| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
একটি কবিতা ও তার গল্প
পর্ব ০২ : ধোঁয়ায় নিমজ্জিত মহাপৃথিবী অক্সিজেন হারায় প্রতিনিয়ত
কিছু অপেক্ষা খুব ব্যক্তিগত।
কোনো একজন মানুষের জন্য অপেক্ষা।
কোনো একটি কথার জন্য অপেক্ষা।
কিংবা নিজের লেখা কয়েকটি শব্দের স্বীকৃতি পাওয়ার অপেক্ষা।
কিন্তু সব অপেক্ষার গল্প শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত থাকে না।
কখনো একটি কবিতার জন্য অপেক্ষা করতে করতে মানুষ আবিষ্কার করে—তার চারপাশের পৃথিবীটাও অপেক্ষা করছে। কোথাও বেঁচে থাকার জন্য, কোথাও একটু উষ্ণতার জন্য, কোথাও নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো নির্মল বাতাসের জন্য।
“ধোঁয়ায় নিমজ্জিত মহাপৃথিবী অক্সিজেন হারায় প্রতিনিয়ত” তেমনই একটি কবিতা।
এখানে একজন কবি আছেন, যিনি তাঁর প্রিয় মানুষের জন্য একটি কবিতা লিখেছেন। কবিতাটি শোনানোর ইচ্ছা ছিল, ছিল কিছুটা স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও। কিন্তু সেই কবিতা শোনার সময়টুকু অন্য মানুষটির কাছে যেন কখনোই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি।
অথচ কবিতাটি লিখতে গিয়ে কত রাত জেগেছে মানুষটি! কতটা সময়, কতটা মনোযোগ, কতটা ব্যক্তিগত জীবন নিঃশব্দে খরচ হয়েছে!
তারপর সেই অপেক্ষা দীর্ঘ হতে হতে একসময় পৃথিবীর দিকে তাকায়।
দেখতে পায়, একটি কবিতার জন্য তার ব্যক্তিগত হাহাকারের বাইরেও কত অসংখ্য মানুষের, প্রাণের এবং প্রকৃতির বেঁচে থাকার সংকট জমে আছে।
এখানে ভালোবাসার অবহেলা থেকে শুরু হওয়া গল্পটি শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে এক বিপন্ন পৃথিবীর গল্প।
কবিতাঃ
ধোঁয়ায় নিমজ্জিত মহাপৃথিবী অক্সিজেন হারায় প্রতিনিয়ত
তোমার জন্য লেখা কবিতাটা যখন তোমকে দিতে গেলাম
তুমি বললে - রেখে দিও সযতনে , চেয়ে নেবো একদিন।
এই একখান কবিতা লিখতে আমাকে জাগতে হয়েছে কয়েক রাত ,
সকালের নাস্তা বাঁসি হয়ে পড়ে ছিল টেবিলের এক কোনায় ,
অবলীলায় পড়ে থাকা গমের রুটিতে লাল পিঁপড়ের বিচরণ লক্ষণীয় ছিল খুব।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো
বিকেল আর সন্ধ্যের মিলনের আলো
নিভতে নিভতে আঁধার নামলো ঠান্ডা ভাতের থালায়।
অথচ তুমি বললে - সযতনে রেখে দিও, চেয়ে নেবো একদিন।
অতঃপর , তোমার জন্য লেখা কবিতাটা
বাক্সোবন্দী করি , সযতনে রাখি
গোপন থেকে গোপনতর কুঠিরে।
পাহারায় রাত জাগি আর দিনপঞ্জিতে বাড়তে থাকে লাল দাগের পরিমান।
এভাবে কেটে যায় দিনের পর দিন
মাস কিংবা বছরের পর বছর
অ্যান্টার্কটিকায় বরফ গুলো গলতে থাকে
সমুদ্রের তেলে ভেসে উঠে মৃত ডলফিন আর নীল তিমিদের দল
সাইবেরিয়ান পাখি গুলো উড়ে আসে শীতের আশায়
পৃথিবীর ফুসফুসে আগুন লাগে , ধোঁয়ায় নিমজ্জিত মহাপৃথিবী
অক্সিজেন হারায় প্রতিনিয়ত।
সেন্টমার্টিনে জমে উঠে পর্যটন আবর্জনা
ভেজে ওঠে প্লাস্টিক , পলিথিন আর চিপসের প্যাকেট
অনিয়ন্ত্রিত বাজারে টিসিবির লাইনে ক্রমশ বাড়তে থাকে মানুষের ভীড়
ফুটপাতে মাথা গোঁজা মানুষ গুলো
এই শীতে হাড়-জিরজিরে হাত বাড়ায় কয়েক ফালি উষ্ণতার আশায়।
আর আমি সামান্য কবিতার জন্য হাকাকার করি !
