| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট। ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে মানুষ আটকে আছে। হাজার হাজার যাত্রী, পণ্যবাহী ট্রাক, বাস, প্রাইভেটকার—সবকিছু যেন থমকে গেছে। আর সেই থমকে থাকা জীবনের মধ্যে একটি অ্যাম্বুলেন্সও আটকে ছিল। গন্তব্য ছিল ঢাকা। কিন্তু হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর একজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে—এমন খবর আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হওয়ার কথা।
কিন্তু আমরা কি সত্যিই নাড়া খেয়েছি?
একজন অসুস্থ মানুষ ২৪ ঘণ্টার যানজটে আটকে থাকলে তার কী পরিণতি হতে পারে, সেটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। সুস্থ একজন মানুষও এত দীর্ঘ সময় রাস্তায় আটকে থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। সেখানে একজন মুমূর্ষু রোগীর জন্য প্রতিটি মিনিটই যেখানে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান, সেখানে ২৪ ঘণ্টার যানজট নিছক ‘ট্রাফিক সমস্যা’ নয়—এটি একটি মানবিক বিপর্যয়।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, আমাদের জাতীয় আলোচনায় এই সংকটের জায়গা কোথায়?
টেলিভিশনের টক শোতে আমরা যুদ্ধবিমান কেনা, সাবমেরিন, ট্যাংক, যুদ্ধজাহাজ, আন্তর্জাতিক জোট—এসব নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করি। এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয়। জাতীয় নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু যে সড়কে একজন রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে না পেরে মৃত্যুবরণ করেন, সেই সড়কব্যবস্থা কি জাতীয় নিরাপত্তার অংশ নয়?
একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার কতটি যুদ্ধবিমান আছে, কতটি ট্যাংক আছে কিংবা কতটি যুদ্ধজাহাজ আছে—তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতা বোঝা যায় তার একজন অসুস্থ নাগরিককে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা দিয়ে; জরুরি অ্যাম্বুলেন্সকে রাস্তা করে দেওয়ার সক্ষমতা দিয়ে; নাগরিকের মূল্যবান সময় ও জীবন রক্ষার সক্ষমতা দিয়ে।
আমরা উন্নয়নের বড় বড় পরিসংখ্যান শুনি। মেগাপ্রকল্পের গল্প শুনি। কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি একজন মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছানোর পথটুকু নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে কোথাও না কোথাও আমাদের অগ্রাধিকারের হিসাবটি নতুন করে দেখা দরকার।
আর জনগণের মানসিকতার প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আমরা অস্ত্র কিনলে গর্বিত হই, বড় প্রকল্প হলে উচ্ছ্বসিত হই, মহাকাশে রকেট উড়লে আনন্দ করি। অথচ প্রতিদিনের সড়ক ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, জরুরি চিকিৎসা এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
সমস্যা এখানেই।
একটি জাতি শুধু স্বপ্ন দেখে বড় হতে পারে না; বড় হতে হলে নিজের প্রতিদিনের ব্যর্থতার দিকেও তাকাতে হয়।
রাজনীতির ব্যর্থতা নিয়ে আমরা কথা বলব, সরকারের সমালোচনা করব, বিরোধীদের সমালোচনা করব—সবই প্রয়োজন। কিন্তু দল-মত নির্বিশেষে একটি প্রশ্ন করতে হবে:
একজন মানুষ যদি হাসপাতালে যাওয়ার পথে রাস্তায় আটকে থেকে মারা যান, তাহলে সেই মৃত্যুর দায় কার?
শুধু চালকের? শুধু ট্রাফিক পুলিশের? শুধু সড়ক বিভাগের? নাকি আমাদের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার?
আরও বড় প্রশ্ন—এই মৃত্যু কি আমাদের কাছে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি একটি ভেঙে পড়া ব্যবস্থার সতর্কবার্তা?
কোনো সরকারই বন্দুকের নল দিয়ে একা দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। ক্ষমতা টিকে থাকে নানা বাস্তবতা, প্রতিষ্ঠান, প্রচারণা, জনমত, রাজনৈতিক কৌশল এবং জনগণের মানসিকতার সমন্বয়ে। তাই নাগরিকদেরও প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি সত্যিই রাষ্ট্রের কাছ থেকে সঠিক জিনিসগুলো দাবি করছি?
আমাদের দাবি শুধু যুদ্ধবিমান নয়; জরুরি অ্যাম্বুলেন্সের জন্য রাস্তা চাই।
আমাদের দাবি শুধু বড় প্রকল্প নয়; নিরাপদ ও সচল সড়ক চাই।
আমাদের দাবি শুধু আন্তর্জাতিক মর্যাদা নয়; নিজ দেশের মানুষের জীবনের মর্যাদা চাই।
কারণ একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার অস্ত্রাগারে রাখা যুদ্ধাস্ত্র নয়—তার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ।
আর সেই মানুষ যদি যানজটে আটকে থেকে মারা যায়, তাহলে আমাদের উন্নয়ন, আমাদের অগ্রাধিকার এবং আমাদের জাতীয় চেতনা—সবকিছুকেই একবার আয়নার সামনে দাঁড় করানো দরকার।
©somewhere in net ltd.