| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু
লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।
সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। গল্পের সমস্ত চরিত্র, নাম, স্থান এবং ঘটনা লেখকের কল্পনাপ্রসূত। বাস্তব কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান অথবা ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে এর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ কাকতালীয় বলে গণ্য হবে।
উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের সেই বিশাল ডুপ্লেক্স বাড়িটার সামনে তখন পুলিশের গাড়ির নীল আলোকরশ্মি চারপাশের দেওয়ালে আছাড় খাচ্ছে। বাড়ির প্রধান ফটকের ভারী লোহার পাতে তিন-তিনটি বুলেটের ক্ষত। আড়াই মাসের ব্যবধানে ঠিক এই বাড়িটা লক্ষ্য করেই দ্বিতীয়বার গুলি চালানো হলো।
ঘটনাস্থলে এসে গাড়ি পার্ক করলেন পিবিআই-এর স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান। জিপ থেকে নামার সময় ওঁর ডান হাতের আঙুলগুলো অভ্যাসবশত কোমরের চামড়ার হোলস্টারে থাকা পয়েন্ট নাইন এমএম পিস্তলটার গ্রিপ ছুঁয়ে গেল। ওঁর ঠিক পেছনেই জিপ থেকে নামল পরিদর্শক তানভীর।
লোকাল ওসির মুখটা শুকিয়ে চুন হয়ে আছে। সে আরিয়ানের পাশে এসে নিচু স্বরে বলল, “স্যার, কেসটা কিন্তু কালু ভাইয়ের গ্যাংয়ের দিকে যাচ্ছে। উত্তরার আন্ডারওয়ার্ল্ড ও একাই কন্ট্রোল করে। কেউ ওর বিরুদ্ধে মুখ খোলে না।”
“প্রথমবার ১০ মার্চ, আর আজ ২২ মে,” তানভীর ফটকের বুলেটের ক্ষতগুলো দেখতে দেখতে বলল। “কালু ভাই স্রেফ আজমল খন্দকারকে ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে।”
“না, তানভীর। তোমরা সবাই একটা জায়গায় ভুল করছ,” করিডোর দিয়ে হেঁটে এগিয়ে আসতে আসতে বলল বর্ষা। তার বব-কাট ব্রাউন কালারের চুলগুলো বাতাসে উড়ছিল। ওঁর ধূসর চোখে এক ধরণের নিজস্ব, জেদী ইনভেস্টিগেশন ইন্সটিংক্ট। সে আরিয়ানের ডিলিউশনের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই ট্যাবের স্ক্রিনটা অন করল।
“আমি আজমল খন্দকারের শেষ তিন মাসের বিজনেস অডিট রিপোর্ট চেক করেছি,” বর্ষা আরিয়ান আর তানভীরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। ওঁর কণ্ঠে এক ধরণের ওভার-কনফিডেন্ট কাঠিন্য। “১০ মার্চের ফায়ারিংয়ের ঠিক পরদিন উনি ওঁর টেক্সটাইল মিলের একটা বড় শেয়ার ট্রান্সফার করেছেন ওঁর ছোট ভাইয়ের নামে। আর আজ ফায়ারিংয়ের ঠিক দুই ঘণ্টা আগে ওঁর অ্যাকাউন্টে বিদেশ থেকে একটা বড় ট্রানজেকশন হোল্ড করা হয়েছে। কালু ভাই কোনো চাঁদা চাচ্ছে না। কেউ আজমল খন্দকারকে দেউলিয়া বানাতে ইন্স্যুরেন্স ফ্রড বা ফ্যামিলি রাইভালরি করাচ্ছে। এটা ইনসাইড গেম।”
আরিয়ান বর্ষার ডেটাগুলোর দিকে তাকালেন। ওঁর ডান হাতের তর্জনীটা নিজের বাম হাতের তালুতে মৃদু ছন্দ তুলল। বর্ষার এই স্বাধীন ডিডাকশন ও একা একা কেস সলভ করার একটা মরিয়া চেষ্টা আরিয়ানের ভালো লাগল, তবে ওঁর তীক্ষ্ণ চোখ সিসিটিভি ফুটেজের অন্য একটা জায়গায় আটকে গেল।
