| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরে গেলেই দেশ অশান্ত হয়ে ওঠে । সালাহউদ্দিন আহমেদের মতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে কেন? প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে থাকলেই কিছু নেতাকর্মী যেন নিজেদের দেশের মালিক ভাবা শুরু করেন । নাকি প্রশাসন এমনিতেই দুর্বল, শুধু প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সেই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ? একের পর এক ঘটনা দেখে এসব প্রশ্ন মাথায় আসা স্বাভাবিক।
গত জুনে তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীন সফরে গিয়েছিলেন। সেই সফরের প্রথম দিন, ২১ জুন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রাণহানি ও সংঘর্ষের খবর আসে। গাইবান্ধায় ছাত্রশিবির নেতা সাইফুল্লাহ সংঘর্ষে নিহত হন। রাজশাহীতে ফয়সাল বাধন নামে এক ব্যক্তি গুলিতে নিহত হওয়ার খবর আসে। যশোরে বিএনপি কর্মী আতিকুর রহমানের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ফরিদপুরে ছাত্রলীগ কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এতগুলো ঘটনা একই সময়ে ঘটেছে বলে বিষয়টি চোখে পড়ার মতো ।
সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। একই সফরের সময় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা হয়। প্রথমে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওর ঘটনাটিই ধরা যাক। ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার ইসিবি চত্বর এলাকায় নিউ গিনি প্রপার্টিজের প্রকল্পে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়। সেই হামলায় সালমানের ব্রাউনফিশ স্টুডিওও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলাকারীদের একটি বড় দল সেখানে ঢুকে স্থাপনা ভাঙচুর করে এবং জিনিসপত্র লুট করে। গুলিবর্ষণের অভিযোগও সামনে আসে। সালমান নিজেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অথচ তারেক রহমান তখন যুক্তরাষ্ট্রে। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী বিদেশে থাকা অবস্থাতেই এমন ঘটনা ঘটেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ পরে জানান, প্রাথমিক তদন্তে প্রায় ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এক পক্ষের লোকজন রাতে জমি দখলের চেষ্টা করতে গিয়ে বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করে। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করে। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না। জমি নিয়ে বিরোধ থাকলেই কি দুইশ বা তারও বেশি লোক নিয়ে একটি প্রকল্পে হামলা চালানো যায়?
জমি দখলের চেষ্টা, ভাঙচুর, লুটপাট ও গুলিবর্ষণের অভিযোগ ওঠার পরও যদি এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তাহলে সাধারণ মানুষ নিজের সম্পত্তির নিরাপত্তা পাবে কোথায়? আর যাঁরা এসব করতে লোক জড়ো করতে পারেন, তাঁদের পেছনে কতটা প্রভাব কাজ করে, সেটাও তদন্তে বের করা দরকার।
এর ঠিক কাছাকাছি সময়ে মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যে হামলা হয়, সেটি আরও ভয়ংকর। ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে দুই শতাধিক লোক সেখানে হামলা চালায় বলে সংবাদমাধ্যমে খবর আসে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মালামাল লুট করা হয়, স্থাপনা ভাঙতে ভারী যন্ত্রপাতিও ব্যবহার করা হয়। এটি কোনো ব্যক্তির বাসার সামনে কয়েকজনের ঝগড়া ছিল না। এত লোক জড়ো করা, ভারী যন্ত্রপাতি আনা, স্থাপনা ভাঙা এবং মালামাল সরিয়ে নেওয়ার মতো কাজ করতে সময় লাগে। তাহলে প্রশাসন কী করছিল?
ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই জানান, সংশ্লিষ্ট থানার ওসির দায়িত্বে অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং তাঁকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। পরে প্রথম আলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার সঙ্গে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন স্থানীয় নেতা ও কর্মীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হামলার নির্দেশদাতাদের পরিচয় সম্পর্কে পুলিশ তথ্য পেয়েছে, কিন্তু তাঁদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। হামলার পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করার তথ্য পুলিশের কাছে থাকার পরও তাঁদের আইনের আওতায় আনতে এত দেরি কেন?
এখানেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বের প্রশ্ন আসে। সালাহউদ্দিন আহমেদ তো এমন কোনো মন্ত্রী নন, যাঁর হাতে ক্ষমতা নেই বা যিনি প্রশাসন সম্পর্কে কিছু জানেন না। তিনি জানেন, পুলিশ কীভাবে কাজ করে, থানার দায়িত্ব কী, অপরাধের তদন্ত কীভাবে এগোয় এবং প্রশাসনিক অবহেলার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তাহলে এত ক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে এমন ঘটনা ঘটছে কেন? শুধু একজন ওসিকে প্রত্যাহার করলেই কি দায়িত্ব শেষ? হামলার নির্দেশদাতা যদি অধরা থাকেন, তাহলে কয়েকজন মাঠপর্যায়ের লোককে গ্রেপ্তার করে কী লাভ? যারা লোক জড়ো করে, পরিকল্পনা করে এবং প্রভাব খাটিয়ে কাজ করায়, তারা যদি নিরাপদে থাকে, তাহলে অপরাধের মূল জায়গায় আঘাত করা হলো কোথায়?
এবার প্রশ্নটা আরও সরাসরি করা যাক। পুলিশ কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে ? নাকি পুলিশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সামনে দায়িত্ব পালনের সাহস হারিয়ে ফেলছে? দুটো বিষয় এক নয়। পুলিশ যদি সত্যিই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে সেটা সরকারের জন্য ভয়াবহ ব্যর্থতা। আর পুলিশ যদি জানে কারা প্রভাবশালী, কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে রাজনৈতিক চাপ আসতে পারে, তারপরও ইচ্ছা করে নিষ্ক্রিয় থাকে, তাহলে সেটাও কম ভয়ংকর নয়। কারণ তখন সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা নয়, বরং আইনের প্রয়োগে বৈষম্য।
অক্টোবর মাসে জাপান সফরের সময় এসে আরও কিছু ঘটনা সামনে এসেছে। ভালুকার সাথী আক্তারের ঘটনাটি এই প্রশ্নকে আরও স্পষ্ট করে। নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বারবার চুরির ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ফেসবুক লাইভে বলেন, বিএনপি সরকারকে ভোট দিয়ে আজ তিনি ভুক্তভোগী। তাঁর বক্তব্যে স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতাকর্মী ক্ষুব্ধ হন এবং তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে পুলিশ তাঁকে আটক করে এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায়। ২৮ শে অক্টোবর তিনি জামিন পান।
এখানে সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় হলো, একজন নারী নিজের দোকানে চুরির ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, সরকারকে ভোট দিয়েও নিরাপত্তা না পাওয়ার অভিযোগ করলেন, আর শেষ পর্যন্ত তাঁকেই কারাগারে যেতে হলো। থানার ওসি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, তাঁর বক্তব্যে সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কিছু পাওয়া যায়নি। তাহলে প্রশ্ন হলো, নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করার কারণে একজন নাগরিককে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে কেন? তাঁর বক্তব্যে কেউ ক্ষুব্ধ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পথ তো খোলা ছিল। কিন্তু একজন নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে তাঁকেই আটক করে আদালতে পাঠানোর প্রয়োজন কেন হলো?
