নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সবুজকে বাঁচাও, সবুজে বাঁচো

Environment

গ্রীনআর্থ০০৭

Nature lover and environment concerned

গ্রীনআর্থ০০৭ › বিস্তারিত পোস্টঃ

মান্দি সমাজের প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপন

০৯ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ বিকাল ৪:৩৬

দাওয়ায় বসে তিনি তখন নিজহাতে দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। মাছের কাটাগুলো পাশে বসে থাকা বিড়ালকে খেতেও দিচ্ছেন। উঠানে দাঁড়িয়ে 'আচ্চু' বলে ডাক দেয়াতেই ১১২ বছর বয়সী মান্দি সাংসারেক জনিক নকরেক ঝাপসা দৃষ্টিতে আমাকে চেনার চেষ্টা করলেন। বললাম, 'আচ্চু আমি সুদূর ঢাকা থেকে এসেছি আপনার সাথে দেখা করতে'।
নিজের খাবারটা এখনও নিজেই তৈরি করে খান। সবসময় লাঠিতে ভর দিয়ে হেঁটে বেড়ান। এতোটা প্রাণবন্ত কিভাবে এখনও, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'পুরোনো দিনের জোরে টিকে আছি এখনও'। স্মৃতি ঘাটতে গিয়ে তিনি চলে যান সোনালী জুমচাষের আমলের দিনগুলোতে। তিনি বলেন, কতকিছুই তো আইন করে বন্ধ হয়। বন থেকে মান্দিদের উচ্ছেদও তো করা হয়েছে, বন রক্ষার স্বার্থে। কিন্তু আদতে কি বন রক্ষা করতে পারছে বন রক্ষকরা? প্রতিদিন চাষের জমি একটু একটু করে বাড়িয়ে উঁচুভুমি মধুপুরগড় প্রকৃতঅর্থে দখল হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে বনের প্রাচুর্য নষ্ট করা হচ্ছে। বন মানেই নিজস্ব প্রাণবৈচিত্র্যে ভরপুর, এটা কখনও সাজাতে পারিনা!
নকরেক বলেন, ১০-১২ বছরের জন্য যদি মধুপুর বনে কোনভাবেই হস্তক্ষেপ না করা হয়, তবে আবার সেই পূর্বের জীববৈচিত্র্য ফিরে পাওয়া সম্ভব। মধুপুর বনে সেই পাকিস্তান আমল থেকেই উন্নয়নের অজুহাত দিয়ে বনের ভেতর রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, প্রমোদকেন্দ্র তৈরির ভাবনা থেকে কৃত্রিম লেক খনন করা হয়, যা একেবারেই প্রয়োজন ছিলনা।
তবুও সবকিছু ভুলে আজও অরণ্যঘেরা প্রাকৃতিক জীবনের আশা করেন তিনি। তাই ওয়ানগালা উৎসবে পূজা দিয়ে প্রার্থনা করেন যেন প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলার শক্তি এ জাতি পায়। মধুপুর আবারও যেন ভরে ওঠে সবুজে।
মান্দি সমাজ বরাবরই কৃষিনির্ভর জাতি। পাহাড়ের ঢালে জুমচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করত তারা। নকরেক বলেন, বৃটিশ আমলে প্রথম এই জুমচাষ আইন করে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু জুমচাষ হলো একটি অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব চাষপদ্ধতি।
জুমচাষের যৌথ কৃষিপদ্ধতি আদিম সাম্যবাদী সমাজের অংশ।তবে এই যৌথচেতনা আজও বিলুপ্ত হয়নি। তিনি বলেন, এখনও কিছু কিছু জমিতে মিশ্র চাষাবাস করছে কিছু কৃষক। এবং অনেকক্ষেত্রেই তা ব্যক্তিগতভাবে নয়, বরং সম্মিলিত হয়ে। যা ছিল জুমচাষের আদি বৈশিষ্ট্য। একই জমিতে তারা ধান, পেঁপে, আলুসহ বিভিন্ন ফলমূল একসাথে চাষ করছে। অনেকটা যেন জুমচাষের পরিবর্তিত চর্চা। তিনি বলেন, এই যে ওয়ানগালা উৎসব আজও এতোটা আয়োজন করে পালিত হয়- তা এসেছে কোথা থেকে? জুমচাষ থেকেই। আজ জুমচাষ ঠিকই হারিয়ে গেছে, রয়ে গেছে শুধুই প্রথা ধরে রাখার ওয়ানগালা পালনের রীতি।
