়; বরং পর্দা সরে যাওয়া।যেমন সূর্য সবসময় ছিল,মেঘ সরে গেল, সূর্য নতুন করে জন্মাল না।তেমনি হয়তো হৃদয়ের গভীরে নূরের সম্ভাবনা সবসময় ছিল।শুধু নফসের মেঘ তাকে ঢেকে রেখেছিল।একদিন কোনো অশ্রু,কোনো বিচ্ছেদ,কোনো দুঃখ,কোনো প্রেম,কোনো নিঃসঙ্গ রাত,কোনো গভীর সিজদা,অথবা কোনো অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে একটি পর্দা সরে গেল, আর মানুষ বলল আহা! তিনি তো এখানেই ছিলেন!

হয়তো এটাই সেই হৃদয়, যার সন্ধান লালনের মনের মানুষএর কাছে;
হয়তো এটাই রুমির ইশ্‌কএর আগুনে পুড়ে স্বচ্ছ হওয়া হৃদয়;হয়তো এটাই ইবনুল আরাবির সেই ক্বালবযেখানে তাজাল্লির অসংখ্য রূপ প্রতিফলিত হয়।

হৃদয় যখন নফসের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়, তখন সে আর কেবল একটি পরিচয়ের ঘর থাকে না সে হয়ে ওঠে এক আয়না। আর সেই আয়নায় যত রূপই ফুটে উঠুক, প্রেমিকের চোখ শেষ পর্যন্ত এক নূরেরই সন্ধান করে।
এই জায়গাতেই গালিবের প্রশ্ন আবার ফিরে আসে
এমন জায়গা দেখাও, যেখানে খোদা নেই?
আর ইবনুল আরাবির হৃদয় যেন নীরবে উত্তর দেয়;
যে হৃদয় সত্যিকারের ইশ্‌কে প্রশস্ত হয়েছে,
সেখানে তাঁর নিদর্শনের জন্য আর কোনো স্থানই পর নয়।

১০. লালনের মনের মানুষ[/sb
লালনের মনের মানুষ ধারণার মধ্যে যে অন্তর্মুখী রহস্য আছে, সেটিই এই আলোচনার সবচেয়ে মানবিক সেতু।
মনের মানুষকে বাইরে খুঁজে কী হবে?দরবেশের পোশাক পরলেই কি দরবেশ হওয়া যায়?জটা রাখলেই কি সাধু হওয়া যায়?তসবিহ হাতে নিলেই কি অন্তর জিকিরে ভরে যায়?মসজিদে গেলেই কি হৃদয় মসজিদ হয়ে যায়? না। ঘর বানানো আর ঘরকে পবিত্র করা এক কথা নয়।হৃদয়ও তেমন।তার মধ্যে হিংসা থাকতে পারে।অহংকার থাকতে পারে।লোভ থাকতে পারে।বিচারপ্রবণতা থাকতে পারে।কিন্তু তার মধ্যেই আবার প্রেম জন্মাতে পারে।ক্ষমা জন্মাতে পারে।করুণা জন্মাতে পারে।অনুতাপ জন্মাতে পারে।আর সেই অনুতাপ থেকেই শুরু হতে পারে প্রত্যাবর্তন।এই প্রত্যাবর্তনের নামই হয়তো তওবা।

আমরা সবাই পথিক এই পৃথিবীতে কেউই সম্পূর্ণ পথিক নয়।কেউ শরিয়তের পথে হাঁটছে।কেউ তরীকতের দরজায়।কেউ মারিফাতের সন্ধানে।কেউ কেবল নিজের নফসের সঙ্গে যুদ্ধ করছে।কেউ আবার এখনো জানেই না যে তার ভেতরে কোনো পথ আছে।তাই অন্যের অবস্থান নিয়ে চূড়ান্ত রায় দেওয়া কত সহজ!

কিন্তু নিজের অবস্থান জানা কত কঠিন!আমি জানি না অন্যের অন্তরে কী আছে।তাই আমার কাজ বিচারক হওয়া নয়।আমার কাজ নিজের অন্তরের দরজায় দাঁড়ানো।নিজেকে জিজ্ঞেস করা আমার ইবাদত আমাকে কতটা নম্র করেছে? আমার জ্ঞান আমাকে কতটা বিনয়ী করেছে?আমার ধর্ম আমাকে কতটা দয়ালু করেছে?আমার জিকির আমাকে কতটা মানবিক করেছে?আমার সিজদা আমাকে কতটা অহংকারমুক্ত করেছে?যদি ইবাদতের পরও আমার মধ্যে ঘৃণা বাড়ে,যদি জ্ঞানের পরও অহংকার বাড়ে, যদি ধর্মের পরও মানুষের প্রতি নিষ্ঠুরতা বাড়ে তবে হয়তো আমাকে আরও গভীরে যেতে হবে।কারণ sb]আচার শেষ হওয়ার পর যে মানুষটি বেরিয়ে আসে, আধ্যাত্মিকতার আসল পরীক্ষা তার মধ্যেই।


ছবি - লালন শাহ'র জীবদ্দশায় তৈরি করা একমাত্র চিত্র, ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে এঁকেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর

খোদাকে পেতে হলে খোদার সৃষ্টি থেকে মুখ ফেরানো যায় না। এখানে এসে সুফি দর্শন এক গভীর মানবিক সত্যের সামনে দাঁড় করায়।তুমি যদি বলো “আমি আল্লাহকে ভালোবাসি,”তবে তাঁর সৃষ্ট মানুষের প্রতি তোমার আচরণেও সেই ভালোবাসার ছায়া থাকার কথা।তুমি যদি বলো “আমি নূর দেখেছি,”তবে তোমার আচরণে অন্যের অন্ধকারের প্রতি একটু করুণা থাকার কথা।তুমি যদি বলো “আমি মারিফাত পেয়েছি,”তবে তোমার ভাষায় অহংকার কমার কথা।তুমি যদি বলো “আমি ইশ্‌কের পথে,”তবে তোমার হৃদয় আরও কোমল হওয়ার কথা।কারণ সত্যিকারের তাজাল্লির একটি চিহ্ন হলো [মানুষের হৃদয় নরম হয়ে যায়।সে অন্যের কষ্টে কষ্ট পায়।
অন্যের ভুলে শুধু ঘৃণা করে না সংশোধনের সম্ভাবনাও দেখে।অন্যের পতনে আনন্দ পায় না।কারণ সে জানে আজ যে পড়ে আছে, কাল সে উঠতে পারে;আর আজ যে দাঁড়িয়ে আছে, কাল সে নিজেই পড়ে যেতে পারে।

জান্নাত কোথায়?আমরা জান্নাত চাই।এটি মানুষের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা।কিন্তু সুফি প্রশ্ন করেন তুমি জান্নাত চাও, না জান্নাতের মালিককে? তুমি দান চাও, না দাতাকে?তুমি আলো চাও, না আলোর উৎসকে? তুমি শান্তি চাও, না সেই সত্তাকে, যার স্মরণে হৃদয় প্রশান্ত হয়?এখানেই প্রেম আর লেনদেনের পার্থক্য।লেনদেনের মানুষ বলে আমি এত ইবাদত করলাম, বিনিময়ে কী পেলাম?
প্রেমিক বলে তুমি আছ এটাই তো যথেষ্ট।এই জায়গায় এসে ইবাদতও বদলে যায়।ভয় থেকে ভালোবাসায়।দাবি থেকে কৃতজ্ঞতায়।লেনদেন থেকে আত্মসমর্পণে।

আর সেই অজ্ঞাত কবির শেষ শের?
পীতা হুঁ সাকি
গাম-এ-দুনিয়া ভুলানে কে লিয়ে
জান্নাত মে কৌনসা গাম হ্যায়,
ইস লিয়ে ওঁয়াহা মাজা নেহি।

ভাবানুবাদ -
(পান করি হে সাকি, সংসারের দুঃখ ভুলে যেতে;
জান্নাতে নেই দুঃখই কোনো,
তাই সেথায় মধ্যপানে মজা নাই।)
কী আশ্চর্য মানবিক স্বীকারোক্তি!মানুষ দুঃখ থেকে পালাতে চায়।কেউ মদে পালায়।কেউ অর্থে।
কেউ ক্ষমতায়।কেউ প্রেমে।কেউ ধর্মীয় অহংকারে।কেউ ব্যস্ততায়।কেউ নিঃসঙ্গতায়।কেউ আবার নিজের তৈরি কোনো পরিচয়ের আড়ালে।কিন্তু দুঃখকে যতই ভুলতে চাই, দুঃখ আমাদের ভেতরে থেকে যায়।

সুফি পথ অন্য কিছু শেখায় দুঃখকে ভুলে যেও না।দুঃখের কাছে বসো।তাকে জিজ্ঞেস করো“তুমি কেন এসেছ?”হয়তো সে বলবে তোমার নফস ভাঙতে।হয়তো বলবে তোমাকে মানুষের কষ্ট বুঝতে শেখাতে। হয়তো বলবে তোমাকে সেই দরজায় নিয়ে যেতে, যেখানে তোমার সমস্ত অহংকারের কোনো মূল্য নেই। তখন দুঃখ শত্রু থাকে না।দুঃখ হয়ে ওঠে মুর্শিদ।

শেষ পর্যন্ত মদ নয় প্রশ্নটাই আসল এই পুরো শায়েরির আসল সৌন্দর্য হয়তো এখানেই এটি আমাদের মদ্যপান শেখাতে আসে না। বরং দেখতে শেখায়।বাহ্যিকতার আড়ালে অন্তরকে।নামের আড়ালে নামহীনকে।রীতির আড়ালে রহস্যকে।শব্দের আড়ালে নীরবতাকে।আর ‘আমি’-এর আড়ালে সেই অসীম সত্যকে, যার সামনে সমস্ত অহংকার ক্ষুদ্র।তাই গালিবের প্রশ্নটি আজও আমাদের পিছু নেয়-
এমন জায়গা দেখাও, যেখানে খোদা নেই।
কারণ যতদূর তাকাই নূর।নূরের মধ্যে নূর।সৃষ্টির মধ্যে নিদর্শন।নিঃশ্বাসে রহস্য।অশ্রুতে ভাষা।প্রেমে তাজাল্লি।আর নীরবতায় এক গভীর উপস্থিতি।

হয়তো খোদার সবচেয়ে কাছের জায়গাটিই আমার অজানা, হয়তো আমি মসজিদের মেহরাব চিনি, কিন্তু নিজের হৃদয়ের মেহরাব চিনি না।হয়তো আমি কাবার দিক জানি,কিন্তু আমার নফস কোন দিকে ছুটছে তা জানি না।হয়তো আমি তসবিহের দানা গুনি,কিন্তু নিজের অহংকারের দানা গুনি না।হয়তো আমি অন্যের ঈমান মাপি,কিন্তু নিজের অন্তরের অন্ধকার মাপি না।হয়তো আমি জান্নাতের দরজা খুঁজি,কিন্তু আমার হৃদয়ের দরজা বন্ধ করে রেখেছি।আর হয়তো-
খোদা সেই দরজার ওপারেই দাঁড়িয়ে আছেন,
যে দরজা খুলতে চাবি হিসেবে লাগে না কোনো সম্পদ,
লাগে শুধু আত্মসমর্পণ।


শেষ কথা: আমি থেকে তুমি সুফি পথের সমস্ত শব্দকে যদি এক বিন্দুতে এনে দাঁড় করাই
নফস,ইশ্‌ক,মারিফাত,হকিকত,তাজাল্লি,ফানা,বাকা,তবে হয়তো এদের অন্তর্নিহিত যাত্রাটি এমন প্রথমে মানুষ বলে আমি আছি।তারপর ইশ্‌ক এসে প্রশ্ন করে এই আমি কে?মারিফাত এসে বলে নিজেকে চিনো।হকিকত এসে বলে যা সত্য, তার সামনে নিজের ধারণাগুলো ছোট করো।তাজাল্লি এসে বলে পর্দার ফাঁকে আলো দেখো।ফানা এসে বলে অহংকারকে বিলীন হতে দাও।আর বাকা এসে শেখায় এবার ফিরে যাও মানুষের কাছে কিন্তু আগের মানুষ হয়ে নয়।এবার তোমার চোখে করুণা থাকবে।কণ্ঠে কোমলতা থাকবে।হৃদয়ে বিনয় থাকবে।অন্যের জন্য দোয়া থাকবে।নিজের জন্য অশ্রু থাকবে।আর সর্বোপরি থাকবে ইশক

তাই আজ গালিবের সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আমি আর মসজিদ, ময়খানা, কাফের কিংবা জান্নাতের মানচিত্র আঁকতে চাই না। আমি শুধু নিজের হৃদয়ের দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে চাই।একবার নিঃশব্দে জিজ্ঞেস করতে চাই;
হে আমার অন্তরের অচেনা পরিচিত,
আমি সারাজীবন তোমাকে কোথায় কোথায় খুঁজেছি!
মসজিদে খুঁজেছি, কাবায় খুঁজেছি, কিতাবে খুঁজেছি, মানুষের মুখে খুঁজেছি, কবিতায় খুঁজেছি, অশ্রুতে খুঁজেছি, প্রেমে খুঁজেছি, কিন্তু কখনো কি সত্যিই নিজের অন্তরে ফিরে এসে তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি তুমি কি এখানেই ছিলে?

