নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

হাইপারসনিক চিৎকার

https://www.facebook.com/BlackBolt.103

ব্ল্যাক বোল্ট

বিশ্বাসঘাতকদেরকে ঘৃণা করি

ব্ল্যাক বোল্ট › বিস্তারিত পোস্টঃ

মধ্যপ্রাচ্যে জঙ্গিবাদের উত্থানের লোমহর্ষক উপাখ্যানঃ পার্ট ১ (হাগানাহ)

০৪ ঠা অক্টোবর, ২০১৩ দুপুর ১:২০





আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগেও মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র ছিল এখনকার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তুর্কি অটোম্যান খিলাফত (ম্যাপে সবুজ অংশ) তখনও অস্তিত্বশীল। মেসোপটেমিয়া,হেজাজ,সিরিয়া,মিশরের মত ফিলিস্তিনও ছিল খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত। শত শত বৎসর ধরেই ফিলিস্তিনে মুসলিম,খ্রিস্টান এবং ইহুদি আরবরা সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির সাথে বসবাস করে আসছিল। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে উত্থান হয় এক অদ্ভুত মতবাদের। যে মতবাদের ভিত্তিতে ফিলিস্তিনে হাজার হাজার বছর ধরে বসবাস করতে থাকা সাধারণ আরবদের নাগরিক অধিকারকে অস্বীকার করা হয়। সেই মতবাদ অনুসারে ফিলিস্তিনের একমাত্র মালিকানা বনী ইসরাইল সম্প্রদায়ের। কারণ হিসেবে দেখানো হয় তাওরাতে বর্ণিত সেই বিখ্যাত ওয়াদা-''God's promised land to the children of Abraham''. এই মতবাদের নাম 'জায়নিজম'। অবশ্য জায়নিজম আরবদেরকে Abraham (PBUH) বা ইব্রাহীম (আ) এর বংশধর হিসেবে মেনে নিলেও তাদের মতে তাওরাতের এই ওয়াদা ছিল শুধুমাত্র ইব্রাহীম (আ) এর ছেলে ইসহাক (আ) এর বংশধরদের জন্য। যেহেতু ইসমাইল (আ) কে শৈশবেই ফিলিস্তিন ছেড়ে মরুভূমিতে প্রেরণ করা হয়েছিল সেহেতু তাঁর বংশধর অর্থাৎ আরবদের জন্য আল্লাহ এবং ইব্রাহীম (আ) এর মধ্যকার এই চুক্তি বা ওয়াদা প্রযোজ্য নয়।



অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাংবাদিক থিওডর হার্জল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই মতবাদ ইউরোপিয়ান ইহুদিদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলল। তারা দলে দলে তৎকালীন অটোম্যান ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে লাগল। তাদের এই মাইগ্রেশনকে বলা হয় 'আলিয়াহ'। মজার ব্যাপার হল, এইসব ইউরোপিয়ান ইহুদিরা হাজার বছর ধরেই ইউরোপে বসবাস করে আসছিল। এদের ভেতর অনেকের পূর্বপুরুষ ছিল কনভারটেড ইহুদী। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই সাদা চামড়া এবং নীলচক্ষু বিশিষ্ট এইসব ইউরোপিয়ান ইহুদিদের অধিকাংশই বনী ইসরাইলের সাথে জেনেটিক্যালি কানেক্টেড ছিল না। কারণ বনী ইসরাইল ছিল আরবদের মতই সেমিটিক একটি জাতি। আর এসব ইউরোপিয়ান জায়নিস্ট ইহুদিরাই ফিলিস্তিনে হাজার হাজার বছর ধরে বসবাসকারী প্রকৃত বনী ইসরাইলের বংশধরদেরকে (যাদের মধ্যে অনেকেই পরে খ্রিস্টান এবং মুসলমান হয়েছিলেন) তাদেরই পূর্বপুরুষের ভূমি থেকে বিতাড়িত করার এক পৈশাচিক স্বপ্নে মেতে উঠল।



