নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জুয়েল তাজিম

জুয়েল তাজিম

অলস হবেন, তো হতাশা পাবেন। শুরু করুন,শেষ হবেই। সামনে এগোতে থাকুন, পথ কমবেই।

জুয়েল তাজিম › বিস্তারিত পোস্টঃ

গুলিস্তাঁ ও বুস্তাঁ: মানুষের ভেতরের মানুষটিকে খোঁজার দুই অনন্ত উদ্যান

১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:০৩

কিছু বই আছে, যাদের শেষ পৃষ্ঠা পড়া শেষ হয়ে গেলেও তাদের পাঠ শেষ হয় না। বইটি বন্ধ করে রাখার পরও তার কোনো একটি বাক্য, কোনো একটি গল্প কিংবা কোনো একটি চরিত্র নীরবে আমাদের ভেতরে হাঁটতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সেই হাঁটাচলা আরও গভীর হয়। শতাব্দী পেরিয়ে যায়, পৃথিবীর চেহারা বদলে যায়, মানুষের জীবনযাপন পাল্টে যায়; অথচ মানুষের ভেতরের লোভ, অহংকার, প্রেম, হিংসা, মমতা, দুর্বলতা আর আত্মপ্রবঞ্চনা প্রায় একই থেকে যায়। তাই বহু শতাব্দী আগে লেখা কোনো গ্রন্থও হঠাৎ আজকের মানুষকে তার নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।

শেখ সাদী শিরাজীর ‘গুলিস্তাঁ’ ও ‘বুস্তাঁ’ তেমনই দুটি গ্রন্থ—দুটি সাহিত্যিক উদ্যান, যেখানে ফুলের সৌরভের পাশাপাশি কাঁটার স্পর্শও আছে; যেখানে জীবনকে ভালোবাসার আহ্বানের পাশাপাশি জীবনকে বোঝার কঠিন শিক্ষাও রয়েছে।

‘গুলিস্তাঁ’ অর্থ গোলাপের বাগান, আর ‘বুস্তাঁ’ অর্থ উদ্যান। নাম দুটির মধ্যেই যেন সাদীর দর্শনের এক অপূর্ব ইশারা লুকিয়ে আছে। বাগানে যেমন কেবল ফুল থাকে না, থাকে কাঁটাও; তেমনি জীবনও শুধু আনন্দের নয়—তার সৌন্দর্যের পাশে বেদনা, প্রাপ্তির পাশে হারানো, ভালোবাসার পাশে বিচ্ছেদ, ক্ষমতার পাশে পতন এবং মানুষের মহত্ত্বের পাশে তার দুর্বলতাও পাশাপাশি অবস্থান করে।

সাদী মানুষকে দূর থেকে দেখেননি। তিনি মানুষকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে—রাজদরবারে, দরবেশের আস্তানায়, বাজারের ভিড়ে, পথের ধুলোয়, বন্ধুত্বের উষ্ণতায়, বিশ্বাসঘাতকতার অন্ধকারে, ক্ষমতার অহংকারে এবং নিঃস্ব মানুষের দীর্ঘশ্বাসে। তাই তাঁর লেখা কেবল নীতিকথা নয়; মানুষের স্বভাব, চরিত্র ও মনস্তত্ত্বের এক গভীর পাঠ।

‘গুলিস্তাঁ’ যেন মানুষের মুখের আয়না। সেখানে মানুষ যেমন, তেমনই ধরা পড়ে। কেউ ক্ষমতা পেয়ে বদলে যায়, কেউ সম্পদের অহংকারে নিজের মানুষটাকেই হারিয়ে ফেলে, কেউ জ্ঞান মুখস্থ করে কিন্তু জ্ঞানের আলো নিজের জীবনে জ্বালাতে পারে না, কেউ ধর্মের পোশাক পরে অথচ চরিত্রে তার কোনো ছাপ নেই। আবার এমন মানুষও আছে, যার হাতে কিছু নেই, কিন্তু হৃদয় ভরা দয়া; যার ঘরে সম্পদ নেই, অথচ যার আচরণে মানুষের জন্য অশেষ সমৃদ্ধি।

