| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বাংলা ব্লগের জগতে সহব্লগাররা যারা আমাকে অনেকদিন ধরে চেনেন, তারা জানেন—আমার একটা রাশিয়ান শৈশব ছিল।
শুনতে একটু অদ্ভুত লাগে, তাই না?
রাশিয়ায় আমি কোনোদিন যাইনি।
তবু আমার একটা রাশিয়ান শৈশব ছিল।
আমার সেই শৈশবের ঠিকানা ছিল বাংলাদেশের এক মাটির ঘর। মাথার ওপর খড়ের চাল। বর্ষা এলে সেই চাল কথা বলতো—টুপটাপ করে পানি পড়তো মাটির মেঝেতে।
বৃষ্টির সেই পানির রং ছিল লালচে।
ছোটবেলার বোকা আমিটা ভাবতাম, ইশ! চাল বেয়ে যদি সত্যিই লাল চা পড়তো, তাহলে না হয় একচুমুকে খেয়ে ফেলা যেত!
সেই ঘরেই, সেই দুপুরগুলোতেই, আমার রাশিয়ান শৈশবের শুরু।
দুপুরে খাওয়া শেষ করে রাশিয়ান বই পড়তে পড়তেই ঘুমিয়ে যেতাম।
তখনো ভালো করে বানান করে পড়তে পারি না। স্কুলেও যাইনি।
আব্বা বই পড়ে শোনাতেন।
রাশিয়ান বইয়ের অচেনা নাম, অদ্ভুত সব শব্দ, দূরদেশের গল্প—আব্বার মুখ থেকে শুনতে শুনতে সেগুলো কেমন যেন আপন হয়ে গিয়েছিল।
আমার কাছে সেগুলো ছিল ছোটমানুষের বই।
কিন্তু আজ বুঝি, ওগুলো কোনোদিনই শুধু ছোটদের বই ছিল না।
ওগুলো ছিল আমার শৈশবের স্কুল।
তাই মাঝে মাঝে আমি সেই বইগুলোকে বলি—
“আমার শৈশবের স্কুল।”
---
আমার আব্বা ছিলেন হাইস্কুলের হেডমাস্টার।
টানা ছত্রিশ বছর।
সেই সময়ের একজন হেডমাস্টারের সংসার খুব স্বচ্ছল ছিল—এমনটা বলা যাবে না। তবু আমার আব্বার একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল।
তিনি ঢাকা অথবা যশোর গেলে আমার জন্য জামাকাপড় কিনতেন না।
খাবারের জিনিসও নয়।
বই আনতেন।
আমাদের ওদিকে তখন তেমন বই পাওয়া যেত না। তাই আব্বা ঢাকা কিংবা যশোরে গেলে আমি অপেক্ষা করতাম।
কী বই আনবেন?
কোন গল্প?
কী ছবি?
কোন নতুন পৃথিবীর দরজা খুলবে এবার?
একদিন অনেক রাত করে আব্বা বাড়ি ফিরেছিলেন।
আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
সকালে ঘুম ভেঙে দেখি—
মাথার পাশে দুটো বই।
আর কয়েকটা লজেঞ্চ।
অরেঞ্জ লজেঞ্চ।
কমলার কোয়ার মতো দেখতে।
সম্ভবত পঁচিশ পয়সা করে।
সেই সকালের অনুভূতিটা আজও আমার মনে আছে।
কেন জানি না, মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপহার বুঝি এটাই ছিল।
বই দুটো ১৯৮৬ সাল থেকে আমার মাথার পাশেই আছে।
আজও।
কিছুটা পুরোনো হয়েছে। পাতাগুলো হলদে হয়েছে।
কিন্তু আমার কাছে ওগুলো এখনো সেই সকালের মতোই নতুন।
---
প্রগতি প্রকাশনের বইগুলো কী চমৎকার ছিল!
কী চমৎকার ছবি!
কী চমৎকার অনুবাদ!
পাতা খুললেই সময় ছুটে পালাতো।
আমি চলে যেতাম অন্য কোথাও।
আমার মাটির ঘরটা থাকতো, কিন্তু তার ভেতরেই যেন খুলে যেত বিশাল একটা পৃথিবী।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পৃথিবী।
রুশ রূপকথা।
অচেনা মানুষের গল্প।
অচেনা শহর।
অচেনা তুষার।
আর আমার ছোট্ট শৈশব।
প্রগতির প্রকাশনা তখন রুশ সাহিত্যকে পৃথিবীর বহু ভাষায় পৌঁছে দিচ্ছিল।
পঞ্চাশটিরও বেশি ভাষায় অনুবাদ হতো সোভিয়েত সাহিত্য।
তাদের উদ্দেশ্য ছিল রুশ সাহিত্যকে সবার দরজায় পৌঁছে দেওয়া।
কিন্তু আমার মনে হয়—
প্রগতি শুধু দরজায় সাহিত্য পৌঁছে দেয়নি।
পৌঁছে দিয়েছিল মননে।
মস্তিষ্কে।
আর আমার মতো কত শিশুর শৈশবে।
---
তারপর এলো ১৯৯১।
আমি তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি।
আমার বয়সই বা কত!
