নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

\'এম এল গনি\' cut & paste করে Google-এ search করলে আমার সম্পর্কে জানা যাবে। https://www.facebook.com/moh.l.gani

এমএলজি

এমএলজি › বিস্তারিত পোস্টঃ

বিদেশে উচ্চশিক্ষা - ভর্তি, টিউশন ফি আর ভিসা-ই কি শেষ কথা?

১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৩৮

আপনি কিংবা আপনার সন্তান কি শিগগিরই কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া বা অন্য কোনো উন্নতদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমাচ্ছেন?

তাহলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিজেকে করুন - বিদেশে পড়াশোনার জন্য কি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, টিউশন ফি-র ব্যবস্থা এবং ভিসা পাওয়াই যথেষ্ট?

অনেকেই হয়তো বলবেন, ‘এ ছাড়া আর কীই বা প্রয়োজন হতে পারে?’

একসময় আমিও হয়তো বিষয়টিকে সেভাবেই দেখতাম। কিন্তু, গত আট বছরের কানাডীয় অভিবাসন পরামর্শক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে ভিন্নভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। আমি এমন অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে (International student) দেখেছি, যারা প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে এবং বৈধ স্টাডি পারমিট নিয়ে বিদেশে যাওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পন্ন করতে পারেনি - কেউ মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেশে ফিরে গেছে, আবার কেউ পড়াশোনার ধারাবাহিকতা হারিয়ে অভিবাসনগত অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

আমার অভিজ্ঞতার মূল ক্ষেত্র কানাডা হলেও, বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি, মানসিক অভিযোজন এবং বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আমার পর্যবেক্ষণগুলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য গন্তব্যের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্যও প্রাসঙ্গিক। আমার উপলব্ধি হলো, বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি কেবল কাগজপত্র, অর্থ ও ভিসাপ্রাপ্তির বিষয় নয়; এটি একইসঙ্গে মানসিক, একাডেমিক, সামাজিক ও জীবনযাপনসংক্রান্ত প্রস্তুতিরও বিষয়।

এ লেখার প্রয়োজনে আমার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি না দিলেই নয়, যদিও গুগলে ‘এম এল গনি’ লিখে অনুসন্ধান করলে আমার সম্পর্কে জানা যায়।

আমি বাংলাদেশের বুয়েট এবং কানাডার ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর গ্র্যাজুয়েট। সপরিবারে প্রায় ২৫ বছর ধরে কানাডায় বসবাস করছি। পেশাগত জীবনে আমি মূলত একজন প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার। পাশাপাশি, গত আট বছর ধরে কানাডীয় অভিবাসন পরামর্শক (RCIC-IRB) হিসেবে কাজ করছি। কানাডার অভিবাসন বিষয়ে বাংলা ভাষায় লেখা আমার বইয়ের নাম ‘কানাডা অভিবাসনের আবেদন - প্রত্যাশা ও বাস্তবতা।’

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেক শিক্ষার্থীর যোগ্যতা, আর্থিক সামর্থ্য ও বিদেশে পড়তে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, সবই আছে, তারপরও আপাতদৃষ্টিতে ছোট, কিন্তু বাস্তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিছু কারণে তারা বিদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সফল হতে না পেরে ধীরে ধীরে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারায়, মানসিক চাপে ভোগে এবং একপর্যায়ে এমন সিদ্ধান্ত নেয়, যার প্রভাব তাদের শিক্ষা, ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ও অভিবাসন-পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এ ধরনের প্রতিটি ঘটনার পেছনে আলাদা গল্প রয়েছে। সবগুলো নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এই লেখা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। তাই, পরিচয় গোপন রেখে কেবল একজন শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতার কয়েকটি দিক তুলে ধরছি। ঘটনাটি থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকনির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে।

