নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি ও বলতে চাই !

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন

ব্লগিং হউক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।

ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন › বিস্তারিত পোস্টঃ

ঢাবিকে ‘কোচিং সেন্টার’ বলা ববি হাজ্জাজের মূর্খতা নাকি অহংকার?

৩০ শে মে, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩

সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং দাবি করেছেন "নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় যা গবেষণা করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার কানাকড়িও করে না।" একজন উচ্চপদস্থ নীতি নির্ধারকের মুখ থেকে এমন ঢালাও ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য কেবল অনভিপ্রেতই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মানদণ্ড নিরূপণে তাঁর দূরদর্শিতার চরম অভাবকে স্পষ্ট করে। তিনি নিজে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন বিধায় প্রতিষ্ঠানটির প্রতি তাঁর এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাত থাকতেই পারে কিন্তু পুরো বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি বৃহৎ ক্যানভাসে রেখে, সততা ও বস্তুনিষ্ঠতার সাথে মূল্যায়ন করার যে ন্যূনতম নিরপেক্ষতা প্রয়োজন, এই একটি মন্তব্যে তিনি নিজের সেই যোগ্যতাহীনতাই প্রকাশ করেছেন।
​বাংলাদেশের সামাজিক, ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অবদান, তা যেকোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বহুণ উপরে। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ বাংলাদেশের অভ্যুদ এর পর নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন চব্বিশের গনঅভ্যুত্থান সহ প্রতিটি বাঁকে নেতৃত্ব দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। দেশের আমলাতন্ত্র, বিচারবিভাগ, শিল্পখাত এবং নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের সিংহভাগ দক্ষ ও দূরদর্শী জনবল তৈরি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঐতিহ্যের দিক থেকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর হাত ধরে ‘কোয়ান্টাম স্টাটিস্টিক্স’ (বসু-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান) এর জন্ম দিয়েছিল, যা আধুনিক কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম ভিত্তি। বর্তমানে ল্যাবরেটরির জরাজীর্ণ দশা এবং নামমাত্র গবেষণা বাজেট নিয়েও বহু অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত মৌলিক গবেষণা করে যাচ্ছেন। তবে এই ধারা যে দিন দিন ক্ষয়িষ্ণু, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

​ববি সাহেবের প্রিয় নর্থ সাউথ বা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এখনও পূর্ণাঙ্গ 'বিশ্ববিদ্যালয়' হয়ে উঠতে পেরেছে কি না তা নিয়ে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্ক রয়েছে। এগুলো মূলত কর্পোরেট কাঠামোর প্রাথমিক ধাপে অবস্থান করছে। এর পেছনে প্রধান তিনটি কাঠামোগত কারণ বিদ্যমান। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরি হয় দর্শন, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, সাহিত্য কিংবা মৌলিক বিজ্ঞানের (পদার্থ, রসায়ন, গণিত) মতো ফান্ডামেন্টাল সাবজেক্টগুলোর চর্চায়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত বাজারমুখী বা জবসাইট-ভিত্তিক কিছু টেকনিক্যাল ও বিজনেস সাবজেক্টের ওপর নির্ভরশীল, যা তাদের এক ধরণের 'ট্রেড স্কুল' বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছে। দ্বিতীয়ত, এখানে গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক ইকোসিস্টেমের অভাব রয়েছে। শিক্ষকদের গবেষণার স্বাধীনতা দেওয়ার চেয়ে 'শিক্ষা কর্মী' হিসেবে ট্রাইমেস্টার সিস্টেমে ক্লাস নিতেই বেশি বাধ্য করা হয়। মানসম্মত গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সময়, পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক বরাদ্দ, উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরি কিংবা সাবাটিক্যাল লিভের (গবেষণা ছুটি) সুব্যবস্থা এখানে নেই বললেই চলে। তৃতীয়ত, গবেষণার প্রাণ সচল রাখার জন্য যে ধরণের শক্তিশালী, নিয়মিত ও স্বনামধন্য পিএইচডি (PhD) কিংবা পোস্ট-ডক (Post-doc) প্রোগ্রাম দরকার, তা এখনও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুপস্থিত।
​বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই অগ্রযাত্রাটুকুও আরও মসৃণ হতে পারত, যদি তাদের 'ট্রাস্টি বোর্ড' নামক নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের 'মালিক' মনে না করতেন। শিক্ষাকে সমাজসেবা বা জ্ঞানার্জনের কেন্দ্র না বানিয়ে অর্থ উপার্জনের লাভজনক শিল্প কারখানা বানিয়ে ফেলার এই পুঁজিবাদী মানসিকতা অত্যন্ত ক্ষতিকর। যারা শিক্ষায় অবদান রাখাকে সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সম্মানজনক মনে না করে একে অর্থবিত্ত চুষে নেওয়ার হাতিয়ার বানান, তারা ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হওয়ার নৈতিক যোগ্যতা রাখেন না।

