| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
ভয়ের কিছু নেই। এখনো পরিস্থিতি খারাপ হয়নি । তবে সাধু সাবধান। স্লোগান দেওয়া শুরু হলে সবকিছু ভেঙে পড়তে খুব বেশি সময় লাগবে না।সরকার এখন ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন বড় শহর থেকে হকার ও অটোরিকশা উচ্ছেদে নেমেছে। এই উদ্যোগের পক্ষে বিশাল একটি শ্রেণির মানুষ আছে। বিপরীত পাশের লোকসংখ্যাও কিন্তু কম নয়। দুই পক্ষের যুক্তিই যথেষ্ট শক্ত। তাই সরকারকে এখানে শুধু রাস্তা বা ফুটপাতের হিসাব করলে চলবে না। পুরো অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার হিসাব করতে হবে।
চীনের দুঃখ হোয়াংহো নদী আর ঢাকার দুঃখ হকার ও অটোরিকশা, এমনটা অনেকেই মনে করেন। হকারদের কারণে ফুটপাত দিয়ে হাঁটার জায়গা কমে গেছে। অল্প জায়গার মধ্যে মানুষকে গাদাগাদি করে চলতে হয়। নারীদের জন্য বিষয়টি আরও বিব্রতকর। তার সঙ্গে আছে পকেটমারের ভয়। অনেক জায়গায় আবার হকাররা রাস্তার একাংশ দখল করে দোকান বসান। ফলে রাস্তার জায়গা কমে গিয়ে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। এসব কারণে গাড়ি ব্যবহারকারী অপেক্ষাকৃত সচ্ছল ও শিক্ষিত শ্রেণির একটি অংশ হকারদের ওপর যথেষ্ট ক্ষুব্ধ। এবার বিপরীত দিকটাও দেখা যাক।
ফুটপাতে হকার বসেন বলেই নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ তুলনামূলক কম দামে অনেক কিছু কিনতে পারেন। অনেক শিক্ষার্থী রাস্তার পাশের ফুডকার্টে রেস্টুরেন্টের তুলনায় কম দামে খাবার খায়। ফুটপাতের টং দোকান সাধারণ মানুষের ছোট ক্ষুধা মেটায়। হাজার হাজার মানুষ রাস্তার পাশে ছোট দোকান দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। হকার তাই শুধু ফুটপাত দখলকারী মানুষ নন, আমাদের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খারাপ লাগলেও আমরা এতদিন তাদের সহ্য করেছি, কারণ অর্থনীতিরও কিছু বাস্তবতা আছে।
তবে সরকার কেন এখন এত কঠোর হচ্ছে, তার পেছনে নানা গল্পও শোনা যাচ্ছে। কেউ বলছেন নতুন সেটআপ ও জায়গা ভাড়ার ব্যবসা তৈরি করার চেষ্টা চলছে। কেউ আবার বলছেন, পলাতক ফ্যাসিস্টরা হকার সেজে ক্ষতি করতে চাইছে, তাই সরকার এমন কঠোর অবস্থানে গেছে। আসল ঘটনা যাই হোক, সরকারপন্থী বা সরকারবিরোধী যে পক্ষের কথাই সত্য হোক না কেন, হকার উচ্ছেদের আগে দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাটা মাথায় রাখা জরুরি।
সরকার চাইলে একটি শক্ত যুক্তি দিতে পারে। ফুটপাতের অবৈধ দোকান উচ্ছেদ হলে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমবে, বৈধ গ্রাহকদের সেবা বাড়ানো যাবে এবং সেই বিদ্যুৎ আরও উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। যুক্তি হিসেবে এটি যথেষ্ট শক্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমান পরিস্থিতি কি সেই যুক্তি বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত?
দেশে চাল, লবণ, সয়াবিন তেল, পোলাওয়ের চাল, সিলিন্ডার গ্যাস সহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। অর্থনীতি এখনো মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল প্রবৃদ্ধির চাপ থেকে বের হতে পারেনি। অনেক মানুষ গার্মেন্টস বা অন্য কোনো কাজ হারিয়ে ছোট ব্যবসায় ঢুকেছেন। বহু তরুণ ফুডকার্ট বা ছোটখাটো ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে হকার উচ্ছেদ করলে লাভটা কোথায়?
বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সরকার এখন পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক অনানুষ্ঠানিক কর্মজীবী মানুষকে উচ্ছেদ করে তাদের জায়গায় পর্যাপ্ত আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি। বর্তমান সরকারই প্রথম সেই কাজটি পারবে, এমনটা ধরে নেওয়ার কারণও নেই। মানুষ নিজের মতো করে চাঁদা দিয়ে, সামান্য জায়গা নিয়ে, নিজের মতো করে খাচ্ছে। ফুটপাত দখল করা আদর্শ কোনো ব্যবস্থা নয়, কিন্তু এটি একই সঙ্গে একটি বাজারের চাহিদারও প্রতিফলন। রাষ্ট্র যখন পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও সস্তা পণ্য সরবরাহ করতে পারে না, তখন মানুষ নিজের মতো করে সেই জায়গা পূরণ করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হকার উচ্ছেদের ভিডিও দিয়ে আপনি হয়তো প্রচুর প্রশংসা পাবেন। রাস্তা পরিষ্কার, ফুটপাত পরিষ্কার, ঢাকা সুন্দর, এসব দেখে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত খুশি হবে। কিন্তু আপনি যাদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, এই কার্ড, সেই কার্ড চালু করছেন, তাদের একটি বড় অংশ যদি সেই ফুটপাতের অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে তারা কিন্তু এত সহজে খুশি হবে না। এখানেই বিপদ। আজকের অসন্তোষ কালকে অন্য কোনো স্লোগান রূপ নিতে পারে। স্লোগান একবার শুরু হলে সেটি কোথায় গিয়ে থামবে, তা প্রশাসন ঠিক করে দিতে পারে না। তাই সময় থাকতে সতর্ক হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
দ্বিতীয় সমস্যা অটোরিকশা। দেশে এখন ঠিক কত অটোরিকশা চলছে, সম্ভবত কেউ জানে না। আগের অনেক অনানুষ্ঠানিক পেশা ছেড়ে মানুষ এখন অটোরিকশা চালানোর দিকে ঝুঁকছে। গার্মেন্টস কর্মী অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কৃষক শহরে এসে অটোরিকশা চালাচ্ছেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী অটোরিকশা চালাচ্ছেন। বাসচালকও অটোরিকশা চালাচ্ছে। মনে প্রশ্ন আসে , সবাই এই পেশায় ঢুকছে কেন ? কারণ অটোরিকশা চালানো এখন অনেক পেশার তুলনায় বেশি লাভজনক।
অটোরিকশার কারণে দুর্ঘটনা বেড়েছে, যানজট বেড়েছে, শহরের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়েছে, এসব সত্য। কিন্তু এর আরেকটি সত্য হলো, অটোরিকশা সাধারণ মানুষের হাতে একটি সস্তা পরিবহনের বিকল্পও দিয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে ধানমন্ডি ঝিগাতলা যাওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল। সিএনজি চালক ৫০০ টাকা চাইলেন। পরে অটোরিকশায় ২০০ টাকা দিয়ে সন্ধ্যার সময় আরামেই চলে গেলাম। অটোরিকশা আসার পর সিএনজি চালকদের পুরোনো সিন্ডিকেটও অনেকটা ভেঙেছে।
শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, মালামাল পরিবহনেও এখন অটোরিকশার ওপর বহু মানুষ নির্ভরশীল। ভাড়াও অনেক ক্ষেত্রে প্যাডেলচালিত রিকশার তুলনায় কম। এখন যদি সারা বাংলাদেশ থেকে অটোরিকশা তুলে দেওয়া হয়, তাহলে কী হবে? প্যাডেলচালিত রিকশার ভাড়া বাড়বে। সিএনজির ভাড়া বাড়বে। বাসের ওপর চাপ বাড়বে। এবং শেষ পর্যন্ত বাড়তি খরচটা দেবে সাধারণ মানুষই।
২০২৩ সালে ঢাকায় অটোরিকশা বন্ধের ঘোষণা নিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সেখানেও আমরা দেখেছি, বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া একটি পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ করে দিলে সিএনজি ও রিকশার ভাড়া বেড়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। পরিবহনের সংকট তৈরি হলে বিভিন্ন পরিবহন শ্রেণি নিজেদের মতো করে একটি কৃত্রিম সিন্ডিকেট তৈরি করে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অটোরিকশার সঙ্গে তাই শুধু একটি যানবাহনের সম্পর্ক নেই। লাখ লাখ মানুষের আয়, যাতায়াত এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মন চাইলেই তাই অটোরিকশা বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়।