হয়তো কোনো উত্তর আসবে না।হয়তো শুধু চোখের কোণে জল জমবে।হয়তো বুকের ভেতর নিঃশব্দে কিছু একটা কেঁপে উঠবে।আর সেই কাঁপনই হয়তো হবে প্রথম তাজাল্লি।সেই অশ্রুই হয়তো হবে প্রথম জিকির।সেই আত্মসমর্পণই হয়তো হবে প্রথম ফানা।আর সেই নীরব প্রশান্তিই হয়তো হবে বাকার প্রথম স্বাদ।তখন বুঝব খোদাকে খুঁজতে গিয়ে আমি যে পৃথিবী ঘুরেছি,তিনি কখনোই আমার কাছ থেকে দূরে ছিলেন না। আমি দূরে ছিলাম।আমার নফসের পর্দা দূরত্ব তৈরি করেছিল।আমার অহংকার দেয়াল তুলেছিল।আমার অজ্ঞতা তাঁকে আড়াল করেছিল।তিনি হারিয়ে যাননি আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম।
আর তাই সুফির শেষ যাত্রা খোদার দিকে নয় নিজের মিথ্যা ‘আমি’ থেকে বেরিয়ে সেই সত্যের দিকে,যার আলোয় আমিও একদিন নীরব হয়ে যায়।তখন আর বলা যায় না খোদা কোথায়?
বরং হৃদয় ধীরে ধীরে বলে ওঠে যেদিকে তাকাই, তাঁরই নিদর্শন।যেদিকে ফিরি, তাঁরই দরজা।
যে হৃদয়কে এতদিন নিজের বলে জানতাম সেখানেও তাঁরই আমানত।

আর তখন লালনের মনের মানুষ, রুমির ইশ্‌ক, ইবনে আরাবির হকিকত, হাফিজের মদখানা সব যেন এসে একই নীরব বিন্দুতে মিলিত হয়।শব্দ আলাদা, পথ আলাদা, উপমা আলাদা কিন্তু আকুলতা এক।সেই আকুলতার নাম ইশক।সেই ইশ্‌কের আগুনে নফস পুড়ুক,অহংকার গলুক,পর্দা সরুক,নূর প্রকাশিত হোক।

আর মানুষ একদিন নিজের অন্তরের দরজায় দাঁড়িয়ে খুব আস্তে করে বলুক আমি তোমাকে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম শেষে আবিষ্কার করলাম,আমার খোঁজাটিও তোমারই দেওয়া।হয়তো এটাই মারিফাতের প্রথম বিস্ময়।এটাই ইশ্‌কের প্রথম অশ্রু।এটাই হকিকতের প্রথম দরজা।আর এটাই মানুষের দীর্ঘতম সফরের সবচেয়ে নীরব গন্তব্য।
এমন জায়গা দেখাও, যেখানে খোদা নেই…হয়তো উত্তরটি কোনো কবিতায় নেই।হয়তো উত্তরটি আমাদের নিজের হৃদয়ের গভীরতম নীরবতায়।

ছবি সুত্র : গুগল উইকিপিডিয়া ।

মন্তব্য ২২ টি রেটিং +৫/-০

মন্তব্য (২২) মন্তব্য লিখুন

১| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৪৩

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: এমন জায়গা দেখাও, যেখানে খোদা নেই?
................................................................................
যারা নাস্তিক , তাদের অন্তরে তো খোদা নেই !!!
সহজ প্রশ্ন , উত্তর দিন ।

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৫

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




মহজ প্রশ্ন , সহজ উত্তর
নাস্তিকের মনেও উঁকি দিয়ে দেখে এসেছি
সেখানেও খোদা আছে, তা জানেনা নাস্তিক।
যাকে তুমি নাস্তিক বলে দূরে সরিয়ে দাও, তার হৃদয়ের গোপন কক্ষে হয়তো এমন এক নূর আছে,
যার খবর সে নিজেও জানে না।

মানুষ নিজেই কখনো কখনো নিজের ভেতরের নূর সম্পর্কে অজ্ঞ।তার মধ্যে যে করুণা আছে,
সে জানে না।তার মধ্যে যে প্রেম আছে, সে জানে না।তার মধ্যে যে অনুতাপ আছে, সে জানে না। তার
মধ্যে যে সত্যের ক্ষুধা আছে, সে জানে না।সে শুধু নিজের পরিচয়ের খোলসটুকু জানে।আর খোদা হয়তো
খোলসের চেয়ে গভীরে তাকান। তাইতো সে অনেক আস্তিকের চেয়েও ভাল আছে এ ভবে ।

শুভেচ্ছা রইল

২| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:০৫

সত্যপথিক শাইয়্যান বলেছেন:




এমন জায়গা দেখাও, যেখানে খোদা নেই।
======================

ভাইয়া,
খোদা ও খোদার - দুটো জিনিস।

খোদাই নূর। আর, নূর হতে সৃষ্ট কিছু মহামানব।
অর্থাৎ, মহামানবদের সৃষ্টি উপাদান নূর।
আর, সাধারণ মানুষ মাটির তৈরী।

এখন, প্রশ্ন, যে মাটি দিয়ে মানুষ তৈরী হয়েছে, সেই মাটি কোথা থেকে আসলো? সেই মাটির সৃষ্টি উপাদান কি?

গোলকধাঁধাটি এখানেই।

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:১৩

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



ভাইয়া, আপনার প্রশ্নটি আসলে খুব গভীর মানুষ যদি মাটি দিয়ে তৈরি হয়, তবে সেই মাটি কোথা থেকে এলো?
আর মাটির সৃষ্টি-উপাদান কী?

প্রথমেই একটি জায়গা পরিষ্কার করা দরকার। ইসলামী আকীদার দৃষ্টিতে আল্লাহ্‌ ও তাঁর সৃষ্টি এ দুটি এক জিনিস
নয়। আল্লাহ স্রষ্টা; নূর, মাটি, পানি, আগুন, মানুষ সবই তাঁর সৃষ্টি। তাই খোদা নূর এবং নূর থেকে সৃষ্টি মহামানব
এই দুই বাক্যকে একই অর্থে গ্রহণ করা ঠিক হবে না।

কুরআনে বলা হয়েছে
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
আল্লাহ আসমানসমূহ ও পৃথিবীর নূর।

এটি সূরা আন-নূর ২৪:৩৫-এর সূচনা। কিন্তু একই আয়াতে আল্লাহ তাঁর নূর এর একটি উপমা দিয়েছেন
একটি কুলুঙ্গির মধ্যে প্রদীপ, প্রদীপটি কাঁচের মধ্যে, এবং বলা হয়েছে, নূরুন ‘আলা নূর নূরের উপর নূর।
অর্থাৎ এখানে নূর কে নিছক কোনো বস্তুগত পদার্থ হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। তাফসিরে এর অর্থ
আল্লাহর হিদায়াত, আলোকপ্রদান ও পথনির্দেশ হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

অতএব, আল্লাহ নূর মানেই আল্লাহ কোনো আলোক-কণা বা পদার্থ দিয়ে তৈরি এমন অর্থ ইসলামী বক্তব্যে নেই।
বরং আল্লাহ সৃষ্ট পদার্থের ঊর্ধ্বে; নূরও তাঁর সৃষ্টি-জগতের একটি ধারণা, আর তাঁর নূর মানুষের অন্তরে হিদায়াত
ও জ্ঞানের আলো হিসেবেও প্রকাশিত হতে পারে।

এবার আসি মহামানব নূর থেকে সৃষ্টি প্রসঙ্গে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।

সহিহ মুসলিমের একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা।) বলেছেন-
ফেরেশতাদের নূর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে আগুনের শিখা থেকে, আর আদমকে
সৃষ্টি করা হয়েছে যা তোমাদের বর্ণনা করা হয়েছে তা থেকে।

অর্থাৎ নূর থেকে সৃষ্টির কথা সরাসরি ফেরেশতাদের ব্যাপারে সহিহ হাদিসে এসেছে। আদম (আ.)-এর ক্ষেত্রে
এসেছে মাটি/কাদামাটির কথা।এখানে তাই নূর থেকে সৃষ্টি এবং মাটি থেকে সৃষ্টি দুটিকে মানুষের মর্যাদার
মাপকাঠি বানানোর প্রয়োজন নেই।কারণ মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার কাঁচামালে নয়, তার আত্মিক অবস্থানে।

মাটি দিয়ে তৈরি মানুষই জ্ঞানী হতে পারে, প্রেমিক হতে পারে, আরিফ হতে পারে, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে।
আবার সেই মানুষই অহংকার, জুলুম ও প্রবৃত্তির দাস হতে পারে।
অর্থাৎ মাটি মানুষের শরীরের উৎস হতে পারে;কিন্তু মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার চেতনা, আমল, তাকওয়া
ও আল্লাহ-সচেতনতার দ্বারা।

এবার আসল প্রশ্ন সেই মাটি কোথা থেকে এলো?”এখানেই প্রশ্নটি আমাদের নিয়ে যায় সৃষ্টিতত্ত্বের গভীরে।
ইসলামী দৃষ্টিতে উত্তরটি হলো মাটি নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি; মাটিও আল্লাহর সৃষ্টি।

কুরআন মানুষকে বিভিন্ন জায়গায় মাটি, ধূলি, কাদামাটি ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত করেছে। অর্থাৎ মানুষের জৈবিক
দেহের উপাদান পৃথিবীর উপাদান-জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এখানে আবার প্রশ্ন করা যায় তাহলে পৃথিবী কোথা থেকে এলো?উত্তর:পৃথিবীও সৃষ্টি।

তারপর প্রশ্ন মহাবিশ্ব কোথা থেকে এলো? ইসলামী বিশ্বাসের উত্তর মহাবিশ্বও সৃষ্টি।

তাহলে আবার যদি প্রশ্ন করি সৃষ্টির আগে কী ছিল? এখানে এসে আমাদের চিন্তার একটি মৌলিক সীমা স্পষ্ট হয়।
কারণ আগে শব্দটিই সময়ের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। আর সময় নিজেই যদি সৃষ্ট জগতের অংশ হয়, তাহলে
সৃষ্টির বাইরে দাঁড়িয়ে সৃষ্টির আগে কী ছিল? প্রশ্নটি আমাদের পরিচিত সময়-ধারণায় সম্পূর্ণভাবে প্রয়োগ করা
যায় না।

ইসলামী তাওহিদের মূল বক্তব্য তাই হলো সৃষ্ট জগতের প্রতিটি কিছুর জন্য কোনো না কোনো কারণ আছে;
কিন্তু আল্লাহ সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত নন। তিনি স্রষ্টা।

অর্থাৎ মাটি, পৃথিবী,মহাবিশ্ব সবই সৃষ্টির ধারার অন্তর্গত।আল্লাহ সেই ধারার আরেকটি বস্তু নন; তিনিই সেই ধারার স্রষ্টা।

কিন্তু এখানেই সুফি সাধনার আরেকটি দরজা খুলে যা বাহ্যিকভাবে মানুষ মাটি।অন্তরে সে নূরের সন্ধানী।

কুরআনের নূর কে যদি হিদায়াত ও ঈশ্বরীয় আলোকপ্রাপ্তির অর্থে বুঝি, তাহলে মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রা হয়ে ওঠে
মাটির শরীর থেকে নূরের দিকে যাত্রা।
এখানে নূর কোনো শারীরিক পদার্থ নয়; এটি হিদায়াত, জ্ঞান, ইশ্‌ক, মারিফাত ও অন্তরের জাগরণের প্রতীক
হিসেবেও বোঝা যায়। কুরআনের নূরের আয়াতের বিভিন্ন তাফসিরে এই আলোক-উপমার সঙ্গে অন্তরের ঈমান
ও হিদায়াতের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

তাই একজন মানুষকে মাটির তৈরি” বলা তার আধ্যাত্মিক সম্ভাবনাকে ছোট করে না।বরং সুফির কাছে এখানেই রহস্য
মাটির মানুষই নূর খোঁজে। মাটির মানুষই প্রেমে জ্বলে।মাটির মানুষই আমি কে অতিক্রম করতে চায়।
মাটির মানুষই একদিন নিজের অন্তরে হিদায়াতের আলো অনুভব করতে পারে।

এই কারণেই সুফি সাহিত্যে মাটি কখনো কেবল নিম্নতার প্রতীক নয়।মাটি নম্র, মাটি ধারণ করে।
মাটি পায়ের নিচে থাকে, মাটি থেকে ফুল জন্মায়, মাটিতে বীজ চাপা পড়ে, তারপর সেই বীজ থেকেই বৃক্ষ
উঠে আকাশের দিকে হাত বাড়ায়।

মানুষও যেন তেমনই শরীরে মাটি,প্রাণে জীবন,চেতনায় প্রশ্ন,হৃদয়ে প্রেম,আর পথের শেষে নূরের সন্ধান।

আর আপনার গোলকধাঁধা-র সবচেয়ে গভীর উত্তরটি সম্ভবত এখানেই

আপনি যদি প্রশ্ন করেন মাটির সৃষ্টি-উপাদান কী? বিজ্ঞানের ভাষায় আমরা বলতে পারি, মাটি কোনো একক মৌল
নয়; এটি খনিজ কণা, জৈব পদার্থ, পানি, বায়ু এবং বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের জটিল সমষ্টি।

আর যদি আবার জিজ্ঞেস করেন এই উপাদানগুলো কোথা থেকে এলো? তাহলে আমরা পৌঁছে যাব পৃথিবীর
ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস, নক্ষত্রের বিবর্তন এবং মহাবিশ্বের প্রাথমিক পদার্থবিজ্ঞানের কাছে।

কিন্তু যদি আরও এক ধাপ পিছিয়ে জিজ্ঞেস করি সেই মহাবিশ্বের অস্তিত্বই বা কেন?
তখন প্রশ্নটি আর কেবল বিজ্ঞানের নয়; এটি হয়ে ওঠে মেটাফিজিক্স ও দর্শনের প্রশ্ন।

আর তাওহিদের উত্তর সেখানে খুব সরল সৃষ্টি নিজের স্রষ্টা নয়।মাটি সৃষ্ট, মানুষ সৃষ্ট।
নূরও সৃষ্ট জগতের ধারণা ও নিদর্শনের অংশ।

কিন্তু আল্লাহ সৃষ্ট নন।
সুতরাং মাটি কোথা থেকে এলো? প্রশ্নের উত্তর আমাদের শেষ পর্যন্ত নিয়ে যায় মাটিরও একজন স্রষ্টা আছেন।

আর সুফির ভাষায় সেই উপলব্ধি আরও অন্তর্মুখী হয়ে ওঠে আমি মাটি থেকে এসেছি তাই আমার অহংকারের
কীসের ভিত্তি?আমি নশ্বর তাই আমার আমি-র এত গর্ব কেন?আর যদি আমার অন্তরে নূরের জন্য আকুলতা
জেগে থাকে,তবে সেই আকুলতাই হয়তো আমার পথের প্রথম প্রদীপ।

অতএব, মাটি ও নূরকে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী পদার্থ হিসেবে না দেখে একটিকে সৃষ্টির বস্তুগত দিক এবং অন্যটিকে
হিদায়াত/আধ্যাত্মিক আলোর প্রতীক হিসেবে দেখলে প্রশ্নটির অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যায়।
মোদ্দাকথা মানুষ মাটির বলে তুচ্ছ নয়;বরং মাটির হয়েও সে নূরের সন্ধান করতে পারে
এইটিই মানুষের রহস্য।

সুন্দর একটি প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ ।

শুভেচ্ছা রইল

৩| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০০

শায়মা বলেছেন: বাপরে মির্জা গালিব থেকে লালন শাহ!
সবাই আধ্যাত্মিক পথের পথিক ও অন্য জগতের আলোয় আলোকিত!
যা আমরা দেখতেও পাই না শুনতেও পাইনা তা তারা দেখে ফেলে কোন দিব্য দৃষ্টির আলোয়!

