| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
এই ছেমড়া কই যাস? বাইত্তে যাই। থাকস কই তুই? এই তো চাইর নাম্বার লাইনের বগিত। যা ভাগ, এখান থিকা। ইন্সপেক্টর আইবো, এদিক আহিস না যেন।
কথা হচ্ছিল উল্লাপাড়া জংশনের স্টেশন মাস্টার আর ওই স্টেশনের টোকাই জিতু মিয়ার। জিতু মিয়ার মত আরো অনেকেই এই স্টেশনের পরিত্যক্ত বগিতে থাকে। সবাই স্টেশনের আশেপাশেই কিছু না কিছু করে খায়। মাস শেষে বড় মিয়া এসে বাড়ি ভাড়া নিয়ে যায়। বড় মিয়া, এই এলাকার এম.পির ডান হাত। তাকে কেউ ঘাটায় না। এরকম মানুষ সাধারণত নিষ্ঠুর গুন্ডা প্রকৃতির হয়। বড় মিয়া গুন্ডা গুন্ডা হলেও বোধহয় অতো খারাপ না। স্টেশনের পিচ্চিগুলার থেকে সে কখনো থাকার টাকা নেয় না। জিতু মিয়ারও তাই থাকার জন্য টাকা দেয়া লাগে না। গায়ে বাতাস লাগায় ঘুরে বেড়ানো যায়। ভাত খাওয়ার জন্য ঘন্টা দুয়েক প্ল্যাটফর্মে হাত পেতে বসে থাকলেই চলে। শুধু যেদিন ইন্সপেক্টর আসে ওইদিন এদিকে আসা যায় না।
চার নাম্বার লাইনের একটা পোড়া বগিতে জিতু মিয়া থাকে। বগির ভিতরে প্রতি কোণাতে এখনো রয়েছে সেইদিনের অগ্নিকান্ডের চিহ্ন। বেশ কয়েক বছর আগে এই লাইনে তেলের ট্যাঙ্কারে আগুন লেগে ভয়াবহ এক দুর্যোগ নেমে এসেছিল এ স্টেশনে। লাইনের কাঠের স্লিপার পর্যন্ত পুড়ে ছাই। পাশের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা রাজশাহী লোকালের কয়েকটা বগিতেও আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়েছিল সেদিন। অনেকে নেমে পড়লেও প্রায় ত্রিশ জনের মতন যাত্রী বগিগুলোর সাথেই পুড়ে অঙ্গার হয়ে গিয়েছিল। তাদের বেশির ভাগ যাত্রীর লাশও শনাক্ত করা যায় নি, এমনকি উদ্ধার পর্যন্ত হয় নি। সেই রাজশাহী লোকালের পোড়া কয়েকটি বগি এখন এই স্টেশনের চার নাম্বার লাইনে পড়ে আছে সেইদিনের দুঃসহ স্মৃতি হিসেবে আরও কয়েকটি পরিত্যক্ত বগির সাথে। অন্য বগিগুলোতে স্টেশনের ভাসমান মানুষগুলি পরিবার নিয়ে থাকলেও ওই পোড়া বগিতে কেউ থাকে না। শোনা যায়, সেখানে নাকি রাতের বেলা পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া যাত্রীরা ঘুরে বেড়ায়, আর বলে তোরাও একদিন সব আগুনে পুড়ে মরবি। তাই এদের থেকে বাঁচার জন্য ওই বগিগুলোতে কেউ থাকে না। জিতু মিয়া জানে এইসব কথা। কিন্তু তাও সে এখানেই থাকে। অন্য বগিতে থাকতে গেলে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। এখানে ভুতের ভয় থাকলেও একটু আরামে থাকা যায়।
একদিন রাতে জিতু মিয়া এক নম্বর বাথরুম করতে বের হয়ে যখন তার জায়গায় ফেরত আসছে তখন দেখে তার বিছানার পাশে এক লোক বসে আছে। নতুন নতুন বিড়ি খাওয়া শিখেছে বলে জিতু মিয়ার কাছে সব সময় ম্যাচ থাকে। সে ম্যাচ ধরাতে যেতেই ওই লোক বাপ-মা তুলে গালি দিয়ে বলছে আগুন নিভাতে। অতটুকু মুহূর্তের মধ্যেই ও দেখতে পেল লোকটার মুখ কেউ যেন এসিড দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। শুধু নাকের আর চোখের দুই জোড়া ছিদ্র যেন শুধু বের হয়ে আছে। জিতু মিয়া এখন বুঝতে পারলো, লোকের মুখে যা শুনেছে তাহলে তা সত্যি! কিন্তু তাও তাকে ভুত মনে হল না। আপনে কেডা? ওর প্রশ্নে লোকটা জিতু মিয়ার বিছানার উপরই শুয়ে পড়ে উত্তর দিল আমি উসমান। আপনে কী চান? কিছু চাই না। তোর এনে থাকুম কিছুক্ষণ। তারপর যামু গা। আপনে কী জীবিত না মরা? জীবিত ও বলতে পারস আবার মরাও কইতে পারস। পোড়া মাইনষেরা মরলেও মরা, বাঁচলেও মরা। জিতু মিয়া এবারে উসমানের পাশে গিয়ে বসলো। লোকটার কথাবার্তা তার পছন্দ হয়েছে। আপনে তাহলে ভুত-টুত না? উত্তরে কিছু বলল না সে। কিছুক্ষণ পর আপনা আপনি বলতে লাগল, আমিও ওইদিন রাজশাহী