নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমার দেশ

রুবেল১৯৮৭

আমি বিশ্বস করি ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশ কিন্তু ধর্মহীনতায় নয়।

রুবেল১৯৮৭ › বিস্তারিত পোস্টঃ

বাংলাদেশে মৌলবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ মানবিকতার ঐতিহ্য

২৮ শে জুলাই, ২০১১ সকাল ১০:২৬



শাহরিয়ার কবির



১৯৭১ সালে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে। ১৯৭২ সালে গৃহীত বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে নতুন প্রজাতন্ত্রের অন্যতম নীতি হিসেবে গ্রহণ করার পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। অথচ স্বাধীনতালাভের চার বছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই বাংলাদেশের প্রধান স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সংবিধান থেকে বাংলাদেশের মূলনীতি হিসেবে গৃহীত ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ মুছে ফেলেন এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন। ১৯৭৫-এ শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের পর রাজনীতি ও সমাজের যে ইসলামীকরণ প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়েছে তার চূড়ান্তরূপ ছিল ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধে জামাতে ইসলামীর রাষ্ট্রক্ষমতার শরিক হওয়া যে দলটি ’৭১-এ ইসলামের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তান ও ইসলাম রক্ষার জন্য পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে গণহত্যা ও নারী নির্যাতন সহ যাবতীয় ধ্বংসযজ্ঞ সাধন করেছিল।

২০০১ সাল থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে বাংলাদেশে হরকতুল জেহাদ ও জামাতুল মুজাহিদীন সহ কয়েক ডজন জঙ্গী মৌলবাদী সংগঠনের অস্তিত্বের কথা দেশবাসীর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ও জেনেছে। বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত এতদসংক্রান্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এসব জঙ্গী মৌলবাদী সংগঠনের অধিকাংশই জামাতে ইসলামীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। জঙ্গী সংগঠনগুলো বাংলাদেশের গ্রামের দরিদ্র যুবকদের ধর্মের দোহাই দিয়ে এবং অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে জেহাদে উদ্বুদ্ধ করেছে। জামাতে ইসলামী ও তাদের সমচরিত্রের মৌলবাদী সংগঠনগুলো কয়েক হাজার বাংলাদেশী যুবককে প্রশিক্ষণ প্রদান করে আফগানিস্তান, কাশ্মীর, বসনিয়া, চেচনিয়া, প্যালেস্টাইন ও বার্মায় জেহাদে অংশগ্রহণের জন্য পাঠিয়েছে। এদের অনেকেই সেই সব দেশে জেহাদ করতে গিয়ে নিহত হয়েছে। অনেকে দেশে ফিরে বিভিন্ন জঙ্গী মৌলবাদী সংগঠনের শক্তিবৃদ্ধি করেছে।

গত শতাব্দীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতনের পর আমেরিকা একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েতপন্থী নজিবুল্লাহ সরকারের বিরুদ্ধে জেহাদের জন্য পাকিস্তান, সৌদি আরব ও আমেরিকার সম্মিলিত উদ্যোগের ফসল হচ্ছে তালেবান, যারা পরবর্তীকালে আমেরিকার জন্য ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সহযোগিতায় তালেবান ও আলকায়দা বিশ্বব্যাপী যে জেহাদী নেটওয়ার্ক বিস্তার করেছে বাংলাদেশের কয়েকটি জঙ্গী সংগঠন তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।

বিএনপি-জামাতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমল থেকে বাংলাদেশে জঙ্গী মৌলবাদের উত্থান সেক্যুলার গণতান্ত্রিক শক্তির জন্য যেমন মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে একইভাবে আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়েছে। ২০০৫ সালের ১৫ আগস্ট জামাতুল মুজাহিদীনের জঙ্গীরা মাত্র আধঘন্টার ব্যবধানে ৫০০ বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জানিয়ে দিয়েছে তাদের নেটওয়ার্ক কতটা শক্তিশালী। ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় জামাতে ইসলামী যেভাবে তালিকা প্রস্তুত করে দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের হত্যা করেছে, একই ভাবে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে জঙ্গী মৌলবাদীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, লেখক, সাংবাদিক, বিচারক, আইনজীবী ও সংস্কৃতি কর্মী সহ বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। সুপরিকল্পিতভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে সংখ্যালঘু ধর্মীয় স¤প্রদায় সহ সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীদের উপর। এই সব হত্যা ও নির্যাতনের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে সেক্যুলার মানবিকতার বোধ নিশ্চিহ্ন করে এ দেশটিকে মনোলিথিক মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত করা, যেমনটি তালেবানরা করেছিল আফগানিস্তানে।