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩০

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



আপু তোমার মন্তব্যটির মধ্যে খানিকটা রসিকতা, খানিকটা সংশয় এবং গভীর একটি দার্শনিক প্রশ্ন আছে। :)
যা আমরা দেখি না, শুনি না তারা কী করে তা দেখে? এই প্রশ্নটিই তো যুগে যুগে সাধক, দার্শনিক ও কবিদের
ভাবিয়েছে।

তবে আমি মনে করি, মির্জা গালিব, লালন, রুমি কিংবা ইবনুল আরাবির মতো মানুষদের অন্য জগতের আলোয়
আলোকিত বলার আগে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার তাঁরা কোনো অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার দাবি করেছেন,
এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তাঁদের অনেকের সাধনা ছিল বাইরের চোখ দিয়ে অদৃশ্য কোনো বস্তু দেখা নয়;
বরং নিজের অন্তরের পর্দাগুলো সরিয়ে বাস্তবতাকে অন্যভাবে অনুভব করার চেষ্টা।

আমরা চোখ দিয়ে মানুষ দেখি, কান দিয়ে শব্দ শুনি; কিন্তু ভালোবাসা, বিবেক, সৌন্দর্য, বেদনা, সত্য এসবের
কতটুকুই বা চোখে দেখা যায়?

একজন মা সন্তানের মুখ দেখে শুধু মুখটি দেখেন না তার মধ্যে নিজের সমগ্র পৃথিবীকে অনুভব করেন। একজন
কবি বৃষ্টিতে শুধু জল দেখেন না স্মৃতি, বিরহ কিংবা প্রেমও দেখতে পান। সেই দেখা চোখের দেখা নয়
অন্তরের দেখা।

সুফিরা সেই অন্তর্দৃষ্টিকেই কখনো বাসিরাত, কখনো মারিফাত, কখনো নূর বলে ভাষা দিয়েছেন।

তাই গালিব যখন প্রশ্ন করেন যেখানে খোদা নেই, এমন জায়গা দেখাও, আর লালন যখন মানুষ ও মনের মানুষের
সন্ধানে ফিরে যান, তখন তাঁরা আমাদের এমন কোনো জগতের মানচিত্র দিচ্ছেন না যা আমরা চোখে দেখতে পাই না।
বরং তাঁরা প্রশ্ন করছেন আমরা যে জগতটি প্রতিদিন চোখের সামনে দেখি, তার গভীরতাটুকু কি সত্যিই দেখতে
শিখেছি?

হয়তো দিব্যদৃষ্টি মানে আকাশের ওপারে কোনো অদৃশ্য জগত দেখা নয়।হয়তো দিব্যদৃষ্টি মানে চোখ একই থাকে,
কিন্তু দেখার মানুষটি বদলে যায়।

আর সেখানেই কবিতা, দর্শন ও সাধনার মিলন।

তাই গালিব থেকে লালন এ যাত্রা বাপরে! বলার মতো রহস্যময় যতটা, তার চেয়েও বেশি নিজেকে
দেখার একটি আমন্ত্রণ।

তা এখন নীজকে কেমন দেখলে একটু বলে যেও ।

শুভেচ্ছা রইল

৪| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩২

সত্যপথিক শাইয়্যান বলেছেন:




ধন্যবাদ, ভাইয়া।
অনেক সুন্দর করে উত্তর দিয়েছেন।

আমি স্বীকার করি যে, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুই এক খোদার সৃষ্টি।

কিন্তু, প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সকল খোদার সৃষ্টি যেহেতু এবং প্রতিটি সৃষ্টির উপাদান আছে, সেগুলো কি খোদার অস্তিত্বের বাইরে যেতে পারে?

এক খোদা ছাড়া বাকি সব কিছুই খোদার সৃষ্টি যেহেতু, সেই বাকি সব কিছুর অস্তিত্বে আসলো কি করে? সেগুলোর কোন না কোন 'সৃষ্টি উপাদান' থাকতেই হবে যে!

আরও গভীরে গেলে, সেই সকল প্রাণ ও বস্তুর 'সৃষ্টি উপাদান'-এর পিছনে আরেকটি সৃষ্টি উপাদান আছে।
যদি সৃষ্টি উপাদান না থাকে, তাহলে, খোদা কি দিয়ে সেগুলো সৃষ্টি করলেন??!!!

এখন প্রশ্ন, সকল সৃষ্ট'র সেই প্রাইমারী 'সৃষ্টি উপাদান' কি?

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




ভাইয়া, এখন আর পারছিনা । ঘুমে চোখ ডুলু। সেই গতকাল সন্ধা থেকে শুরু করে সারা রাত ধরে এখন পর্যন্ত
লিখেই চলেছি। পোস্টের লেখা , পরের পোস্টে মন্তব্য করা , নীজের পোস্টে বিস্তারিত মন্তব্য করা সেযে
সময় সাপেক্ষ্য। কখন যে রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি । যাক একঘুম দিয়ে উঠে আপনার
এই কঠীন প্রশ্নের কী উত্তর দেয়া যায় তা ভাবব । এর মাঝে দেখলাম আপনি ২ টি পোস্ট দিয়েছেন সেখানেও
কিছু কথা বলার আছে ।

শুভেচ্ছা রইল

২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৪

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




এখন হাতে একটু সময় নিয়ে ফিরে এলাম আপনার মন্তব্যে তুলে ধরা বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা শেয়ার করার জন্য ।
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গভীর। কারণ এটি শুধু সৃষ্টিকে কী দিয়ে সৃষ্টি করা হলো?” প্রশ্ন নয়; একটু গভীরে গেলে এটি
গিয়ে দাঁড়ায় আরও মৌলিক এক প্রশ্নে কোনো কিছু আদৌ ‘আছে’ কেন? আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে
আমাদের বস্তু, উপাদান, কারণ’এবং অস্তিত্ব এই চারটি শব্দকে আলাদা করে দেখতে হয়।

আমরা জগতের কোনো বস্তু দেখলেই তার উপাদান খুঁজি। একটি ঘর ইট-পাথর দিয়ে তৈরি, ইট মাটি দিয়ে, মাটি
নানা খনিজ ও রাসায়নিক উপাদানে গঠিত; অণু পরমাণুর সঙ্গে, পরমাণু আরও মৌলিক কণা ও ক্ষেত্রের সঙ্গে
সম্পর্কিত। বিজ্ঞান এই অনুসন্ধানকে ক্রমাগত গভীরে নিয়ে গেছে।

কিন্তু এখানে একটি সূক্ষ্ম দার্শনিক সমস্যা আছে; কোনো বস্তুর উপাদান থাকা এবং সেই বস্তুর‘অস্তিত্বের চূড়ান্ত কার
থাকাএকই কথা নয়।একটি কাঠের টেবিলের উপাদান কী এটি এক ধরনের প্রশ্ন।কিন্তু কাঠ, পরমাণু, শক্তি, ক্ষেত্র
এসবের অস্তিত্বই বা কেন?এটি সম্পূর্ণ অন্য স্তরের প্রশ্ন।প্রথমটি বিজ্ঞানের প্রশ্ন হতে পারে।দ্বিতীয়টি অধিবিদ্যার প্রশ্ন।

এখন প্রশ্ন হলো প্রাথমিক উপাদান খুঁজতে গেলে আমরা কোথায় গিয়ে থামব? ধরা যাক, আমরা বললাম সবকিছুর
মূল উপাদান হলো ‘ক’।তাহলে স্বাভাবিক প্রশ্ন হবে ‘ক’ কোথা থেকে এলো?যদি উত্তর হয়‘খ’ থেকে, তাহলে প্রশ্ন
হবে খ কোথা থেকে এলো?তারপর ‘গ’, ‘ঘ’, ‘ঙ’...। এভাবে যদি প্রতিটি অস্তিত্বের ব্যাখ্যা তার আগের কোনো
অস্তিত্বের ওপর নির্ভর করে, তাহলে আমরা একটি অসীম পশ্চাদপসরণে যেতে পারি।

কিন্তু এখানে একটি গভীর প্রশ্ন থেকে যায়, শুধু কারণের সংখ্যা অসীম করে দিলেই কি আমরা অস্তিত্বের চূড়ান্ত
ব্যাখ্যা পেয়ে গেলাম?এই সমস্যাটিই প্রাচীন ইসলামী দর্শনে অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে। ইবন সিনা থেকে মোল্লা
সদরার ধারায় প্রশ্নটি ক্রমশ প্রথম বস্তু কী? থেকে সরে গিয়ে কোন অস্তিত্ব নিজে থেকে অপরের ওপর নির্ভরশীল
নয়?এই প্রশ্নে পৌঁছায়।এখানে আসে Necessary Being বা ওয়াজিবুল-উজুদ অর্থাৎ এমন অস্তিত্ব, যার অস্তিত্ব
অন্য কিছুর ওপর নির্ভরশীল নয়।

মোল্লা সদরার বিপ্লব আসল প্রশ্ন কী দিয়ে? নয়, অস্তিত্ব কোথা থেকে?
মোল্লা সদরার দর্শনের সবচেয়ে গভীর দিকগুলোর একটি হলো আসালাতুল-উজুদ অর্থাৎ অস্তিত্বের মৌলিকতা।
মোল্লা সদরা (১৬ শতক) ছিলেন ইসলামী স্বর্ণযুগের পরবর্তী সময়ের একজন সেরা ইরানি দার্শনিক যিনি
'ট্রান্সেন্ডেন্ট থিওসফি' বা হিকমাত আল-মুতাআলিয়া (Transcendent Wisdom) নামক দর্শনের প্রবর্তক।
তার দর্শনের মূল কথা হলোজগতের সবকিছুর মূলে রয়েছে পরম সত্তা বা অস্তিত্ব (ওজুদ)।
সুত্র : Oxford Centre for Islamic Studies Click This Link
তাঁর মতে, আমরা সাধারণত জগতকে বস্তু ও তার গুণাবলির সমষ্টি হিসেবে দেখি। কিন্তু গভীরে গেলে কী জিনিস
(মাহিয়্যাহ)-এর চেয়েও মৌলিক হয়ে ওঠে‘তা আছে’ (উজুদ)।একটি মানুষ কী এটি তার মাহিয়্যাহ বা সত্তাগত
পরিচয়ের প্রশ্ন।কিন্তু মানুষ আছে এই আছে টি আরও মৌলিক প্রশ্ন।

মোল্লা সদরার মতে, সৃষ্ট জগতের অস্তিত্ব নিজস্ব ও স্বাধীন নয়; তা নির্ভরশীল। আর আল্লাহর অস্তিত্ব কোনো ধার
করা অস্তিত্ব নয়। তিনি Necessary Being পরম ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অস্তিত্ব। তাঁর দর্শনে অস্তিত্বকে একটি গতিশীল
বাস্তবতা হিসেবেও ভাবা হয়, যা বিভিন্ন মাত্রা ও তীব্রতায় প্রকাশিত হয়।

তাই সৃষ্টির প্রথম উপাদান কী? এই প্রশ্নের পরিবর্তে মোল্লা সদরার দৃষ্টিতে আরও মৌলিক প্রশ্ন হতে পারে:
সৃষ্টির অস্তিত্ব যে আছে তার ontological ভিত্তি কী? অর্থাৎ আমরা ‘প্রথম কণা’ খুঁজছি না; আমরা খুঁজছি ‘প্রথম
অস্তিত্বের ভিত্তি’।

ইবন আরাবি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন , ইবন আরাবির কাছে বিষয়টি আরও সূক্ষ্ম।তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে
ওয়ুজুদ অস্তিত্ব।তাঁর মতে, প্রকৃত বা স্বাধীন অস্তিত্ব কেবল আল্লাহর; সৃষ্টির অস্তিত্ব নির্ভরশীল ও ধার করা। ইবন
আরাবির ব্যাখ্যায় সৃষ্ট সত্তা নিজের অস্তিত্বের মালিক নয়; তার অস্তিত্ব মুহূর্তে মুহূর্তে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল।
এখানে ধার করা অস্তিত্ব এই ধারণাটি অত্যন্ত সুন্দর।যেমন চাঁদের নিজস্ব আলো নেই; তার আলো সূর্যের
আলোয় দৃশ্যমান।কিন্তু চাঁদ সূর্য নয়।তেমনি, সৃষ্টির অস্তিত্ব আল্লাহ-নির্ভর কিন্তু সৃষ্টি আল্লাহ নয়।

এ কারণেই ইবন আরাবির চিন্তাকে সরলভাবে সৃষ্টিই আল্লা বা “জগৎই ঈশ্বর এভাবে বোঝা ঠিক নয়। তাঁর
অস্তিত্বতত্ত্ব অত্যন্ত সূক্ষ্ম, এবং আধুনিক গবেষণাতেও তাঁর নামে প্রচলিত wahdat al-wujud পরিভাষাটি তিনি
নিজে সরাসরি মতবাদের নাম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন কি না, তা নিয়ে সতর্কতা রয়েছে।
তাঁর জন্য মূল কথাটি বরং এই স্বাধীন ও পরম অস্তিত্ব এক; সৃষ্ট অস্তিত্ব নির্ভরশীল ও সম্ভাব্য।

তাহলে আপনার প্রশ্নের উত্তর এখানেই এক নতুন অর্থ পায়।সৃষ্টির উপাদান কী? ইবন আরাবির দৃষ্টিতে বলা যায়-
সৃষ্টির চূড়ান্ত ব্যাখ্যা কোনো বস্তুগত উপাদান-এ শেষ হয় না; বরং তার অস্তিত্বের নির্ভরতার দিকে নির্দেশ করে।

তাহলে আল্লাহ কী দিয়ে সৃষ্টি করলেন? এখানে আমার মনে হয় সবচেয়ে বড় ভুলটি হয় প্রশ্নটির ভাষাতেই।
কী দিয়ে সৃষ্টি করলেন? এই প্রশ্নটি একজন কারিগরকে সামনে রেখে করা প্রশ্ন।
কারিগর কাঠ দিয়ে চেয়ার বানান।
স্থপতি ইট-পাথর দিয়ে ভবন নির্মাণ করেন।
কুমার মাটি দিয়ে পাত্র তৈরি করেন।
কিন্তু এরা কেউই উপাদানটির অস্তিত্ব সৃষ্টি করেন না; তারা পূর্বস্থিত উপাদানকে রূপান্তর করেন।

অতএব, যদি আমরা আল্লাহকে এমন একজন কারিগর হিসেবে কল্পনা করি যিনি মহাবিশ্বের বাইরে বসে আগে
থেকে থাকা কোনো কাঁচামাল নিয়ে মহাবিশ্ব বানালেন, তাহলে আমরা অজান্তেই আল্লাহকে সৃষ্ট জগতেরই একটি
কারিগরি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসছি।তখন প্রশ্ন আসবেই সেই কাঁচামাল কোথা থেকে এলো?আর তার উত্তর
খুঁজতে গিয়ে আবার একই অসীম পশ্চাদপসরণ।

সুতরাং তাওহিদের দার্শনিক বক্তব্য হলো আল্লাহ কোনো উপাদান ব্যবহার করে অস্তিত্ব লাভকারী সত্তা নন;
বরং তিনি সৃষ্ট অস্তিত্বের চূড়ান্ত ভিত্তি।

এ কারণেই ইসলামী চিন্তায় আল্লাহকে আল-আহাদ, আস-সামাদ, আল-আউয়াল ইত্যাদি নামে বোঝানো হয়
যেখানে তাঁর ওপর কোনো ontological dependency আরোপ করা হয় না।

গাজ্জালি এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলে দেন। ইমাম গাজ্জালির চিন্তার কেন্দ্রে ছিল কারণ-কার্য
সম্পর্ক নিয়ে গভীর প্রশ্ন।আমরা দেখি আগুনে তুলা রাখলে তুলা পুড়ে যায়। তাই আমরা বলি আগুন পোড়ার কারণ।
কিন্তু গাজ্জালি প্রশ্ন করেন আমরা কি কেবল ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করে বলতে পারি যে আগুনের
মধ্যে এমন একটি অপরিবর্তনীয়, স্বাধীন causal power আছে যা অবশ্যই পোড়াবে?