অন্যদিকে ‘বুস্তাঁ’ যেন সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখার পর নিজেকে প্রশ্ন করার গ্রন্থ। এখানে সাদী শুধু বলেননি মানুষ কেমন; তিনি বলেছেন মানুষ কেমন হতে পারে, কেমন হওয়া উচিত। ন্যায়, দয়া, উদারতা, বিনয়, প্রেম, আত্মসংযম, তওবা ও আধ্যাত্মিকতার মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের একটি উত্তমতর রূপের সন্ধান করেছেন।

অর্থাৎ, ‘গুলিস্তাঁ’ আমাদের মানুষ চিনতে শেখায়, আর ‘বুস্তাঁ’ আমাদের মানুষ হয়ে উঠতে শেখায়।

সাদীর দর্শনের কেন্দ্রে তাই কোনো রাজা নেই, কোনো সাম্রাজ্য নেই, কোনো ধনসম্পদের অহংকার নেই—আছে মানুষ। আর সেই মানুষ একা নয়; সে অন্য মানুষের সঙ্গে যুক্ত। তার সুখের সঙ্গে অন্যের সুখ, তার দুঃখের সঙ্গে অন্যের দুঃখেরও সম্পর্ক আছে।

এই মানবিক দর্শনের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রকাশ তাঁর সেই অমর পঙ্‌ক্তিতে—

“বনী আদম আজায়ে-ইয়েকে দিগারান্দ,
কে দর আফরিনেশ জে ইয়েক গোহারান্দ।”

ভাবানুবাদ করলে দাঁড়ায়—

“আদমসন্তান পরস্পরের অঙ্গ,
তাদের সৃষ্টির উৎস একই মণিমুক্তা।”

এর পরের ভাবটি আরও গভীর—দেহের একটি অঙ্গে ব্যথা হলে যেমন অন্য অঙ্গও নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না, তেমনি একজন মানুষের দুঃখ থেকে অন্য মানুষও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না।

আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে এই কথার চেয়ে আধুনিক আর কী হতে পারে?

আমরা প্রতিদিন অন্যের দুঃখ দেখি, কিন্তু অনেক সময় তাকে নিজের জীবনের বাইরে রেখে দিই। কারও অভাব, কারও কান্না, কারও অপমান, কারও অসহায়ত্ব—সবকিছুকে ‘তার সমস্যা’ বলে পাশ কাটিয়ে যাই। সাদী যেন আটশো বছর দূর থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন—মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আগে তুমি কি অন্তত মানুষটির কষ্টটুকু অনুভব করতে শিখেছ?

সাদীর কাছে মানবিকতা দুর্বলতা নয়; বরং এটাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।

প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করা, অন্যকে ছোট করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে সম্মান দেওয়া, নিজের প্রাপ্তির বাইরে অন্যের প্রয়োজনটুকুও মনে রাখা—এসবই তাঁর নৈতিক দর্শনের মূল সুর।

তবে সাদী কেবল কোমলতার কবি নন; তিনি ছিলেন গভীর বাস্তববোধের মানুষ। তিনি জানতেন, পৃথিবীতে ভালোবাসার পাশাপাশি প্রতারণা আছে, বন্ধুত্বের পাশাপাশি স্বার্থ আছে, সত্যের পাশে মিথ্যা আছে। তাই তাঁর দর্শনে ক্ষমা আছে, কিন্তু অন্ধ বিশ্বাস নেই; দয়া আছে, কিন্তু বিবেকহীন সরলতা নেই; ভালোবাসা আছে, কিন্তু আত্মমর্যাদার বিসর্জন নেই।

এই কারণেই তাঁর শিক্ষা এত জীবন্ত।

তিনি জানেন, মানুষের বাহ্যিক অবয়ব দেখে মানুষকে চেনা যায় না। পোশাক, পদবি, সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা মুখের মিষ্টি কথার আড়ালে মানুষটির প্রকৃত চরিত্রটি কোথায়—সেটিই আসল প্রশ্ন।

কেউ সাধুর পোশাক পরলেই সাধু হয় না। কেউ জ্ঞানের কথা বললেই জ্ঞানী হয় না। কেউ ধর্মের কথা বললেই ধার্মিক হয় না।

মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার আচরণে।

সে দুর্বল মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করে, অধীনস্থ মানুষের সঙ্গে কেমন কথা বলে, ক্ষমতা হাতে পেলে কী করে, কেউ না দেখলেও সৎ থাকে কি না—এসব ছোট ছোট জায়গাতেই মানুষের আসল চরিত্র প্রকাশ পায়।

আর এখানেই সাদী আজও আমাদের অস্বস্তিতে ফেলেন।

কারণ আমরা অন্যের চরিত্র বিচার করতে খুব পছন্দ করি, কিন্তু নিজের চরিত্রের আয়নার সামনে দাঁড়াতে চাই না।

কে মিথ্যা বলল, কে প্রতারণা করল, কে অহংকারী, কে ভণ্ড—এসব নিয়ে আমাদের বিচার-বিশ্লেষণের শেষ নেই। অথচ নিজের ভেতরের ছোট ছোট মিথ্যা, স্বার্থ, অহংকার, ঈর্ষা কিংবা ভণ্ডামির দিকে তাকানোর সময় আমাদের হয় না।

সাদীর শিক্ষা ঠিক সেখানেই এসে থামে না; বরং সেখান থেকেই শুরু হয়।

অন্যের চোখের কাঁটা দেখার আগে নিজের চোখের কাঁটাটি দেখো।

এই আত্মসমালোচনাই তাঁর দর্শনের অন্যতম গভীর শিক্ষা। কারণ পৃথিবীকে বদলানোর সবচেয়ে কঠিন, অথচ সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজটি অন্য মানুষকে বদলানো নয়—নিজেকে বদলানো।

‘বুস্তাঁ’র নৈতিক জগতে তাই বিনয়ের এত মূল্য। মানুষ যত বড় হয়, তার বিনয় তত গভীর হওয়া উচিত। কারণ অহংকার মানুষকে তার সীমাবদ্ধতা ভুলিয়ে দেয়। সম্পদ তাকে মনে করায় সে অমর, ক্ষমতা তাকে মনে করায় সে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, যৌবন তাকে মনে করায় সময় তার জন্য থেমে থাকবে।

কিন্তু সময় কারও জন্য থামে না।

রাজা ও দরবেশ, ধনী ও দরিদ্র, ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীন—সবাই শেষ পর্যন্ত সময়ের একই দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। এই ক্ষণস্থায়িত্বের বোধই সাদীকে সম্পদের চেয়ে সন্তুষ্টিকে, ক্ষমতার চেয়ে বিনয়কে এবং বাহ্যিক জৌলুসের চেয়ে অন্তরের সৌন্দর্যকে বড় করে দেখতে শিখিয়েছে।

যার চাহিদা সীমাহীন, তার কাছে পৃথিবীর সব সম্পদও অপ্রতুল। আর যে অল্পে তৃপ্ত হতে জানে, তার সামান্যও অনেক।

তাই সাদীর কাছে প্রকৃত ধনী সে নয়, যার ঘরে সোনা আছে; প্রকৃত ধনী সে, যার হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা ও তৃপ্তি আছে।

এই শিক্ষা আজকের ভোগবাদী পৃথিবীর জন্য আরও জরুরি। আমরা যত পাই, ততই আরও চাই। যা আছে তার আনন্দ উপভোগ করার আগেই যা নেই তার পেছনে ছুটতে শুরু করি। ফলে সম্পদ বাড়ে, অথচ প্রশান্তি কমে; ঘর বড় হয়, অথচ হৃদয়ের জায়গা ছোট হয়ে আসে।

সাদী যেন মৃদু স্বরে প্রশ্ন করেন—তুমি কি জীবনকে উপভোগ করার জন্য সম্পদ অর্জন করছ, নাকি সম্পদ অর্জন করতে গিয়ে জীবনটাকেই হারিয়ে ফেলছ?

জ্ঞান নিয়েও তাঁর প্রশ্ন একই রকম কঠিন।

জ্ঞান শুধু মুখস্থ করার বিষয় নয়। বইয়ের পাতা থেকে উঠে যদি জ্ঞান মানুষের আচরণে না আসে, তবে সেই জ্ঞান কেবল স্মৃতির বোঝা। কেউ সততার ওপর দীর্ঘ বক্তৃতা দিতে পারে, কিন্তু সুযোগ পেয়ে অসৎ হলে তার জ্ঞানের মূল্য কোথায়? কেউ বিনয়ের প্রশংসা করতে পারে, কিন্তু সামান্য ক্ষমতা পেলেই অন্যকে অপমান করলে সেই জ্ঞান তাকে কী শিখিয়েছে?

