নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

শেরপা

দেখতে চাই ধরনী

মুনতাসির

আমি পাহাড়ে চড়ি,সাগরে ডুবি, পৃথিবী আমার প্রেম

মুনতাসির › বিস্তারিত পোস্টঃ

ভিলেনের অনুপস্থিতিতে অ্যাড্রেনালিন সংকট: আমাদের নতুন বাস্তবতা

১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:৪৬

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০২৬) শেষ হয়েছে। ফলাফল ঘোষিত হয়েছে—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। আশ্চর্যের বিষয়, এই ফলাফলের পর দেশে যে শুনশান নীরবতা নেমে এসেছে, তা আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল।

পরাজিত দলগুলো (যেমন জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য) ফলাফল মেনে নিয়েছে; কোনো বড় ধরনের প্রতিবাদ, মিছিল বা সহিংসতার খবর নেই।

বিজয়ী পক্ষও বিজয়োল্লাসে রাস্তায় নেমে উৎসব করেনি; বরং মসজিদে দোয়া-প্রার্থনার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। টেলিভিশনের টকশোতে বিশ্লেষকরা বসে আছেন, কিন্তু তর্কের উত্তাপ নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যাশট্যাগ যুদ্ধ বা ট্রোলিং-এর ঝড় ওঠেনি। রাস্তায় কোনো ধরপাকড়, কোনো বিক্ষোভ, কোনো “গণতন্ত্র হত্যা”র অভিযোগের বড় শিরোনাম নেই।

এভাবে কি চলে? আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তো একটা অলিখিত নিয়ম কাজ করে—সবকিছুর জন্য একজন ভিলেন বা scapegoat থাকতে হবে। এই scapegoating-এর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি গভীর। সমাজবিজ্ঞানী রেনে গিরার্দ (René Girard)-এর তত্ত্ব অনুসারে, সমাজ যখন অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়ে, তখন একটা “ভিলেন” বা দোষীকে চিহ্নিত করে সকল ক্ষোভ তার ওপর নিক্ষেপ করা হয়—যাতে সমাজের ঐক্য ফিরে আসে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই প্রক্রিয়া বহুবার দেখা গেছে। আমরা কি এখন তাকে খুঁজব?

আমরা দেখেছি: দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি চলেছে “ভিলেন-নির্ভর” মডেলে। অতীতে একদল অন্যদলকে “দেশের শত্রু”, “গণতন্ত্রের হত্যাকারী”, “দুর্নীতির মূর্ত প্রতীক” বলে চিহ্নিত করেছে। ডিমের দাম বাড়লে ভিলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে ভিলেন, বন্যা-খরা হলে ভিলেন, ট্রাফিক জ্যাম-ইন্টারনেট স্লো-দুর্নীতি-বেকারত্ব—সবকিছুর পেছনে একটা মুখ, একটা দল, একটা নেতা খুঁজে বের করা হয়েছে। এই ভিলেনকে দোষারোপ করার মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের “ভালো পক্ষ” বলে প্রমাণ করি, নিজেদের দায়মুক্তি পাই, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—একত্রিত হই। এবং এই এক বয়ানেই লিখিত হতো সামাজিক পরিচয়।

কিন্তু এখন? এই নির্বাচনোত্তর শান্তিতে ভিলেনের অভাব স্পষ্ট। কেউ কাউকে সহজে “দেশদ্রোহী” বলতে পারছে না। ফলাফল মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে বিরোধী পক্ষও একটা পরিণত আচরণ দেখিয়েছে। বিজয়ীরা উৎসব না করে দোয়া করেছে। এই শান্তি আমাদের জন্য অস্বস্তিকর—কারণ আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি সংঘাতের অ্যাড্রেনালিনে। এই অ্যাড্রেনালিন রাশে আমরাই সংঘাতে জড়িয়েছি নিজেদের সাথে, সঠিক কারণের ক্যালকুলাস না করেই। বিরোধী না থাকলে নিজের অবস্থান কীভাবে স্পষ্ট করব? কাকে টার্গেট করে সোশ্যাল মিডিয়ায় “ভাইরাল” হব? কাকে ঘিরে ট্রেন্ড তৈরি করব? কাকে “জাতির শত্রু” ঘোষণা করে নিজেদের “দেশপ্রেমিক” প্রমাণ করব?

এই শান্তির মধ্যে একটা গভীর, বিপজ্জনক সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। যদি সত্যিই কোনো বড় “ভিলেন” না থাকে, তাহলে দোষারোপের সুবিধাজনক পথ বন্ধ হয়ে যায়। তখন আর বলা যায় না—“সব দোষ ওদের। ওরা ক্ষমতায় থাকলে দেশ চলবে না।” তখন প্রশ্ন উঠে আসে আরও কঠিন, আরও ব্যক্তিগত—ট্রাফিক জ্যামে অযথা হর্ন বাজাচ্ছে কে? রাস্তার পাশে প্লাস্টিক-ময়লা ফেলছে কে? সিগন্যাল অমান্য করে রাস্তা পার হচ্ছে কে? ছোটখাটো দুর্নীতি, ঘুষ, লাইন ধরা—এগুলো চালিয়ে যাচ্ছে কে? অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি—এসবের দায় কার?