তাঁর Tahāfut al-Falāsifa-র আলোচনায় তিনি কারণ ও ফলের মধ্যে অবশ্যই এমনই হতে হবেএই কঠোর
প্রয়োজনীয়তাকে প্রশ্ন করেন। তাঁর দৃষ্টিতে আল্লাহ চাইলে কারণ ও ফলের সম্পর্কের স্বাভাবিক ধারার বাইরের
ঘটনাও ঘটতে পারে। আধুনিক গবেষণায় গাজ্জালির অবস্থানকে কেবল সরল সবকিছুই তাৎক্ষণিকভাবে আল্লাহ
করেন বলে ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে সতর্কতা আছে; তাঁর লেখায় secondary causation-এর সম্ভাবনাও
আলোচিত হয়েছে।

এখানে গাজ্জালির শিক্ষা হলো আমরা প্রকৃতির নিয়ম আবিষ্কার করি; কিন্তু সেই নিয়মকে অস্তিত্বের চূড়ান্ত
স্বয়ংসম্পূর্ণ কারণ বলে ধরে নিতে পারি না।অর্থাৎ মাধ্যাকর্ষণ মহাবিশ্বের ভেতরে কীভাবে কাজ করে এটি
এক প্রশ্ন। কিন্তু মাধ্যাকর্ষণসহ এমন একটি নিয়মতান্ত্রিক মহাবিশ্ব আদৌ কেন আছে?এটি অন্য প্রশ্ন।

আধুনিক কসমোলজি আমাদের কোথায় নিয়ে যায়?এখানে বিজ্ঞানের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই একটি সীমা
মনে রাখা জরুরি।আধুনিক কসমোলজি আমাদের জানায় যে মহাবিশ্ব একসময় অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন অবস্থায় ছিল
এবং প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর ধরে তার বিবর্তনের ইতিহাস আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি। Cosmic inflation
এর ধারণাও প্রাথমিক মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মডেল; কিন্তু NASA-ও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে
যে inflation-এর আগে কী ছিল বা সেটিকে কী চালিত করেছিল তা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না।

অতএব Big Bang শুনে যদি কেউ বলে বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে সৃষ্টির আগে কিছুই ছিল না, তারপর খোদা
মহাবিশ্ব বানিয়েছেন তাহলে সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে অতিরিক্ত দাবি।

আবার কেউ যদি বলে বিজ্ঞান মহাবিশ্বের প্রাথমিক অবস্থার ব্যাখ্যা করতে পারে, অতএব স্রষ্টার প্রশ্ন সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়
সেটিও বিজ্ঞান থেকে একটি অতিরিক্ত দার্শনিক সিদ্ধান্ত।কারণ Big Bang মূলত আমাদের মহাবিশ্বের প্রাথমিক
ভৌত বিবর্তন সম্পর্কে কথা বলে কেন অস্তিত্ব আছে? এই চূড়ান্ত প্রশ্নের উত্তর একা দেয় না।
এমনকি inflation-এর আগের অবস্থাও এখনও অজানা।

তাহলে কী প্রথম উপাদান আদৌ আছে?এখানেই আপনার প্রশ্নের সবচেয়ে গভীর জায়গাটি।হয়তো আমরা
প্রথম উপাদান খুঁজতে গিয়ে ভুল শ্রেণির উত্তর খুঁজছি। কারণ যদি আমরা কোনো একটি কণাকে বলি
এই হলো সবকিছুর প্রথম উপাদান তাহলে পরবর্তী প্রশ্ন হবে এই কণাটি আছে কেন? যদি কোনো শক্তিকে
বলি এই শক্তিই প্রথম।প্রশ্ন হবে এই শক্তির অস্তিত্বের ভিত্তি কী? যদি বলি মহাবিশ্ব নিজেই চিরন্তন তবুও
প্রশ্ন থাকতে পারে চিরন্তন মহাবিশ্ব কেন আছে?

অর্থাৎ প্রথম বস্তু’ খুঁজে পেলেও প্রথম ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।এখানে মোল্লা সদরার দর্শনের গুরুত্ব আবার
ফিরে আসে অস্তিত্বের প্রশ্নটি বস্তুগত উপাদানের প্রশ্নের চেয়ে মৌলিক।

আর এখানেই সৃষ্টি ও অস্তিত্ব আলাদা হয়ে যায়। একটি আপেল কী দিয়ে তৈরিএটি material explanation।
আপেল কীভাবে গঠিত হলো এটি physical explanation।আপেল কেন এই পরিবেশে জন্মালএটি causal
explanation।কিন্তু আপেল, পৃথিবী, নক্ষত্র, পদার্থ, শক্তি, স্থান, সময়এসবের অস্তিত্বই কেন আছে?
এটি ontological question।

এই শেষ প্রশ্নটির উত্তর কোনো একটি পরমাণু বা শক্তির নাম দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।কারণ পরমাণুও তখন ব্যাখ্যার
অপেক্ষায় থাকবে।

সুফি দৃষ্টিতে প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত নিজের কাছেই ফিরে আসে। ইবন আরাবির দর্শনে wujūd শুধু বইয়ের একটি দার্শনিক
শব্দ নয়; অস্তিত্বের উপলব্ধি ও সচেতনতার সঙ্গেও এর সম্পর্ক আছে।তাই সুফির কাছে প্রশ্নটি একসময় এমন হয়ে যায়:
বিশ্ব কী দিয়ে তৈরি? থেকে বিশ্বের অস্তিত্ব কার ওপর নির্ভরশীল? তারপর আমার নিজের অস্তিত্বের ভিত্তি কী?
আর শেষে যে ‘আমি’ এই প্রশ্নটি করছি, সেই ‘আমি’ কে?

এখানে মোল্লা সদরার দর্শন ও সুফি অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি আকর্ষণীয় সেতু দেখা যায়। মোল্লা সদরা দর্শনকে শুধু
তর্কের অনুশীলন হিসেবে দেখেননি; তাঁর কাছে জ্ঞান আত্মিক পরিশুদ্ধি ও উপলব্ধির সঙ্গেও যুক্ত।
অর্থাৎ, সত্যকে শুধু বাইরে খুঁজে পাওয়া নয় নিজের অস্তিত্বের প্রকৃতিও অনুসন্ধানের বিষয়।

তাই আপনার প্রাইমারি সৃষ্টি উপাদান প্রশ্নটির উত্তর আমি এভাবে দিব, যদি উপাদান বলতে বস্তুগত কোনো
প্রথম কাঁচামাল বোঝান, তাহলে আধুনিক বিজ্ঞান এমন কোনো চূড়ান্ত কাঁচামালকে প্রতিষ্ঠিত করেনি যাকে
নিশ্চিতভাবে সবকিছুর প্রথম উপাদান বলা যায়।

আর যদি প্রশ্নটি হয় সকল সৃষ্ট অস্তিত্বের চূড়ান্ত ভিত্তি কী? তাহলে ইসলামী দর্শনের উত্তর হবে আল্লাহ
ওয়াজিবুল-উজুদ; যাঁর অস্তিত্ব অন্য কিছুর ওপর নির্ভরশীল নয়, অথচ সৃষ্ট অস্তিত্ব তাঁর ওপর নির্ভরশীল।

মোল্লা সদরা বলবেন অস্তিত্বের মৌলিকতা বোঝার দিকে তাকান।
ইবন আরাবি বলবেন স্বাধীন অস্তিত্ব একমাত্র হকের; সৃষ্টির অস্তিত্ব নির্ভরশীল।
গাজ্জালি বলবেন কারণ-কার্য সম্পর্ককে চূড়ান্ত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ধরে নেবেন না;
প্রকৃত কার্যকারণ ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস নিয়ে প্রশ্ন করুন।
আর আধুনিক কসমোলজি বলবে আমরা মহাবিশ্বের প্রাথমিক ভৌত ইতিহাস সম্পর্কে অনেক কিছু জানি,
কিন্তু কেন কিছু আছে এই চূড়ান্ত প্রশ্নের উত্তর এখনও আমাদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বাইরে।

তাই আমার কাছে আপনার প্রশ্নটির সবচেয়ে গভীর উত্তরটি কোনো একটি বস্তু র নাম নয়।বরং
সৃষ্টির প্রথম উপাদান খুঁজতে খুঁজতে মানুষ শেষ পর্যন্ত অস্তিত্বের প্রথম ভিত্তির প্রশ্নে এসে পৌঁছায়।

আর তখন প্রশ্নটি আর থাকে না খোদা কী দিয়ে সৃষ্টি করলেন? বরং প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়
যে সমস্ত ‌ ’কী দিয়ে’ আমরা ব্যাখ্যা করি, সেই সমস্ত ‘কী’এর অস্তিত্বই বা কেন?
এই জায়গাতেই পদার্থবিদ্যার প্রশ্ন ধীরে ধীরে অধিবিদ্যার প্রশ্নে পরিণত হয়।

আর সুফির ভাষায় যে বস্তু খুঁজতে বেরিয়েছিলাম, শেষে দেখি প্রশ্নটি আমাকে বস্তুটির কাছে নয় অস্তিত্বের
কাছে নিয়ে এসেছে।আর অস্তিত্বের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রথমবার জিজ্ঞেস করে-
আমি যা কিছু দেখি, তার অস্তিত্ব কোথা থেকে ধার করা;
আর সেই ধার দেওয়া অস্তিত্বের চূড়ান্ত উৎস কে?
হয়তো সেখানেই সৃষ্টির উপাদান এর অনুসন্ধান শেষ হয় না বরং শুরু হয়
অস্তিত্বের রহস্য এর প্রকৃত অনুসন্ধান।আর এই রহস্য সন্ধানের শেষ বলতে
এখনো কিছু নেই ।

শুভেচ্ছা রইল

৫| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২২

কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত) বলেছেন: সুফিইজম আর পালনকে এক সুতোয় গাঁথা কখনোই ঠিক নয়।

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৫৩

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




ভাই, আপনার আপত্তিটিকে আমি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েই দেখছি। সুফিইজম আর লালনকে এক সুতোয় গাঁথা
কখনোই ঠিক নয় কথাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য অবশ্যই আছে। লালনকে সরাসরি সুফি বলে চিহ্নিত করা
যেমন অতিসরলীকরণ হবে, তেমনি লালন-দর্শনকে সুফিবাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্কহীন বলাও ইতিহাস ও
গবেষণার আলোকে খুব সহজ সিদ্ধান্ত বলে মনে হয় না।

তাই প্রথমেই একটি বিনীত প্রশ্ন এক সুতোয় গাঁথা বলতে কি আমরা দুটিকে এক ও অভিন্ন বলে দাবি করছি,
নাকি তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক ও দার্শনিক যোগাযোগ এবং সাদৃশ্যগুলো নিয়ে আলোচনা করছি?

