| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সৈয়দ কুতুব
নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!
ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো অনেকেই হতাশ হয়েছিল। মানুষ চেয়েছিল জাহেদ ভাই সব সময় বিরোধী দলের ভূমিকা রাখবেন। কিন্তু সবার সব আশা পূরণ হয় না।
জাহেদ ভাই প্রতি মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করেন। তাঁর নিজের মুখের কথা, মঙ্গলবার এলেই তাঁর পরিবার চিন্তিত হয়ে যায়, আজকে আবার জাহেদ ভাইকে নিয়ে কী না কী ট্রল শুরু হয় ! আসলে সরকারে গেলে বাংলাদেশে খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা কমে যায়, এটা আমরা জানি। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ এখন জাহেদ ভাইয়ের প্রতিটি কথায় ভুল ধরবে, আগে কী বলেছিলেন আর এখন কী বলছেন, সেসব নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য ও ট্রল করবে।
সরকার নতুন করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এলপিজি গ্যাসের সরকারি দাম আরও ২০০ টাকা বাড়াবে। বাংলাদেশে এলপিজি গ্যাস সরকারি নির্ধারিত দামে পাওয়া যায় না। যেকোনো গ্যাসের দোকানে গেলে সরকারি দামে সাড়ে বারো কেজি সিলিন্ডার পাবেন, সেই সম্ভাবনা খুবই কম। সাধারণ মানুষকে সব সময় ৫০০-৭০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হয়।
গত সাত মাসে দফায় দফায় গ্যাসের দাম বাড়ানোর পর সবার আশংকা সিলিন্ডারের দাম তিন হাজার টাকা হয়ে যাবে। একটি সিলিন্ডার তিন হাজার টাকা দিয়ে কিনে মাসে ১৮ থেকে ২২ দিনের বেশি চালানো কতজনের পক্ষে সম্ভব ? চার সদস্যের একটি পরিবারে গড়ে মাসে দুটি সিলিন্ডার লাগে। ফলে অনেক পরিবারকে দেখা যাবে সিলিন্ডার ও ইলেকট্রিক চুলা দুটোই ব্যবহার করতে হচ্ছে। এদিকে বিদ্যুতের দামেও তেমন স্বস্তি নেই।
জাহেদ ভাই গতকাল সংবাদ সম্মেলনে এলেন এবং আমাদের জানালেন , সরকার জনগণের কষ্ট বুঝতে পেরেছে। এরপর বললেন, জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের কথা ভেবেই এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। এটা শুনে বেশ অবাক হলাম। দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের জন্য আবার দাম বাড়ে কিভাবে ?
জাহেদ ভাই ব্যাখ্যা দিলেন, সরকারকে এলএনজি-তে আগের চেয়ে বেশি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। গত ১০ মাসে ৪৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকিতে খরচ হয়েছে। সরকার এলপিজি-তে কোনো ভর্তুকি দেয় না। এটা পুরোপুরি বেসরকারি খাতের হাতে। স্বাভাবিকভাবেই সরকারি প্রতিষ্ঠান বিইআরসি চাইলেও দাম নির্ধারণের বাইরে সরকার নির্ধারিত দামে পরিবেশকদের এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে পারে না।
কোনো সরকার কে এ দাম নিয়ন্ত্রণ করার তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। BERC-তে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দিয়ে তদারকি বাড়ালে হয়তো সাধারণ মানুষকে ৫০০-৭০০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হতো না। জাহেদ ভাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার এলপিজি-র দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলে ভর্তুকি দিতে হবে । কিন্তু এতে সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে। ফলে বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক থেকে ঋণ পাবেন না। আর টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেছেন, টাকা যতই থাকুক, ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে সাধারণ মানুষের কোনো লাভ হয় না। একই সঙ্গে বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থানও বাধাগ্রস্ত হবে। নিজের বক্তব্যের মূল যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেছেন, সরকার ভর্তুকি দিয়ে দাম কম রাখার চেষ্টা করছে না, সেটি আসলে দীর্ঘমেয়াদে জনগণের কল্যাণের জন্যই। এই মুহূর্তে হয়তো বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্যই এই সিদ্ধান্ত।
তবে দাম বাড়ানোর কারণে সাধারণ মানুষের কষ্ট কমবে না, সেটি তিনি স্বীকার করেছেন। এ অবস্থায় সবচেয়ে অসহায় মানুষকে সুরক্ষা দিতে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত LPG কার্ডের কথাও বলেছেন।
আচ্ছা, মূল্যস্ফীতি কি শুধু ভর্তুকি দিলেই বাড়ে ? সরকার কি মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য পলিসি রেট প্রায় দশ শতাংশের আশপাশে রাখেনি ? তারপরও মূল্যস্ফীতি কমছে না কেন? সরকার যদি পে-স্কেলের জন্য ব্যাংক থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে পারে, তাহলে এলপিজির-তে ভর্তুকির জন্য ঋণ নিতে সমস্যা কোথায়?
