| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
বাংলাদেশে যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখতে ভালোবাসেন, তারা সাধারণত খুব নিরীহ বিষয় পছন্দ করেন। এর একটা কারণও আছে। বেশিরভাগ মানুষই অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক এড়িয়ে চলতে চান। এমন কোনো বিষয় নিয়ে লেখা ভালো, যেটা নিয়ে দু’জন পরিচিতের সঙ্গে একটু হালকা তর্ক করা যাবে, কমেন্ট বাক্সে কিছু মজার রিয়েকশন পাওয়া যাবে, অথচ নিজের বাস্তব জীবনে যার জন্য কোনো বড় ঝামেলা পোহাতে হবে না।
তাই আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় মাঝে মাঝে এমন সব ঘটনা ‘জাতীয় ইস্যু’ হয়ে যায়, দেখে মনে হয় দেশবাসী বুঝি এতদিন ঠিক এই সমস্যাটিরই অপেক্ষায় ছিল। একটি ছোট ঘটনা ঘটল। তারপর লেখা হলো। পাল্টা লেখা হলো। ভিডিও হলো। লাইভ হলো। প্রতিবাদ হলো। আবার সেই প্রতিবাদ নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হলো। শেষ পর্যন্ত ঘটনাটি যতটা না বড় ছিল, তাকে নিয়ে লেখালেখি আর হইচই তার চেয়ে শতগুণ বড় হয়ে গেল।
এই মুহূর্তে এর দুটি চমৎকার উদাহরণ হলো ‘হাফপ্যান্ট বিতর্ক’ এবং ‘তিন অবিবাহিত মেয়ের নেপাল ভ্রমণ বিতর্ক’। একজন ক্রীড়াবিদ হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে উঠতে গিয়ে বাধা পেলেন। ব্যস! শুরু হয়ে গেল তুমুল প্রতিবাদ, লেখালেখি আর চুলচেরা বিশ্লেষণ। এরপর শত শত মানুষ হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে উঠে প্রতিবাদ করলেন। ছবিও উঠল। ভিডিও হলো। একপর্যায়ে মনে হলো, বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বুঝি ওই হাফপ্যান্টের দৈর্ঘ্যের ওপরই নির্ভর করছে।
অথচ ঘটনাটি পরের দিনই মোটামুটি শেষ। মেট্রোরেল চলছে। মানুষ দিব্যি অফিসে যাচ্ছে। কেউ হাফপ্যান্ট পরে উঠছে, কেউ ফুলপ্যান্ট পরে উঠছে। জীবন যথারীতি নিজের গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আরেকটি ঘটনা হলো তিনজন অবিবাহিত মেয়ের একসঙ্গে নেপাল ভ্রমণ করতে গিয়ে ইমিগ্রেশনে বাধা পাওয়ার ঘটনা। বিষয়টি এখন আদালতে বিচারাধীন, তাই এ নিয়ে বাড়তি কিছু বলা ঠিক হবে না।
কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার উন্মাদনা দেখলে মনে হয়, তিনজন মেয়ে নেপাল যেতে পারল কি না, তার ওপরই যেন বাংলাদেশের নারী স্বাধীনতা, পর্যটননীতি, ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা এবং পুরো সভ্যতার ভবিষ্যৎ আটকে আছে! এসব বিষয় নিয়ে লেখা যাবে না, তা নয়। অবশ্যই লেখা যাবে। কেউ প্রতিবাদ করবেন, কেউ মজা করবেন, কেউ বা সিরিয়াস বিশ্লেষণ করবেন। সমস্যা লেখায় নয়। সমস্যা হলো, আমরা একটা ছোট ঘটনা নিয়ে লিখতে লিখতে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাই যে মূল সংকটগুলো সেই লেখার পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে দম বন্ধ হয়ে মারা যায়।
বাংলাদেশে প্রতিদিন কত যে ঘটনা ঘটে, তার কোনো হিসাব নেই। কত মানুষ বাজারে গিয়ে জিনিসপত্রের হিসাব মেলাতে না পেরে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন, কত ছোট ব্যবসায়ী খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন, কত পরিবার রান্নার গ্যাস কিনতে গিয়ে অন্য খাতের খরচ ছাঁটাই করছেন, আর কত মানুষ মাসের মাঝামাঝি এসেই বুঝতে পারছেন না পুরো মাসের বেতনটা আসলে কোথায় উবে গেল!