২০০৫ সালের বোমা হামলা এবং বহুমাত্রিক সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ডের পর প্রধানত পশ্চিমের চাপে খালেদা জিয়ার সরকার জেএমবির কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় জঙ্গী নেতাকে গ্রেফতার করেছিল, যদিও সরকার প্রথমে এদের অস্তিত্ব অস্বীকার করছিল। গ্রেফতারকৃত শীর্ষ জঙ্গীরা গোয়েন্দা বিভাগের জিজ্ঞাসাবাদের সময় বলেছে, জোট সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী, এমপি এবং জামাতে ইসলামীর সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার কথা। তারা বলেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বিভিন্ন ইসলামী এনজিও থেকে কীভাবে তারা অর্থসাহায্য পায় এবং প্রতিবেশী দেশসমূহে তাদের নেটওয়ার্ক কতদূর বিস্তৃত। ২০০৬-এর অক্টোবরে খালেদা জিয়ার জোট সরকারের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে জঙ্গী মৌলবাদীরা আত্মগোপন করেছে। কেউ কেউ তাদের বন্ধু দেশে হিজরত করেছে। জামাতে ইসলামীর সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য সহ অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত।

২০০৫ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী-লীগের সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় জঙ্গী মৌলবাদীরা গ্রেনেড-বোমার হামলা চালিয়ে ২২ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করেছিল যাদের ভেতর ছিলেন কেন্দ্রীয় নেত্রী আইভি রহমান। আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা সহ এই হামলায় দলের শতাধিক নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ২০০৬ সালে গ্রেফতারকৃত জঙ্গীরা এই হামলা ও হত্যার দায় স্বীকার করেছে। ২০০৬-এর জানুয়ারিতে দিল্লীতে বাংলাদেশের হরকতুল জেহাদের দুই জঙ্গীকে বিস্ফোরক সহ গ্রেফতার করা হয়েছে। তারাও কবুল করেছে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার সঙ্গে তারা জড়িত ছিল। ২০০৭-এর জানুয়ারিতে ভারতের আসামে বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গী সংগঠন উলফার এক শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যে স্বীকার করেছে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার সঙ্গে তারাও জড়িত ছিল। এর আগে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়ার পর আমরা জানতে পেরেছি বাংলাদেশের জঙ্গীরা বিপুল পরিমাণ এই অস্ত্র অবৈধভাবে আমদানি করেছিল পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গীদের জন্য। বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা কক্সবাজার ও বান্দরবনে বার্মার রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এমন কয়েকটি জঙ্গী সংগঠনের যুক্ত যাদের সঙ্গে বাংলাদেশের জামাতে ইসলামীর সম্পৃক্তি গোপন কোন বিষয় নয়। বাংলাদেশের হরকতুল জেহাদের জঙ্গীরা আরাকানেও জেহাদ করতে গিয়েছে। বার্মার হরকতুল জেহাদ ও জঙ্গী রোহিঙ্গাদের ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করে জামাতের মালিকানাধীন ইসলামী ব্যাংক। এভাবেই বাংলাদেশের জঙ্গীদের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জঙ্গীদের সৌহার্দ্যরে সম্পর্ক ও নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।

সরকার ও প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া জঙ্গী মৌলবাদীদের নেটওয়ার্ক বিস্তার সম্ভব নয়। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে জঙ্গীদের বিস্তার ঘটেছে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায়। বিভিন্ন দেশে সরকারের অপশাসন, দুর্নীতি, দারিদ্র এবং সংখ্যালঘু ধর্মীয় স¤প্রদায় ও প্রান্তিক জাতিসত্তার প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ ও নির্যাতনও জঙ্গীবাদের ক্ষেত্র তৈরি করে। যে সব দেশে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গীবাদের বিস্তার ঘটেছে একসময় তা সরকারের জন্যেও বিড়ম্বনার কারণ হয়েছে। তারপরও জঙ্গী মৌলবাদের বিরুদ্ধে মুসলিম প্রধান দেশগুলোর সরকার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না। বাংলাদেশে আমরা বিগত জোট সরকারের সময়ে দেখেছি জঙ্গী মৌলবাদের উত্থান সম্পর্কে সিভিল সমাজের উদ্বেগের প্রতি সরকার বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেনি যতক্ষণ না চাপ এসেছে পশ্চিমের দাতা দেশসমূহ থেকে। কোথাও সরকার জঙ্গীদমনে আন্তরিক হলেও জঙ্গীদের আন্তঃরাষ্ট্রীয় নেটওয়ার্কের কারণে তাদের প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সব ধর্মের ভেতর মৌলবাদের যেমন রয়েছে উদারনৈতিকতা, মানবিকতা ও সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতির উপাদানও রয়েছে। ধর্মপ্রচারকদের স্থির করতে হবে কীভাবে তাঁরা ধর্মকে মানুষের ভেতর প্রচার করবেন। তবে বর্তমানে ইসলামের নামে জঙ্গী মৌলবাদের যে গ্লোবাল উত্থান ঘটেছে তেমনটি অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে ঘটেনি। মুসলিমপ্রধান দেশসমূহে জঙ্গী মৌলবাদী সংগঠনগুলোর ভেতর শক্তিশালী আন্তঃরাষ্ট্রীয় নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে গত ২০ বছরে। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে এই সব দেশে মৌলবাদের বিরুদ্ধে যারা লড়ছে সেই সব সেক্যুলার গণতান্ত্রিক সংগঠন ও ব্যক্তির ভেতর কোন কার্যকর যোগসূত্র এখনও গড়ে ওঠেনি। জঙ্গী মৌলবাদের কারণে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি, নারীর সমঅধিকার, মুক্ত চিন্তা, বিজ্ঞান ও শিল্পসংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্র ক্রমশঃ সংকুচিত হচ্ছে। জঙ্গী মৌলবাদীরা সন্ত্রাস ও হত্যার মাধ্যমে সমাজে আতঙ্কের আবহ সৃষ্টি করছে, মানুষকে নিয়তিবাদী ও সহিংস করে তুলছে। ধর্মান্ধতা ও ধর্মোন্মাদনা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে মানুষের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস ও ঘৃণা। ধর্মের নামে হত্যা ও সন্ত্রাসকে বৈধতা প্রদান করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বিশ্বশান্তি ও বিশ্বসভ্যতার জন্যে মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সময়ের দাবি হচ্ছে মৌলবাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে আন্দোলনরত সেক্যুলার গণতান্ত্রিক শক্তির কার্যকর নেটওয়ার্ক গঠন, যাতে প্রতিরোধের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হয়।