মনে মনে ভাবতে থাকি, কালের পটবদলের মধ্য দিয়ে তারা পেছনে ফেলে এসেছে অনেককিছু, আবার পারিপার্শ্বিকতার চাপে অনেক পেশা, রীতি-নীতি ছাড়তে হয়েছে। অনেককিছুই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, কিন্তু তাদের থেকে নিয়েছি কতটুকু? যখন আধুনিক বিশ্ব টেকসই উন্নয়ন কিংবা পরিবেশকে টিকিয়ে রাখার কথা বলে, তখন প্রকৃতির সাথে নিবিড় আলিঙ্গনে যে জীবনব্যবস্থা রয়েছে, তা অনুসরণীয় নয় কেন? কেন তা বহুক্ষেত্রে ব্যপকভাবে অবহেলিত? আমরা আজ উন্নয়নের পথে হাঁটছি ঠিকই, কিন্তু আর্থিক উন্নয়নই কি সত্যিকারের উন্নয়ন?
গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, মান্দি পুরাণে উল্লেখ আছে চিগেলবাড়িওয়ারীখুট্টি নামের এক দ্বীপে মান্দির আদি আবাস ছিল। দ্বীপটি উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত ছিল, তবে ঠিক কত বছর আগে সেটার অস্তিত্ব ছিল, তার উল্লেখ পুরাণের কোথাও খুঁজে পাওয়া পায়নি। কালক্রমে তারা ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। মধুপুরগড় মান্দিদের কাছে হাবিমা অর্থাৎ মাতৃভূমি হিসেবে পরিচিত। মধ্যযুগে মধুপুরগড় সহ এর আশপাশের এলাকা গভীর বন দিয়ে ঘেরা ছিল। মান্দি সমাজের প্রাচীন চিন্তাধারা আর দর্শন অনেকটাই অরণ্যঘেরা জীবনযাপনকে লালন করে। তাই মান্দি সমাজকে টিকিয়ে রাখতে অরণ্যের টিকে থাকাটা অবশ্যম্ভাবী।
তিনি বলেন, আজ মান্দি সম্প্রদায়ের অধিকাংশ লোকই ধর্মান্তরিত। কিন্তু আদি ধর্ম-সাংসারেক, অনেকক্ষেত্রেই অরণ্য নির্ভরশীল ছিল। আর তাই ধর্ম পালনের জন্যই বিভিন্ন ঔষধী গাছের ব্যবহার অপরিহার্য ছিল। আজ সেই চর্চা অনেকটাই মলীন। তরুণ মান্দি ছেলে-মেয়েদের অনেকেরই বনজ গাছপালা সম্পর্কে পরিচিতি নেই। এমনকি নারীদের মাঝেও এই জ্ঞানের অভাব রয়েছে। শুধুমাত্র কিছু সংখ্যক প্রবীণ পুরুষদের কাছ থেকে দূর্লভ ঔষধী গাছ ও তার ব্যবহার সম্পর্কে জানা যায়। এই হারিয়ে যাওয়া বিদ্যার সংরক্ষণের কোন তৎপরতাও কারও মাঝে লক্ষ্য করা যায়না।
জনিক নকরেক এ প্রসঙ্গে বলেন, বনের গাছ থেকেই সবধরনের প্রয়োজন মেটানো যায়। আর তাই আগে লবণের অভাব মেটাতে একধরনের উদ্ভিজ্জ ক্ষার রান্নায় ব্যবহার করা হত। আজও আমি খাই। এটা বিভিন্ন শারীরিক রোগ, যেমন- হৃদরোগ, আমাশয়, আলসার, বহুমূত্র রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। কিন্তু আজ অধিকাংশ মান্দি পরিবারও এই উদ্ভিজ্জ ক্ষার ব্যবহার করেনা।
মান্দিদের ঐতিহাসিক দর্শন-সম্মিলিত বসবাস। জীববৈচিত্র্যের সাথে মিলেমিশেই বাঁচতে হবে। তাদের এই বিলুপ্তপ্রায় আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি আধুনিক সমাজে হারিয়েই যেতে বসেছে। তবুও বিশ্বব্যাপী একধরনের জোয়ার এসেছে সবুজকে রক্ষা করে প্রকৃতির মাঝেই উন্নত জীবন খোঁজার। সেই তাগিদেই আমরা মান্দি সমাজের জীবনপদ্ধতিকে শ্রদ্ধা করতে পারি।
লেখাটি কিছুটা পরিবর্তিত রূপে নিউজনেক্সট বিডি ডট কম থেকে প্রকাশিত হয়েছে। লিঙ্কটি:
[link|http://bangla.newsnextbd.com/article202414.nnbd/|শালবনের কান্না

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.