​পাশাপাশি গবেষণার মান বিচার করতে হলে শুধু কিছু অর্থের বিনিময়ে 'স্পনসরড' বা 'প্রিডেটরি জার্নালে' প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যার হিসাব করলেই চলে না সেই গবেষণার ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর এবং সাইটেশন ইনডেক্সও দেখতে হয়। Nature, Nature Communications কিংবা পদার্থবিজ্ঞানের APS (American Physical Society) এর মতো বিশ্বখ্যাত ও কঠোরভাবে পিয়ার-রিভিউড ফ্ল্যাগশিপ জার্নালগুলোতে এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান কতটুকু, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাজেট স্বল্পতা এবং চরম অব্যবস্থাপনার মাঝেও প্রতি বছর বিশ্বমানের জার্নালগুলোতে যে পরিমাণ মৌলিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিষয়ের গবেষণা সাইটেশন পায়, তার গভীরতা অনেক বেশি। তাছাড়া বর্তমানে দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে শিক্ষকেরা সুনামের সাথে আলো ছড়াচ্ছেন, যাঁদের ধার করা মেধা দিয়ে তারা র‍্যাংকিংয়ের বড়াই করছে, তাঁদের সিংহভাগের আন্ডারগ্রাজুয়েট, মাস্টার্স এবং মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি কিন্তু এই দেশের কোনো না কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই অর্জিত।

​তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান যে ক্রমাগত নিম্নগামী এবং এটি একটি রাজনৈতিকভাবে ডুবন্ত জাহাজ, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। কিন্তু এই সংকটের মূল কারিগর আমাদের রাষ্ট্র ও নীতি-নির্ধারকেরাই। নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতিকে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যেভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, তা-ই এই সংকটের মূল কারণ। এখানে এক চরম রাষ্ট্রীয় দ্বিচারিতা দৃশ্যমান। খোদ রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানেরা প্রায়শই বিভিন্ন সমাবর্তনে ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন যে, শিক্ষক নিয়োগে রাজনীতিকরণের কারণে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়ছে। অথচ, পর্দার আড়ালে সম্পূর্ণ দলীয় ও রাজনৈতিক বিবেচনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অযোগ্য উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার সংস্কৃতি তারাই বছরের পর বছর টিকিয়ে রেখেছেন। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে উপাচার্যদের সিদ্ধান্তই শেষ কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যই বড় যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়। সুতরাং, রাষ্ট্র যখন নিজেই শিক্ষক নিয়োগের পুরো পথটিকে রাজনৈতিক কলুষতায় ভরিয়ে তুলছে, তখন আবার শিক্ষক নিয়োগের রাজনীতিকরণ নিয়ে আফসোস করা চরম ভণ্ডামির শামিল।

​'বিশ্ববিদ্যালয়' বা University শব্দটির উৎপত্তিই হয়েছে 'ইউনিভার্সাল' (Universal) বা বৈশ্বিক ধারণা থেকে। এর অর্থ এখানকার নিয়ম, চিন্তার স্বাধীনতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং শিক্ষার মানদণ্ড হবে আন্তর্জাতিক ও সর্বজনীন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর সমস্ত নিয়মকে বৈশ্বিক না করে সম্পূর্ণ 'লোকাল' বা আঞ্চলিক দলীয়করণে রূপান্তর করেছি, যেখানে মেধার চেয়ে আনুগত্য বড় যোগ্যতা। এই কারণেই আজ আক্ষেপ করে বলতে হয় বাংলাদেশে আসলে প্রকৃত অর্থে স্বকীয়তাসম্পন্ন কোনো 'বিশ্ববিদ্যালয়'ই অবশিষ্ট নেই। ​পাবলিক বা প্রাইভেটের মাঝে কোনো কৃত্রিম দেয়াল তোলার উদ্দেশ্য আমার নেই। আমি চাই বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ই আন্তর্জাতিক মানের হয়ে উঠুক, কারণ একটি দেশের টেকসই সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের সাথে হাত ধরাধরি করে এগিয়ে যায়। তবে পতনের এই দায়ভার ববি হাজ্জাজ সাহেবদের মতো বুর্জোয়া নীতি-নির্ধারক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার কাঁধেই বর্তায়। দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করার আগে তাদের অন্তত ইতিহাস ও কাঠামোগত বাস্তবতার ‘হোমওয়ার্ক’ টুকু করে নেওয়া উচিত।

মন্তব্য ৩ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (৩) মন্তব্য লিখুন

১| ৩০ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৩:০২

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: ঢাবিয়ান দের দেখি ভালোই গায়ে লেগেছে ।

২| ৩০ শে মে, ২০২৬ রাত ৮:৫৬

নতুন বলেছেন: ম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং দাবি করেছেন "নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় যা গবেষণা করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার কানাকড়িও করে না।" একজন উচ্চপদস্থ নীতি নির্ধারকের মুখ থেকে এমন ঢালাও ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য কেবল অনভিপ্রেতই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মানদণ্ড নিরূপণে তাঁর দূরদর্শিতার চরম অভাবকে স্পষ্ট করে।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কি নর্থ সাউথ আর ব্যাকের চেয়ে গবেষণা বেশি করে?

যদি ঢাবির গবেষায় বেসরকারী বিশ্ববিদালয়ের চেয়ে বেশি করে থাকে তবে ববি হাজ্জাজ ভুল বলেছেন। সেই ভুল তাকে ধরিয়ে িদলেই হয়।

৩| ৩১ শে মে, ২০২৬ রাত ১২:৪১

নিমো বলেছেন: কয়েকদিন আগে যখন জা-শি বেশ্যালয় বলেছিল, তখন কোথায় ছিলেন?

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.