মাতম তুলি পূর্ব থেকে পশ্চিমে।
এবার আসা যাক কবিতার গল্পেঃ
গল্পের শুরুটা খুব ব্যক্তিগত।
“তোমার জন্য লেখা কবিতাটা যখন তোমাকে দিতে গেলাম
তুমি বললে - রেখে দিও সযতনে, চেয়ে নেবো একদিন।”
একজন মানুষ আরেকজন মানুষের জন্য কবিতা লিখেছে।
কবিতাটি হয়তো শুধু কিছু শব্দের সমষ্টি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েকটি নির্ঘুম রাত, কিছু ব্যক্তিগত অনুভূতি, অনেকটা সময় এবং নিজের ভেতরের একান্ত কিছু কথা।
কবিতাটি লেখার পর তার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা ছিল প্রিয় মানুষটিকে শোনানো।
কিন্তু উত্তরে সে পেল একটি আশ্বাস—
“রেখে দিও সযতনে, চেয়ে নেবো একদিন।”
কথাটির মধ্যে কোনো প্রত্যাখ্যান নেই। আবার গ্রহণও নেই।
আছে একটি অনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ।
একদিন চেয়ে নেবো।
কিন্তু সেই একদিনটি কবে?
এখানেই কবিতার প্রথম অভিমান।
কারণ যে মানুষটি কয়েক রাত জেগে একটি কবিতা লিখেছে, তার কাছে কবিতাটি শুধু লেখা নয়। এটি তার সময়ের বিনিয়োগ, অনুভূতির প্রকাশ, এমনকি নিজের ভেতরের কিছুটা অংশ অন্য মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা।
অথচ সেই চেষ্টা আপাতত তুলে রাখা হলো।
কোনো এক অনির্দিষ্ট দিনের অপেক্ষায়।
এরপর কবিতায় আসে খুব সাধারণ কিছু দৃশ্য।
“এই একখান কবিতা লিখতে আমাকে জাগতে হয়েছে কয়েক রাত,
সকালের নাস্তা বাঁসি হয়ে পড়ে ছিল টেবিলের এক কোনায়,”
কী চমৎকারভাবে এখানে কবিতার পেছনের মানুষটিকে দেখা যায়!
আমরা সাধারণত একটি কবিতা পড়ি। তার শব্দ, উপমা, ছন্দ কিংবা বক্তব্য নিয়ে কথা বলি।
কিন্তু কবিতাটি লেখার সময় কবির কী হয়েছিল, সেটি খুব কমই ভাবি।
কত রাত সে জেগেছে।
কতবার একটি লাইন লিখে আবার কেটে দিয়েছে।
কতবার হয়তো মনে হয়েছে, এই শব্দটির বদলে অন্য শব্দ হলে ভালো হতো।
আর এসবের মধ্যে কখন যে সকালের নাস্তা পড়ে থেকে বাসি হয়ে গেছে, সেটিও তার খেয়াল নেই।
“অবলীলায় পড়ে থাকা গমের রুটিতে লাল পিঁপড়ের বিচরণ লক্ষণীয় ছিল খুব।”
এই দৃশ্যটি কবিতার অন্যতম সুন্দর পর্যবেক্ষণ।
একজন মানুষ তার সৃষ্টির ভেতর এতটাই ডুবে আছে যে, তার দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে গেছে।
টেবিলে পড়ে থাকা রুটি আর তার ওপর লাল পিঁপড়ের চলাচল যেন সময়ের নীরব সাক্ষী।
জীবন থেমে নেই।
পিঁপড়েরা তাদের মতো করে কাজ করে যাচ্ছে। সকাল হচ্ছে, দুপুর হচ্ছে।
শুধু কবি আটকে আছেন একটি কবিতার ভেতর।
তারপর সময় আরও একটু এগিয়ে যায়।
“দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো
বিকেল আর সন্ধ্যের মিলনের আলো
নিভতে নিভতে আঁধার নামলো ঠান্ডা ভাতের থালায়।”