এই দুটি কিন্তু এক কথা নয়।লালনকে আমি সুফি বানানোর চেষ্টা করছি না। বরং প্রশ্নটি একটু অন্যভাবে দেখতে
চাই, লালনের সাধনা ও দর্শনে সুফি ভাবধারার কোনো প্রভাব বা সাদৃশ্য আছে কি না?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে তথ্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যায়।বাংলাপিডিয়ার Lalon Shah
নিবন্ধে বলা হয়েছে, লালনের গানে হিন্দু ও মুসলিম ধর্মতত্ত্বের জ্ঞান প্রতিফলিত হয়েছে এবং তাঁর দর্শনের উপাদান
এসেছে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মীয় ধারা, বৈষ্ণব সহজিয়া মত এবং সুফিবাদ থেকে। একই সূত্রে তাঁর সাধনার লক্ষ্য
হিসেবে অন্তর্নিহিত নিরাকার পরমসত্তাকে প্রেম, ভক্তি ও ধ্যানের মাধ্যমে উপলব্ধির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ এটি আমার ব্যক্তিগত অনুমান নয়; বাংলা সংস্কৃতি ও ইতিহাস নিয়ে একটি স্বীকৃত তথ্যভাণ্ডারেও লালনের
চিন্তার উৎসের মধ্যে সুফিবাদের কথা উল্লেখ আছে।

আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়।বাংলাপিডিয়ার Philosophy নিবন্ধে বাউল দর্শনের সঙ্গে বৈষ্ণববাদ ও সুফিবাদের
সাদৃশ্যের আলোচনা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাউলদের মতে মানবদেহের মধ্যেই পরমসত্তার অবস্থান; তাই
পরমসত্তাকে জানতে হলে প্রথমে নিজেকে জানা প্রয়োজন। একই আলোচনায় বাউলদের আধ্যাত্মিক উপলব্ধির
সঙ্গে সুফি ধারণা ফানা ও বাকা-র তুলনাও করা হয়েছে।

তাহলে কি আমরা বলতে পারি লালন কী সুফি? না, এত সরল সমীকরণ আমি নিজেও করব না।আবার কী বলতে
পারি লালন ও সুফিবাদের মধ্যে কোনো ঐতিহাসিক বা ভাবগত যোগাযোগই নেই?সেটিও একইভাবে বলা কঠিন।
লালনকে শরিয়তি অর্থে সুফি সাধক বলে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা যেমন অতিসরলীকরণ, তেমনি তাঁর দর্শনে
সুফিবাদের প্রভাব নেই বলা-ও তথ্যসম্মত নয়।

ইতিহাসের সৌন্দর্য হলোএকটি নদী অনেক উপনদী গ্রহণ করেও নিজের স্বাতন্ত্র্য হারায় না।লালনও তেমনই।
তাঁর মধ্যে সুফি এসেছে, বৈষ্ণব সহজিয়া এসেছে, বৌদ্ধ ভাবধারার প্রতিধ্বনি এসেছে কিন্তু সবকিছুকে নিজের
সাধনা ও গানের ভাষায় রূপান্তর করে তিনি তৈরি করেছেন নিজস্ব লালন-দর্শন। বাংলাপিডিয়াও তাঁর দর্শনের
এই বহুস্রোতীয় উৎসের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে।তাই আমার কাছে লালনকে সুফিবাদের আলোচনায় রাখা
কোনো টেনে-হিঁচড়ে কাউকে সুফি বানানো নয়।বরং এটি বাংলার মরমি চিন্তার ইতিহাসকে তার পারস্পরিক
আদান-প্রদান, মিল ও স্বাতন্ত্র্যসহ বোঝার একটি প্রয়াস।

যদি সুফি সাধনার একটি প্রধান প্রশ্ন হয় পরম সত্যকে বাইরে খুঁজব, নাকি নিজের অন্তরে? আর লালন যদি
বারবার সেই সত্যের সন্ধান নিজের দেহ, মন ও মনের মানুষ এর মধ্যে করতে বলেন, তাহলে তাঁদের একই
আলোচনার টেবিলে বসানোটা কি এতটাই অযৌক্তিক?হয়তো লালনকে সুফি বলার চেয়ে আরও সুন্দর কথা
হলো লালন ছিলেন বাংলার মরমি সাধনার এমন এক কণ্ঠ, যেখানে সুফি ইশ্‌ক, বৈষ্ণব প্রেম, সহজিয়া সাধনা
ও মানবতাবাদ এসে এক আশ্চর্য সুরে মিলেছে।

আর সেই কারণেই গালিব থেকে লালন পর্যন্ত আমাদের যাত্রা কোনো ধর্মকে অন্য ধর্মের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা নয়,
বরং মানুষের অন্তরে সত্য, প্রেম ও পরমসত্তার সন্ধানের বিভিন্ন ভাষাকে পাশাপাশি শোনার চেষ্টা।

কারণ বাউলধারা নিজেই বাংলার এক বহুস্রোতীয় মরমি সাধনা। বাংলাপিডিয়ার বাউল-সংক্রান্ত আলোচনাতেও
বাউল সাধনায় সহজিয়া ও সুফি সাধনার সম্মিলনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং লালনের সাধনায় সুফি সাধন
প্রক্রিয়ার পাশাপাশি সহজিয়া সাধনার প্রভাবের কথাও বলা হয়েছে।আমার মনে হয়, এখানেই আমাদের
আলোচনার সূক্ষ্ম জায়গাটি।

লালনকে সুফি বলা আর লালনের মধ্যে সুফি প্রভাব অনুসন্ধান করা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য।প্রথমটি একটি পরিচয়
নির্ধারণী দাবি।দ্বিতীয়টি একটি ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক গবেষণার প্রশ্ন।আমি দ্বিতীয় প্রশ্নটিই তুলেছি।

আর একটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার লালনের নিজস্বতা এতটাই শক্তিশালী যে তাঁকে শুধু সুফি, শুধু বৈষ্ণব,
শুধু সহজিয়া কিংবা শুধু কোনো একটি ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করলে তাঁর দর্শনের ব্যাপ্তিই বরং ছোট
হয়ে যায়। তিনি বাংলার মরমি সাধনার এক অসাধারণ সমন্বয়ী কণ্ঠ।

তাঁর মনের মানুষ, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, দেহতত্ত্ব, অন্তরসন্ধান, বাহ্যিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষকে
দেখার প্রবণতা এসবের সঙ্গে সুফি মারিফাত, ইশ্‌ক, নফস অতিক্রম ও অন্তরশুদ্ধির কিছু গভীর সাদৃশ্য অবশ্যই
আলোচনার দাবি রাখে।তবে সাদৃশ্য মানেই অভিন্নতা নয়।একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়।

রুমি, ইবনুল আরাবি, লালন তিনজনই অন্তর নিয়ে কথা বলতে পারেন। কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের ধর্মতাত্ত্বিক পরিসর,
সাধনপদ্ধতি, ভাষা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এক নয়।তাই তাঁদের এক করে দেওয়া ভুল।কিন্তু তাঁদের পাশাপাশি
বসিয়ে প্রশ্ন করা মানুষের অন্তর, প্রেম, আত্মসন্ধান ও পরমসত্তা সম্পর্কে তাঁদের মধ্যে কোথায় মিল, কোথায় অমিল?
এটি তো বরং জ্ঞানচর্চারই স্বাভাবিক পদ্ধতি।আমার কাছে গালিব থেকে লালন পর্যন্ত এই আলোচনার উদ্দেশ্যও সেটিই।
কাউকে কারও সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া নয়; বরং বিভিন্ন মরমি ঐতিহ্যের মধ্যে যে সংলাপ, প্রভাব, সাদৃশ্য ও পার্থক্য আছে সেগুলোকে বোঝার চেষ্টা করা।

আর সত্যি বলতে, আপনার আপত্তিটি আলোচনাটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। কারণ এর ফলে আমাদের একটি
গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা স্পষ্ট হলো , লালনকে সুফি বানানোর প্রয়োজন নেই;কিন্তু লালনের দর্শনে সুফি ভাবধারার
সম্ভাব্য প্রভাব ও সাদৃশ্য নিয়ে আলোচনা করতেও সংকোচের কারণ নেই।

শেষে তাই আপনাকেই একটি বিনীত প্রশ্ন রেখে যাই যদি ইতিহাসের তথ্যসূত্র নিজেই লালনের চিন্তার উৎস ও
বাউল সাধনার প্রবাহে সুফিবাদের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে, তাহলে লালন ও সুফিবাদকে পাশাপাশি
আলোচনা করা যাবে না এই সিদ্ধান্তের সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ভিত্তিটি কী?

হয়তো আমাদের মতভেদটি আসলে খুব সামান্য আপনি বলছেন, এক সুতোয় গাঁথা ঠিক নয়। আমি বলছি,
এক করে দেওয়া ঠিক নয় কিন্তু যে সুতো দিয়ে ইতিহাসের বিভিন্ন ভাবধারা কখনো কখনো পরস্পরকে স্পর্শ
করেছে, সেই সুতোটি খুঁজে দেখা অবশ্যই যায়।

আর সেই অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য কাউকে ছোট বা বড় করা নয় সত্যকে তার বহুস্তরীয় রূপে বোঝার প্রযাস মাত্র।

শুভেচ্ছা রইল

৬| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৫

নতুন বলেছেন: সে জানতে চায় আল্লাহ কোথায়?কিন্তু খুব কম মানুষ প্রশ্ন করে আমার অন্তর কোথায়? আমার অন্তর কি সত্যিই তাঁর দিকে মুখ করে আছে? নাকি কেবল আমার শরীর সিজদায় যায়, আর আমার নফস দাঁড়িয়ে থাকে অহংকারের মসনদে?আমি কি সত্যিই তাঁকে চাই?নাকি তাঁর কাছ থেকে শুধু তাঁর দানগুলো চাই?আমি কি তাঁকে ভালোবাসি? নাকি তাঁর দেওয়া জান্নাতকে ভালোবাসি?আমি কি তাঁর সন্তুষ্টি চাই?নাকি মানুষের চোখে ধার্মিক হওয়ার সম্মান চাই? এই প্রশ্নগুলোই সুফির পথের শুরু।

শরিয়াতের ঠিকাদারী এখন ধর্মব্যবসায়ীদের হাতে। শরিয়াত ধর্মের কমিটির হাতে। মসজিদ, মন্দির, মাজার, খানকা আয়ের উতস। সেখানে কমিটি দেখে কত মানুষ আসলো, কত খরচ করলো সেটাই কমিটির মানুষের ধান্দা। যেটা পৃথিবিতে প্রায় ৪-১০ হাজার ধর্মের ক্ষেত্রেই ঘটেছে।

মারেফত-সুফীবাদ মানুষকে সৃস্টিকর্তার বিশালতার সাথে মেলানোর চেস্টা করে। সেটা এক অর্থে ঠিকই আছে।

কার্ল সাগান বলেছিলো "We are all star stuff," এক অর্থ মানুষের প্রতিটি অনু মহাবিশ্বের প্রতিটি অনুর সমান বয়স। সেই অর্থে মানুষ আর মহাবিশ্ব একই জিনিস।

কিন্তু সমস্যা আসে সৃস্টিকর্তার আইডিয়া থেকে।
আসলে কি সৃস্টিকর্তা ১ জন বলে কেউ আছে?
আর থাকলেও সেই সৃস্টিকর্তাই ইসলাম ধর্মের নবী/রাসুল দের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন।

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৩১

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




ভাই নতুন , আপনার মন্তব্যটি মন দিয়ে পড়লাম। বিশেষ করে শেষের প্রশ্নগুলো সৃষ্টিকর্তা আদৌ আছেন কি?
থাকলে তিনি কি সেই সৃষ্টিকর্তাই, যাঁর সঙ্গে নবী-রাসুলদের যোগাযোগের কথা ইসলাম বলে? এগুলো অত্যন্ত
মৌলিক দার্শনিক প্রশ্ন। এগুলোকে পাশ কাটিয়ে শুধু ধর্মীয় আবেগ দিয়ে উত্তর দেওয়া ঠিক হবে না।

তবে আপনার বক্তব্যের কয়েকটি স্তর আলাদা করে দেখলে হয়তো আমাদের আলোচনাটি আরও পরিষ্কার হতে পারে।

প্রথমেই আপনার একটি কথার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত ধর্মীয় পরিচয় আর আত্মিক সত্য এক জিনিস নয়।

একজন মানুষের শরীর সিজদায় যেতে পারে, অথচ তার নফস অহংকারে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেসএটি আসলে সুফি
সাধনার অন্যতম মৌলিক আত্মসমালোচনা। কিন্তু এখান থেকে শরিয়াতই ধর্মব্যবসা অথবা শরিয়াতের সঙ্গে যুক্ত
প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত অর্থের উৎস এমন একটি সর্বজনীন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো একটু বেশি দূর চলে যাওয়া হবে।

মসজিদ, মন্দির, মাজার, খানকা কিংবা কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এসবের সঙ্গে মানুষের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক
স্বার্থ জড়িয়ে পড়তে পারে; অপব্যবহারও ঘটতে পারে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহার দিয়ে সেই ধর্মীয়
ঐতিহ্যের মূল শিক্ষাকে বিচার করা যুক্তিগতভাবে ঠিক নয়।বরং সুফিদের আত্মসমালোচনাই এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

সুফি প্রশ্ন করে আমি কি সত্যিই আল্লাহকে চাই, নাকি আল্লাহর দেওয়া জিনিস চাই?আমি কি সত্যিই তাঁকে ভালোবাসি,
নাকি তাঁর কাছ থেকে পুরস্কার চাই?আমি কি ইবাদত করছি তাঁর সন্তুষ্টির জন্য, নাকি মানুষের প্রশংসার জন্য?

কুরআনের ভাষাতেও আল্লাহর নৈকট্যের কথা এসেছে আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আমি
তো নিকটেই আছি এবং একই আয়াতে সেই নৈকট্যের সঙ্গে সাড়া দেওয়া ও সঠিক পথে চলার কথাও বলা হয়েছে।
অর্থাৎ আত্মিক অনুসন্ধান ইসলামের বাইরের কোনো সংযোজন নয়; ইসলামের ভেতরেই এর একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য
আছে।

এবার আসি We are all star stuff-এর কথায়। এখানে আপনার বক্তব্যের একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে
তবে তার সঙ্গে একটি দার্শনিক সিদ্ধান্তকে আলাদা রাখা দরকার।
কার্ল সাগানের বিখ্যাত We are made of star stuff কথাটির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি যথেষ্ট শক্তিশালী। NASA-ও
ব্যাখ্যা করেছে যে মহাবিশ্বের প্রাথমিক সময়ে মূলত হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও সামান্য লিথিয়াম তৈরি হয়েছিল
পরবর্তী সময়ে নক্ষত্রের অভ্যন্তরে নিউক্লিয়ার ফিউশনের মাধ্যমে কার্বন, অক্সিজেন, লোহা ইত্যাদি ভারী মৌল
তৈরি হয়, এবং নক্ষত্রের জীবনচক্র ও বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেই উপাদানগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী
প্রজন্মের নক্ষত্র, গ্রহ এবং শেষ পর্যন্ত জীবদেহ সেই পদার্থ থেকে গঠিত হয়েছে।

NASA-র ভাষাতেও সাগানের বক্তব্যটি এসেছে-We’re made of star stuff.সুতরাং রূপক অর্থে বলা যায়
আমাদের শরীরের বহু পরমাণুর ইতিহাস মানুষের জন্মের বহু আগে নক্ষত্রের ভেতর দিয়ে গেছে।এটি অত্যন্ত সুন্দর
একটি বৈজ্ঞানিক সত্য।কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে;আমরা নক্ষত্রজাত পদার্থ দিয়ে তৈরি থেকে
তাই মানুষ ও মহাবিশ্ব একই জিনিস এই দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটি আর বিজ্ঞানের সরাসরি সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি দার্শনিক
ব্যাখ্যা।কারণ কোনো কিছুর উপাদানগত উৎস একই হওয়া আর দুটি জিনিসের অস্তিত্বগত পরিচয় একই হওয়া
এক কথা নয়।

উদাহরণস্বরূপ, আমাদের শরীরের কার্বন, অক্সিজেন ও লোহার পরমাণু নক্ষত্রের ইতিহাস বহন করে। কিন্তু সেই
কারণে মানুষ, নক্ষত্র ও মহাবিশ্বকে একই সত্তা বলা যায় না।