আসলে জাহেদ ভাইয়ের সমস্যা হলো, ডাক্তার মানুষ সব বিষয়ে পাণ্ডিত্য করে বেড়ান । কখনো তিনি আমাদের পারমাণবিক বোমা নিয়ে জ্ঞান দেন, কখনো আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে কথা বলেন। এবার তিনি অর্থনীতিবিদ হয়ে গেছেন। তাই মূল্যস্ফীতির আধা গল্প শুনিয়েছেন আমাদের। জাহেদ ভাই কি মনে করেন, সাধারণ মানুষ এসব বোঝে না ?
বাংলাদেশে সরকার যদি এখন সব ধরনের ভর্তুকি বন্ধ করে দেয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি কমবে, নাকি আরও বাড়বে? বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির বড় একটি অংশই cost push inflation । উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন ও জ্বালানির খরচ বাড়ার কারণে পণ্যের দাম বাড়ে। সেই কারণে প্রায় দুই বছর ধরে পলিসি রেট ১০ শতাংশের আশপাশে রাখা হয়েছে । শুধু সুদের হার বাড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।
জাহেদ ভাই ভলনারেবল মানুষের জন্য এলপিজি কার্ডের ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন। জ্বালানির ক্ষেত্রে আবার ভলনারেবল মানুষ কারা? সবার জীবনই জ্বালানির দামের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আপনি যদি জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের কথা ভাবতেন, তাহলে এলপিজি খাত নিয়ে আরও অনেক পদক্ষেপ নিতে পারতেন। এলপিজি কার্ড দেওয়ার দরকার নেই। জনগণ না হয় এই বছর বা সামনের বছর একটু কষ্ট করলো , কিন্তু আপনি যে সরকারের অংশ, তাদের কাছে এলপিজি নিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আছে ?
পুরো এলপিজি খাত যেহেতু বেসরকারিকরণ হয়ে গেছে, তাই সরকারের দরকার ছিল কীভাবে এ খাতে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো যায়, সেই ব্যবস্থা করা। দরকার ছিল সরকারি এলপিজি বটলিং প্ল্যান্ট নির্মাণ কাজ শুরু করা । এলপিজি গ্যাস টার্মিনালের কাজ দ্রুত শেষ করা। কিন্তু একনেক-এর সভায় আমরা এলপিজি টার্মিনাল বা বটলিং প্ল্যান্ট নির্মাণের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো বাজেট অনুমোদন হতে দেখি না। তাহলে দীর্ঘমেয়াদে জনগণের কল্যাণ কীভাবে হবে ?