এখানে কবিতাটি দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে চলে যায়।
দুপুর পেরিয়ে বিকেল।
বিকেল থেকে সন্ধ্যা।
তারপর অন্ধকার।
কিন্তু এই সময়ের পরিবর্তনের মধ্যে কবির কোনো পরিবর্তন নেই। তার অপেক্ষা একই জায়গায় রয়ে গেছে।
ঠান্ডা ভাতের থালা যেন শুধু অবহেলিত খাবারের ছবি নয়। এটি সেই মানুষের নিজের প্রতিও অবহেলার ছবি।
অন্য একজনের জন্য কবিতা লিখতে গিয়ে সে নিজের খাওয়া, নিজের বিশ্রাম, নিজের প্রয়োজন—সবকিছু ভুলে গেছে।
এখানে ভালোবাসার একটি পরিচিত স্বভাব ধরা পড়ে।
মানুষ কখনো কখনো অন্য কাউকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে নিজের অস্তিত্বকেই আড়ালে সরিয়ে রাখে।
এরপর আবার ফিরে আসে সেই একই কথা।
“অথচ তুমি বললে - সযতনে রেখে দিও, চেয়ে নেবো একদিন।”
কবিতার শুরুতে যে কথাটি বলা হয়েছিল, এখানে তার পুনরাবৃত্তি হয়েছে।
কিন্তু এবার কথাটির অর্থ বদলে গেছে।
প্রথমবার এটি ছিল একটি আশ্বাস।
দ্বিতীয়বার এটি অপেক্ষার ভার।
যে কথাটি একবার শুনলে সাধারণ মনে হতে পারে, বারবার মনে পড়লে সেটিই অভিমানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কারণ অপেক্ষারও একটি সময়সীমা থাকে।
একটি কবিতা চেয়ে নেওয়ার জন্য যদি কোনো দিন নির্দিষ্ট না থাকে, তাহলে কবিতাটির অপেক্ষা শেষ হবে কীভাবে?
তারপর কবিতার গল্পে আসে একটি বাক্স।
“অতঃপর, তোমার জন্য লেখা কবিতাটা
বাক্সোবন্দী করি, সযতনে রাখি
গোপন থেকে গোপনতর কুঠিরে।”
এই স্তবকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এতক্ষণ কবি কবিতাটি কাউকে দিতে চেয়েছিলেন।
এবার তিনি সেটি নিজের কাছেই ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
বাক্সে ভরে রাখছেন।
সযতনে।
গোপন থেকে আরও গোপন কোনো জায়গায়।
এখানে বাক্সটি কেবল একটি বস্তু নয়। এটি অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
যে অনুভূতি প্রকাশের জন্য জন্মেছিল, সেটিকে আবার লুকিয়ে ফেলতে হচ্ছে।
কবিতাটি লেখা হয়েছিল একজনের জন্য, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার ঠিকানা হলো একটি বন্ধ বাক্স।
এ যেন নিজের অনুভূতিকেই নিজের কাছ থেকে আড়াল করে রাখা।
এরপর আসে দীর্ঘ অপেক্ষার সময়।
“পাহারায় রাত জাগি আর দিনপঞ্জিতে বাড়তে থাকে লাল দাগের পরিমান।”
কী নিঃশব্দ অথচ বেদনাময় একটি দৃশ্য!
দিনপঞ্জিতে লাল দাগ বাড়ছে।
একটি দিন যাচ্ছে।
আরেকটি দিন আসছে।
মাস পেরিয়ে বছর।
কিন্তু কবিতাটি সেই বাক্সেই রয়ে গেছে।
কবি যেন অপেক্ষার পাহারাদার হয়ে উঠেছেন।
যে মানুষটির একদিন কবিতাটি চেয়ে নেওয়ার কথা ছিল, তার জন্য তিনি এখনও সেটি আগলে রেখেছেন।
কিন্তু সময় কি কারও জন্য অপেক্ষা করে?