বিজ্ঞান আমাদের বলে “কীভাবে” পদার্থের এই ধারাটি গড়ে উঠেছে।কিন্তু প্রশ্ন এই মহাবিশ্ব কেন আছে?
কেন কিছু আছে, কিছুই না থাকার পরিবর্তে? প্রকৃতির নিয়মগুলো এমনই কেন? চেতনা কীভাবে উদ্ভূত হলো?
এসব প্রশ্ন বিজ্ঞানের পাশাপাশি দর্শন ও অধিবিদ্যারও প্রশ্ন।

এবার আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসলে কি সৃষ্টিকর্তা একজন বলে কেউ আছে?এখানে সৎ উত্তর হলো
এটি এমন প্রশ্ন নয় যার উত্তর একটি পরীক্ষাগারে বসে সরাসরি প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা যায়।এটি দর্শনের ঈশ্বর-প্রশ্ন।
একজন নাস্তিক বলতে পারেন মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করতে স্রষ্টার ধারণা প্রয়োজন নেই।

একজন দার্শনিক আস্তিক বলতে পারেন মহাবিশ্বের অস্তিত্ব, কারণ-নির্ভরতা, সুশৃঙ্খল প্রকৃতিনিয়ম, চেতনা ইত্যাদি
স্রষ্টার দিকে ইঙ্গিত করে।আবার কেউ বলতে পারেন এগুলো থেকে স্রষ্টার অস্তিত্বের সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তি তৈরি করা
যায়, কিন্তু তা গণিতের উপপাদ্যের মতো বাধ্যতামূলক প্রমাণ নয়।অর্থাৎ এখানে যুক্তি আছে, পাল্টা-যুক্তিও আছে।
এই জায়গাটিই সৎ বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার জায়গা।কিন্তু ইসলাম ঠিক কী দাবি করে?ইসলামের দাবি শুধু এই নয়
যে কোনো একজন স্রষ্টা আছেন। ইসলামের দাবি আরও নির্দিষ্ট স্রষ্টা এক, তিনি অদ্বিতীয়, তিনি সৃষ্টির মতো নন,
এবং তিনি নবী-রাসুলদের মাধ্যমে মানুষের কাছে ওহি ও পথনির্দেশ পাঠিয়েছেন।

কুরআনের সূরা আল-ইখলাসে তাঁকে বলা হয়েছে “আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়... তিনি জন্ম দেননি এবং জন্মগ্রহণও
করেননি, এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।”এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক পার্থক্য আছে।ইসলামের আল্লাহ
মহাবিশ্বের কোনো অংশ নন।তিনি নক্ষত্র নন, শক্তি নন, পদার্থ নন, মানুষের সম্মিলিত চেতনার নামও নন।

অর্থাৎ আমরা মহাবিশ্বের অংশ এবং মহাবিশ্বই আল্লাহ এই দুটি কথা ইসলাম এক করে না।বরং তাওহিদের ধারণায়
স্রষ্টা ও সৃষ্টি ontologically আলাদা।এই জায়গায় সুফিবাদের প্রকৃত অবস্থানও বোঝা দরকার।সুফি যখন বলে
অন্তরে আল্লাহকে খোঁজো, তার অর্থ সাধারণত এই নয় যে মানুষের আত্মাই আল্লাহ হয়ে গেছে।বরং অর্থ হলো-
নিজের অন্তরের অহংকার, নফস, আসক্তি ও অজ্ঞতার পর্দা সরিয়ে আল্লাহর নৈকট্য, হিদায়াত ও উপস্থিতির
অনুভব লাভ করা।এ কারণেই সুফির অন্তর-অনুসন্ধানকে মানুষই স্রষ্টা এই সিদ্ধান্তে নামিয়ে আনা ঠিক হবে না।

আর নবী-রাসুলদের সঙ্গে স্রষ্টার যোগাযোগ?এখানে ইসলাম একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক দাবি করে
ওহি বা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে আল্লাহ নবী-রাসুলদের পথনির্দেশ দিয়েছেন।এই দাবিকে বিজ্ঞানের পরীক্ষাগারে
পুনরাবৃত্তি করে প্রমাণ করা সম্ভব নয়; কারণ এটি পরীক্ষণযোগ্য ভৌত ঘটনা হিসেবে দাবি করা হচ্ছে না। এটি
ধর্মীয় সাক্ষ্য, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, কুরআনের দাবি এবং তার সত্যতা নিয়ে দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তির ওপর
দাঁড়ানো একটি বিশ্বাসগত অবস্থান।
সুতরাং একজন সংশয়বাদীকে জোর করে বলা অতএব এটা প্রমাণিত বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সঠিক হবে না।
আবার একজন মুসলমানের বিশ্বাসকে শুধু এই কারণে অযৌক্তিক বলা বিজ্ঞান তো ওহি মাপতে পারে না
সেটিও যুক্তির সীমা ভুলভাবে প্রয়োগ করা।

কারণ বিজ্ঞান যে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য তৈরি, আর দর্শন যে প্রশ্ন করে, আর ধর্ম যে অর্থ ও উদ্দেশ্যের
প্রশ্ন তোলে তিনটি ক্ষেত্র সম্পূর্ণ অভিন্ন নয়।আমার কাছে আপনার মন্তব্যের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটি তাই শেষের
প্রশ্ন নয়; বরং শুরুতে ফিরে যাওয়া সেই প্রশ্ন আমার অন্তর কোথায়?হয়তো এখানেই গালিব, রুমি, লালন ও
সুফি সাধনার আলোচনার প্রকৃত তাৎপর্য।তাঁরা আমাদের প্রথমে অন্যের ঈশ্বরকে বিচার করতে বলেন না।
তাঁরা প্রশ্ন করেন আমার অহংকার কোথায়?আমার লোভ কোথায়?আমার ভয় কোথায়?আমার প্রেম কোথায়?
আমি যে সত্যের দাবি করি, আমার জীবন কি তার সাক্ষ্য দেয়?আর এখানেই ধর্মের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।

মসজিদে কত মানুষ গেল তার চেয়ে কঠিন প্রশ্ন,সিজদা থেকে উঠে আমি কতটা মানুষ হয়ে ফিরলাম।আমি কতবার
আল্লাহর নাম নিলাম তার চেয়ে কঠিন প্রশ্ন,আমার আচরণে তাঁর রহমতের কতটুকু প্রকাশ পেল।

আর বিজ্ঞান আমাদের বলে তোমার শরীরের বহু পরমাণু নক্ষত্রের প্রাচীন ইতিহাস বহন করছে।সুফি এসে হয়তো
জিজ্ঞেস করবে তাহলে তোমার হৃদয়ের ইতিহাস কী?সেই হৃদয়ে কি শুধু মহাবিশ্বের ধূলিকণা আছে,নাকি সত্যের
জন্য কোনো আকুলতাও আছে?এই দুই প্রশ্নকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর মধ্যেই হয়তো আমাদের প্রকৃত সংলাপ;
বিজ্ঞান জিজ্ঞেস করে আমি কী দিয়ে তৈরি? দর্শন জিজ্ঞেস করে আমি কেন আছি? সুফি জিজ্ঞেস করে আমি কে?
আর ধর্ম জিজ্ঞেস করে আমি কার দিকে ফিরব?চারটি প্রশ্নকে এক করে ফেলার প্রয়োজন নেই।বরং প্রত্যেকটির
নিজস্ব ক্ষেত্র ও সীমা স্বীকার করেই যদি আমরা প্রশ্ন করি, তাহলে বিতর্কের চেয়ে অনুসন্ধান বড় হয়ে ওঠে।
আর সত্যিকারের অনুসন্ধানী মানুষের জন্য প্রশ্ন করা কখনোই অপরাধ নয়; প্রশ্নকে সত্যের দিকে নিয়ে
যাওয়াই আসল সাধনা।

শুভেচ্ছা রইল

৭| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০১

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: এত বড়ো লেখা ঠান্ডা মাথায় লেখা খুবই কঠিন । এত কিছু একসাথে মনে রাখা সম্ভব হয় না । আপনার চেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই । আপনি বলতে চেয়েছেন নিজের ভেতরের কু-প্রবৃত্তি কে জয় করাই আসল জয় এটা কোনো নতুন ধারনা ছিলো না । রুমি , হাফিজ , লালন এরা ছিলেন গ্রেট অবজারভার । এরা সবসময় খেয়াল করতেন তাদের মনের অবস্থা কেমন হয় যখন কাম আসে , লোভ আসে , হিংসা অনুভূত হয় । এগুলো মানুষের ডোপামিন বাড়িয়ে দিতো । এরা লক্ষ্য করতেন মানুষ ক্রোধের বশে কিভাবে আরেকজনের ক্ষতি করতে গিয়ে নিজের ক্ষতি করছে । নামাযে দাঁড়ানো অবস্থায় নিজের অন্তরে অনুভূতিকে খেয়াল করতেন । শায়েরীর মাধ্যমে এসব বিষয় লিখে যাওয়ায় তা পড়তে ভালো লাগে । আমি হিন্দুধর্মের একটা লেখায় পেয়েছিলাম যে ভগবান পৃথিবীর সবকিছুর মাঝে বিরাজমান । এটাও সুফিবাদের একটা কোর আইডোলজী । ভালো লিখেছেন ।

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৬

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:




আপনার এত মন দিয়ে লেখাটি পড়া এবং এত সুন্দরভাবে তার অন্তর্নিহিত কথাটুকু ধরতে পারা আমার জন্য
লেখাটির চেয়েও বড় প্রাপ্তি। আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা রইল। :)

আপনি একেবারে ঠিক জায়গাটিই ধরেছেন নিজের ভেতরের কু-প্রবৃত্তিকে জয় করাই আসল জয়। সত্যিই এটি
কোনো নতুন আবিষ্কার নয়। মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা যত পুরোনো, এই প্রশ্নও তত পুরোনো আমি বাইরে পৃথিবীকে
জয় করতে চাই, কিন্তু নিজের ভেতরের কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, হিংসা ও অহংকারকে কতটা জয় করতে পেরেছি?

রুমি, হাফিজ, লালন কিংবা অন্য মরমি সাধকদের মহত্ত্ব সম্ভবত এখানেই তাঁরা শুধু ধর্মীয় উপদেশ দেননি, মানুষের
অন্তর্জগতকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। মানুষের ভেতরে কামনা জাগলে কী ঘটে, লোভ এলে বিচারবোধ কীভাবে বদলে
যায়, ক্রোধ এলে মানুষ কীভাবে নিজেরই ক্ষতির পথে এগিয়ে যায়, অহংকার কীভাবে সত্য দেখার ক্ষমতাকে আচ্ছন্ন
করে এসব তাঁরা গভীরভাবে অনুভব ও ভাষায় প্রকাশ করেছেন।

আপনার গ্রেট অবজারভার কথাটি তাই আমার খুব ভালো লেগেছে।তবে একটি জায়গায় সামান্য পার্থক্য করা যায়।
তাঁরা আধুনিক অর্থে স্নায়ুবিজ্ঞানী বা নিউরোসায়েন্টিস্ট ছিলেন না, তাই ডোপামিন বাড়ছে এই ভাষাটি তাঁদের
নিজেদের ভাষা নয়। কিন্তু তাঁরা মানুষের আকাঙ্ক্ষা, পুরস্কার, আসক্তি, তৃপ্তি, অস্থিরতা ও পুনরাবৃত্ত আচরণের যে
অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছেন, আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও নিউরোসায়েন্সের কিছু পর্যবেক্ষণের সঙ্গে তার আকর্ষণীয় সাদৃশ্য খুঁজে
পাওয়া যায়।

অর্থাৎ প্রাচীন মরমি সাধকরা বলছিলেন অন্তরের ভাষায়, আধুনিক বিজ্ঞান বলছে মস্তিষ্ক ও আচরণের ভাষায়।
একটি জায়গায় এসে দুয়ের প্রশ্ন যেন পরস্পরকে স্পর্শ করে। কেন মানুষ জানে কোনো কাজ তার ক্ষতি করবে,
তবুও সে বারবার সেই কাজের দিকে ফিরে যায়?সুফি বলবেন নফস, আসক্তি, গাফলত।মনোবিজ্ঞানী হয়তো
বলবেন অভ্যাস, পুরস্কার-ব্যবস্থা, আবেগপ্রবণতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব।ভাষা আলাদা, কিন্তু মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বটি
একই।

আর আপনি নামাজের কথা যে বললেন, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নামাজ শুধু শরীরের একটি নির্দিষ্ট ভঙ্গির সমষ্টি নয়
একজন সাধকের কাছে সেটি নিজের অন্তরের অবস্থাকে দেখারও একটি মুহূর্ত হতে পারে।

আমি সিজদায় আছি, কিন্তু আমার মন কোথায়?আমার শরীর কিবলামুখী, কিন্তু আমার আকাঙ্ক্ষাগুলো কোন দিকে?
আমি আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়েছি, কিন্তু আমার অহংকার কি এখনও আমার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে?এই আত্ম
পর্যবেক্ষণই তো সুফি সাধনার একটি গভীর দিক।আর আপনার শেষ কথাটি ভগবান পৃথিবীর সবকিছুর মাঝে
বিরাজমান এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য উল্লেখ করা ভালো বলে মনে করি।

হিন্দু দর্শনের বিভিন্ন ধারায় ঈশ্বর, ব্রহ্ম ও জগতের সম্পর্কের ব্যাখ্যা এক নয়; সব হিন্দু দর্শন একইভাবে ঈশ্বর
সবকিছুর মধ্যে আছেন” বলে না। একইভাবে সুফিবাদের মধ্যেও আল্লাহ ও সৃষ্টির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার বিভিন্ন
দার্শনিক ধারা আছে। তাই দুটিকে সরাসরি অভিন্ন বলে দেওয়া ঠিক হবে না।

তবে ঈশ্বরীয় উপস্থিতি, সর্বব্যাপী ঐশ্বরিক নিদর্শন এবং মানুষের অন্তরে পরম সত্যের সন্ধান এই জায়গায় বিভিন্ন
মরমি ঐতিহ্যের মধ্যে গভীর তুলনামূলক আলোচনা অবশ্যই সম্ভব।

ইবনুল আরাবির ভাষায় সৃষ্টিজগতে ঈশ্বরীয় তাজাল্লি বা প্রকাশের ধারণা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি লালনের মনের
মানুষ এর সন্ধানও মানুষকে বাইরের আচার থেকে নিজের অন্তরের দিকে ফিরিয়ে দেয়।সেখানেই হয়তো আমাদের
এই দীর্ঘ আলোচনার সবচেয়ে সুন্দর মিলটি-
গালিব প্রশ্ন করেন খোদা নেই এমন জায়গা কোথায়?
রুমি বলেন ইশ্‌কের আগুনে আমি -কে পুড়িয়ে দাও।
হাফিজ প্রেমের নেশায় অহংকার ভুলে যেতে বলেন।
লালন খোঁজেন মনের মানুষকে।
আর সুফি বলে আগে নিজের অন্তরটাকে দেখো।

শেষ পর্যন্ত সবাই যেন আমাদের একই আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেন যাকে খুঁজছ, তার আগে নিজেকে দেখো।
যে জগতকে বদলাতে চাও, তার আগে নিজের নফসকে দেখো।আর যে প্রেমের কথা বলছ, দেখো তোমার আচরণে
সেই প্রেমের কতটুকু আলো আছে।

আপনার মন্তব্যের জন্য আবারও কৃতজ্ঞতা। আপনি গ্রেট অবজারভার কথাটি দিয়ে রুমি, হাফিজ ও লালনকে যে
এক অসাধারণ জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছেন, আমার মনে হয় সেটিই তাঁদের ভাবনার আসল শক্তি, তাঁরা মানুষকে
শুধু দেখেননি, মানুষের ভেতরে মানুষটিকেও দেখেছেন।

শুভেচ্ছা রইল

৮| ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:২৫

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: মসজিদের ওই কোণে বসে, শুধাই আমি বারে বার
হে গালিব, ঢালিতে দাও সাকি শরাবের ওই ধার।
তুমি তো বলিছ খোদার ঘরে পাপের ছোঁয়া বারণ অতি,
তবে দেখাও আমায় এমন ভুবন, যেখানে নেইকো
তাহার জ্যোতি (কেরামতি )?