(দুই)

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ হচ্ছে প্রথম দেশ যেখানে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান গ্রহণ করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালে নয় মাসব্যাপী যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল তার ভিত্তি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিত্বের চেতনা। ১৯৭২ সালে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র নতুন প্রজাতন্ত্রের মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হয়।

বাংলাদেশে সেক্যুলারিজমের ধারণা পশ্চিমের চেয়ে বহুলাংশে স্বতন্ত্র। বাংলাদেশে এবং ভারতেও সেক্যুলারিজম বলতে বোঝায় রাষ্ট্র ও ধর্মের বিচ্ছিন্নতা (ঝবঢ়ধৎধঃরড়হ ড়ভ ংঃধঃব ভৎড়স ৎবষরমরড়হ ), ধর্মের সঙ্গে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা নয়। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন “ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। তাতে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্ম-কর্ম করার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা আইন করে ধর্মকে নিষিদ্ধ করতে চাই না এবং করব না। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে। তাদের বাধা দিবার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রের কারো নেই। হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কারো বাধা দিবার মত ক্ষমতা নেই। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে, খৃষ্টানরা তাদের ধর্ম পালন করবে। তাদের কেউ বাধা দিতে পারবে না। আমাদের শুধু আপত্তি হলো, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। ২৫ বছর আমরা দেখেছি ধর্মের নামে জুয়াচুরী, ধর্মের নামে বেঈমানী, ধর্মের নামে অত্যাচার, খুন, ব্যাভিচার বাংলাদেশের মাটিতে চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিষ। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে যে ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে আমি বলব, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা করেছি।” (গণপরিষদের ভাষণ, ১২ অক্টোবর ১৯৭২)

ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করার জন্য ’৭২-এর সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল যা সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বাইরে কোন সেক্যুলার গণতান্ত্রিক দেশে সম্ভব হয়নি। এই সংবিধান কার্যকর থাকলে বাংলাদেশে বর্তমানে ধর্মের নামে রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচার ও জঙ্গী মৌলবাদের জেহাদী উন্মাদনা দেখতে হতো না।

’৭২-এর সংবিধানে সেক্যুলারিজমকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণের পর এটি দুই ধরনের সমালোচনা শিকার হয়। এক পক্ষ হচ্ছে সা¤প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠী, যারা ইসলামকে মনে করে পরিপূর্ণ জীবনবিধান যা রাষ্ট্র-রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজ-সংস্কৃতি সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করবে। অপরপক্ষ হচ্ছে সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টরা যারা পশ্চিমের প্রভাবে ধর্মকে ব্যক্তি ও সমাজজীবন থেকে নির্বাসনের পক্ষে। মৌলবাদীরা মুজিবের ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাকে আক্রমণ করেছে এই বলে যে ধর্মনিরপেক্ষতা অর্থ হচ্ছে নাস্তিকতা, রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ হলে মানুষের ধর্মপালন ও প্রচারের স্বাধীনতা থাকবে না। মৌলবাদী নয়, এমন দক্ষিণপন্থী বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা ছিল ’৭২-এর সংবিধানপ্রণেতারা ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানে ঢুকিয়ে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও ধর্মের প্রতি অনুরাগের বিষয়টি উপেক্ষা করেছেন। শতকরা ৮৫% মুসলমানের দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