উত্তর আর বাইরে খুঁজতে হয় না। উত্তরটা আমরা নিজেরাই—সাধারণ নাগরিক, ভোটার, সমাজের অংশ—আবালবৃদ্ধবণিতা। এই অস্বস্তিকর শান্তি আসলে আত্মসমালোচনার দরজা খুলে দিতে পারে। এটা আমাদের বাধ্য করে ভাবতে—আমরা কি শুধু ভিলেন খুঁজে নিজেদের দায় এড়াই? আমরা কি সত্যিকারের পরিবর্তন চাই, নাকি শুধু “পক্ষ পরিবর্তন” চাই? এই প্রশ্নটা ২০০৩ সালের হলিউড কমেডি Bruce Almighty-এর মূল থিমের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। ছবিতে ব্রুস নোলান (জিম ক্যারি) সবসময় God-কে দোষ দেয়—জীবন অন্যায়, প্রমোশন হয়নি, সবকিছু খারাপ। God (মর্গান ফ্রিম্যান) তাকে বলেন: “You've been doing a lot of complaining about me, Bruce. Quite frankly, I'm tired of it.” তারপর ব্রুসকে ডিভাইন পাওয়ার দেওয়া হয় যাতে সে “better job” করতে পারে। কিন্তু ব্রুস যখন সব প্রার্থনা “yes” করে দেয় (যাতে সবাই যা চায় তাই পায়), তখন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়—কারণ মানুষ আসলে কী চায় তা নিজেরাও জানে না। God পরে বলেন: “But since when does anyone have a clue about what they want?” এবং free will-এ হস্তক্ষেপ করা যায় না বলে ব্রুস শেষে বুঝতে পারে—সত্যিকারের পরিবর্তন বাইরের ক্ষমতা দিয়ে নয়, নিজের দায়িত্ব নেওয়া দিয়ে আসে। God-এর বিখ্যাত কথা: “You want to see a miracle, son? Be the miracle.”

আমাদের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে একটা গভীর অভ্যাস আছে—নাটকের প্রতি আসক্তি। শান্তি আমাদের জন্য বিরক্তিকর। নাটক না থাকলে জীবন যেন ফাঁকা লাগে। হর্ন না বাজলে শহর ফাঁকা লাগে। বিরোধিতা না থাকলে কণ্ঠস্বর শুকিয়ে যায়। তাই শান্ত সময়ে আমরা অস্থির হয়ে উঠি—কাকে দোষ দেব? কাকে ঘিরে গল্প বানাব? কাকে অভিযুক্ত করে নিজেদের “সচেতন নাগরিক” প্রমাণ করব?

কিন্তু এখন প্রশ্নটা আরও বড়: আমরা কি এই শান্তিকে সুযোগ হিসেবে নেব? নাকি আবার একটা নতুন ভিলেন তৈরি করে পুরনো চক্রে ফিরে যাব? হয়তো আমাদের এখন দরকার এক ভিন্ন ধরনের “ভিলেন”—যে চিৎকার করে বলবে: “শান্ত হও। দায়িত্ব নাও। অজুহাত বন্ধ করো। কাজ করো। নিজের থেকে শুরু করো। রাষ্ট্র শুধু নেতাদের দোষারোপ করে চলবে না—নাগরিক হিসেবে তোমারও দায় আছে।”

কিন্তু এমন ভিলেনকে আমরা সাধারণত পছন্দ করি না। কারণ সে নাটক দেয় না। সে শুধু বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াতে বলে। সে আমাদের আরামের ঘুম ভাঙিয়ে দেয়।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সরল, কিন্তু ভয়ঙ্কর গভীর— আমরা কি এই শান্ত সময়ে বাঁচতে শিখব? আমরা কি নিজেদের দিকে তাকিয়ে আত্মসমালোচনা করতে পারব? নাকি নাটক চালিয়ে যাওয়ার জন্য আবার একজন ভিলেন বানিয়ে নেব—হয়তো পুরনো শত্রুকে নতুন করে জাগিয়ে, নয়তো নতুন কোনো “হুমকি” আবিষ্কার করে?

কারণ ভিলেন না থাকলে নাটক থেমে যায়। আর নাটক থেমে গেলেই হয়তো প্রকৃত বাস্তবতা শুরু হয়। প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই শুরু হয়, যখন আমরা ভিলেন খোঁজা বন্ধ করে নিজেদের দায়িত্বের দিকে তাকাই।
এই শান্তি যেন আমাদের সেই শুরুর সুযোগ দেয়। এই শান্তিকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করব—আত্মপরিবর্তনের জন্য, নাকি আবার পুরনো খেলায় ফিরে যাওয়ার জন্য? এ দায় আমাদের নিজেদের


প্রকাশিত : প্রকাশিত : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকেল ৪:৫১ / যায়যায়দিন / view this link

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২০

কাঁউটাল বলেছেন: প্রকৃত ভিলেন পভুপাদ মুদির দেশ ভঁড়ৎ এবং ছুপা হাউয়ামী ভাদারা। বাকিরা এইজন্যই নিরব। নির্বাচন উপলক্ষে কিছুটা হিচিং হলেও সবাই জানে ভারতীয় কুত্তারা ওত পেতে আছে। এইজন্যই কোন উল্লাস নাই। সবাই সতর্ক ভাবে মুভ করছে।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.