| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
জীবনে তো আনন্দের মুহূর্ত কমবেশি আসেই: কেউ পরীক্ষায় পাশ করে মিষ্টি বিলায়, কারো ঘরে নতুন অতিথি আসে, আবার কেউ হয়তো জ্যাম পার হয়ে ঠিকঠাক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলেই আকাশের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানায়; কিন্তু এই সপ্তাহে বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের মধ্যে ভালোবাসার যে আচমকা ডিজিটাল সুনামি দেখলাম, তার সামনে এসব পার্থিব আনন্দ এক নিমেষে নস্যি হয়ে গেছে।
নেটিজেনদের ভার্চুয়াল কোলাকুলি আর কমেন্ট বক্সে ‘ব্রাদারহুড’ মার্কা পিৎজা-কাবাব বিনিময় দেখে আমার চোখ দিয়ে যে খুশির পানি চলে এসেছে; মনে হচ্ছিল আমি আর এই ধরাধামে নেই, সোজা কোনো স্বর্গীয় বাগানে প্রবেশ করেছি , যেখানে একাত্তরের মোটা মোটা ইতিহাসের বইগুলো লাইব্রেরির কোণে ধুলো খাচ্ছে খাক, বাজারের চাল-ডাল আর ডলারের দাম আকাশ ছোঁয়া হোক কুচ পরোয়া নেই, পেটে ভাত না থাকলেও ওদিকের কোনো এক ভাই কমেন্টে ‘শুকরিয়া’ লিখে আমাদের ‘ডিজিটাল উম্মাহর’ রিলেশনশিপ স্ট্যাটাসটা তো অন্তত জ্যান্ত রাখল, মনে এত মায়া মমতা থাকলে দুনিয়ার বাস্তব হিসাব-নিকাশ করে কী লাভ !
আর এই স্বর্গীয় মায়ার সবচেয়ে বড় স্মারকটা এলো সরাসরি শিয়ালকোট থেকে: পুরো এক হাজার পিস আস্ত ফুটবল ! গুনে দেখুন, একের পরে তিনটা শূন্য! অনেকে হয়তো পাকিস্তানের নিজস্ব অর্থনৈতিক টানাপোড়েন বা বেলুচিস্তানের দারিদ্রতার পরিসংখ্যান টেনে আনবেন; কিন্তু তারা আসল ঘটনা বোঝে না। আরে ভাই, পাকিস্তান যে প্রতি বছর নিয়ম করে আইএমএফের সদর দপ্তরে যায়, ওটা তো নিজেদের দরকারে না; ওয়াশিংটনের ওই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে থাকা আইএমএফের গরিব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিটা যেন টিকে থাকে, তাদের ফাইলগুলো যেন সচল থাকে, সেই পরোপকারী মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই তারা বছরের পর বছর এই ঋণের বোঝা মাথায় তুলে নিচ্ছে !
এমন নিঃস্বার্থ আর পরোপকারী পরাশক্তি নিজেদের সব বৈষয়িক চিন্তা ভুলে আমাদের পাড়ার মাঠ গরম করার জন্য ফিফা বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বলের কারিগরদের দিয়ে উপহার পাঠিয়েছে: এর চেয়ে বড় আন্তর্জাতিক ঘটনা আর কী হতে পারে? নিজেদের পকেটের হিসাব তো স্রেফ কাগজের টুকরা , আসল কথা হলো এই পরম ভ্রাতৃত্বের এক হাজার ফুটবলে লাথি মেরে আমরা যে এক লাফে বিশ্বমঞ্চের কত বড় উচ্চতায় পৌঁছে যাচ্ছি, সেই গূঢ় তত্ত্ব বোঝার মতো মগজ কজনারই বা আছে !