২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০৩

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



সুন্দর লিখেছেন আপনার মত আমিউ একান্তে বসে ভাবি

মসজিদের ওই নীরব কোণে, জিজ্ঞাসি গালিবেরই ভাষায়
খোদা যদি সর্বত্র থাকেন কোন ঘর তাঁকে হারায়?
সাকি, ঢালো ইশ্‌কের পেয়ালা, মুছে যাক আমি’র ভার
যে নেশাতে নফস হারায়, সে নেশাই তো সত্যিকার।

মসজিদ, মন্দির, মাজার পেরিয়ে খুঁজি তাঁকে অন্তর মাঝে
যেন নূর তাঁরই ঝরে নীরবে, প্রেমের অশ্রুর সাজে
পাপ-পুণ্যের হিসাব পেরিয়ে যখন হৃদয় হয় স্বচ্ছ
দেখি যেদিকে চোখ মেলি, তাঁরই জ্যোতি অনন্ত।

শুভেচ্ছা রইল

৯| ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪০

সুলাইমান হোসেন বলেছেন: আসসালামুআলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ
সুপ্রিয় ব্লগার,
ড.এম এ আলী,
অবশেষে সুফিবাদ নিয়ে আপনার নিকট থেকে বিশাল একটি পোস্ট পেয়ে আমি বিশেষভাবে আনন্দিত হয়েছি।আপনার এই বিশাল পোস্টের থেকে শায়খে আকবার মুহিউদ্দীন ইবনূল আরাবির কয়েকটি বাক্যের ব্যাখা করব,আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকে।
তার আগে বিখ্যাত সূফি দার্শনিক,মাওরানা জালালউদ্দিন রুমি রহমাতুল্লাহি আলাইহির একটি শেরের অর্থ জেনে নেওয়া প্রয়োজন মনে করি,তাহলে মুহিউদ্দীন ইবনুল আরাবি রহ.এর বাক্যগুলো বুজতে সহজ হবে,
বিখ্যাত মসনবীয়ে রুমিতে একটি শের রয়েছে,

সোহবতে সলেহ তূরা সলেহ কুনাদ,
সোহবতে তলেহ তুরা তলেহ কূনাদ।"
এই শেরটির বাংলা কাব্যিক অর্থ হলো,
"সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস,
অসৎসঙ্গে সর্বনাশ"

কিন্তু সেরটাকে শুধু এপর্যন্তই রাখলে এর প্রকৃত অর্থ বোঝা যাবেনা।
এখন আমরা মুহিউদ্দীন ইবনুল আরাবী রহ.এর বাক্যগুলোর ব্যাখায় এই সেরটাকে কাজে লাগাবো।আপনার পোস্ট থেকেই ইবনুল আরাবীর রহ.এর বাক্যগুলো এখানে কপি পেস্ট করা হলো—

আমার হৃদয় এখন প্রত্যেক রূপ ধারণের উপযোগী-
সে কখনো হরিণের চারণভূমি, কখনো সন্ন্যাসীদের উপাসনালয়,
কখনো মূর্তির মন্দির, কখনো তীর্থযাত্রীর কাবা,
কখনো তাওরাতের ফলক, কখনো কুরআনের পবিত্র পৃষ্ঠা।
আমি প্রেমের ধর্ম অনুসরণ করি
প্রেমের উটের কাফেলা যেদিকে মুখ ফেরায়,
সেদিকেই আমার ধর্ম,
সেদিকেই আমার ঈমান।

এই বাক্যগুলোতে সুফিবাদের চূড়ান্ত মকামের বর্ণনা রয়েছে যাকে মকামে রেযা বা সন্তুষ্টির মকাম বলা হয়।বাক্যগুলো পাঠ করা যতটা সহজ কিন্তু এই বাক্যগুলোর অবস্তায় বা হালে পৌঁছানো ততটা সহজ নয়।অগনিত পরিক্ষা নিরিক্ষার মধ্য দিয়ে এই মকামে পৌঁছাতে হয়।
আধ্যতিক সাধককে আল্লাহতায়ালা বিভিন্ন হাল বা অবস্তায় রেখে পরিক্ষা করেন।কখোনো তার সামনে আসতে পারে মুনাফেকি বা সন্দেহের হালত।আবার কখোনো আসতে পারে ফকিরীর হালত আবার আসতে পারে ধনাঢ্যতার হালত।কখোনো রাজা কখোনো ফকির এমনসব হালত দিয়ে সাধককে পরিক্ষা করা হয়।এর অবশ্য অনেক কারনও রয়েছে।যেমন যে কখোনো কুফরিতে পতিত হয়নি সে কখোনো ইমানের সাদ বা মজা বুজতে পারবেনা।
আধ্যাতিক পথিক সম্পূর্ণরুপে আল্লাহতে ফানা হয়ে থকেন।নিজে থেকে চেষ্টা তদবীর করে কোনো হালত দূর করেননা।উদাহরন সরুপ যদি কোনো বিষয়ে সন্দেহের হালতে রাখা হয়,তাহলে সাধক সন্দেহের হালতেই পরে থাকেন,আবার যদি ইমানের হালতে রাখা হয় তাহলে ইমানের হালতেই পরে থাকেন।
"কিন্তু এই পথে যে একবার প্রবেশ করে,সে আজীবনের জন্য প্রবেশ করে,এই পথ থেকে সে আর বের হতে পারেনা।

২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩৭

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



ওআলাইকুমসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ
সুপ্রিয় ব্লগার সলাইমান হোসেন,
আপনার দুটো মন্তব্য যেহেতু একটি পুর্ণ মন্তব্যেরই দুটি অংশ, তাই দুটিকে মিলিয়ে আমার প্রতিমন্তব্য আপনার
পরের মন্তব্যের প্রতিমন্তব্যের ঘরেই দিলে ভাল হয় বিবেচনায় সেখানেই তুলে দিব । দয়া করে সেখানে দেখে
নিবেন ।
শুভেচ্ছা রইল

১০| ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:১১

সুলাইমান হোসেন বলেছেন: এখন আসি আরো উঁচু পররযায়ের আলোচনায়।মাওলানা রুমি রহ.এর সেরটার সাথে ইবনে আরাবী রহমাতুল্লাাহি আলাইহির বাক্যের সম্পর্ক কি?
মাওলানা রুমি রহ. এর সেরটার সারকথা হলো সোহবত বা সংস্পর্শের প্রতিক্রিয়া অবশ্যই হয়।খারাপ সঙ্গে থাকলে মানুষ খারাপ হয় আর ভালো সঙ্গে থাকলে মানুষ ভালো হয়ে।একজন আরিফের আত্মার সাথে জগতের আত্মাও কানেকটেড হয়ে যায়।মুহিউদ্দী ইবনুল আরাবী রহ.মস্তবড় একজন আরিফ ছিলেন।তার লেখাগুলো থেকে কিছুটা অনুমান করা যায় তিনি কতবড় আরিফ ছিলেন।একজন আরিফ,সে যত নির্জন কুঠিরে গিয়েই লুকিয়ে থাকুকনা কেন,জগতের পাপ পঙ্কিলতা এবং বিভিন্ন পরিবর্তনের একটা তাছির বা প্রভাব অবশ্যই তার অন্তরে গিয়েও পরবে।এজন্যই তিনি এ কথা বলেছেন।তার অন্তর বিভিন্ন রুপ ধারন করে।ইবনুল আরাবী রহ.এমন অনেক গোপন কথা প্রকাশ করেছেন,যা আসলে মাশায়েখরা প্রকাশ করেননা।কারন এগুলো অনেকসময় ফেতনার কারন হয়।যেমন মনসূর হাল্লজ তার অন্তরের একটি উঁচু হালত প্রকাশ করে দিয়েছিলেন।এজন্য তাকে জীবন দিতে হয়েছিলো।আর ইবনূল আরাবী এমন অনেক গোপন কথা প্রকাশ করছিলেন,যার কারনে শরীয়তের আলিমদের বিরোধীতার সম্মূখী হতে হয়েছিলো।ইমাম আবু হামেদ গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাই ইবনুল আরাবী একই মতের অনুসারী ছিলেন।ইমাম ইবনূল জাওযি রহ.ইবনুল আরাবীর বিরোধীতা করেছিলেন।

২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:৩৫

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:



আসসালামুআলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

সুপ্রিয় সোলাইমান হোসেন ভাই , আপনার দীর্ঘ ও মননশীল মন্তব্যটির জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বিশেষ করে
ভালো লেগেছে যে আপনি শুধু ইবনুল আরাবি (রহ.)-এর বহুল উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিগুলো তুলে ধরেননি, বরং তার
অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বোঝার জন্য ‘সোহবত’-এর ধারণাটিকেও সামনে এনেছেন। আপনার মন্তব্যটি
আসলে আরেকটি আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে।

তবে কয়েকটি জায়গায় আমার খুব সামান্য ভিন্ন পাঠ আছে তবে তা ভিন্নতা প্রকাশের জন্য নয়, বরং বিষয়টিকে
আরও নির্ভুলভাবে বোঝার জন্য।

প্রথমেই রুমির সেই বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি;

সোহবতে সলেহ তূরা সলেহ কুনাদ,
সোহবতে তলেহ তূরা তলেহ কুনাদ।

এর মর্ম যে সঙ্গ মানুষের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে এ বিষয়ে দ্বিমত থাকার কারণ নেই। মানুষ সামাজিক ও
অনুকরণপ্রবণ প্রাণী; তার ভাষা, মূল্যবোধ, আচরণ, এমনকি আত্মপরিচয়ের ওপরও সঙ্গ ও পরিবেশের প্রভাব
পড়ে। সুফি পরিভাষায় এই ‘সোহবত’ শুধু সামাজিক মেলামেশা নয়; এটি হৃদয়ের ওপর হৃদয়ের প্রভাব,
চরিত্রের ওপর চরিত্রের প্রভাব এবং কখনো আধ্যাত্মিক অবস্থারও প্রভাব।

কিন্তু ইবন আরাবির “আমার হৃদয় প্রত্যেক রূপ ধারণের উপযোগী…”
এই পঙ্‌ক্তিকে শুধু জগতের ভালো-মন্দের প্রভাবে একজন আরিফের হৃদয় বিভিন্ন রূপ ধারণ করে এভাবে
ব্যাখ্যা করলে আমার মনে হয় তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়।

ইবন আরাবি নিজেই এই কবিতার ব্যাখ্যায় হৃদয়ের qalb শব্দের সঙ্গে taqallub অর্থাৎ পরিবর্তন, উলট-পালট
বা অবস্থান্তরের সম্পর্ক করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় হৃদয়ের এই পরিবর্তন ঘটে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক অবস্থা এবং
Divine self-disclosure বা তাজাল্লির ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে। অর্থাৎ এখানে ‍‌হৃদয় প্রত্যেক
রূপ ধারণ করে কথাটি কেবল বাহ্যিক জগতের প্রভাব গ্রহণের কথা নয়; এটি আরিফের হৃদয়ের অসাধারণ
গ্রহণক্ষমতা ও বহুরূপী তাজাল্লি গ্রহণের ক্ষমতা নির্দেশ করে।

আর এখানেই তাঁর পরের পঙ্‌ক্তি-

আমি প্রেমের ধর্ম অনুসরণ করি,
প্রেমের কাফেলা যেদিকে যায়,
সেদিকেই আমার ধর্ম,
সেদিকেই আমার ঈমান।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই কথাটিকে সরাসরি সব ধর্ম একই কিংবা শরিয়তের আর কোনো প্রয়োজন নেই এমন অর্থে নেওয়া
ঠিক হবে না।

ইবন আরাবির এই কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তাঁর নিজের তরজুমান আল-আশওয়াক-এর ভাষ্য
এবং পরবর্তী গবেষণায়। সেখানে Religion of Love বা প্রেমের ধর্ম -এর সঙ্গে তিনি কুরআনের তোমরা
-আল্লাহকে ভালোবাসলে আমাকে অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন- এই ভাবনাকে যুক্ত করেছেন।
অর্থাৎ তাঁর কাছে প্রেম নিছক আবেগ নয়; প্রেমের সত্যতা প্রকাশ পায় অনুসরণ, আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যে।
এটি আমার কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

অর্থাৎ ইবন আরাবির প্রেমের ধর্ম কে যদি শুধু উদার মানবতাবাদ বা সব ধর্মকে একই বলে দেওয়ার একটি
কাব্যিক ঘোষণা বানিয়ে ফেলি, তাহলে তাঁর নিজের দার্শনিক-আধ্যাত্মিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে যায়।

তাঁর হৃদয় -প্রত্যেক রূপের আধার- কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তিনি সব বিশ্বাসের মতবাদগত পার্থক্য অস্বীকার করেছেন।
বরং তাঁর কাছে আরিফের হৃদয় এত বিস্তৃত যে সে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতীকের মধ্যে প্রকাশিত সত্যের বিভিন্ন দিক উপলব্ধি
করতে পারে। ইবন আরাবির এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর অস্তিত্বতত্ত্ব, তাজাল্লি এবং মানব-হৃদয়ের ধারণার সঙ্গে যুক্ত।

