নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

[কারো সমালোচনা করো না, তাহলে নিজেও সমালোচিত হবে না]

Sujon Mahmud

কারো যদি গোপন সাফল্যের চাবিকাঠি থাকে, তাহলে সেটা থাকে তার অন্যের কথার দৃষ্টাকোণ আর নিজের দৃষ্টি কোণ বুঝে নেওয়ার মধ্যে।।

Sujon Mahmud › বিস্তারিত পোস্টঃ

ফেরার ট্রেন

৩০ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:১২


ঈদের ছুটিটা যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। বারোটা দিন—ক্যালেন্ডারের হিসেবে ছোট, কিন্তু হৃদয়ের হিসেবে এক বিশাল পৃথিবী। সেই পৃথিবীতে ছিল হাসি, ছিল কান্না, ছিল ঘরের গন্ধ, ছিল প্রিয় মানুষের স্পর্শ।

আজ সকালটা অন্যরকম। উঠোনে নরম রোদ পড়েছে, কিন্তু সেই রোদের উষ্ণতা যেন বুকের ভেতর ঢুকছে না। ব্যাগটা গুছিয়ে দরজার পাশে রেখে দাঁড়িয়ে আছি, তবুও মনে হচ্ছে—কিছু একটা ফেলে যাচ্ছি। আসলে কিছু না, সবকিছুই ফেলে যাচ্ছি।

বউটা চুপচাপ। সে কখনো সামনে কাঁদে না। কিন্তু আজ তার চোখের নিচে জমে থাকা ঘুমহীন রাতের চিহ্নগুলো সব বলে দিচ্ছে। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে বারবার একই প্রশ্ন করছে,
—আর কিছু লাগবে?
আমি জানি, এটা প্রশ্ন না… এটা তার মনের অজানা ভয়—আমি গেলে আবার সেই ফাঁকা ঘর, সেই একাকীত্ব।

আমার ছোট মেয়েটা বুঝে না কিছুই। সে শুধু জানে, বাবা যাবে।
তার ছোট্ট হাতটা আমার শার্ট আঁকড়ে ধরে বলল,
—বাবা, তুমি যেও না… তুমি এখানে থাকো না?
এই ছোট্ট প্রশ্নটার উত্তর দিতে পারিনি। শুধু তাকে বুকের সাথে চেপে ধরেছি। তার মাথার গন্ধটা যেন বুকের ভেতর গেঁথে নিতে চাইলাম—ঢাকার একাকী রাতগুলোতে বাঁচার জন্য।

বাবা বারান্দায় বসে আছেন। তার চোখে কোনো জল নেই, কিন্তু দৃষ্টি অনেক দূরে। হয়তো তিনি ভাবছেন—তার ছেলেটা কবে আবার এমন করে বাড়ি ফিরবে। বয়সের ভারে তার শরীর নুয়ে পড়েছে, তবুও আমাকে বললেন,
—সাবধানে থাকিস… শরীরের খেয়াল রাখিস।
এই কথাগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকে হাজারটা না বলা ভালোবাসা।

মা… মা কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছে না।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আমার ব্যাগে বারবার হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, যেন ব্যাগের সাথে আমাকে আটকে রাখতে চায়।
—খাবার ঠিকমতো খাস… সময়মতো ঘুমাস…
এই কথাগুলো তো প্রতিবারই বলে, কিন্তু আজ কেন যেন প্রতিটা শব্দ বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধছে।

বাড়ি থেকে বের হওয়ার মুহূর্তটা সবচেয়ে কঠিন।
একবার পেছনে তাকালাম—
বউটা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে, চোখে অশ্রু।
মেয়েটা তার আঁচল ধরে আছে, কাঁদতে কাঁদতে হাত নাড়ছে।
মা দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে, যেন পা এগোতে পারছে না।
বাবা চুপচাপ তাকিয়ে আছেন—নিঃশব্দ বিদায়।

রাস্তা ধরে হাঁটছি, কিন্তু মনে হচ্ছে প্রতিটা পা আমাকে ছিঁড়ে ফেলছে।
স্টেশনে পৌঁছে ট্রেনে উঠলাম।
ট্রেন ছাড়ার আগে শেষবার ফোন করলাম—
ওপাশ থেকে শুধু কান্নার শব্দ।

ট্রেনটা যখন ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করল, মনে হলো—আমি শুধু একটা শহরে যাচ্ছি না, আমি আমার সুখগুলো পেছনে ফেলে যাচ্ছি।

ঢাকায় পৌঁছালে আবার সেই ব্যস্ততা, সেই কাজের চাপ, সেই কোলাহল।
কিন্তু রাত নামলে, নিঃশব্দে একটা শূন্যতা এসে বসবে পাশে।
মোবাইলের স্ক্রিনে মেয়ের হাসি, বউয়ের ছবি, মায়ের কণ্ঠ—সবকিছুই থাকবে… কিন্তু ছোঁয়া থাকবে না।

জীবনটা বড় অদ্ভুত।
আমরা সবাই ভালো থাকার জন্য ছুটি, কিন্তু ভালো থাকার জায়গাটাই ফেলে চলে আসি।

ঈদের সেই বারোটা দিন এখন শুধু স্মৃতি।
আর আমি…
আমি আবার অপেক্ষা করছি—পরের ছুটির, পরের ফিরে যাওয়ার, পরের সেই মুহূর্তের জন্য—যখন আবার দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে কেউ বলবে,
—এসেছো?

হয়তো সেই একটা শব্দই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

মন্তব্য ২ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ৩০ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:২০

কাজী ফাতেমা ছবি বলেছেন: সন্তানদের মা বাবা এত কষ্ট করে যত্ন করে বড় করেন অথচ বয়সকালে কেউ থাকতে পারি না তাদের কাছাকাছি। এটাই জীবন, আমাদের জীবনো এমন হবে একদিন

লেখা ভালো লাগলো

২| ৩০ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৭

হুমায়রা হারুন বলেছেন: লেখাটা ভাল লাগলো।
আমিও এই জিনিসটা খেয়াল করেছি। দেশ, জাতি ভেদে, departure এবং arrival - দুই জায়গায় একদম ভিন্ন দুই scenario

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.