শেখ মুজিব ও তাঁর সহযোগী যারা ’৭২-এর সংবিধান প্রণয়ন করেছেন তারা ধর্মকে রাষ্ট্র ও রাজনীতি থেকে পৃথক করার কথা বললেও ব্যক্তিজীবনে ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বার বার তাদের বলতে হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্মহীনতা নয়।

অপরদিকে বামপন্থীরা মুজিবের সেক্যুলারজিম সম্পর্কিত ধারণাকে গোঁজামিল আখ্যা দিয়ে বলেছেন সেক্যুলারিজমের অর্থ হচ্ছে ইহজাগতিকতা, রাষ্ট্র ও সমাজের কোথাও ধর্মের স্থান থাকবে না, কারণ ইহজগতের সঙ্গে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই। এদের সমালোচনার বিষয় ছিল সরকারী বেতার ও টেলিভিশনে সব ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ ও আলোচনা, এমনকি রাজনৈতিক দলের মহাসমাবেশের আরম্ভে সব ধর্মগ্রন্থ পাঠ প্রভৃতি সেক্যুলারিজমের পরিপন্থী। সেক্যুলার ও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (ঘঅগ) সদস্য হয়েও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের ঙওঈ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান এবং এর সদস্যপদগ্রহণও তখন সমালোচিত হয়েছিল। মুজিব সরকার কর্তৃক ইসলামিক একাডেমীকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে রূপান্তর, মদ্যপান ও ঘোড়দৌড় নিষিদ্ধ করা, রাষ্ট্রীয় খরচে মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ এ সবই তখন সেক্যুলারিজমের বিচ্যুতি হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সেক্যুলাজিরমকে বামপন্থীরা ঢ়ংবঁফড়-ংবপঁষধৎরংস বলেছেন যেমনটি তারা বলেন ভারতের সেক্যুলারিজম সম্পর্কে। অথচ ৩৬ বছর পর পর্যালোচনা করতে গিয়ে আমরা উপলব্ধি করছি ’৭২-এর সংবিধানপ্রণেতারা ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে ধর্মের অবস্থানকে মেনে নিয়ে রাজনীতি ও রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে দূরে রাখার জন্য ধর্মনিরপেক্ষতার যে নতুন সংজ্ঞা দিয়েছিলেন সেটা আমাদের মতো দেশের জন্য সর্বোত্তম।



(তিন)

বাংলাদেশের তিন হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাব সেক্যুলারিজমের চেতনা এদেশে পশ্চিম থেকে আমদানি করা হয়নি। ভারতবর্ষে যখন প্রথম বৈদিক ধর্মের প্রবর্তন হয় তখন থেকেই উদ্ভব ঘটেছে ধর্মের বিরোধী চিন্তা। খৃষ্টের জন্মের প্রায় এক হাজার বছর আগে চার্বাক দর্শন ঈশ্বর, পরলোক, স্বর্গ, নরক, জন্মান্তর প্রভৃতি বৈদিক ধর্মের মূল বিষয়সমূহ অস্বীকার করে ভারতীয় উপমহাদেশে বস্তুবাদী দর্শনের জন্ম দিয়েছে। ঋগবেদে এই দর্শনের আদিগুরু বৃহস্পতি বলেছেন, ‘বস্তুই হচ্ছে চরম সত্তা’। চার্বাক দর্শনের অনুসারীরা জীবনকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগের কথা বলেছেন। এই ভোগবাদ ধর্মবিশ্বাসীদেরও প্রভাবিত করেছিল। হিন্দুর বৈদিক ধর্মকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছিল জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম যা বৈদিক ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা সমালোচিত হয়েছে নাস্তিকতা হিসেবে।

নাস্তিকতার প্রভাবে বাঙালি হয়েছে সেক্যুলার। তবে বাঙালির চেতনায় সেক্যুলারিজম ধর্মের বহু আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে সহ অবস্থান করেছে বিশেষভাবে যে সব আচার-অনুষ্ঠান পার্থিব প্রাপ্তির সন্ধান দেয়।