সরকারকে ভোট দেওয়া মানে কি সরকারের সমালোচনা করার অধিকার ছেড়ে দেওয়া? বিএনপিকে ভোট দিলে কি স্থানীয় নেতাকর্মীদের সব কাজ মেনে নিতে হবে? মানুষ ভোট দেয় নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও ভালো শাসনের আশায়। ভোট দিয়ে কেউ নিজের নাগরিক অধিকার দলীয় নেতাদের হাতে তুলে দেয় না। সাথী আক্তারের ঘটনায় সাধারণ মানুষের কাছে যদি এমন বার্তা যায় যে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরাগভাজন হলে উল্টো নিজেরই বিপদ হতে পারে, তাহলে সেটি সরকারের জন্য ভালো লক্ষণ নয়।
অক্টোবরের আরেকটি ঘটনা নাটোরের গুরুদাসপুরে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলামের মৃত্যু। ১৪ অক্টোবর হামলার শিকার হওয়ার পর প্রায় ১২ দিন চিকিৎসাধীন থেকে তিনি মারা যান। পরে বিএনপির সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। পরবর্তী সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁর রিমান্ডের খবরও আসে। তদন্তে স্থানীয় রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। একজন রাজপথ কাপাঁনো ছাত্রদল নেতাকে হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হলো কেন? ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যেই যদি এমন সংঘাত ঘটে, তাহলে দলীয় শৃঙ্খলা কোথায় ? দলের পরিচয় যদি মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ফেলে, তাহলে সেই রাজনীতির লাভ কী ?
সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা কেএম তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর ঘটনাও এ সময়ে মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ২৮ অক্টোবর তুরাগ নদী থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্ত ও তদন্তের প্রয়োজন। তাঁর অতীত পরিচিতি ও রাজনৈতিক আলোচনার সঙ্গে এই মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা প্রমাণ ছাড়া বলা ঠিক হবে না। কিন্তু এমন সংবেদনশীল ঘটনায় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হলো দ্রুত, স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করা। মানুষ যেন গুজবের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য না হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বিদেশে থাকলে দেশের প্রশাসন তো বিদেশে চলে যায় না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশে থাকেন, পুলিশপ্রধান দেশে থাকেন, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার দায়িত্বে থাকেন, থানার কর্মকর্তারাও তাঁদের পদে থাকেন। তাহলে প্রধানমন্ত্রী বিদেশে থাকলেই যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে সমস্যা হয়, তাহলে এর অর্থ কী? পুরো প্রশাসন কি একজন মানুষের উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল? প্রধানমন্ত্রী দেশে থাকলে সবাই দায়িত্ব পালন করবে, আর তিনি বিদেশে গেলেই স্থানীয় প্রভাবশালীরা বেপরোয়া হয়ে উঠবে? এমন হলে সেটি কোনো সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার লক্ষণ নয়।
আওয়ামী লীগের আমলে দলীয় প্রভাব, প্রশাসনের পক্ষপাত এবং বিচারহীনতা নিয়ে মানুষ বহু অভিযোগ করেছে। সেই অভিজ্ঞতার পর মানুষ বিএনপির কাছে কী আশা করেছিল? নিশ্চয়ই এই নয় যে সরকার বদলাবে, কিন্তু স্থানীয় ক্ষমতাবানদের আচরণ বদলাবে না। আওয়ামী লীগের লোকজনের জায়গায় বিএনপির লোকজন যদি একইভাবে প্রভাব খাটাতে শুরু করেন, প্রশাসন যদি একইভাবে অসহায় হয়ে থাকে এবং সাধারণ মানুষ যদি নিজের দলের সরকারের সমালোচনা করেও নিরাপদ না থাকে, তাহলে পরিবর্তনের অর্থ কোথায়?
প্রধানমন্ত্রী দেশে থাকুন বা বিদেশে, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বিদেশে গেলেই যদি মানুষ নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ে , তাহলে সেই শঙ্কা দূর করার দায়িত্ব সরকারের। আর যদি এই ধারণা ভুল হয়, তাহলেও সরকারকে তথ্য দিয়ে তা প্রমাণ করতে হবে। কারণ মানুষ শুধু আশ্বাস শুনতে চায় না, কাজের প্রমাণ দেখতে চায়।
সরকারকে এখনই প্রমাণ করতে হবে, দেশের আইনশৃঙ্খলা কোনো ব্যক্তি বা দলের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয়। নইলে একসময় মানুষের মনে ভয় নয়, আরও বড় অবিশ্বাস তৈরি হবে। আর কোনো সরকারের জন্য জনমনে এই অবিশ্বাস তৈরি হওয়া ভালো লক্ষণ নয়।
ফটোকার্ড ক্রেডিট : সংগৃহীত
©somewhere in net ltd.