স্বাভাবিকভাবেই তৎকালীন ফিলিস্তিনি সমাজ বিষয়টাকে ভালো চোখে দেখল না। হাজার হাজার বছর ধরে তারা যে ভূমিতে বসবাস করে আসছেন সেখান থেকেই তাদেরকে উৎখাত করবে বহিরাগতরা! তারাও জায়নিস্টদের এই মাইগ্রেশনের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে প্রতিবাদ জানাতে লাগলেন। এর মধ্যেই শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধে জায়নিস্ট ইহুদীরা অটোম্যান খিলাফতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ব্রিটিশদের সহায়তা করতে লাগল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিন থেকে অটোম্যান শাসন উৎখাত করে তা ব্রিটিশদের দখলে আনতে পারলে ব্রিটিশরা আনুগত্যের পুরস্কারস্বরূপ ফিলিস্তিনে ইহুদিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে। যুদ্ধ শেষ হল। ফিলিস্তিনও ব্রিটিশদের দখলে আসল। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার বেলফোর চুক্তিতে ফিলিস্তিনে ইহুদীরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করল। তবে তৎকালীন ফিলিস্তিনে তখনও আরবরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। সুতরাং রাতারাতি ইহুদিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব ছিল না। আর এতেই জায়নিস্টরা মরিয়া হয়ে উঠল। তারা যত দ্রুত সম্ভব ফিলিস্তিনে স্বাধীন ইহুদীরাষ্ট্র ''ইসরায়েল'' প্রতিষ্ঠা করার জন্য ব্রিটিশ সরকারকে চাপ দিতে লাগল। এদিকে স্থানীয় ফিলিস্তিনিরা বেলফোর চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন। তারা ফিলিস্তিনে ইহুদিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করতে লাগলেন। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের জন্য ব্রিটিশরা ফিলিস্তিনে অধিক হারে সেনা মোতায়েন করল।







জায়নিস্টরা এবার সশস্ত্র পন্থা অবলম্বন করল। ১৯২০ সালে গড়ে উঠল জায়নিস্ট আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠন এবং আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম জঙ্গি সংগঠন ''হাগানাহ'' (যা পরবর্তীতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে সর্ববৃহৎ অংশ দখল করে)। অবশ্য পরে গড়ে ওঠা অন্যান্য জায়নিস্ট জঙ্গি সংগঠনের তুলনায় হাগানাহ তুলনামূলক মডারেট ছিল। প্রথমদিকে তাদের এক্টিভিটি মূলত আর্মস কালেকশন এবং ফিলিস্তিনে জায়নিস্টদের নেটওয়ার্ক বৃদ্ধির ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে তা ভয়ানক রূপ ধারণ করে। দ্রুততম সময়ে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তারা ব্রিটিশ সেনাদের উপরও চড়াও হতে থাকে (বিস্তারিত পরবর্তী পার্টে)।



হাগানাহ এর প্রথম স্বীকৃত সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয় যখন ১৯২৪ সালে তারা জ্যাকব দে হান নামের স্বজাতি এক নন-জায়নিস্ট ইহুদিকেই হত্যা করে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতির অভিযোগে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাগাদ হাগানাহ ১৬০০০ সদস্যের এক প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলে। ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের ভেতর তারা বিভিন্ন পাবলিক যানবাহন এবং ব্রিটিশ সেনাদের টহলযানে হামলা চালায়। এতে ২৪ জন নিহত হন। ১৯৪০ সালের ২৫ নভেম্বর হাগানাহ প্রথমবারের মত বড় আকারে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। ফ্রেঞ্চ জাহাজ SS Patria প্রায় ১৮০০ ইউরোপিয়ান ইহুদী সহ ফিলিস্তিনের হাইফা পোর্টে উপস্থিত হয়। কিন্তু জাহাজটির এন্ট্রি পারমিট না থাকায় স্থানীয় ব্রিটিশ প্রশাসন জাহাজটিকে বন্দরে ভেড়ার পারমিশন না দিয়ে মরিশাসে যাওয়ার আদেশ দেয়। এতে বেঁকে বসে হাগানাহ। তারা এই ১৮০০ ইহুদীকে যেকোন মূল্যে ফিলিস্তিনের মাটিতে নামাতে জাহাজের ভেতর বোমা ফিট করে যাতে জাহাজটি কার্যকারিতা হারিয়ে মুভ করতে না পারে। কিন্তু ভুলবশত বোমায় বিধ্বংসী উপাদান বেশী হয়ে যাওয়ায় জাহাজটি একেবারে ডুবেই যায়। এতে ২৬৮ জন ইহুদী নিহত হন এবং ১৭২ জন আহত হন।





