| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
সালমান মুক্তাদীর বাংলাদেশের কনটেন্ট ক্রিয়েশন জগতের পথিকৃৎ। তার হাত ধরে এদেশে কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে কত তরুণ, তার কোনো হিসাব নেই। তার ভক্তের সংখ্যা অগণিত। তবে কাজের মাধ্যমে সে যতটা সুনাম কুড়িয়েছে, তার চেয়ে ঢের বেশি নাম কামিয়েছে ব্যক্তিগত জীবনের কালো অধ্যায়ের সুবাদে। সালমান মুক্তাদীর হলো বাংলার ক্যাসানোভা, যার গার্লফ্রেন্ডের সঠিক সংখ্যা কারো জানা নেই।
তার এই পথচলার শুরুটা হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন দেশ সবেমাত্র ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে হাঁটা শুরু করেছে। সে যত নাম, যশ ও প্রতিপত্তি অর্জন করেছে, তার সবকিছুই শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে। আওয়ামী লীগের কাছ থেকে সে ও তার সঙ্গীরা পেতেন রীতিমতো ভিআইপি মর্যাদা। যেকোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হোক কিংবা রাজনৈতিক প্রচারণার মঞ্চ, সব জায়গাতেই তাদের অবাধ যাতায়াত ছিল চোখে পড়ার মতো।
সে সময়কার সরকারপন্থী কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কাছে শেখ হাসিনা ছিলেন নারী জাগরণের অগ্রদূত। আওয়ামী লীগের যেকোনো মতবিনিময় সভায় তাদের সমাদর ছিল রাজকীয়। তারা সরাসরি আবদার করতো শেখ হাসিনার কাছে, খেতে চাই আপনার হাতের মোরগ পোলাও। রাষ্ট্রযন্ত্র এবং এই ইনফ্লুয়েন্সারদের সেই লাল নীল সুখের সংসার বেশ জমে উঠেছিল।
ক্ষমতার সঙ্গে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের এই সুসম্পর্কের একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল। তরুণ প্রজন্ম তাদের অন্ধের মতো অনুসরণ করতো। কেউ কনটেন্ট বানাত, কেউ দেখত, আবার কেউ বা দুটোই একসঙ্গে করত। এভাবেই তৈরি হচ্ছিল একটি বিশেষ প্রজন্ম, যার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি নিয়ে হয়তো অন্য কোনো দিন আলোচনা করা যাবে।
বাংলাদেশের মিলেনিয়াল ও জেনজি প্রজন্মকে বিপথগামী করার পেছনে যাদের প্রধান ভূমিকা রয়েছে, তাদের মধ্যে মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী ও সালমান মুক্তাদীর অন্যতম। মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী যেদিন অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিসভায় ডাক পেল, তাতে বিন্দুমাত্র অবাক হইনি। বরং এই চতুর সিলেকশনটি কার মাথা থেকে এসেছিল, তা ভেবেই কূল কিনারা পাচ্ছিলাম না। তবে সালমান মুক্তাদীর কেন হঠাৎ করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কোটা আন্দোলনে নেমে পড়েছিল, তার হিসাব শত চেষ্টা করেও মেলাতে পারিনি।