সাদীর কাছে জ্ঞানের প্রকৃত সৌন্দর্য তার প্রয়োগে।

জ্ঞান তখনই আলো, যখন তা চরিত্রকে আলোকিত করে।

এই জায়গায় এসে ‘গুলিস্তাঁ’ ও ‘বুস্তাঁ’ কেবল সাহিত্য থাকে না; তারা হয়ে ওঠে আত্মপরীক্ষার আয়না।

আমরা কী বলি—তার চেয়ে আমরা কী করি, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মানুষের সামনে কেমন—তার চেয়ে কেউ না দেখলেও আমরা কেমন, সেটিই আমাদের প্রকৃত পরিচয়। আমরা কতটা ধর্মের কথা জানি—তার চেয়ে আমাদের আচরণে কতটা ন্যায়, দয়া ও সততা আছে, সেটিই বড় কথা।

সম্ভবত এ কারণেই সাদীর সাহিত্য এত দীর্ঘ পথ পেরিয়েও পুরোনো হয়ে যায়নি।

তিনি মানুষের সময়কে নয়, মানুষের স্বভাবকে পড়েছিলেন।

তাই আটশো বছর আগের কোনো রাজা, কোনো দরবেশ, কোনো পথিক কিংবা কোনো অজ্ঞ মানুষের গল্প পড়তে গিয়ে আজও আমরা নিজেদের ছায়া দেখতে পাই।

‘গুলিস্তাঁ’ আমাদের শেখায়—মানুষকে চিনতে।
‘বুস্তাঁ’ শেখায়—নিজেকে গড়তে।

একটি আমাদের বাইরের পৃথিবীর দিকে তাকাতে শেখায়, অন্যটি আমাদের ভেতরের পৃথিবীর দরজা খুলে দেয়।

সাদীর বাগানে তাই শুধু গোলাপের সুবাস নেই; আছে কাঁটার সতর্কতা। সেখানে শুধু প্রেম নেই; আছে বিচ্ছেদের শিক্ষা। শুধু ক্ষমা নেই; আছে বিবেক। শুধু জ্ঞান নেই; আছে জ্ঞানকে জীবনে ধারণ করার আহ্বান। শুধু ধর্মের কথা নেই; আছে চরিত্রের পরীক্ষা।

শেষ পর্যন্ত সাদীর দর্শন যেন এসে দাঁড়ায় একটি সহজ অথচ গভীর সত্যের সামনে—

ধন মানুষকে ধনী করতে পারে,
ক্ষমতা তাকে শক্তিশালী করতে পারে,
জ্ঞান তাকে খ্যাতিমান করতে পারে;
কিন্তু দয়া, বিনয়, সততা ও উত্তম চরিত্রই তাকে সত্যিকার অর্থে মানুষ করে।

আর তাই ‘গুলিস্তাঁ’ ও ‘বুস্তাঁ’ শুধু পড়ার বই নয়; এগুলো নিজের কাছে ফিরে যাওয়ার বই।

জীবনের কোনো এক নির্জন সন্ধ্যায় যখন চারপাশের মানুষের বিচার করতে করতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি, তখন সাদীর বাগানে একটু হাঁটা যেতে পারে। হয়তো সেখানে কোনো একটি গোলাপের পাশে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হবে—আমি এতদিন অন্যের কাঁটা গুনেছি, নিজের কাঁটার হিসাব কি কখনো নিয়েছি?

হয়তো কোনো একটি বাক্য এসে আমাদের থামিয়ে দেবে।

হয়তো কোনো একটি গল্প আমাদের নিজের গল্পের মতো মনে হবে।

আর সেই মুহূর্তেই ‘গুলিস্তাঁ’ ও ‘বুস্তাঁ’র পাঠ সত্যিকার অর্থে শুরু হবে।

কারণ সাদীর বাগানে প্রবেশের শেষ দরজাটি অন্য কারও দিকে নয়—নিজের ভেতরের মানুষের দিকে খুলে যায়।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.