অধ্যাপক আহমদ শরিফ বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও বৈশিষ্ট সম্পর্কে বলেছেন ‘আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ, তাই ভাষার নাম বাঙলা এবং তাই আমরা বাঙালী। আমরা এদেশেরই জলবায়ু ও মাটির সন্তান। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই এদেশের মাটির পোষণে, প্রকৃতির লালনে এবং মানুষের ঐতিহ্য-ধারায় আমাদের দেহ-মন গঠিত ও পুষ্ট। আমরা আর্য নই, আরবি, ইরানি কিংবা তুর্কিস্তানিও আমরা নই। আমরা এদেশেরই অস্ট্রিক গোষ্ঠীর বংশধর। আমাদের জাত আলাদা, আমাদের মনন স্বতন্ত্র, আমাদের ঐতিহ্য ভিন্ন, আমাদের সংস্কৃতি অনন্য। আমরা আগে ছিলাম ধহরসরংঃ, পরে হলাম ঢ়ধমধহ, তারও পরে ছিলাম হিন্দু-বৌদ্ধ, এখন আমরা হিন্দু কিংবা মুসলমান। আমরা বিদেশের ধর্ম নিয়েছি, ভাষা নিয়েছি, কিন্তু তা কেবল নিজের মতো করে রচনা করবার জন্যেই। তার প্রমাণ নির্বাণকামী ও নৈরাত্ম-নিরীশ্বরবাদী বৌদ্ধ এখানে কেবল যে জীবনবাদী হয়ে উঠেছিল, তা নয়, অমরত্বের সাধনাই ছিল তাদের জীবনের ব্রত। বৌদ্ধচৈত্য ভরে উঠেছিল অসংখ্য দেবতা ও উপদেবতার প্রতিমায়। হীনযান-মহাযান ত্যাগ করে এরা তৈরি করেছিল বজ্রযান-সহজযান, হয়েছিল থেরবাদী। এতে নিহিত তত্ত্বের নাম গুরুবাদ।

‘সে জীবনবাদী, তাই বস্তুকে সে তুচ্ছ করে না, ভোগে নেই তার অবহেলা, তাই জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে যা কর্তব্য, তাতেই সে উদ্যোগী। সেজন্যেই সে তার গরজমতো জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার দেবতা সৃষ্টি করেছে। পারলৌকিক সুখী জীবনের কামনা তার আন্তরিক নয় পোশাকীই। তাই সে মুখে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ গ্রহণ করেছিল, অন্তরে কোনোদিন বরণ করেনি। তার পোশাকী কিংবা পার্বণিক জীবনে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্ম এবং আচার আবরণ ও আভরণের মতো কাজ দিয়েছে, কিন্তু তার আটপৌরে জীবনে ঠাঁই পায়নি।’ (বাংলা, বাঙালী ও বাঙালিত্ব, অনন্যা, ঢাকা, ২০০১)

হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মকে বাঙালি যেভাবে নিজের বস্তুবাদী চেতনার উপযোগী করে গ্রহণ করেছে পরবর্তীকালে একইভাবে গ্রহণ করেছে ইসলাম ও খৃষ্টধর্মকে। ইসলাম এ দেশে এসেছে এক হাজার বছর আগে এবং তা প্রচারিত হয়েছে সুফীদের দ্বারা। দু একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সুফীরা তলোয়ারের জোরে নয়, মানবপ্রেম অবলম্বন করে ইসলাম প্রচার করেছেন। হিন্দু ধর্মের বর্ণবৈষম্যের শিকার নিম্নবর্ণের মানুষ ব্রাহ্মণের সমান হওয়ার জন্য কিংবা পরবর্তীকালে মুসলিম শাসকদের অনুগ্রহভাজন হওয়ার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছে। তবে এই ইসলাম আরবের রক্ষণশীল সালাফি ইসলাম ছিল না। ইরানে উদ্ভূত সুফীবাদের উপর মুতাজিলাদের প্রভাবের ফলে কিতাবসর্বস্ব আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তে উদারনৈতিক মানবিকতার যে পরিচয় ইসলামে পাওয়া যায় তা এতদঞ্চলের মানুষদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল।

সালাফী ইসলামে নৃত্যকলা, সঙ্গীত ও চিত্রকলা নিষিদ্ধ। সুফীরা মুতাজিলাদের মতো নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে এর চর্চা করেছেন। বিশেষভাবে চিশতিয়া ও সোহরাওয়ার্দী তরিকার সুফীদের প্রভাবে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের চর্চায় মুসলিম শিল্পীরা অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। উত্তর ভারতীয় উচ্চাঙ্গ নৃত্যশিল্পের বিকাশেও মুসলমানরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বাংলার হিন্দু জমিদাররা লক্ষেèৗ, জয়পুর, আগ্রা ও এলাহাবাদ থেকে মুসলিম ওস্তাদ ও বাঈজীদের আনতেন দুর্গোৎসবে কিংবা কোন পারিবারিক উৎসবে।

সুফীবাদের সাম্য ও মানবিকতা বাংলার সনাতন হিন্দু ধর্মকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল তার প্রমাণ হচ্ছে মধ্যযুগে চৈতন্যদেবের বৈষ্ণব ধর্ম। বৈষ্ণব কবিদের রচনায় মানবপ্রেম নানাভাবে মূর্ত হয়েছে। এ সময়ের কবি চন্ডিদাসই মানবতার শাশ্বত বাণী উচ্চারণ করেছিলেন ‘শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’