এ ক্ষেত্রে একটু পেছনের পাতা উল্টে দেখা দরকার। সালমান মুক্তাদীর কখনোই বিএনপি জামায়াত জোটের আন্দোলনকে সমর্থন করতো বলে মনে হয় না। সে রাজনৈতিক দর্শনের ধার ধারার মানুষ নয়। খালেদা জিয়াকে নিয়ে সে কখনো টু শব্দটিও করেনি। সালমান বা তার সমসাময়িক প্রজন্মের কাছে দল হিসাবে বিএনপি ছিল বরাবরই উপেক্ষিত। বিএনপি মানেই ছিল তাদের কাছে ঈদের পরের আন্দোলন সর্বস্ব একটি দল।
বিএনপির কোনো পোড় খাওয়া ইন্টেলেকচুয়াল উইং নেই। বাংলাদেশের কোনো প্রথিতযশা সংগীতশিল্পী বা তারকা কখনো দলীয়ভাবে বিএনপির পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেনি। আসিফ আকবর বা কনকচাঁপারা তরুণ প্রজন্মের মনে চিরস্থায়ী কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। সুতরাং আদর্শগত কারণে সালমানের এই আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার বিন্দুমাত্র যৌক্তিকতা ছিল না। আমরা হলাম সাধারণ পরিবারের সন্তান। আমাদের জীবনে একটিমাত্র চাকরিই কেবল পারে ভাগ্য পুরোপুরি বদলে দিতে। কিন্তু সালমান তো ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। আমাদের সমাজে টিকে থাকার সংগ্রাম সে কোনোদিন বুঝবেও না।
অবশ্য অন্যের ব্যক্তিগত সংকট নিজের না হলেও মানবতার খাতিরে তার পাশে দাঁড়ানো যায়। সেটাই তো একজন সচেতন নাগরিকের মৌলিক দায়িত্ব। হয়তো সালমান তার অনুসারীদের জন্যই রাজপথে নেমেছিল। ইনফ্লুয়েন্সারদের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ভয় থাকে ফলোয়ার হারানোর আতঙ্ক। তবে সালমান যতটুকু কামানোর দরকার, তা বহু আগেই কামিয়ে ফেলেছে। সেইদিক থেকে তার তো কোনো হারানোর ভয় থাকার কথা ছিল না। তাহলে কোন অদৃশ্য টানে সে জুলাই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল ?
রাজনীতির ঘূর্ণাবর্ত থেকে এবার একটু সালমানের ব্যক্তিগত জীবনে প্রবেশ করা যাক। সালমানের এই আকস্মিক আন্দোলনে নামার নেপথ্যে কি তার বৈবাহিক সূত্রে প্রাপ্ত পারিবারিক কোনো সমীকরণ কাজ করেছিল ? সে বিয়ে করেছে বয়সে সিনিয়র এবং দুই সন্তানের জননীকে। হয়তো পরিণত নারীর প্রতি তার গভীর মনস্তাত্ত্বিক আকর্ষণ ছিল। নিজেই কিছুদিন আগে এক পডকাস্টে অকপটে স্বীকার করেছে যে, জীবনসঙ্গী হিসেবে সে সবসময় মাদার ফিগারের কাউকে প্রত্যাশা করতো।
বিয়ের আগে যখন সে পাত্রী খুঁজছিল, বাতাসে গুঞ্জন উঠেছিল কোনো তরুণীই তাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি হচ্ছিল না। শেষমেশ নানা সমীকরণ মিলিয়ে সে একজন বয়সে বড়ো নারীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়। সিঙ্গেল মাদারকে বিয়ে করার এই সাহসী সিদ্ধান্তটি সামাজিকভাবে তার কিছুটা ইমেজ উদ্ধার করেছিল । নিন্দুকেরা ধারণা করেছিল, সালমান নিজের নষ্ট হওয়া ভাবমূর্তি ফিরে পেতেই এই পথ বেছে নিয়েছিল। কিন্তু সালমান যে পর্দার আড়ালে তার চেয়েও বেশি ধুরন্ধর, তা কে জানত!
