নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়

১১ ই মে, ২০২৬ রাত ১:৫১


মাইলস্টোন স্কুলের কথা কি এখনও মনে আছে? একটা ট্রেনিং জেট ক্রাশ করেছিল স্কুলের ওপর। ছোট ছোট বাচ্চারা ক্লাস করছিল, হঠাৎ আকাশ থেকে নেমে এল মৃত্যু। ঠিক যেমনটা আমরা সিনেমাতে দেখি, অথচ সেটা ছিল নিষ্ঠুর বাস্তব। আমরা আসলে এক অদ্ভুত ‘গোল্ডফিশ মেমোরি’র জাতি। বেইলি রোডের আগুনে যখন ২১ জন মানুষ নিছক এক রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে পুড়ে ছাই হয়ে গেল, তখন কয়েকদিন খুব শোরগোল হলো। তারপর সব ঠান্ডা। এখন আর সেই আগুনের উত্তাপ কারো গায়ে লাগে না।

ঠিক একইভাবে মাইলস্টোন স্কুলের ওপর যখন ট্রেনিং জেটটা আছড়ে পড়ল, সেই মুহূর্তের বীভৎসতাও আমরা প্রায় ভুলতে বসেছি। আমাদের দেশে প্রতিদিন মানুষ মরে: কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, কেউ স্রেফ মাথার ওপর ইঁট পড়ে, আবার কেউ বা হামের মতো অসুখে। অভাবী দেশে মৃত্যুর মিছিল এতই দীর্ঘ যে, ছয় মাস বা এক বছর আগের শোক মনে রাখাটা এখানে বিলাসিতা মাত্র। সম্প্রতি মাইলস্টোনকে নিয়ে এক অপ্রত্যাশিত সাক্ষ্য এসেছে। খালেদ মহিউদ্দিনের একটি টক শোতে হুম্মাম কাদের চৌধুরী, যার পিতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি হয়েছিল, তিনি বলেছেন:

"একটা ট্রেনিং জেট ক্রাশ করেছিল মাইলস্টোন স্কুলে। সবাই ছোটাছুটি করছিল কীভাবে ক্রাইসিসটা ট্যাকল করা যায়... সৎ সাহস নিয়ে একটা কথা বলতে চাই: ডা. সামন্ত লাল সেন, আওয়ামী লীগের শেষ সময়ে মন্ত্রীও ছিলেন। ওনাকে সবাই চেনে এজ গুরু অফ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট আর বার্ন ইউনিটের জন্য। ওনার তরফ থেকেও সাহায্যের হাত বাড়ানো হয়েছিল, আমি এই মেসেজটা পাস করেছিলাম ইন্টেরিম সরকারের কাছে, ওনারা বলেছে 'অ্যাবসোলিউটলি নট'। আমি জানি না, ওনাকে নিলে হয়তো কয়েকটা জান বাঁচানো যেত। এটা ছিল তাদের ঘাড়ত্যাড়ামি।"

এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাটা লুকিয়ে আছে। আমাদের দেশে যোগ্যতার চেয়ে 'রঙ' বা 'ট্যাগ' অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ডা. সামন্ত লাল সেন নিঃসন্দেহে একজন অসাধারণ চিকিৎসক এবং তার বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠার অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু তিনি যখন শেখ হাসিনার শেষ সময়ে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হওয়ার পথে পা বাড়ালেন, তখন থেকেই তিনি নিজের পেশাদারিত্বের নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়ে দিলেন। যিনি দেশের সেরা চিকিৎসকদের একজন হিসেবে পরিচিত, তিনি কি সত্যিই বুঝতে পারেননি যে ২০২৪ সালের সেই নির্বাচন কী ছিল?