পাকিস্তান আর বাংলাদেশের এত কাছাকাছি আসার গল্পের শুরুটা হয়েছিল জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের মহিলা শাখার বাংলাদেশ সফর দিয়ে। অনেকেই পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে সে দেশের জামায়াতের আসন সংখ্যার খতিয়ান টেনে এনে মুখ বাঁকান; কিন্তু তারা বোঝেন না, আসল খাতা তো খোলা হয়েছে বাংলাদেশে । পাকিস্তান জামায়াতের মায়েরা যখন এ দেশে এসে নিজের চোখে দেখলেন; যে কাজটা তারা নিজেদের দেশের মাটিতে গত কয়েক দশকে মাথা কুটেও করে উঠতে পারেননি, অর্থাৎ ডাকসু, জাবি, রাবি কিংবা চবি-র মতো বড় বড় দুর্গ জয় করে একসময় দেশের পার্লামেন্টে প্রধান বিরোধী দল হওয়া এবং এক ধাক্কায় ৬৮টি আসন পকেটে পোরা-সেটা এই দেশের সন্তানেরা কত অনায়াসে করে দেখিয়েছে, তখন তাদের বুকটা গর্বে কতটা ফুলে উঠেছিল, তা আমি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছি।
সফরটা আসলে কোনো সাধারণ কূটনৈতিক চা-চক্র ছিল না; এটা ছিল মূলত একটা সফল ‘রেসিপি’ আদান-প্রদান কর্মসূচি;পাকিস্তানে যা রাঁধতে গিয়ে বারবার পাতিল পুড়ে গেছে, বাংলাদেশে কোন জাদুকরী মসলায় সেই বিরিয়ানি এত সুস্বাদুভাবে রান্না হলো, সেই গোপন রন্ধনপ্রণালী ডায়েরিতে নোট করে নিয়ে যাওয়াই ছিল এই মাতৃকুলের আসল লক্ষ্য। অবশ্য তাদেরও দোষ দিয়ে লাভ নেই, পাকিস্তানে আমাদের মতো কোনো "ইউনুস স্বাদ-এ ম্যাজিক ’ছিল না যে সব সমীকরণ বদলে দিতে পারে !
ছাব্বিশ সালের জুন মাসে আমাদের ছাত্রশিবিরের এক শীর্ষ নেতা পাকিস্তান সফরে গেলেন, তখন দুই দেশের হৃদয়ের টান যেন আর বাঁধ মানল না। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বড় বড় সভার কেন্দ্রীয় আসন; সবখানেই তাকে যেভাবে বরণ করা হলো, তাতে বোঝার বিন্দুমাত্র উপায় ছিল না যে তিনি অন্য একটা স্বাধীন দেশের স্রেফ একটা ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি। অবশ্য এই দৃশ্য দেখে আমার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি উঁকি দিয়েছিল: ভাবছিলাম, বড়ো দল গুলোর ছাত্র সংগঠনের কোনো নেতা যদি একইভাবে কলকাতায় যেতেন আর সেখানে কংগ্রেস বা তৃণমূলের কর্মীরা বিমানবন্দর থেকে তাকে নিয়ে মিছিল করত, তবে এতক্ষণে ফেসবুকের নিউজফিড ‘ভারতের দালাল’ আর ‘সার্বভৌমত্ব গেল গেল’ চিৎকারে নিশ্চিত কান ঝালাপালা হয়ে যেত !
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের একটা প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে গিয়েছেন । সেখানে স্পিকার বললেন দুই দেশের "shared parliamentary history" আছে। কথা কিন্তু মিথ্যা না, আমিও তার সাথে একমত। ১৯৭১ সালের আগের সেই গৌরবময় দিনগুলোয় আমরা তো একই ট্রেনের যাত্রী ছিলাম, কাজেই সেই ইতিহাস অবশ্যই ‘শেয়ার্ড’। দুষ্টু লোকেরা হয়তো খামখেয়ালি করে সেই ইতিহাসেরই একটা ছোটখাটো, নগণ্য অধ্যায়ের কথা তুলতে পারে। কিন্তু ভাইরে, খাঁটি বন্ধুত্বের প্রথম শর্তই হলো: অতীতের এসব খুচরো এবং অপ্রাসঙ্গিক ট্র্যাজেডি বেমালুম ভুলে যাওয়া।
পাকিস্তান আজ পর্যন্ত একটা আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ারও প্রয়োজন বোধ করেনি, তো কী হয়েছে? আমরা তো আর ছোটমনের মানুষ নই, আমরা তো অলরেডি তাদের সাথে ‘সিস্টার সিটি’ বানানোর উৎসব করছি ! হ্যাঁ, ঢাকা আর ইসলামাবাদ সিস্টার সিটি হবে। চুক্তির খসড়া তৈরি হয়ে গেছে। আমার মনে এত আনন্দ হচ্ছে যে বলার ভাষা নেই। দুই শহরের মাঝে দুই বোনের মতো সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠেবে । ঢাকায় যানজট আছে, ইসলামাবাদেও যানজট আছে। ঢাকায় বিদ্যুৎ সমস্যা আছে, ইসলামাবাদেও আছে। ঢাকায় অর্থনৈতিক সংকট আছে, পাকিস্তানে আরও বেশি আছে। এত মিল থাকলে সিস্টার সিটি না হয়ে উপায় আছে ?