সোভিয়েত ইউনিয়ন কী, রাজনীতি কী, ক্রেমলিন কী—এসবের কিছুই বুঝতাম না।
শুধু জানতাম—
ওখান থেকে আমার বই আসে।
২৫ ডিসেম্বর ১৯৯১।
মস্কোর ক্রেমলিনে শেষবারের মতো উড়ছিল সোভিয়েত পতাকা।
সন্ধ্যা ৭টা ২ মিনিটে পতাকাটা নামিয়ে দেওয়া হলো।
সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ নেতা মিখাইল গর্বাচেভ পদত্যাগ করলেন।
বললেন—
“আমরা বাস করছি এক নতুন পৃথিবীতে।”
আমি তখন মাটির ঘরে বসে থাকা একটা শিশু।
সেই নতুন পৃথিবীর কিছুই বুঝিনি।
পরদিন সকালে আব্বা আমাকে বললেন—
“তোমার সোভিয়েত ভেঙে গেছে।”
কথাটা শুনে আমার মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল।
আমি কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম—
“আর আমার সোভিয়েত বই?”
“প্রগতি প্রকাশনী?”
আব্বা বললেন—
“ওগুলো আর কোনোদিনই ছাপা হবে না।”
কথাটা শুনে সেদিন কী অনুভব করেছিলাম, সেটা আজও পুরোপুরি বোঝাতে পারি না।
আমার বয়স তো তখন খুব কম।
সোভিয়েত পতাকা নামার অর্থ বুঝিনি।
একটা রাষ্ট্র ভেঙে যাওয়ার অর্থ বুঝিনি।
ক্রেমলিনের গুরুত্ব বুঝিনি।
কিন্তু একটা জিনিস বুঝেছিলাম।
আমার বইগুলো আর আসবে না।
সেদিন মাটির ঘরের সেই ছোট্ট ছেলেটা বিষণ্ণ চোখে কল্পনায় একটা পতাকা নামতে দেখেছিল।
আজ এত বছর পর বড় হয়ে সেই পতাকা নামার ভিডিও দেখি।
কী অদ্ভুত!
ভিডিওটা আমি আজ দেখছি।
কিন্তু দৃশ্যটা আমি বহু বছর আগেই দেখে ফেলেছিলাম।
আমার কল্পনায়।
আমার শৈশবে।
আর পতাকাটা নামার সঙ্গে সঙ্গে যেন আমার ছোট্ট একটা পৃথিবীকেও সেদিন হত্যা করা হয়েছিল।
কারণ বইগুলো আর ছাপা হবে না।
---
সময় চলে গেল।
আমি বড় হলাম।
মাটির ঘর নেই।
খড়ের চাল নেই।
বৃষ্টির দিনে লালচে পানির সেই টুপটাপ শব্দ নেই।
প্রগতির ছাপাখানাও নেই।
সেই দুপুরগুলোও নেই।
তবু কিছু বই এখনো আছে।
বুকশেলফে সাজানো।
মাঝে মাঝে হাত বুলাই।
পাতা উল্টাই।
আর আশ্চর্যভাবে সময় পিছিয়ে যায়।
আবার দেখি—
একটা ছোট্ট ছেলে দুপুরের ভাত খেয়ে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যাচ্ছে।
আবার শুনি—
আব্বার মুখ থেকে রাশিয়ান বইয়ের পরিচিত শব্দগুলো।
আবার অপেক্ষা করি—
ঢাকা কিংবা যশোর থেকে আব্বা কখন ফিরবেন।
আবার মাথার পাশে দেখি—
দুটো বই।
আর কয়েকটা অরেঞ্জ লজেঞ্চ।
---
নাহ।
অতীতে ফেরা যায় না।
মুছে ফেলাও যায় না।
তবু কিছু কিছু দুপুর মানুষের ভেতর থেকে কখনো চলে যায় না।
মাঝে মাঝে পুরোনো বইয়ের দোকানে যাই।
সেই বইগুলো খুঁজি।
জানি, সব পাব না।
তবু খুঁজি।
কারণ আমি আসলে বই খুঁজি না।
আমি খুঁজি আমার শৈশব।
খুঁজি সেই মাটির ঘর।
খুঁজি সেই দুপুর।
খুঁজি একটা পুরোনো পৃথিবী।
আর সবচেয়ে বেশি—
খুঁজি সেই মানুষটাকে, যিনি ঢাকা কিংবা যশোর থেকে ফিরে আমার জামাকাপড়ের বদলে বই এনে দিতেন।
আমার আব্বা।
---
আজ বুঝি, তিনি আমাকে শুধু বই দেননি।
তিনি আমাকে একটা পৃথিবী দিয়েছিলেন।