যেখানে বিরোধী দল অংশ নেয়নি আর ডামি প্রার্থী দিয়ে ভোটের অভিনয় করা হয়েছিল, সেখান থেকে মন্ত্রী হওয়া মানে একটি ব্যর্থ ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়া। তিনি বুঝেননি না কি বুঝেও লোভে পড়েছিলেন, সেটা তিনিই জানেন। তবে তিনি যদি শুধু তার সাদা অ্যাপ্রনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতেন এবং কোনো দলের আশ্রয় না নিতেন, তবে যেকোনো সরকারই আজ তার কাছে ছুটে যেত। একজন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের যে অপরিসীম মূল্য, তা তিনি নিজেই একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কমিয়ে ফেলেছেন।

এই ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কঠিন নিয়ম চালু আছে বাংলাদেশে। যে দল ক্ষমতায় আসে, প্রথম কাজই হলো আগের দলের সব কিছু মুছে দেওয়া : স্কুল-কলেজের নামফলক থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রতিটা স্তর পর্যন্ত। আগের সরকারের আমলারা ওএসডি হন, অবসরে যান, কেউ কেউ জেলে যান। এটাকে কেউ সংস্কৃতি বলে, কেউ বলে প্রতিশোধ। আসল সত্যি হলো, ক্ষমতার পালাবদলে যোগ্যতার কোনো মূল্য নেই এই দেশে। যোগ্যতা বিচার হয় দলীয় পরিচয়ে।

গত পনেরো বছরে যারা আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত ছিলেন, সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন বা কোনোভাবে যোগাযোগ রেখেছেন, তাদের একটা বড় অংশকে এখন মূল্য দিতে হচ্ছে। কেউ জেলে, কেউ দেশ ছেড়েছেন, কেউ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন। এমনকি যারা কিছুই করেননি, শুধু একদিন কোনো একটা অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের কারো পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছিলেন, তারাও সমস্যায় পড়েছেন। এই আগুনেই এখন ডা. সামন্ত লাল সেনের মতো দক্ষ মানুষরা পুড়ে 'ফ্যাসিবাদীর দোসর' হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়, এটাই বাংলাদেশের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।

আওয়ামী লীগ যে দীর্ঘ সময় দেশ পরিচালনা করেছে, তাতেই ডা. সেনের মতো দক্ষ মানুষকে এত দেরিতে নিয়োগ দেওয়া থেকে বোঝা যায় স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা কতটা খারাপ ছিল। করোনা মহামারীর সময় যখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিল, তখনই তাকে নিয়োগ দেওয়া যেত। অথচ ২০০৮ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় এসেও সেটা করা হয়নি। বরং হাসান মাহমুদ বা দিপু মনিদের মতো ভুইফোঁড় মানুষরা বারবার মন্ত্রী হয়েছেন এবং দেশের ক্ষতি করেছেন।

অন্তর্বর্তী সরকারে যারা উপদেষ্টা হয়েছেন, সামনের দিনগুলো তাদের জন্য খুব একটা সহজ হবে না। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে বা উঠবে, তাদের পরিণতি মইন উ আহমেদের মতো হওয়ার আশঙ্কা কম নয়। জুলাইয়ের কোটা আন্দোলন থেকে ক্ষমতায় আসা সত্ত্বেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। আজ যারা হিরো, কাল তারা জিরো হতে সময় লাগবে না।

আমাদের বুদ্ধিজীবী এবং দক্ষ মানুষেরা যখন রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি শুরু করেন, তখন তারা আসলে নিজেদেরই ক্ষতি করেন না, বরং পুরো জাতির জন্য এক অপূরণীয় আক্ষেপ তৈরি করেন। রাজনীতি আসবে, যাবে; কিন্তু মেধা আর যোগ্যতার যে অপচয় হচ্ছে এই প্রতিহিংসার সংস্কৃতিতে, তার মাশুল কে দেবে? সম্ভবত সেই উলুখাগড়া নামের সাধারণ মানুষরাই, যাদের জীবনের দাম রাজাদের লড়াইয়ের চেয়ে অনেক কম।




মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.