এসব নিয়ে অবশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় এত জোরালো লেখালেখি হয় না। দেখলে মনে হয়, আমাদের দেশে বুঝি আর কোনো বড় সমস্যা নেই। দেশবাসীর একমাত্র সমস্যা হলো, হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে ওঠা যাচ্ছে না এবং তিন তরুণী নেপাল যেতে পারছেন না। এই দুটি সমস্যার সমাধান হয়ে গেলেই বাকি বাংলাদেশ মোটামুটি ঠিকঠাক আছে!
অথচ এই মুহূর্তে অন্তত তিনটি বিষয় নিয়ে দেশে প্রধান আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। সরকার ১২.৫ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১,৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষকে বাধ্য হয়ে ২,০০০ টাকা বা তারও বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। কোথাও কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগে তদন্তের নির্দেশ পর্যন্ত দিতে হয়েছে। রান্নার গ্যাসের দাম যদি সরকারি দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা করে বেড়ে যায়, সেটি কি হাফপ্যান্টের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ?
এলপিজি কোনো বিলাসী পণ্য নয়। এটা দিয়ে মানুষ রান্না করে খায়। এর দাম বাড়লে সরাসরি পরিবারের মাসিক বাজেট ছোট হয়ে আসে। আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট থাকতে পারে, আমদানি খরচ বাড়তে পারে। এগুলো বাস্তবতা। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের সংকটের কথা বলেই কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
Deep Sea LPG terminal নিয়ে কথা হওয়া দরকার ছিল। আমদানি ও সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো নিয়ে পলিসি মেকারদের মাথা ঘামানোর কথা ছিল। ভবিষ্যতে চাহিদা বাড়লে কীভাবে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা যাবে, সেটি নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা ব্যস্ত রইলাম কনটেন্ট বানিয়ে লাইক কুড়াতে।
সয়াবিন তেলের বাজারে বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র আধিপত্য ও কারসাজির ইতিহাস নতুন নয়। সেপ্টেম্বরের শুরুতে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরকারি সর্বোচ্চ খুচরা দাম বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা থেকে ২০৪ টাকা লিটার করা হলেও, বাজারের বাস্তব চিত্র ছিল অস্বস্তিকর। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ঢাকার অনেক বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গিয়েছিল। কিছু দোকানে ১ লিটারের বোতলই পাওয়া যাচ্ছিল না, আবার ৫ লিটারের বোতল প্রায় ১,০২০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছিল।
একদিকে দাম বৃদ্ধি, অন্যদিকে সরবরাহের সংকট। এই দ্বিমুখী চাপ সামলাতে গিয়ে সাধারণ ক্রেতার নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে দাম বাড়ানোর দাবি করছে, সরকার যাচাই বাছাইয়ের কথা বলছে। কিন্তু তেলের লিটার যখন ২১৭ টাকা ছুঁইছুঁই করবে, তখন সাধারণ পরিবারের রান্নার হাঁড়ি কীভাবে চড়বে, সেই হিসাব করার ফুরসত কি আমাদের আছে?