তরুণটি চার বছর মেয়াদি ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জনের উদ্দেশ্যে তিন বছর আগে কানাডায় আসে। প্রথম দুটি সেমিস্টার শেষ করে ছুটিতে দেশে বেড়াতে যায়। দেশ থেকে কানাডায় ফেরার পর থেকেই তার চিন্তাভাবনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে।

প্রথম চ্যালেঞ্জ: কানাডার পড়াশোনার গতি ও চাপ - তার কাছে কানাডার শিক্ষাব্যবস্থাকে মনে হয়েছিল অত্যন্ত দ্রুতগতির। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হয়, নিয়মিত ক্লাস ও পড়াশোনার প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে হয়, আর পরীক্ষার সময়সূচিও কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। শেষ মুহূর্তে পড়াশোনা গুছিয়ে নেওয়া কিংবা সময়সীমা পেরিয়ে কাজ শেষ করার সুযোগ সবক্ষেত্রে থাকে না।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ: পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন - বিদেশে এসে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের অভাব সে গভীরভাবে অনুভব করত। দেশে বেড়াতে গিয়ে আরও একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তার মনে আঘাত করে। দেশে যে মেয়েটির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল, সে ততদিনে অন্য একজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করেছে। বিষয়টি তার জন্য কষ্টের হয়ে দাঁড়ায়। সেই মানসিক আঘাত বুকে নিয়েই তাকে আবার কানাডায় ফিরে আসতে হয়।

তৃতীয় চ্যালেঞ্জ: পড়াশোনা শেষে চাকরি ও স্থায়ী বসবাসের অনিশ্চয়তা - কানাডায় ফিরে সে দেখতে পায়, তার পরিচিত অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে প্রত্যাশা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছে না। এতে তার মনে প্রশ্ন জাগে, পড়াশোনা শেষ করেও যদি চাকরি না পাওয়া যায়, তাহলে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ কীভাবে তৈরি হবে? চাকরি, ভবিষ্যৎ কর্মজীবন এবং স্থায়ী বাসিন্দা (Permanent Resident বা PR) হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে দুশ্চিন্তা তাকে ক্রমেই আচ্ছন্ন করে ফেলে।

চতুর্থ চ্যালেঞ্জ: স্বনির্ভর জীবনযাপনে অভ্যস্ত না হওয়া - দেশে থাকতে তরুণটি পরিবারের আদরের সন্তান ছিল। তার মা অনেক সময় নিজের হাতে খাবার তুলে দিতেন। দৈনন্দিন জীবনের নানা প্রয়োজনও পরিবার সহজেই মিটিয়ে দিত। কিন্তু, কানাডায় এসে নিজের খাবার নিজেকেই রান্না করতে হয়। বাজার করা, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার রাখা, দৈনন্দিন খরচের হিসাব করা, এসব কাজও নিজের দায়িত্বে সামলাতে হয়। প্রথম দিকে নতুন জীবনের অভিজ্ঞতা ভালো লাগলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। একসময় তার কাছে এই স্বনির্ভর জীবনযাপন অসহনীয় মনে হতে শুরু করে। বিদেশে আসার আগে রান্নাবান্না ও দৈনন্দিন কাজের অভ্যাস গড়ে তোলার মতো বিষয়গুলো যে এত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তা সে আগে বুঝতে পারেনি।

পঞ্চম চ্যালেঞ্জ: খণ্ডকালীন কাজ, নতুন সম্পর্ক ও ভুল প্রত্যাশা - অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন মেটাতে সে একটি রেস্তোরাঁয় রাতের বেলায় কাজ শুরু করে। সেখানে এক সহকর্মীর সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই নারী ধূমপান করতেন; একপর্যায়ে তরুণটিও তাঁর সঙ্গে ধূমপান শুরু করে। নারীটি কানাডার নাগরিক হওয়ায় তরুণটির মনে ধারণা জন্মায়, তাঁকে বিয়ে করলে হয়তো স্পাউস-স্পনসরশিপের মাধ্যমে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এই প্রত্যাশা থেকে সে সম্পর্কটির পেছনে বেশ কিছু অর্থও ব্যয় করে। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত সম্পর্কটি টেকেনি। এতে তার ব্যক্তিগত হতাশা আরও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে তার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটিও ভেঙে পড়ে।

