| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
জেমসকে প্রথম শুনেছিলাম প্রেমে বা বিরহের গান দিয়ে নয়।
মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা একজন মানুষের কণ্ঠ দিয়ে।
গানটির নাম—
“জেল থেকে বলছি।”
১৯৯৩ সাল।আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। গান শুনতাম।
তবে গান তখনও আমার জীবনের কোনো বিশেষ জায়গা দখল করে নেয়নি। বাংলা ব্যান্ডের গানও শুনেছি অনেক। ভালো লেগেছে, আবার ভুলেও গেছি।
কোনো গান তখনও বুকের ভেতর এসে বসেনি।
তারপর একদিন শুনলাম—
“জেল থেকে বলছি।”
কী হলো জানি না।
গানটা শোনার পর মনে হলো—
বাংলা ব্যান্ডের গান বোধহয় এমনও হতে পারে!
এটা শুধু একটা গান নয়।
এ যেন একটা গল্প।
একজন মানুষ বন্দি। সামনে মৃত্যুর অপেক্ষা। চারপাশে পাথরের দেয়াল। আকাশ নেই, চাঁদ-তারা নেই। অথচ মৃত্যুর এত কাছে দাঁড়িয়েও তার মনে পড়ে একজন মানুষকে।
তার মুখ।
তারপর সেই লাইনটা—
“অবুঝ মনটা শুধু চায় যে নিতে
তোমার চুলের মৃদু গন্ধ।”
আমি তখন ক্লাস ফাইভের একটা ছেলে।
প্রেম কী, তার কতটুকুই বা বুঝি!
চুলের মৃদু গন্ধের মধ্যে কী এমন জাদু লুকিয়ে আছে, সেটাও জানি না।
তাহলে কেন এই দুটো লাইন আমাকে আটকে দিল?
আজ এত বছর পর মনে হয়—
সম্ভবত সেদিন আমি প্রেম বুঝিনি।
আমি বুঝেছিলাম "আকুলতা"।
কাউকে খুব কাছে পাওয়ার ইচ্ছেটা বুঝেছিলাম, যদিও তখনও জানতাম না সেই অনুভূতির নাম কী।
হয়তো গান আসলে এভাবেই আমাদের বড় করে।
আমরা যখন কোনো অনুভূতির নাম জানি না, গান তখন তার একটা নাম দিয়ে দেয়।
পরে যখন একটু বড় হলাম, তখন জেমসকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম।
জানলাম, এই গানটা শুধু কোনো বন্দি মানুষের ব্যক্তিগত হাহাকার হয়ে থাকেনি। নব্বইয়ের শুরুর অস্থির সময়, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের আবহ, মানুষের ভেতরের ক্ষোভ আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেও গানটির নাম ও চিত্রকল্প নানা শ্রোতার স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে।
তখন বুঝলাম—
কিছু গান আমরা যখন শুনি, তার পুরো ইতিহাস আমরা জানি না।
শুধু অনুভব করি।
তারপর সময় আমাদের সেই গানের পেছনের গল্পগুলো খুলে দেয়।
১৯৯৩-এর সেই ক্লাস ফাইভের ছেলেটা অবশ্য এসব কিছুই জানত না।
সে জানত না জেমস কে হয়ে উঠবেন।
জানত না, একদিন তাঁকে মানুষ নগর বাউল বলে ডাকবে।
জানত না, এই কণ্ঠ একটা প্রজন্মের প্রেম, বিরহ, অভিমান, একাকিত্ব আর বিদ্রোহের সঙ্গে মিশে যাবে।
সে শুধু জানত—
জেমসের গলা শুনলে বুকের ভেতর কেমন একটা অদ্ভুত শব্দ হয়।
সেই ছিল আমার জেমসকে চেনার শুরু।
তারপর বহু বছর কেটে গেছে।
ফিলিংসের জেমস থেকে নগর বাউল জেমস।
ক্যাসেট থেকে সিডি,
সিডি থেকে ডিজিটাল পৃথিবী।
আমিও বদলেছি।
কিন্তু ১৯৯৩-এর সেই ছেলেটা পুরোপুরি বদলায়নি।
আজও “জেল থেকে বলছি” শুনলে সে কোথা থেকে যেন ফিরে আসে।
ক্লাস ফাইভের একটা ছেলে।
যে প্রেম বোঝেনি,
বিরহ বোঝেনি,
মৃত্যু বোঝেনি—
শুধু একটা গান শুনে হঠাৎ বুঝে গিয়েছিল,
কিছু কিছু গান কানে শোনা যায় না।
বুকের কোথাও গিয়ে আটকে থাকে।
আর আশ্চর্যের ব্যাপার কী জানেন?
আজ এত বছর পর বুঝি—
সেদিন আমি আসলে জেমসের গান শুনিনি।
আমি প্রথমবার একটা কণ্ঠের শক্তি শুনেছিলাম।
একটা কণ্ঠ কীভাবে একটা গল্পকে শরীর দিতে পারে, একটা শব্দকে স্মৃতি বানাতে পারে, একটা অচেনা অনুভূতিকে নিজের অনুভূতি মনে করিয়ে দিতে পারে—তার প্রথম পাঠ নিয়েছিলাম সেই গান থেকে।
তাই আজ জেমসের জন্মদিনে তাঁকে শুধু একজন গায়ক বলে শুভেচ্ছা জানাতে ইচ্ছে করছে না।
কেউ কেউ শিল্পী হন।
কেউ কেউ নায়ক হন।
আর কেউ কেউ একটা সময়ের সঙ্গে মিশে যান।
জেমস আমাদের কাছে সেই তৃতীয় মানুষটি।
১৯৯৩ সালে যে কণ্ঠটা আমার ছোট্ট পৃথিবীটাকে একটু অন্যরকম করে দিয়েছিল, আজও সেই কণ্ঠ শুনলে মনে হয়—
সেই ছেলেটা কোথাও যায়নি।
সে এখনও গানটা শুনছে।
হয়তো এখনও সে জানে না প্রেম কী।
শুধু জানে—
কোনো এক অদ্ভুত কারণে
একজন মানুষের চুলের মৃদু গন্ধের কথা শুনলেই
তার বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা তৈরি হয়।
আর সে অবাক হয়ে ভাবে—
একটা গানের ভেতর এতটা জীবন কী করে থাকে!
শুভ জন্মদিন, গুরু।
শুভ জন্মদিন, জেমস।
আপনার কণ্ঠে আমাদের কৈশোরের অনেক রাত আজও বেঁচে আছে।
— স্বপ্নবাজ সৌরভ
©somewhere in net ltd.