এলপিজি গ্যাসের দাম বিশ্ববাজারে বেড়েছে, এটা ঠিক। কিন্তু আমাদের মতো দেশগুলোর সরকার নানা উপায়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছে। ভারতের সঙ্গে তুলনা দিলাম না। নেপাল পর্যন্ত সরকারিভাবে এলপিজি আমদানি ও বিতরণের মতো বিষয়গুলো কঠোরভাবে তদারকি করছে। সরকার চাইলে এখন থেকেই উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু করতে পারে।
জাহেদ ভাইয়ের কাছে জানতে ইচ্ছা করে, বাংলাদেশে আরেকটি রিফাইনারি নির্মাণের যে পরিকল্পনা ছিল, সেটার কোনো আপডেট তাঁর কাছে নেই কেন? সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে জানা গেছে, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ ছয় মাসের জন্য পিছিয়ে গেছে। এই প্রকল্পের জন্য এডিপিতে সরকারের বরাদ্দ মাত্র ২০০ কোটি টাকা। অথচ ফ্যামিলি কার্ডের জন্য বরাদ্দ ১৪ হাজার কোটি টাকা।
আমাদের কাছে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ? ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিট হলে সরকারের বছরে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে ২ কোটি মানুষকে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা দিতে বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা খরচের হিসাব সামনে এসেছে। পাঁচ বছরে এর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা।
জনগণ কি সরকারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড চেয়েছে ? গরিব মানুষ কি সরকারের কাছে এই কার্ড চেয়েছে? মানুষ চায় কর্মসংস্থান, আয় করার সুযোগ, কম দামে জ্বালানি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ব্যবস্থা। এসব চাওয়া পূরণ না করে সরকার এমন কাজে হাত দিয়েছে যা কাগজে কলমে হয়তো দারিদ্র কমেছে দেখাবে , বিশ্বব্যাংকের প্রশংসা কুড়াবে ।
একনেকে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সেখানে এলপিজি টার্মিনাল বা জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ চোখে পড়ল না। কেবল নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধানের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দেশে গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন পরিস্থিতি বিবেচনা করলে শুধু নতুন কূপ অনুসন্ধানের ওপর নির্ভর করে জ্বালানি সমস্যার সমাধান হবে না।
সরকার বাজেট ঘোষণার আগেই ইরান যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। যুদ্ধের কারণে আমাদের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়বে, এটা অনুমান করা খুব কঠিন ছিল না। তারপরও সরকার ফ্যামিলি কার্ডের মতো প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই টাকা দিয়ে সরকার যদি এলপিজি খাত নতুন করে সাজানোর প্লান করতো , তাহলে সাধারণ মানুষের লং টার্মে কিছুটা স্বস্তি মিলত।
একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যবসা চালিয়ে যেতেও সামনে সুবিধা হতো। ব্যবসা বাড়লে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ারও সুযোগ তৈরি হতো। ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে সরকার এই ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে না। এদিকে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচও বেড়েছে। ফলে এলপিজি পরিবেশকদের ওপর পরিবহন ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে।
পরিবেশকদের তাই অতিরিক্ত মুনাফালোভী বলে দায় এড়ানো যাবে না। সরকারকে দেখতে হবে আমদানি থেকে শুরু করে ভোক্তার হাতে সিলিন্ডার পৌঁছানো পর্যন্ত কোথায় কোথায় খরচ বাড়ছে এবং কোথায় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সরকারের একমাত্র প্লান হলো আগের সরকার যা করেছে, তার চেয়ে বেশি কিছু করে দেখানো।
পূর্বের সরকার ১০ বছর বেশি সময় লাগিয়ে দ্বিগুণের বেশি টাকা খরচ করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছে। বর্তমান সরকার দ্বিতীয় পদ্মা সেতু তৈরি করতে চায় । তার জন্য আগের সরকারের মতো দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা লাগবে । সেটা কি আর কখনো সম্ভব হবে ?
মানুষ অপছন্দ করছে এটা না বোঝার মতো ‘স্টুপিড’ নিশ্চয়ই সরকার না- ঢাকা ডায়েরী ।
©somewhere in net ltd.