সালমানের শ্বশুরবাড়ির পারিবারিক ইতিহাস রহস্যময় ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। তার শ্বশুর নুরুল ইসলাম ঢাকার একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী; সে মূলত বার ও মদের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক সে। সালমানের স্ত্রীরা দুই বোন। সুতরাং সবকিছু হিসাব নিকাশ করেই সালমান এই সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। আর এখানেই সবচেয়ে রোমহর্ষক ও শিহরণ জাগানো তথ্যটির মুখোমুখি হতে হয়।
সালমানের স্ত্রীর মামার নাম সুইডেন আসলাম। নামটি উচ্চারণ করলেই মেরুদণ্ডে একপ্রস্থ শীতল স্রোত বয়ে যায়। কারো কারো মনে পড়ে যেতে পারে অতীতের সেই ভয়াল দিনগুলোর কথা, যখন খবরের কাগজের পাতায় পাতায় আসত দেশের শীর্ষ অপরাধীদের ত্রাসের রাজত্বের নানা চাঞ্চল্যকর বিবরণ। সুইডেন আসলাম হলো বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী ও পেশাদার খুনী। রাজধানীর ফার্মগেট এলাকা পুরোপুরি তার ইশারায় চলত। আজ থেকে প্রায় সাতাশ বছর আগে শেখ হাসিনার শাসন আমলেই তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করেছিল। আমি পুরাতন খবরের কাগজ থেকে সুইডেন আসলামের ব্যাপারে জেনেছিলাম।
সেই ভয়ংকর মানুষটি গত ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে গেছে। এখন সময়ের হিসাবগুলো একটু মেলাতে হবে। সালমান বিয়ে করেছিল ২০২৩ সালের ৩০শে মে। আর তার ঠিক পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে কোটা আন্দোলন। সালমানের স্ত্রীর সাথে তার নানীর পরিবারের যোগাযোগ ছিল না, তা কি কখনো বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে ? জুলাই আন্দোলনে সালমানের সরব উপস্থিতি এবং সুইডেন আসলামের কারাগার থেকে জামিনে মুক্তিলাভ-ঘটনা দুটি কি নিছকই কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো অদৃশ্য সমঝোতা?
এমন কোনো প্রত্যক্ষ বা অকাট্য প্রমাণ আমার হাতের মুঠোয় নেই, যা দিয়ে জোর গলায় বলতে পারব যে সালমান এই সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেয়েছিল। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, এই সংশয় কেন মানুষের মনে জাগবে না? সুইডেন আসলাম এখন আইনগতভাবে সালমানের মামাশ্বশুর। সম্প্রতি যখন সন্ত্রাসীরা তার ইসিবি স্টুডিওতে ভাঙচুর চালায়, তখন হামলাকারীরা সুইডেন আসলামের নাম শোনার পরেই আরও বেশি হিংস্র ও আগ্রাসী হয়ে উঠেছিল। এই বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করে দেখা দরকার।
জুলাই মাসে সালমান রাজধানীর অভিজাত এলাকার কিছু তরুণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে শোডাউন করেছিল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সালমান মুক্তাদীর সেই আন্দোলনে না নামলেও কোটা আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি একচুলও এদিক থেকে ওদিক হতো না। অথচ এর আড়ালে অলৌকিকভাবে মুক্তি পেয়ে গেল এক দুর্ধর্ষ পেশাদার খুনি। শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে গ্রেপ্তারের পর বিএনপির পুরো দ্বিতীয় টার্মেও যার ভাগ্যের একচুলও পরিবর্তন হয়নি, সেই সুইডেন আসলাম জুলাই পটপরিবর্তনের পর দিব্যি জামিনে বেরিয়ে এল!
কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসাবে সালমানের নৈতিকতার মানদণ্ড তলানিতে ঠেকলেও তার সামাজিক প্রভাবে এখনো ভাটা পড়েনি। অতীতে সে যেমন পুরো একটি প্রজন্মের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক চরিত্র ধ্বংস করে দিয়েছিল, বর্তমান সময়ে এসে রীতিমতো দুর্ধর্ষ কিলার ও গ্যাংস্টারদের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তাদের সমাজের চোখে মর্যাদাবান করে তুলছে। দেশের অনুসন্ধিৎসু সাংবাদিকদের এখনই সময় গভীরভাবে তালাশ করা-সালমানের জুলাই আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার প্রকৃত অভিসন্ধি কী ছিল। সুইডেন আসলামের আকস্মিক মুক্তির সঙ্গে তার কোনো যোগসাজশ আছে কি না। এমন সুবর্ণ সুযোগ কারো হাতছাড়া করা উচিত হবে না ।
ফটোকার্ড ক্রেডিট: ট্রেন্ডলাইন
©somewhere in net ltd.