পোলাও বা সুগন্ধি চাল এখন আর শুধু উৎসবের অনুষঙ্গ নয়। অনলাইন ফুড ব্যবসা, হোম ডেলিভারি এবং ঘরে বসে খাবার বিক্রির কারণে এটি হাজার হাজার মানুষের ব্যবসার কাঁচামাল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে আজ হাজার হাজার নারী ঘরে বসে ফেসবুক পেজ খুলে বিরিয়ানি, পোলাও বা লাঞ্চবক্স বিক্রি করে নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন। তাদের কোনো বড় শোরুম নেই, বড় মূলধন নেই, ব্যাংক ঋণ নেই। আছে শুধু একটা রান্নাঘর আর একটা ফেসবুক পেজ।
বর্তমান বাজারে ভালো মানের পোলাও চালের কেজি ২৫০ টাকা বা তারও বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে সাধারণ ক্রেতার পাশাপাশি বিপাকে পড়েছেন ছোট উদ্যোক্তারাও। এখন তাদের এলপিজির দাম বাড়তি দিতে হচ্ছে, তেলের চড়া দাম দিতে হচ্ছে, পোলাও চাল ও অন্যান্য উপাদানের বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে। রান্নার প্রতিটি উপকরণের দাম একটু একটু করে বাড়তে বাড়তে শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যবসাটাই ব্যয়বহুল হয়ে যাচ্ছে।
ক্রেতা যখন দাম কমাতে বলেন, তখন তারা বিপাকে পড়েন। আবার দাম বাড়ালে ক্রেতা মুখ ফিরিয়ে নেন। এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যখন বাজারের বাড়তি খরচের চাপে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন, তখন অর্থনীতিতে একটি নীরব ধাক্কা লাগে। একজনের রান্নাঘর বন্ধ হয়, একজনের আয় বন্ধ হয়, একজনের হয়তো আরও দুজনকে কাজ দেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়। কিন্তু এ নিয়ে আমাদের কোনো হেলদোল নেই।
সরকার এখনো নতুন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু জনগণ তো শুধু নতুন মুখ দেখার জন্য সরকার বদলায় না। মানুষ নিজের জীবনে শান্তি ও স্বস্তি দেখতে চায়। বাজারে, চাকরির বাজারে, ব্যবসার পরিসরে এবং সবচেয়ে বেশি নিজের পকেটের স্থিতিশীলতায়।
অথচ সরকারের ওপর জনগণের সঠিক ও কার্যকর চাপ তৈরি হয় না। কারণ, আমরা ভুল জায়গায় শক্তি ক্ষয় করছি। একজন গৃহিণী যদি প্রতিদিন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন, “আজ আবারও এলপিজি কিনতে অতিরিক্ত ৪০০ টাকা বেশি লেগেছে”, সেটি একটা ডেটা। একজন ছোট উদ্যোক্তা যদি লেখেন, “কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় আজ আমার রান্নাঘরের চুলা বন্ধ রাখতে হলো”, সেটি বাজারের নিখাদ সত্য
কিন্তু আমরা এসব লিখি না। আমরা লিপ্ত থাকি চটকদার বিতর্কে। আমরা বাহাস করি কার প্যান্টের দৈর্ঘ্য কতটুকু হওয়া উচিত আর কার বিদেশযাত্রার ছাড়পত্র মিলল তা নিয়ে। ফলে যে সমস্যাগুলো প্রতিদিন মানুষের সংসারে ঢুকছে, সেগুলো নিয়ে সামাজিক চাপ তৈরি হওয়ার সুযোগও কমে যাচ্ছে।
জনগণ যতদিন গ্যাস, তেল আর চালের বাড়তি দামের চেয়ে অন্যের হাফপ্যান্টের মাপ নিয়ে বেশি উত্তেজিত থাকবে, ততদিন বাজারের শক্তিশালী খেলোয়াড়দের খুব বেশি দুশ্চিন্তা করার কারণ থাকবে না। কারণ বাজারের দাম কমানোর জন্য শুধু একজন ক্রেতার ক্ষোভ যথেষ্ট নয়। দরকার সেই ক্ষোভের দৃশ্যমানতা, ধারাবাহিকতা এবং জনপরিসরে আলোচনা।
হাফপ্যান্টের বিতর্ক একদিন শেষ হয়ে যাবে। নেপাল ভ্রমণের বিতর্কও একদিন শেষ হবে। কিন্তু এলপিজি, সয়াবিন তেল আর চালের বাড়তি দাম পরদিন সকালে আবার বাজারে হাজির হবে। বাস্তব জীবন ফেসবুকের ট্রেন্ডিং টপিকে থাকে না। বাস্তব জীবন থাকে বাজারের ব্যাগে, রান্নাঘরে আর মাসের শেষ সপ্তাহের হিসাবের খাতায়।
©somewhere in net ltd.