আগে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। ধীরে ধীরে ঢাকার ওপর চাপ কমাতে হবে। একসময় বলা হতো মেট্রোরেল হলে ঢাকার পরিবহন সংকট কমবে। এখন দেখা যাচ্ছে, মেট্রোরেল এসেছে, কিন্তু অটোরিকশার সংখ্যা এমনভাবে বেড়েছে যে মানুষ আবার অন্য ধরনের পরিবহন সংকটে পড়েছে । অটোরিকশা চালাচ্ছে কারা, আগে তারা কী কাজ করত, কেন তারা আগের পেশা ছেড়ে এই পেশায় এল, তাদের আয় কত, পরিবারের ওপর কতজন নির্ভরশীল, এসব নিয়ে বড় কোনো জরিপ ছাড়া অটোরিকশা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।
কারণ কোনো একটি পেশার মানুষ হঠাৎ করে অটোরিকশায় চলে যায় না। এর পেছনে নিশ্চয়ই অর্থনীতির কোনো গল্প আছে। আর সেই গল্পটা বোঝার চেষ্টাই যদি না করা হয়, তাহলে সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে? দেশের সাধারণ মানুষের সমস্যা এখন চরমে পৌছে গেছে। বাজারে গেলে আগুন দাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরে তুলনামূলক কম দামের জিনিস খুঁজতে হয়। সিলিন্ডার কিনতে গেলে রান্নার জন্য গ্যাসের দাম শুনেই অনেকের অক্কা পাওয়ার জোগাড়।
বিশ্ববাজারে এলপিজির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেনের দাম বেড়েছে। তাই এলপিজির দাম বাড়ানোর চাপ আছে, সেটা বোঝা যায়। কিন্তু সরকার কি এমন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না, যাতে সাধারণ মানুষ অন্তত বুঝতে পারে সরকার কিছু করার চেষ্টা করছে? পুরো এলপিজি খাত যখন বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তখন সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে, সেটিও প্রশ্ন। শুধু দাম ঘোষণা করে দিলেই বাজারে সেই দাম কার্যকর হয় না। সমাধান খুঁজতে হলে এখানেই সরকারকে সৃজনশীল হতে হবে।
ধরা যাক, ফ্যামিলি কার্ডের পেছনে ১৪ হাজার কোটি টাকা খরচ না করে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য বোতলজাত এলপিজিতে কোটা ভিত্তিক ভর্তুকি দেওয়া হলো। ভারতে এ ধরনের ব্যবস্থার উদাহরণ আছে। এতে ভর্তুকি সরাসরি সেই পণ্যটির ওপর দেওয়া সম্ভব, যার দাম সরাসরি মানুষের রান্নাঘরে আঘাত করছে। সরকারের কাছে এমন আরও অনেক সহজ সমাধান থাকতে পারে।
সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় সহজ সমাধান বাদ দিয়ে বড় প্রকল্পের দিকে ছুটে যাই। কিন্তু যে সুবিধা দেশের অধিকাংশ মানুষ পায় না, সেটিকে দিন শেষে জনগণের সুবিধা বলা কঠিন। বর্তমান সময়ে সরকারের সবচেয়ে বড় কাজ হওয়া উচিত মানুষের জীবনকে একটু সহজ করা। ফুটপাত পরিষ্কার করা দরকার, কিন্তু ফুটপাত পরিষ্কার করার পর সেখানে যারা বসত তাদের জীবনও পরিষ্কারভাবে দেখতে হবে।
অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করা দরকার, কিন্তু যারা অটোরিকশা চালায় তাদের বিকল্প আয়ও তৈরি করতে হবে। উচ্ছেদ সবচেয়ে সহজ কাজ। কর্মসংস্থান তৈরি করা কঠিন। রাষ্ট্র যদি কঠিন কাজটি না করে সহজ কাজটি করতে থাকে, তাহলে একসময় ফুটপাত পরিষ্কার থাকবে, রাস্তা পরিষ্কার থাকবে,একই সাথে প্রান্তিক মানুষের মনের ভেতর ক্ষোভের আগুন তৈরি হবে যা নিয়ন্ত্রণ করা কারো পক্ষে সম্ভব হবে না ।
ফটোকার্ড : ঢাকা পোস্ট
©somewhere in net ltd.