এমন একটা পৃথিবী, যেখানে রূপের ডালি খেলতে খেলতে মানুষ সুন্দর হয়ে উঠতো।
যেখানে গল্পের ছোট ছোট চরিত্রগুলো আমাকে ন্যায়, মায়া, সাহস আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা শেখাতো।
তখন বুঝিনি।
বড় হতে হতে বুঝেছি—
সেই ছোটদের বইগুলো আসলে ছোটদের জন্য ছিল না।
ওগুলো ছিল মানুষ হয়ে ওঠার বই।
আমার শৈশবের স্কুল।
আমার একান্ত সম্পদ।
আমার রাশিয়ান শৈশব।
---
অনেক বই হারিয়ে ফেলেছি।
কিছু বই এখনো আগলে রেখেছি।
কিছু বই হয়তো আর কোনোদিন খুঁজে পাব না।
তবু আমি খুঁজবো।
পুরোনো বইয়ের দোকানে।
বুকশেলফের অন্ধকার কোণে।
হলদে হয়ে যাওয়া পাতার ভাঁজে।
কারণ জানি—
বইগুলো হয়তো আর ফিরে আসবে না।
শৈশবও না।
আব্বাও না।
কিন্তু স্মৃতি?
স্মৃতি বড় অদ্ভুত জিনিস।
একটা পুরোনো বইয়ের পাতা খুললেই সে দরজা খুলে দেয়।
আর আমি ফিরে যাই—
একটা মাটির ঘরে।
একটা ঝলমলে দুপুরে।
একটা ছোট্ট ছেলের কাছে।
যে তখনো জানে না—
একদিন বড় হয়ে এই বইগুলোর জন্য তার বুকের ভেতর এতটা হাহাকার থাকবে।
---
ননী ভৌমিক, হায়াৎ মাহমুদ, প্রগতি প্রকাশন—
আমার শৈশব তোমাদের কাছে চিরঋণী।
আর আব্বা?
তোমার কাছে তো আমার পুরো শৈশবটাই ঋণী।
তুমি হয়তো ভেবেছিলে, ছেলে কিছু বই পড়ুক।
কিন্তু তুমি জানতেই পারোনি—
তুমি আমার জন্য একটা পৃথিবী রেখে যাচ্ছিলে।
একটা রাশিয়ান শৈশব।
আমার একান্ত শৈশব।
আমার শৈশবের স্কুল।
---
আজও সেই বইয়ের পাতায় হাত রাখলে মনে হয়—
দূরে কোথাও একটা দুপুর ঘুমিয়ে আছে।
আর তার পাশে বসে আছেন আব্বা।
বই পড়ে শোনাচ্ছেন।
আমি চোখ বন্ধ করে শুনছি।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।
খড়ের চাল থেকে টুপটুপ করে লালচে পানি নামছে।
আর পৃথিবীর কোথাও কোনো পতাকা নামছে না।
কোনো দেশ ভেঙে যাচ্ছে না।
কোনো বইয়ের ছাপাখানা বন্ধ হচ্ছে না।
শুধু আমার আব্বার কণ্ঠে গল্প চলছে।
আর আমি—
আমার সেই রাশিয়ান শৈশবের ভেতর,
চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ছি।
২|
১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:২২
খায়রুল আহসান বলেছেন: অসাধারণ বললেও কম বলা হবে। হৃদয়স্পর্শী স্মৃতিচারণ, মনে গেঁথে থাকার মত গল্প, আর ঝরে পড়া ফুলের পাপড়ির মত অসংখ্য ইতস্ততঃ ছড়ানো ছিটানো কিছু কথার মালা। আবেগ সে কথাগুলোকে একসাথে বেঁধে রেখেছে।
আপনার দূরদর্শী প্রধান শিক্ষক বাবা জামাকাপড়ের বদলে আপনাকে ছোটবেলায় 'সোভিয়েট শৈশব' দান করে তখন থেকেই আপনার মনে ন্যায়, মায়া, সাহস আর মানুষের প্রতি ভালোবাসার যে বীজ বপন করেছিলেন, সেটা আপনার সন্তানের মাঝেও সঞ্চারিত হোক!
শুভকামনা....
৩|
১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৫
রাজীব নুর বলেছেন: আমি ভাই, ঠাকুরমার ঝুলি পড়েই বড় হয়েছি।
'স্বপ্নবাজ সৌরভ' আপনি কেমন আছেন?
©somewhere in net ltd.
১|
১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৩
সৈয়দ মশিউর রহমান বলেছেন: স্মৃতিচারণ।