দিনপঞ্জির পাতায় লাল দাগ বাড়ে।
মানুষের বয়স বাড়ে।
পৃথিবী বদলে যায়।
শুধু বাক্সের ভেতরে রাখা কবিতাটি একই জায়গায় পড়ে থাকে।
এখানেই কবিতাটি হঠাৎ তার ব্যক্তিগত পরিসর থেকে বেরিয়ে আসে।
“এভাবে কেটে যায় দিনের পর দিন
মাস কিংবা বছরের পর বছর”
এই দুটি লাইন যেন একটি সেতু।
একদিকে ব্যক্তিগত অপেক্ষা, অন্যদিকে পৃথিবীর দীর্ঘ সময়।
একজন মানুষ একটি কবিতার জন্য অপেক্ষা করছে।
আর সেই অপেক্ষার মধ্যেই পৃথিবীতে ঘটে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবর্তন।
তারপর কবি আমাদের নিয়ে যান অ্যান্টার্কটিকায়।
“অ্যান্টার্কটিকায় বরফ গুলো গলতে থাকে
সমুদ্রের তেলে ভেসে উঠে মৃত ডলফিন আর নীল তিমিদের দল”
কবিতাটি এখানে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা পায়।
এতক্ষণ যে মানুষটির ব্যক্তিগত অভিমান নিয়ে আমরা পড়ছিলাম, হঠাৎ তার সামনে খুলে যায় এক বিপন্ন পৃথিবীর ছবি।
বরফ গলছে।
সমুদ্র দূষিত হচ্ছে।
সামুদ্রিক প্রাণীরা মারা যাচ্ছে।
যে পৃথিবী একসময় অসংখ্য প্রাণের নিরাপদ আশ্রয় ছিল, সেই পৃথিবীই ক্রমশ তাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
একজন মানুষের কবিতা বাক্সে বন্দী হয়ে আছে।
অথচ পৃথিবীর অসংখ্য প্রাণের অস্তিত্বই আজ বিপন্ন।
এই বৈপরীত্য কবিতাটিকে ব্যক্তিগত অনুভূতির সীমানা ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।
তারপর আসে সাইবেরিয়ার পাখিরা।
“সাইবেরিয়ান পাখি গুলো উড়ে আসে শীতের আশায়”
এই লাইনটি প্রথম পাঠে খুব সাধারণ মনে হতে পারে।
কিন্তু আগের লাইনগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে এর ভেতর অন্য একটি অর্থ তৈরি হয়।
পাখিরা ঋতুর টানে আসে।
তাদেরও একটি পরিচিত পৃথিবী আছে। আছে বেঁচে থাকার স্বাভাবিক ছন্দ।
কিন্তু সেই পৃথিবী কি আগের মতো আছে?
জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশের বিপর্যয়, মানুষের নির্বিচার হস্তক্ষেপ—সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃতির চেনা নিয়মগুলোও বদলে যাচ্ছে।
কবি এখানে প্রকৃতির বিপন্নতার কথা বলছেন, কিন্তু তার পাশাপাশি মানুষের অপেক্ষার কথাটিও যেন আরও বড় হয়ে উঠছে।
একটি কবিতার জন্য অপেক্ষা করতে করতে কত ঋতু চলে যায়!
আর পৃথিবীর ঋতুগুলোও ক্রমশ বদলে যায়।
তারপর আসে কবিতার শিরোনামের মূল উচ্চারণ।
“পৃথিবীর ফুসফুসে আগুন লাগে, ধোঁয়ায় নিমজ্জিত মহাপৃথিবী
অক্সিজেন হারায় প্রতিনিয়ত।”
এখানে পৃথিবীর ফুসফুস বলতে বনভূমির কথা মনে পড়ে।
যে বনভূমি পৃথিবীর প্রাণপ্রবাহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, সেই বনভূমিতেই আগুন লাগে।
ধোঁয়ায় ঢেকে যায় আকাশ।
বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
পৃথিবী যেন নিজের শ্বাসটুকুও হারিয়ে ফেলছে।
শিরোনামের শক্তিটাও এখানে।
ধোঁয়ায় নিমজ্জিত মহাপৃথিবী অক্সিজেন হারায় প্রতিনিয়ত।
এটি শুধু পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিবরণ নয়। এটি মানুষের তৈরি এক সংকটের প্রতিচ্ছবি।
আমরা যে পৃথিবীতে বেঁচে আছি, সেই পৃথিবীকেই প্রতিনিয়ত বসবাসের অযোগ্য করে তুলছি।
এরপর কবিতাটি ফিরে আসে বাংলাদেশের বাস্তবতায়।
“সেন্টমার্টিনে জমে উঠে পর্যটন আবর্জনা
ভেজে ওঠে প্লাস্টিক, পলিথিন আর চিপসের প্যাকেট”
এখানে দূরের অ্যান্টার্কটিকা কিংবা সাইবেরিয়া আর নেই।
আছে আমাদের চেনা সেন্টমার্টিন।
যে দ্বীপের সৌন্দর্য মানুষকে আকর্ষণ করে, সেই সৌন্দর্যের ওপরই মানুষ নিজের ভোগের চিহ্ন রেখে যায়।
সমুদ্রের পাশে জমে ওঠে প্লাস্টিক।
পলিথিন।
চিপসের প্যাকেট।
প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে মানুষ সেই প্রকৃতিকেই দূষিত করে।
কবিতাটি যেন প্রশ্ন তোলে—
আমরা কি সত্যিই প্রকৃতিকে ভালোবাসি, নাকি শুধু তার সৌন্দর্যটুকু ভোগ করতে চাই?