এর আগে চর্যাপদের যুগে বৌদ্ধ কবিরাও মানবিকতার জয়গান গেয়েছেন এবং জীবনবিমুখ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের সমালোচনা করেছেন। এগারশ বছর আগে চর্যাপদকর্তা সরহপার একটি দোহা গানের কথা হচ্ছে

‘কী হবে তোর দীপে, কী হবে তোর নৈবদ্যে?/ কী হবে তোর মন্ত্র ও সেবায়?/ তীর্থে তপোবনে গিয়েই বা তোর কী হবে?/ মোক্ষ কি লাভ হয় জলে স্নান করে?’ (চর্যাগীতি পদাবলী, সম্পাদনা সুকুমার সেন, কলকাতা ১৯৬৬)

এরই চূড়ান্ত রূপ আমরা পাই ফকির লালন শাহ ও তার সমগোত্রীয় বাউলদের গানে। দেড়শ বছর আগে লালন লিখেছেন, ‘এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে / যবে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ খৃষ্টান জাতিভেদ নাহি রবে।’

লালন আরও বলেছেন  ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে/ লালন কয় জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে .../ জগৎ জুড়ে জাতের কথা/ লোকে গল্প করে যথাতথা/ লালন বলে জাতের ফাতা/ ডুবাইছি সাত বাজারে।’

লালন ফকির প্রভাবিত হয়েছিলেন ইসলামের আদিযুগের সুফীদের দর্শনের দ্বারা। ইরানের সুফীসাধক মওলানা জালালউদ্দিন রুমী (১২০৭-১২৭৩ খৃস্টাব্দ) ‘দিওয়ান-এ শামস-এ তাবরিযি’ কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন ‘আমি কী করতে পারি, হে আল্লাহর অনুসারীগণ বল? আমি তো নিজেকেই চিনি না।/ আমি খৃস্টান নই, ইহুদি নই, অগ্নিউপাসক নই, মুসলিমও নই,/ আমি প্রাচ্যের অথবা পাশ্চাত্যের নই, জলের নই, স্থলেরও নই,.../ আমি ভারতের নই, চীনের নই, বুলগারের নই সাকসিনের নই,/ দুই ইরাক দেশের নই, খোরাসানেরও নই,/ আমি এ জগতের নই, জগতাতীতও নই,/ আমি স্বর্গের নই, নরকেরও নই, আমি যাঁকে চাই, যাঁকে আমি চিনি, যাঁকে আমি দেখি, যাঁকে আমি ডাকি।/ তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ, তিনি বাহিরের, তিনি অন্তরের/ তাঁকে ছাড়া আমি আর কাউকে জানি না। ...’ সাধক রুমী তাঁর গুরু ও বন্ধু শামস তাবরিযির ভেতর ঈশ্বরকে অবলোকন করেছেন।

চতুর্দশ শতকের সুফী সাধক মাহমুদ শাবিস্তারি লিখেছেন, “আমি” ও “তুমি” স্বর্গ ও মর্তের মাঝখানে পর্দার মতো/ এই পর্দা সরিয়ে দাও, তুমি দেখবে/ ধর্ম ও স¤প্রদায়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই,/ যখন “তুমি” আর “আমি” থাকব না/ তখন কীসের মসজিদ, কীসের উপসনালয় আর কীসেরই বা অগ্নিমন্দির?’ সুফীরা ধর্মের আধ্যাত্মিকতার কথা বলেছেন, জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার সম্পর্কর কথা বলেছেন, ওহাবিরা ধর্মের আধ্যাত্মিকতা প্রত্যাখ্যান করে জাগতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাজনৈতিক ইসলাম প্রচার করছে, যার কোন উপাদান বাংলার মাটিতে নেই।

মধ্যযুগের সুফী সাধক ও লালন ফকিরের বহু গানে ধর্মনিরপেক্ষ মানবিকতার চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে। লালনের মানবিক সৌন্দর্য ও রহস্যময়তা পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও প্রভাবিত করেছিল। তবে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবোধ দেশ ও কালের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। তাঁর জবষরমরড়হ ড়ভ গধহ-এ তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘গু ৎবষরমরড়হ রং ঃযব ৎবপড়হপরষরধঃরড়হ ড়ভ ঃযব ংঁঢ়বৎ-ঢ়বৎংড়হধষ সধহ, ঃযব ঁহরাবৎংধষ যঁসধহ ংঢ়রৎরঃ রহ সু ড়হি রহফরারফঁধষ নবরহম.’