ডুবন্ত SS Patria



১৯৪৬ সালের ১৬-১৭ জুন হাগানাহ অপারেশন মারকোলেত নামক এক অভিযান চালায় যা নাইট অফ দ্য ব্রিজেস নামেও পরিচিত। এই অভিযানে তাদের টার্গেট ছিল ফিলিস্তিনের সাথে পাশ্ববর্তী আরব স্টেটগুলোর সংযোগ বিধানকারী ১১টি ব্রিজ ধ্বংস করা। হাগানাহ এর সাথে এই অভিযানে অংশ নেয় আরেক জায়নিস্ট জঙ্গি সংগঠন পালমাচ। তারা মিলিতভাবে অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সাথে অভিযান সম্পন্ন করে। মাত্র ১টি অপারেশন বাদে বাকি সবগুলোই সফল হয়। ফিলিস্তিনের সাথে প্রতিবেশী স্টেটগুলোর যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ সরকার তৎকালীন প্রায় আড়াই লক্ষ স্টেরলিং পাউন্ড এর সম্পদ হারায়।



১৯৪৬ সালেরই ২৬ জুলাই হাগানাহ এবং অপর জায়নিস্ট জঙ্গি সংগঠন ইরগুন মিলিতভাবে জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেলে (তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসনিক সদর দপ্তর) বোমা হামলা চালায়। এতে ৯১ জন নিহত হন যাদের ভেতর ২৮ জন ব্রিটিশ,৪১ জন আরব এবং ১৭ জন ইহুদী ছিলেন।উল্লেখ্য এই অভিযানে জায়নিস্ট জঙ্গিরা আরবদের মত ড্রেসআপ করে অংশ নেয় জাতে আপাতদৃষ্টিতে ব্রিটিশদের সন্দেহ ফিলিস্তিনিদের উপর যায়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কাছে তাদের প্ল্যান ফাঁস হয়ে যায় এবং তারা ধরা পড়ে।





বোমা হামলার পর বিধ্বস্ত কিং ডেভিড হোটেল



ঐ বছরেই হাগানাহ অধিক ব্রিটিশ সেনার আগমন ঠেকাতে ফিলিস্তিনের রেলওয়েগুলোর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। ১৯৪৭ এর শেষের দিকে এসে ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর হয়ে হাগানাহ নির্বিচারে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করতে শুরু করে। ১৯৪৭ এর ১৯ ডিসেম্বর হাগানাহ সাফাদ নামক এক আরব গ্রাম আক্রমণ করে এবং দুইটি বাড়ি বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়। পাঁচজন শিশুসহ মোট ১০ জন নিহত হন। ১৯৪৮ এর ১ জানুয়ারি মাউন্ট ক্যারমেলে অবস্থিত একটি গ্রামে হাগানাহ এর চালানো হত্যাজজ্ঞে ১৭ জন নিহত এবং ৩৩ জন আহত হন। ৪ জানুয়ারি তারা ব্রিটিশ সেনাদের ইউনিফর্ম পড়ে ছদ্মবেশে জাফফায় প্রবেশ করে এবং আরব ন্যাশনাল কমিটির হেডকোয়ার্টার উড়িয়ে দেয়। এতে ৪০ জন নিহত এবং ৯৮ জন আহত হন।



১৯৪৮ এর ৫ জানুয়ারি তারা পবিত্র জেরুজালেমে অবস্থিত খ্রিস্টান মালিকানাধীন সেমিরামিস হোটেলে বোমা হামলা চালায়। এতে তৎকালীন স্প্যানিশ অ্যাম্বাসেডর সহ সর্বমোট ২৬ জন নিহত হন।









বিধ্বস্ত সেমিরামিস হোটেল



১৯৪৭ এর ডিসেম্বর থেকে ১৯৪৮ এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাবলিক বাস, মার্কেটপ্লেস এবং ক্যাফে এরিয়াতে নিরীহ আরব সিভিলিয়ানদের উপর জায়নিস্ট গ্যাংগুলো মিলিতভাবে বোমাহামলা চালায়। এ সমস্ত ঘটনায় ৯৩ জন নিহত এবং ১৬১ জন আহত হন। এছাড়াও আরও অনেক ঘটনা ঘটে যা ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ধামাচাপা পড়তে থাকে। আফটার অল, হিস্ট্রি ইজ রিটেন বাই দ্য ভিক্টোরিয়াস। পরবর্তী পর্বে আরেক জায়নিস্ট জঙ্গি সংগঠন এবং সম্ভবত সন্ত্রাসের দিক দিয়ে সবচেয়ে ভয়ানক 'ইরগুন' এর ব্যাপারে আলোচনা করা হবে।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.