তারপর দৃশ্য বদলে যায় আরও একবার।
“অনিয়ন্ত্রিত বাজারে টিসিবির লাইনে ক্রমশ বাড়তে থাকে মানুষের ভীড়”
এবার আর প্রকৃতির সংকট নয়।
এবার মানুষের বেঁচে থাকার সংকট।
বাজারের অস্থিরতা, দ্রব্যমূল্যের চাপ, সীমিত আয়ের মানুষের অসহায়ত্ব—সব মিলিয়ে টিসিবির লাইনে দীর্ঘ হতে থাকে অপেক্ষা।
এই অপেক্ষা আর কবির অপেক্ষা এক নয়।
একজন অপেক্ষা করছে তার লেখা কবিতার স্বীকৃতির জন্য।
অন্যজন অপেক্ষা করছে প্রয়োজনীয় পণ্যটুকু পাওয়ার জন্য।
একজনের অপেক্ষায় অভিমান আছে।
অন্যজনের অপেক্ষায় বেঁচে থাকার তাগিদ।
কবিতার এই বৈপরীত্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
কারণ পৃথিবীতে সব মানুষের অপেক্ষার মূল্য এক নয়।
কারও কাছে অপেক্ষা একটি আবেগ।
কারও কাছে অপেক্ষা প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
এরপর আসে আরও মর্মস্পর্শী একটি দৃশ্য।
“ফুটপাতে মাথা গোঁজা মানুষ গুলো
এই শীতে হাড়-জিরজিরে হাত বাড়ায় কয়েক ফালি উষ্ণতার আশায়।”
এখানে কবি আমাদের নিয়ে আসেন শীতের ফুটপাতে।
যেখানে কিছু মানুষের মাথা গোঁজার জায়গা বলতে ফুটপাত।
তাদের কাছে শীত মানে শুধু ঋতু পরিবর্তন নয়।
শীত মানে শরীরের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই।
একটু গরম কাপড়।
একটু উষ্ণতা।
একটু নিরাপদ আশ্রয়।
এই সামান্য চাওয়াগুলোই তাদের কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি।
কবিতাটি এখানে এসে আমাদের ব্যক্তিগত অভিমানকে আরও বড় একটি বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়।
একজন মানুষ একটি কবিতা শোনানোর সুযোগ না পেয়ে কষ্ট পাচ্ছে।
অন্যদিকে আরেকজন মানুষ শীতের রাতে শরীরটুকু উষ্ণ রাখার জন্য হাত বাড়িয়ে আছে।
দুটি চাওয়াই মানুষের।
কিন্তু তাদের প্রয়োজনের গভীরতা এক নয়।
তারপর আসে শেষের সেই বিস্ময়কর আত্মস্বীকারোক্তি।
“আর আমি সামান্য কবিতার জন্য হাকাকার করি!
মাতম তুলি পূর্ব থেকে পশ্চিমে।”
এখানেই কবিতাটি নিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পৌঁছায়।
এতক্ষণ কবি পৃথিবীর বিপন্নতার ছবি এঁকেছেন।
গলতে থাকা বরফ।
মৃত সামুদ্রিক প্রাণী।
জ্বলতে থাকা বনভূমি।
দূষিত সমুদ্র।
বাজারের দীর্ঘ লাইন।
শীতার্ত মানুষের প্রসারিত হাত।
আর সবকিছুর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন একজন কবি—যিনি একটি কবিতার জন্য হাহাকার করছেন।
শেষের এই স্বীকারোক্তিতে আত্মবিদ্রূপ আছে।
আছে নিজের আবেগকে নতুন করে বিচার করার চেষ্টা।
কবি যেন হঠাৎ নিজের কাছেই প্রশ্ন করছেন—
পৃথিবীতে এত বড় বড় বিপর্যয় ঘটে যাচ্ছে, মানুষ বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করছে, প্রকৃতি তার অস্তিত্ব হারাচ্ছে—আর আমি কি না একটি কবিতার স্বীকৃতির জন্য এতটা অস্থির!