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় ভগবানের বুকে লাথি মেরে মানবতার জয়গান গেয়েছেন এই বলে ‘গাহি সাম্যের গান/ মানুষের চেয়ে নহে কিছু বড়, নাহি কিছু মহিয়ান।’ নজরুলের সমসাময়িককালে ১৯২৫ সালে কলকাতায় সূচিত হয়েছিল ‘বুদ্ধি মুক্তি’র আন্দোলন যা শহরের শিক্ষিত মুসলমানদের ধর্মনিরপেক্ষ মুক্তচিন্তায় উদ্বুদ্ধ করেছে। আবুল হোসেন, কাজী আবদুল ওদুদ ও কাজী মোতাহার হোসেন এই আন্দোলনের সূচনা করেছেন, যার শ্লোগান ছিল ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ এদের সমসাময়িক বাঙালি এমএন রায় ‘র‌্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম’ আন্দোলনের জন্ম দিয়েছেন, যার ভিত্তি হচ্ছে যুক্তি-নীতি-স্বাধীনতা। তিনি মানুষের স্বাধীন ব্যক্তিসত্তাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সকল প্রকার রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় শৃঙ্খল থেকে মানুষের মুক্তি। উনিশ শতকে বাংলার বিদ্বৎ সমাজে ইউরোপের রেনেসাঁর প্রভাবে ধর্মনিরপেক্ষ মানবিকতার চর্চা যেমন নতুন মাত্রা লাভ করে, এর বিপরীতে ইংরেজ শাসকদের উপনিবেশ-নীতি ধর্মে ধর্মে বিভাজন ও বিরোধকে সমানভাবে উৎসাহিত করেছে।



(চার)

গ্রাম-বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতিতে সেক্যুলার মানবিকতার বোধ যতটা প্রবল নগরকেন্দ্রিক বিত্তবান এলিটদের চেতনায় ততটা কখনও ছিল না। বাঙালির লোক-ঐতিহ্যে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান ধর্মের এক ধরনের সমন্বয় ঘটেছে যা গ্রাম বাংলার বাউল, জারি, সারি গানে, কবি গানে, বাংলা নববর্ষ, চৈত্র সংক্রান্তি ও নবান্নর উৎসবে আমরা দেখতে পাই। এসব সাংস্কৃতিক আয়োজন একান্তভাবেই সেক্যুলার, যা শত শত বছর ধরে গ্রাম বাংলার মানুষ চর্চা করেছে।

রাজা ও ভূস্বামীদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে বিভিন্ন সময়ে ধর্মে ধর্মে বিরোধ ও হানাহানির ঘটনা ঘটলেও গ্রাম বাংলার মানুষ তাতে খুব একটা সাড়া দেয়নি। এমনকি ধর্মীয় আচরণের ক্ষেত্রে হিন্দুরা যেমন মুসলিম পীরের মাজারে গিয়ে মানত করেছে, মুসলমানরাও হিন্দুদের অনেক কাল্পনিক দেবদেবীর শরণাপন্ন হয়েছে, যাদের ভেতর সত্যনারায়ণ, ওলাইচণ্ডী, শীতলা দেবী, বনদেবীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

হিন্দুদের সত্যনারায়ণ ছিলেন মুসলমানদের সত্যপীর। মধ্যযুগে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে ‘সত্য’র সাধনা করেছেন। সেই সময়ে সত্যপীর বা সত্যনারায়ণকে বন্দনা করে বহু পুঁথি লেখা হয়েছিল। একটি পুঁথিতে বলা হয়েছে‘হিন্দুর দেবতা হইল মুসলমানের পীর/ দুই কুলে সেবা লয় হইয়া জাহির।/ ...মক্কার রহিম আমি অযোধ্যার রাম/ কলিতে স¤প্রতি আমি সত্যনারায়ণ।’

এই সব দেবদেবী কিংবা পীর মুর্শিদের কাছে হিন্দু মুসলমান গিয়েছে পার্থিব প্রয়োজনে, পরকালে কিছু প্রাপ্তির আশায় নয়। বাঙালির চেতনায় পরকালের চেয়ে ইহকাল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যযুগে বহু বাঙালি মুসলমান কবি হিন্দুর দেবদেবীর বন্দনা করে কবিতা লিখেছেন, হিন্দু কবি ও শিল্পীরা মুসলিম পীর-মুরশীদ ও শাসকদের বন্দনা করেছেন, তাদের রাজসভা অলংকৃত করেছেন।