এতগুলো সমস্যার সঙ্গে লড়াই করতে করতে একপর্যায়ে তরুণটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। অবশেষে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার পড়াশোনার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলে সে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একটি চিঠি পায়। চিঠিটি পাওয়ার পর সে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। তার মূল প্রশ্ন ছিল, এই পরিস্থিতিতে কীভাবে কানাডায় স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পাওয়া সম্ভব।

ওদিকে, পরিবার নিয়মিত তার টিউশন ফি পাঠিয়ে যাচ্ছিল। সে পরিবারকে জানিয়েছিল, টিউশন ফির বাইরে অন্যান্য খরচ সে কাজ করে উপার্জন করছে। ফলে পরিবারের ধারণা ছিল, তার পড়াশোনা যথারীতি চলছে। কিন্তু, বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি জমা দেয়নি। অর্থাৎ, পরিবার যে উদ্দেশ্যে টাকা পাঠাচ্ছিল, সেই উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছিল না।

বেশ কিছুদিন পর অন্য একটি সূত্রে ছেলের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে তার পরিবার তাকে দেশে ফিরে যেতে বলে। কিন্তু তরুণটি কানাডা ছাড়তে রাজি নয়। একবার ভাবুন, তার অবস্থাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অনাকাঙ্খিত অবস্থার পেছনে ছেলেটির ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের দায় যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিদেশে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও বাস্তবতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকার প্রশ্নও।

বিদেশে গিয়ে সমস্যায় পড়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পরিস্থিতি এক নয়। কারও সমস্যা একাডেমিক, কারও আর্থিক, কারও মানসিক, আবার কারও ক্ষেত্রে একাধিক সমস্যা একসঙ্গে কাজ করে। তাই, বিদেশে উচ্চশিক্ষার আগে যে প্রস্তুতিগুলো জরুরি -

১. বিদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে আগেই জানুন
২. মানসিক প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দিন
৩. দৈনন্দিন জীবনে স্বনির্ভর হতে শিখুন
৪. অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত করুন
৫. পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার সক্ষমতা যাচাই করুন
৬. ভবিষ্যৎ চাকরি ও অভিবাসন নিয়ে বাস্তব প্রত্যাশা রাখুন
৭. ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও জীবনযাপনের সিদ্ধান্তে সতর্ক থাকুন
৮. বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলুন
৯. সন্তানকে শুধু বিদেশে পাঠানোর প্রস্তুতি নয়, বিদেশে টিকে থাকার মানসিক প্রস্তুতিও দিন

উন্নতদেশে উচ্চশিক্ষা নিঃসন্দেহে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সঠিক পরিকল্পনা, পরিশ্রম এবং বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা থাকলে এটি একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে। কিন্তু, বিদেশে পৌঁছানোই শেষ কথা নয়; সেখানে গিয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করা, সুস্থভাবে জীবনযাপন করা, আর্থিক দায়িত্ব সামলানো এবং ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আপনি যদি নিজে বিদেশে পড়তে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, কিংবা আপনার সন্তানকে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া বা অন্য কোনো দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠাতে চান, তাহলে দেশ ছাড়ার আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিগুলো সম্পন্ন করুন। যে দেশে যাচ্ছেন সেদেশের দৈনন্দিন জীবন প্রণালী, সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কেও আগেভাগে ধারণা নিন। বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কানাডার অভিবাসনসংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ নিতে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে নিচের ইমেইল ঠিকানায় লিখতে পারেন:

ইমেইল: [email protected]
এম এল গনি (ML Gani) - কানাডীয় অভিবাসন পরামর্শক (RCIC-IRB), প্রকৌশলী ও লেখক।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.