এখানে কবি নিজেকে ছোট করছেন না।
বরং নিজের ব্যক্তিগত দুঃখকে বৃহত্তর পৃথিবীর বাস্তবতার পাশে দাঁড় করাচ্ছেন।
আর পাঠককে ভাবতে বাধ্য করছেন—
আমাদের ব্যক্তিগত হাহাকারগুলো কখনো কখনো পৃথিবীর বিশাল বেদনার তুলনায় কত ক্ষুদ্র!
তবু সেই হাহাকারও তো মানুষেরই।
সেটিকেও পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না।
শেষ পর্যন্ত কবিতাটি আমাদের একটি অদ্ভুত জায়গায় এনে দাঁড় করায়।
একটি কবিতা লেখা হয়েছিল একজন মানুষের জন্য।
সেই মানুষটি বলেছিল, একদিন চেয়ে নেবে।
কবি কবিতাটি বাক্সে তুলে রেখেছেন।
দিন গেছে।
মাস গেছে।
বছর গেছে।
অথচ সেই কবিতার অপেক্ষা শেষ হয়নি।
কিন্তু এই দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে পৃথিবী বদলে গেছে।
প্রকৃতি বিপন্ন হয়েছে।
মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়েছে।
এবং কবি একসময় বুঝতে পেরেছেন—তার ব্যক্তিগত অপেক্ষার বাইরেও পৃথিবীতে অসংখ্য অপেক্ষা রয়েছে।
কেউ অপেক্ষা করছে একটুখানি খাবারের জন্য।
কেউ একটু উষ্ণতার জন্য।
কেউ বেঁচে থাকার মতো নির্মল বাতাসের জন্য।
আর কেউ হয়তো অপেক্ষা করছে এমন একটি পৃথিবীর জন্য, যেখানে প্রকৃতি আর মানুষের অস্তিত্ব পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে না।
তবু কবিতার শেষের হাহাকারটুকু থেকে যায়।
কারণ মানুষের অনুভূতি সবসময় যুক্তির নিয়ম মেনে চলে না।
পৃথিবীর সব বিপর্যয়ের কথা জেনেও একজন মানুষ তার অপূর্ণ ভালোবাসার জন্য কাঁদতে পারে।
এটাই মানুষ।
এটাই তার সীমাবদ্ধতা।
এটাই তার সৌন্দর্য।
হয়তো এই কবিতার সবচেয়ে বড় প্রশ্নও সেখানেই—
পৃথিবী যখন প্রতিনিয়ত অক্সিজেন হারাচ্ছে, তখন আমরা কি শুধু প্রকৃতির নিঃশ্বাসটুকুই হারাচ্ছি, নাকি একে অপরের অনুভূতিগুলো বোঝার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলছি?
একটি কবিতা বাক্সে বন্দী হয়ে থাকে।
পৃথিবী ধোঁয়ায় ঢেকে যায়।
মানুষ উষ্ণতার আশায় হাত বাড়ায়।
আর কোথাও একজন কবি তার অপ্রাপ্তির হিসাব মেলাতে বসে।
কেউ কবিতাটি চেয়ে নেয় না।
কিন্তু কবিতাটি শেষ পর্যন্ত শুধু সেই একজন মানুষের জন্যও লেখা থাকে না।
তা হয়ে ওঠে পৃথিবীর জন্য এক দীর্ঘশ্বাস।
একজন মানুষের ব্যক্তিগত অভিমান থেকে জন্ম নেওয়া এক মহাপৃথিবীর মাতম।
একটি কবিতা কখনো কখনো একজন মানুষের জন্য লেখা হয়, অথচ তার গল্প হয়ে ওঠে সমগ্র পৃথিবীর।
---
একটি কবিতা ও তার গল্প
পর্ব ০২ শেষ।
— স্বপ্নবাজ সৌরভ
©somewhere in net ltd.