এখানেই সাদৃশ্য এবং অভিন্নতা এই দুটি শব্দের পার্থক্য অত্যন্ত জরুরি।একজন আরিফ অন্যের ধর্মীয় অনুভূতির মধ্যে
আল্লাহর সন্ধানের একটি সত্য উপলব্ধি করতে পারেন এটি এক কথা।আর সব ধর্মের আকিদা, নবুয়ত, ওহি, শরিয়ত
ও খোদাতত্ব অভিন্নএ কথা বলা সম্পূর্ণ অন্য কথা।

প্রথমটি ইবন আরাবির হৃদয়ের বিস্তৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে আলোচনা করা যায়; দ্বিতীয়টি তাঁর বক্তব্যকে অতিরিক্ত সরলীকরণ করার ঝুঁকি তৈরি করে।

আপনার -মকামে রেযা- প্রসঙ্গটিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমার মনে হয় এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রাখা ভালো ।
ইবন আরাবির এই কবিতাকে সরাসরি শুধু ‘মকামে রেযা’-র সংজ্ঞা হিসেবে চিহ্নিত না করে, প্রেম, তাজাল্লি, হৃদয়ের পরিবর্তনশীলতা এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা অধিক নিরাপদ। কারণ সুফি পরিভাষায় মাকাম
এবং হাল এক জিনিস নয়। মাকাম সাধারণত সাধকের অর্জিত ও স্থিত আধ্যাত্মিক অবস্থান; আর হাল হলো আল্লাহর
পক্ষ থেকে আগত এমন আধ্যাত্মিক অবস্থা, যা সাধকের ইচ্ছাধীন নয় এবং স্থায়ীও নাও হতে পারে।

আপনি যে বলেছেন সাধক কখনো দারিদ্র্য, কখনো প্রাচুর্য, কখনো পরীক্ষা, কখনো সন্দেহ, কখনো ঈমানের স্বাদ
বিভিন্ন অবস্থার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেন এটি সুফি আখ্যানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু এখানে একটি
সতর্কতা জরুরি:
প্রত্যেক সন্দেহকে আধ্যাত্মিক পরীক্ষার নামে গ্রহণ করা এবং সন্দেহকে চিরস্থায়ী অবস্থান হিসেবে মেনে নেওয়া
এক কথা নয়।ইসলামী আধ্যাত্মিকতায় তাওয়াক্কুল, রেযা, তাসলিম ও ফানা এসবের অর্থ নিজের বিচারবুদ্ধি,শরিয়ত
ও নৈতিক দায়িত্বকে পরিত্যাগ করা নয়। বরং নিজের সীমাবদ্ধ অহংকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করা।

এখানে ফানা শব্দটিও আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বোঝা দরকার।ফানা মানে ব্যক্তি-মানুষটি শারীরিকভাবে
বিলীন হয়ে যাওয়া নয়; বরং নিজের স্বাতন্ত্র্যবাদী অহং, আত্মমুগ্ধতা ও ‘আমি-ই কর্তা’ এই দাবির ক্ষয়। আর সুফি
ঐতিহ্যে এর সঙ্গে বাকা অর্থাৎ আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে নতুনভাবে স্থিত হওয়ার ধারণাটিও যুক্ত।
অর্থাৎ-
ফানা হলো আমি কিছুই নই উপলব্ধির দিকে যাত্রা,
আর বাকা হলো সেই উপলব্ধির পর ‘আমি কার জন্য?’এই প্রশ্নের নতুন উত্তর।

আপনার মন্তব্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাগুলোর একটি হলো একজন আরিফ নির্জনে থাকলেও জগতের প্রভাব
থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নন। এখানে আমি সামান্য কিছু কথা যোগ করব।

ইবন আরাবির হৃদয়ের পরিবর্তন কে কেবল পাপ-পঙ্কিল জগতের সংস্পর্শের ফল হিসেবে দেখলে বিষয়টি কিছুটা
সংকুচিত হয়ে যায়। তাঁর নিজের ব্যাখ্যায় হৃদয়ের পরিবর্তনশীলতা আরও গভীরভাবে তাজাল্লির পরিবর্তনশীল
প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ হৃদয় একটি আয়নার মতো যেখানে বাস্তবতার বিভিন্ন দিক প্রতিফলিত হতে পারে।
এই কারণে তাঁর কাছে আরিফের হৃদয়ের ব্যাপ্তি কোনো নৈতিক আপসের নাম নয়; বরং সীমিত ধারণার সংকীর্ণতা
অতিক্রম করার ক্ষমতা।তবে এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দেয়।

“আমার হৃদয় মন্দিরও, কাবাও, তাওরাতের ফলকও, কুরআনের পৃষ্ঠা” এই ভাষা শুনে কেউ যদি বলেন,
তাহলে ইবন আরাবি সব বিশ্বাসকে সমান সত্য বলেছেন , তিনি হয়তো কবিতার ভাষাটিকে তার নিজস্ব মরমি-
দার্শনিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করছেন।
আবার কেউ যদি বলেন, “এখানে অন্য সব রূপের কোনো মূল্যই নেই” তাহলেও কবিতার অন্তর্ভুক্তির শক্তিকে
অস্বীকার করা হয়।বরং তাঁর বক্তব্যটি এমন এক হৃদয়ের কথা বলে, যে হৃদয় বিভিন্ন রূপের মধ্যেও পরম সত্যের
তাজাল্লি উপলব্ধি করতে সক্ষম, অথচ কোনো এক বাহ্যিক রূপকে পরম সত্যের সম্পূর্ণ সীমা মনে করে না।

এখানে তাঁর একটি গভীর ধারণা মনে পড়ে,মানুষ আল্লাহকে যেভাবে কল্পনা করে, তার সেই কল্পনারও সীমা আছে।
তাই আরিফের যাত্রা শুধু নতুন জ্ঞান সংগ্রহের যাত্রা নয়; বরং নিজের তৈরি খোদা-ধারণার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম
করারও যাত্রা।এ কারণে ইবন আরাবির “হৃদয়” আসলে শুধু আবেগের কেন্দ্র নয় এটি আধ্যাত্মিক জ্ঞানের একটি
বিশেষ ক্ষেত্র।

আর একটি ঐতিহাসিক সংশোধনের কথা বিনয়ের সঙ্গে বলি।আপনি বলেছেন, ইমাম আবু হামেদ গাজ্জালী (রহ.)
ইবনুল আরাবীর একই মতের অনুসারী ছিলেন।এখানে সময়ের একটি মৌলিক সমস্যা আছে। ইমাম আবু হামিদ
আল-গাজ্জালি ইন্তেকাল করেন ১১১১ খ্রিস্টাব্দে, আর মুহিউদ্দীন ইবন আরাবির জন্ম ১১৬৫ খ্রিস্টাব্দে। অর্থাৎ
ইবন আরাবির জন্মের প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি আগে গাজ্জালি ইন্তেকাল করেন।

তাই ঐতিহাসিক অর্থে বলা যায় না যে গাজ্জালি ইবন আরাবির অনুসারী ছিলেন, কিংবা দুজনের মধ্যে প্রত্যক্ষ
মতবিনিময় হয়েছিল।তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁদের মধ্যে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক সাদৃশ্য নেই। বরং ইবন আরাবির
পূর্ববর্তী ইসলামী আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক ঐতিহ্যের ওপর গাজ্জালির গভীর প্রভাব ছিল এমন আলোচনা করা যথার্থ।
কিন্তু প্রভাব, সাদৃশ্য এবং প্রত্যক্ষ অনুসরণ এই তিনটি আলাদা বিষয়।

একইভাবে ইবনুল জাওযির ব্যাপারেও একটু ঐতিহাসিক সতর্কতা প্রয়োজন। তিনি ইবন আরাবির চিন্তার সমালোচক
ছিলেন এমন সাধারণভাবে বলা গেলেও, ইবন আরাবির নির্দিষ্ট রচনার কোন বক্তব্যকে কেন্দ্র করে কোন বিরোধিতা,
কোন সময় এবং কোন ঐতিহাসিক সূত্রে এসব আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন। সুফি ব্যক্তিত্বদের ঘিরে পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বহু কাহিনি, কিংবদন্তি ও জনশ্রুতি যুক্ত হয়েছে; তাই আধ্যাত্মিক শ্রদ্ধা আর ইতিহাসের দলিল দুটিকে
আলাদা রাখাই ভালো।

হাল্লাজের প্রসঙ্গেও একই সতর্কতা প্রযোজ্য। তাঁর বিখ্যাত “আনাল হক” উক্তি এবং মৃত্যুর ইতিহাস সুপরিচিত; কিন্তু
তাঁর মৃত্যুকে সরলভাবে শুধু “একটি গোপন আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করার শাস্তি” হিসেবে ব্যাখ্যা করলে রাজনৈতিক,
ধর্মতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের অনেক কিছু বাদ পড়ে যায়।

আমার কাছে বরং এখানেই সুফি ঐতিহ্যের একটি বড় শিক্ষা রয়েছে:যে সত্য অন্তরে উপলব্ধি হয়, তা প্রকাশ করার
ভাষা সবসময় সেই সত্যের সমান গভীর হয় না।অভিজ্ঞতা এক জিনিস, তার ভাষায় প্রকাশ আরেক জিনিস, আর
পাঠকের ব্যাখ্যা তৃতীয় জিনিস।

একজন সাধক যে -হাল-এর মধ্যে কোনো সত্য উপলব্ধি করেন, তিনি যখন সেটিকে ভাষায় প্রকাশ করেন, তখন ভাষা
তার সীমা আরোপ করে। শ্রোতা আবার নিজের পূর্বধারণা দিয়ে সেই ভাষাকে ব্যাখ্যা করেন। এখানেই মরমি সাহিত্যের
সৌন্দর্য যেমন সৃষ্টি হয়, তেমনি ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনাও তৈরি হয়।

তাই ইবন আরাবির এই পঙ্‌ক্তিগুলো আমার কাছে কোনো ধর্মীয় সীমারেখা মুছে দেওয়ার ঘোষণা নয়; বরং হৃদয়ের
সীমা বিস্তৃত করার আহ্বান।

শরিয়ত মানুষকে পথের শৃঙ্খলা শেখায়,তরীকত শেখায় সেই পথে চলতে,মারিফাত শেখায় পথের অর্থ উপলব্ধি করতে,
আর হাকিকত সেই উপলব্ধির গভীরে নিয়ে যায়।কিন্তু এই স্তরগুলোকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না করে পরস্পর-সম্পূরক
হিসেবে দেখা যায়।হয়তো তাই ইবন আরাবির কবিতার প্রেমের ধর্ম কে আমি এভাবে বুঝতে চাই-

প্রেম এমন এক হৃদয় তৈরি করে, যে হৃদয় সত্যকে নিজের ছোট্ট ধারণার মধ্যে বন্দী করে না।সে কাবাকে দেখে,
মন্দিরকে দেখে, তাওরাতকে দেখে, কুরআনকে দেখে কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের দেখা কোনো রূপকেই আল্লাহর
সম্পূর্ণ সীমা বলে মনে করে না।আর এখানেই আপনার রুমির “সোহবত”-এর সঙ্গে ইবন আরাবির হৃদয় -এর
একটি সুন্দর সেতু তৈরি হয়।

সৎ সঙ্গ মানুষকে বদলায়।আবার গভীরতর সোহবতে মানুষ নিজের ভেতরের মানুষটিকেও নতুন করে দেখতে শেখে।
একজন সত্যিকারের আরিফের সোহবত তাই শুধু তাঁর কথায় নয় তাঁর অস্তিত্বের পরিশুদ্ধিতে।

তাঁর কাছে বসে আমরা হয়তো কোনো অলৌকিক দৃশ্য দেখব না; কিন্তু যদি তাঁর সোহবতে আমাদের অহং একটু নরম
হয়, ঘৃণা একটু কমে, প্রেম একটু বাড়ে, সত্যের প্রতি আকাঙ্ক্ষা একটু গভীর হয় ,তাহলে সেই সোহবতের প্রভাবই
হয়তো সবচেয়ে বড় ‘কারামত’।

শেষ পর্যন্ত ইবন আরাবির হৃদয় এবং রুমির সোহবত দুটিই যেন একই দিকে ইঙ্গিত করে:
হৃদয়কে এত সংকীর্ণ করো না,যাতে সত্য তোমার ধারণার চেয়ে বড় হতে না পারে।
আর এত উদারও হয়ো না,যাতে সত্য-মিথ্যার পার্থক্যটাই হারিয়ে যায়।
বরং এমন হৃদয় গড়ে তোলো যেখানে প্রেম বিস্তৃত,বিবেক জাগ্রত,শরিয়ত পথের শৃঙ্খলা,মারিফাত অন্তরের আলো,
আর সত্য নিজের অহংকারের চেয়েও বড়।

আপনার মন্তব্যটি তাই আমার পোস্টকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি, বরং ইবন আরাবির হৃদয় কে নতুন করে ভাবার
একটি সুন্দর সুযোগ করে দিয়েছে।এই গভীর আন্তরিক আলোচনার জন্য আপনাকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা।

শুভেচ্ছা রইল ।

১১| ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৫:১৭

সত্যপথিক শাইয়্যান বলেছেন:



ভাইয়া,
ধন্যবাদ এভাবে বিস্তারিত লেখার জন্যে।
মোল্লা সদরা এবং ইবনুল আরাবির ধারণা সম্পর্কে জানলাম।

আমার মনে হয়েছে, অসীমের অনেক কিছু সসীমের গন্ডি থেকে জানা অসম্ভব। এখানে, তাই, ধারণা করতে হয় অনেক কিছু। সেখানেই বিপদ। ইসলামে ধারণার কোন স্থান আছে কি না তা বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।


আমরা বিজ্ঞানের রিসার্চের সময়ে একটি হাইপোথিসিস দাড় করাই। তারপরে, তা প্রমাণ করার চেষ্টা করি। ইসলামে সেই রকম করার কোন স্কোপ আছে কি যদি কোরআন ও সুন্নাহ থেকে কোন নির্দিষ্ট ডিরেকশন না থাকে?

পবিত্র কোরয়ান এবং সুন্নাহ যদি আমাদের ভিত্তি হয়ে থাকে, সেখানে কি কোন সরাসরি কোন ডিরেকশন নেই এই সম্পর্কে?

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.