“তোমার ফ্যামিলি রাইভালরির থিওরিটা চমৎকার, বর্ষা। কিন্তু তুমি একটা জিনিস ওভারলুক করেছ,” আরিয়ান শান্ত গলায় বললেন। “১০ মার্চ গুলি হয়েছিল রাত ঠিক ৮টা ৫ মিনিটে। আজ ফায়ারিং হয়েছে রাত ৮টা ৭ মিনিটে। আজমল খন্দকারের টেক্সটাইল মিলের বড় শিপমেন্টগুলো ঠিক এই নির্দিষ্ট সময়গুলোতেই পোর্ট থেকে রিলিজ হয়। শুটাররা আজমল খন্দকারকে ভয় দেখাচ্ছে না, ওরা ওঁর ভেতরে একটা স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করছে যাতে উনি নিজের নিরাপত্তার জন্য সমস্ত ফোকাস বাড়ির দিকে দেন এবং ফ্যাক্টরির পাহারা ঢিলেডালা হয়ে যায়। এটা একটা বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা। তবে তথ্য পাচারটা ভেতর থেকেই হচ্ছে।”
বর্ষা এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তার ধূসর চোখে নিজের ভুলটা ধরার একটা সূক্ষ্ম ইমোশনাল কনফ্লিক্ট দেখা দিল, কিন্তু সে চট করে নিজের ভুল স্বীকার না করে মুখটা শক্ত করে নিল।
“তানভীর, আজমল খন্দকারের পার্সোনাল ড্রাইভার আর সিকিউরিটি ইন-চার্জের ফোন রেকর্ড আগামী আধ ঘণ্টার মধ্যে আমার টেবিলে চাই,” আরিয়ান বললেন।
রাত একটা। উত্তরা পশ্চিম থানার পেছনের একটা পরিত্যক্ত গোডাউনে জেরা চলছিল।
আরিয়ানের লজিক অনুযায়ী ড্রাইভারের কললিস্ট ধরে টান দিতেই বের হয়ে এসেছে কালু ভাইয়ের ডান হাত রনির নাম। রনিকে ওঁর আস্তানা থেকে তুলে এনেছে তানভীর। রনি টেবিলে মাথা নিচু করে বসে ছিল।
তানভীর এবার কোনো চিল্লাপাল্লা করল না, ওঁর কলারও ধরল না। সে ধীর পায়ে রনির একদম পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। তানভীরের চওড়া অবয়বের ছায়াটা রনির ওপর পড়তেই পুরো ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেল। তানভীর স্রেফ ওঁর ভারী হাতটা রনির কাঁধের ওপর রাখল। আলতো একটা চাপ।
রনির পুরো শরীর এক সেকেন্ডে জমে গেল। ওঁর গলার স্বর হুট করে বদলে কেমন যেন খাঁখাঁ শোনাল। “স্যার... আমি স্রেফ খবর দিছি যে আজমল সাহেব আজ রাতে বাসায় থাকবেন। গুলি কে চালাইছে আমি জানি না। কালু ভাই ওনাদের হায়ার করছিল।”
“কালু এখন কোথায়?” তানভীরের কণ্ঠস্বর এবার নিচু, কিন্তু তাতে এক ধরণের শীতল হিংস্রতা ছিল।
“দিয়াবাড়ির ওপাশে... স্লুইস গেটের পাশের পুরোনো ইটভাটা,” রনি আর এক সেকেন্ডও চাপ নিতে পারল না। তানভীরের এই শান্ত অথচ ভয়ানক রূপের সামনে সে এক ঝটকায় ভেঙে পড়ল। “আজ রাতে ওইখানেই ওদের বাকি টাকা লেনদেন হওয়ার কথা।”
আরিয়ান ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে নিজের পিস্তলের ম্যাগাজিনটা চেক করে নিলেন। ওঁর চোখে কোনো ক্লান্তি নেই, বরং এক ধরণের শীতল সংকল্প। “তানভীর, ফোর্স রেডি করো। বর্ষা, তুমি পেছনের দল নিয়ে চারপাশটা ব্লক করবে। আজ রাতেই এই চ্যাপ্টার ক্লোজ হবে।”
রাত আড়াইটা। দিয়াবাড়ির নির্জন কাশবনের মধ্য দিয়ে ধীর গতিতে এগোচ্ছিল আরিয়ানের জিপ। চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু দূর থেকে তুরাগ নদীর পানির শব্দ আসছিল।
পুরোনো ইটের ভাটার কাছাকাছি আসতেই আরিয়ান জিপের হেডলাইট বন্ধ করে দিলেন। তানভীর ওঁর শটগানটা রেডি করে জিপের দরজা আলতো করে খুলল।
ঠিক তখনই অন্ধকারের বুক চিরে একটা রাইফেলের কর্কশ গর্জন শোনা গেল—ধাঁই!