আমাদের আমলারাও পাকিস্তানে ট্রেনিং নিচ্ছেন। পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে। পাকিস্তান যে সিভিল সার্ভিস দিয়ে দেশটাকে এত সফলভাবে চালিয়ে আসছে যে, ওয়াশিংটনের আইএমএফ কর্মকর্তাদের চাকরি বাঁচানোর জন্য তাদের বারবার সেখানে গিয়ে ‘উদ্ধারকর্তা’ হিসেবে দাঁড়াতে হয়; সেই অভাবনীয় প্রশাসনিক সাফল্যের সুতিকাগার থেকেই এখন আমাদের দেশের নীতি-নির্ধারকেরা দেশ চালানোর গূঢ় বিদ্যা রপ্ত করবেন। এর চেয়ে মোক্ষম বিনিয়োগ আর কী হতে পারে বলুন?
ভ্রাতৃত্বের এই মেলবন্ধনে আরো যুক্ত হয়েছে এক অনন্য উপহার: আমাদের পাঁচশত ছাত্র-ছাত্রী বিনামূল্যে পাকিস্তানে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পাবে । বলাই বাহুল্য, আমাদের দেশের সবচেয়ে ‘মেধাবী ও সুশৃঙ্খল’ ছাত্র সংগঠনের কর্মীরাই যে এই বৃত্তির সিংহভাগ পাবে তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেকে অবশ্য এখনই বুক চাপড়ে কান্নাকাটি শুরু করেছেন যে, এই শিক্ষার আড়ালে শেষমেশ কোন ধরনের ‘বিশেষ ট্রেনিং’ দেওয়া হবে; তাদের নাকি আবার ইতিহাস ঘেঁটে আফগানিস্তান কিংবা কাশ্মীরের পুরোনো সব সিলেবাসের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে !
আধুনিক বন্ধুত্বের যুগে ওসব পুরোনো প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের কথা ভেবে ভয় পাওয়াটা স্রেফ আমাদের মনের সংকীর্ণতা। আমাদের ছেলেরা যদি ওখানকার দুর্গম পাহাড়ি একাডেমিগুলো থেকে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি দেশপ্রেমের কিছু দীক্ষা নিয়ে ফেরে যা এক নিমেষে আমাদের পুরো সমাজটাকে ওলটপালট করে দিতে পারে, তবে সেটাকে শিক্ষার সবচেয়ে বাস্তবমুখী বিনিয়োগ ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায় ।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান দিল্লিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়ে ফিরে এলেন। এর পরপরই পাকিস্তান হাইকমিশনার ছুটে এলেন ফুটবল নিয়ে। কী চমৎকার timing। যেন পাকিস্তান সারাক্ষণ অপেক্ষায় থাকে কখন বাংলাদেশকে ভারত কষ্ট দিবে আর তারা সান্ত্বনা দিতে আসবে। এই বন্ধুত্বকে কী বলব ? অতুলনীয়।
NA Speaker Sardar Ayaz Sadiq Welcomes Bangladeshi Higher Education Delegation; Urges Enhanced Academic Cooperation and Parliamentary Ties- National Assembly of Pakistan
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে: পাকিস্তান হাইকমিশনার- যুগান্তর
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতিকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দিলো পাকিস্তান-সোনালি নিউজ
এবার ‘সিস্টার-সিটি’ হচ্ছে ঢাকা ও ইসলামাবাদ- দৈনিক ইনকিলাব ।
সরকারি স্কুলে বিতরণের জন্য মাউশিকে ১০০০ ফুটবল দিলো বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বল তৈরি করা পাকিস্তানের শিয়ালকোট-ডেলটা লেনস ।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ফুল ফ্রি স্কলারশিপ দিচ্ছে পাকিস্তান -একুশে টেলিভিশন ।
জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের নেত্রীর সাথে জামায়াতের মহিলা বিভাগের মতবিনিময়-নয়া দিগন্ত অনলাইন
পাকিস্তানে গেলেন জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি-টিডিসি রিপোর্ট
After diplomatic reset, Bangladesh shifts civil servant training from India to Pakistan-the Turkish Radio and Television Corporation (TRT),
©somewhere in net ltd.