তবে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে এটাও আমরা দেখেছি এক শ্রেণীর গোঁড়া ধর্মপ্রচারক বাংলায় সাধারণ মানুষের জীবনে সেক্যুলার জীবনযাপন বা ধর্মসমন্বয়ের আচরণকে সহজভাবে গ্রহণ করেননি। মধ্যযুগে দিল্লীতে সম্রাট আকবরের ‘দীন ই এলাহী’র মাধ্যমে সর্বধর্ম সমন্বয়ের উদ্যোগ এবং বাংলায় সুফী-বৈষ্ণবদের সর্বধর্ম সমন্বয়ের মাধ্যমে মানবধর্মের আবাহনকালে আবির্ভাব ঘটেছিল শেখ আহমদ সিরহিনদ-এর নেতৃত্বে একদল কট্টর উলামার, যাদের লক্ষ্য ছিল হিন্দুদের প্রভাব থেকে মুসলমানদের বের করে আনা এবং শরিয়তের বিধানসমূহ কঠোরভাবে পালন করা। এরই ধারাবাহিকতায় উনিশ শতকের প্রথম দিকে বাংলায় ওহাবী আন্দোলনের সূচনা হয়েছে। শুরুতে ওহাবীরা বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও পরে তাদের বিরোধিতার লক্ষ্য ছিল ভারতের অমুসলিম ধর্মীয় স¤প্রদায় এবং আখেরে ইসলামি হুকুমত কায়েমের উদ্যোগ।

বাংলার নগরকেন্দ্রিক এলিট মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ সব সময় ধর্মকে আত্ম পরিচয়ের প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচনা করতে গিয়ে আর্যদের মতো বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিরোধিতা করেছে। বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা না উর্দু-ফারসি এ বিতর্ক বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত গড়িয়েছে। এ বিষয়ে সপ্তদশ শতকের মুসলিম কবি আবদুল হাকিমের কঠোর মন্তব্য ছিল

‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’

এর একশ বছর পর অষ্টদশ শতকে রামনিধি গুপ্তের গানেও বলা হয়েছে

‘নানান দেশে নানান ভাষা/বিনে স্বদেশীয় ভাষে পুরে কি আশা।’

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে বাংলায় বহু গান ও কবিতা লেখা হয়েছে যেখানে সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল। বাঙালি এলিট মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সংকট মোচনের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের বিজয় পর্যন্ত। অথচ গ্রাম বাংলায় সাধারণ বাঙালি জীবনে এ ধরনের পরিচয়ের সংকট ছিল না, তার সর্বধর্ম সমন্বয়ের মানবতাবাদী ঐতিহ্যের কারণে।



(পাঁচ)

বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বহুমত ও পথের স্বীকৃতি মূর্ত হয়েছে বাংলার সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্য, চিত্রকলা, যাত্রা ও মেলার উৎসবে। গ্রাম বাংলার এই সংস্কৃতির প্রধান উপাদান ছিল অসা¤প্রদায়িক এবং সেক্যুলার। ধর্মের মানবিক উপাদানকে নাকচ না করেও যে সেক্যুলারিজমের চর্চা করা যায় বাংলাদেশ তার একটি উদাহরণ হতে পারে।

মানবিক ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষার বিস্তার মানুষকে সেক্যুলার হতে সাহায্য করে এবং বিজ্ঞানে ও ব্যবহারিক জীবনে ধর্মের কোন ভুমিকা নেই এ সবই সত্য। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বের বিপুল সংখ্যক মানুষ ধর্মের ভেতর বাস করছে ততক্ষণ পর্যন্ত ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করে তাকে ব্যক্তিজীবনে সীমাবদ্ধ রাখাই সেক্যুলার মানবতাবাদীদের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট শাসকরা সফল হতে পারেনি। জাতি-ধর্ম-বর্ণের অহংকার ও ঔদ্ধত্য থেকে মানুষের মুক্তির জন্য প্রয়োজন সেক্যুলার মানবিকতার ধারাবাহিক ও বহুমাত্রিক চর্চা।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় মৌলবাদের সা¤প্রতিক উত্থানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ অবশ্যই আছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা মৌলবাদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে। সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশে জঙ্গী মৌলবাদীরা প্রধানতঃ সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্য ও পাকিস্তানের বিপুল আর্থিক সমর্থনে পুষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কখনও মৌলবাদী নয়। মৌলবাদী হওয়ার উপাদান তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে নেই। সরকার এবং বাইরের সমর্থন ও সহযোগিতা না পেলে বাংলাদেশের মৌলবাদী ও সা¤প্রদায়িক শক্তি যে টিকে থাকতে পারবে না আমাদের হাজার বছরের সেক্যুলার মানবিকতার ইতিহাস তার প্রমাণ।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ২৮ শে জুলাই, ২০১১ সকাল ১১:৫৭

এস এইচ খান বলেছেন: এডায় কুন শারিয়ারকুবির? ঐ যে চিকুলার মোলবাদী! আই হেতারে কুউব বালা পাই B:-/ বাউরে হেতে মাঝেমধ্যে হলাইয়া কুনাই যায়?

হোস্টে অউগ্গা হিলাচ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.