জিপের সামনের কাঁচ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। আরিয়ান মুহূর্তের মধ্যে শরীর নিচু করে ডোর প্যানেলের আড়ালে পজিশন নিলেন। বর্ষার দল বাম দিক থেকে পাল্টা গুলি শুরু করায় গ্যাংয়ের মনোযোগ কিছুটা সটকে গেল।
এই সুযোগে আরিয়ান বিদ্যুৎ গতিতে রোল করে একটা পুরোনো ইটের স্তূপের আড়ালে চলে গেলেন। ওঁর সামনেই প্রায় বিশ গজ দূরে হেলমেট পরা এক শুটার পজিশন নিচ্ছিল তানভীরকে নিশানা করার জন্য। আরিয়ান এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করলেন না। ওঁর ডান হাতটা সোজা হলো, চোখের পলক স্থির। ওঁর পয়েন্ট নাইন এমএম পিস্তলটা দুইবার কেঁপে উঠল—ঠাস! ঠাস!
শুটারের ডান কাঁধে আর হাঁটুতে বুটেল বিঁধল। সে চিৎকার করে অস্ত্র ফেলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। আরিয়ানের নিখুঁত জীবননাশহীন নিশানা অপরাধীকে জীবন্ত ধরার জন্য যথেষ্ট।
মুল হোতা কালু ভাই তখন একটা বাইক স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করছিল। তানভীর চিতার মতো বেগে ছুটে গিয়ে রানিং বাইকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বাইকসহ কালু ছিটকে পড়ল মাটিতে। কালু কোমর থেকে চপার বের করার চেষ্টা করতেই তানভীর ওঁর ভারী বুট দিয়ে কালুর কবজিতে একটা নিখুঁত লাথি মারল। তানভীর কালুর পিঠে হাঁটু চেপে ধরল।
মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে থেকেও কালুর চোখে কোনো ভয় ছিল না। সে ওঁর ভাঙা কবজি নিয়েই একটা শীতল, ভয়ঙ্কর হাসি হাসল। তানভীরের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলল:
“উত্তরায় কার নিশ্বাস চলবে, সেই সিদ্ধান্ত আমি নিই, অফিসার। আজ হাত ভেঙেছিস, কাল তোর বুকটা ফাঁকা করে দেব।”
তানভীর ওঁর মুখের হাসিটা দেখে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর ঠান্ডা গলায় বলল, “কার নিশ্বাস চলবে জানি না, তবে তোর বাকি জীবনটা যে চার দেওয়ালের ভেতরেই কাটবে, সেই সিদ্ধান্ত আজ পিবিআই নিয়ে নিল।”
ভোর চারটা।
দিয়াবাড়ির আকাশে তখন হালকা লালাভ আভা। কুয়াশা আর বারুদের গন্ধ মিশে একটা গুমোট পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
কালুসহ পুরো গ্যাংকে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়েছে। বর্ষা ওঁর ট্যাবে জব্দকৃত মালের তালিকা মেলাতে মেলাতে আরিয়ানের পাশে এসে দাঁড়াল। ওঁর বব-কাট চুলে কিছু ইটের ধুলো লেগে আছে।
“তিনটি পিস্তল, দুটো ওয়ান শুটার আর আজমল খন্দকারের ফ্যাক্টরির রিলিজ পেপার পাওয়া গেছে ওনাদের ব্যাগে,” বর্ষা আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল। ওঁর ধূসর চোখে এখন আর আরিয়ানের প্রতি স্রেফ অন্ধ অ্যাডমিরেশন নেই, বরং নিজের থিওরি ভুল হওয়ার একটা পেশাদারী আক্ষেপ ও শিক্ষা নেওয়ার জেদ। “আজ রাতে ফ্যাক্টরির শিপমেন্ট লুট করার সব প্ল্যান কমপ্লিট ছিল ওনাদের। আমার ফাইনান্সিয়াল ফ্রডের থিওরিটা স্রেফ একটা কো-ইন্সিডেন্স ছিল।”
আরিয়ান কোনো উত্তর দিলেন না। ওঁর ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা নিজের বাম হাতের তালুতে মৃদু ছন্দ তুলল।
তানভীর ওঁর শটগানটা জিপের পেছনের সিটে রাখতে রাখতে বলল, “রিপোর্টটা এসপি অফিসে ড্রপ করে দিও, তানভীর,” আরিয়ান খুব সাধারণ, বাস্তবসম্মত গলায় বললেন। ওঁর গলায় কোনো জয়ের আনন্দ নেই, স্রেফ দায়িত্ব শেষের ক্লান্তি।
আরিয়ান জিপের ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলেন। আরিয়ান স্টিয়ারিং হুইলটা দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরলেন। ওঁর শ্বাসটা হঠাৎ খুব ভারী হয়ে এল, বুকটা নিংড়ে একটা তীব্র অস্বস্তি ওঁর গলা পর্যন্ত উঠে আসছিল। ওঁর হাত দুটো সামান্য কাঁপছে। তিনি কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে স্টিয়ারিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে নিস্পৃহ হয়ে বসে রইলেন। ওঁর ভেতরের এই অবদমিত ঝড়টা বাইরের কেউ দেখতে পেল না।
জিপটা স্টার্ট নিল। ধুলো আর ভোরের কুয়াশা চিরে গাড়িটা হাইওয়ের দিকে এগিয়ে গেল।
২৪ শে মে, ২০২৬ দুপুর ১:২০
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: যখন ছোট ছিলাম তখন ’দি এক্স-ফাইল’ টিভি সিরিজটা দেখতাম। স্ক্যালী রূপী জিলিয়ান এন্ডারসন ছিলো আমার ছোটবেলার ক্রাশ। এরপর ফ্যান ছিলাম ‘সিআইডি’ টিভি সিরিজের। ইন্সপেক্টর দয়াকে খুব ভালো লাগতো। এগুলো থেকেই মাথায় পোকাটা ঢুকে গেছে।
অনেক ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য।
২|
২৪ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৪:২২
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: এরকম থ্রিলার/ডিটেকটিভ প্রতিদিন লিখছেন কি করে ? আজকের টা আমার ভালোই লেগেছে ।
২৪ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুশি হলাম। মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।
©somewhere in net ltd.
১|
২৪ শে মে, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭
শায়মা বলেছেন: আজকাল গল্প কবিতা তেমন কেউ আর লেখে না।
যাইহোক আমি মাঝখানে ক্রাইম পেট্রল দেখতাম খুব। অবাক হতাম মানুষের এত কুবুদ্ধি সাথে ডিটেকটিভ আর পুলিশদেরও মহা বুদ্ধি দেখে ......