লোকালে ছিলাম। নিজের চোখের সামনে ট্যাঙ্কারে আগুন ধরতে দেখেছিল সে; তারপর সে আগুন ছড়িয়ে পড়তে দেখেছে; দেখেছে কীভাবে ওই আগুন তার পরিবারের সবাইকে পুড়ে অঙ্গার করে দিয়েছে। মামার বাড়ি যাওয়ার জন্য ট্রেনে উঠে তার চার বছরের ছেলেটা যমের বাড়ি চলে গিয়েছিল সেদিন। আপনে তাহলে বাঁচলেন কেমনে? কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উসমান বলল, “আমার শরীর প্রায় পুরাই পুড়ে গেছিল। লোকে মরে গেছি ভেবে ফেলায় গেছিল। পরে একজন এসে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়; কোন রকমে বাইচা যাই সেবার। এরপর থেকেই আমার পোড়া মুখ দেখে সবাই ভয়ে পালায়। তাই মানুষ থেকে লুকায় থাকি। তাও মাঝে মধ্যে দুই-একজন আমার সামনে পরে ভুত ভেবে চিৎকার করে ভিমরি খায়।“
জিতু মিয়ার ওই লোকটার জন্য খুব মায়া হল। বলল,” আপনে এখানেই থাকেন। আপনে যদি ভুতও হন তাও আপনে ভাল লোক। তয় একটা প্রশ্ন আছিল মাথায়। আগুন ধরছিল কেমনে?” প্রশ্নটা করায় পাশে যেন বজ্রপাত হল। চিৎকার করে উঠল উসমান। “ওই শালার আবদুল মেম্বার। ***** ই তো আগুন লাগাইছিল। আমি স্পষ্ট দেখছি ওই কী জানি ঢালল, তারপর লাইটার ফেলে চলে গেল।“ ও আগুন ধরালো কেন? রেলের জায়গা দখল, তেল চুরি এইগুলাই ছিল ওই মেম্বারের কাজ। ওই ট্যাঙ্কারের প্রায় পুরা তেলই ওই **** চুরি করছে। ওইদিন ইনস্পেকটর আসবে তদারকি করতে তাই প্রমাণ মিটাতে পুরা ট্যাঙ্কারই জ্বালায় দিসে শালায়। সবাই ভাবল দুর্ঘটনায় আগুন লাগছে; কেউ জানলো না কেমনে আগুন ধরানো হল। ছাড়মু না। ওরে আমি ছাড়মু না। প্রতিশোধের লিগাই আমার পরান এহনো বাইর হইয়া যায় নাই। ওরে আমি আগুনেই পুইড়াই মরতে দেখতে চাই।
উঠতে উঠতে বেলা হয়ে গেল জিতু মিয়ার। উঠে পাশ ফিরে দেখে কেউ নাই। উসমানের কোন চিহ্ন পর্যন্ত নাই। স্বপ্নই দেখল কিনা কে জানে? কিন্তু বড় বাস্তব মনে হচ্ছিল। প্ল্যাটফর্ম থেকে স্টেশন মাস্টারের বাঁশি শোনা যাচ্ছে। আজকেও ইন্সপেক্টর আসবে বলে। এক নাম্বার লাইন দিয়ে কেবল একটা ট্রেন গেল। মাসের শেষ বলে বড় মিয়াকেও দেখা যাচ্ছে লাইনের দিকে। টাকা তুলছে সবার। বড় মিয়া জিতুর দিক আসতেই দুই নাম্বার লাইনে দূরে অন্য এক ট্রেনের ইঞ্জিনের বাতি দেখা গেল। জিতু মিয়াকে দেখেই বড় মিয়া বলে উঠল,সেইদিনের গেঁদা দেখি এখনি বিড়ি খাওয়া শিখসে। পরের মাস থিকা তুইও ভাড়া দিবি। বিড়ি ধরালে তাকে আর পিচ্চি কোটায় ফ্রি ভাড়া দেই না আমি। জিতু মিয়া মাথা চুলকাতে চুলকাতে কী জবাব দিবে ভাবতে ভাবতেই দুই নাম্বারে ট্রেন ঢুকে পড়ল। বড় মিয়া এখন ওকে ছেড়ে দিয়ে ওই ইঞ্জিনের দিক হাঁটা দিল। এদের থেকেও ভাড়া পায় নাকি সে?- ভাবতে লাগল জিতু মিয়া। তখন সে দেখতে পেল ট্রেনের নিচে দিয়ে ওপাশে এক জোড়া ঝলসানো পা পানির মতন কী ফেলতে ফেলতে সামনের দিকে চলে যাচ্ছে। কালকের কাহিনী ভেবেই কিনা জিতু মিয়া উলটা দিকে দৌড় দিল। তার মন বলতেছে এখন ভীষণ কিছু ঘটতে চলেছে। কিছুক্ষণ পরেই বোমা বিস্ফোরণের মতন শব্দে পুরো স্টেশন কেঁপে উঠল। দুই নাম্বার লাইনে মাত্র এসে দাঁড়ানো অয়েল ট্যাঙ্কারে আগুন লেগেছে সেদিনের মতন। নিমিষেই একের পর এক ট্যাঙ্কারের বগিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে আর বোমার মতন ফাটছে। ট্রেনের কাছ থেকে সরে না আসলে জিতু মিয়া এখন কয়েকটা রক্তাক্ত মাংসপিন্ড ছাড়া কিছুই থাকতো না। বড় মিয়া কই?সে তো ওখানেই ছিল; সে সরে আসতে পেরেছে? নাকি সেও পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে এতক্ষণে? তাহলে কী কালকের উসমানের কথাই ঠিক? শেষমেশ স্টেশনে আবার আগুন লাগলই? নাকি আজ যা ঘটল তা ছিল কেবল প্রতিশোধেরই এক রকম নিদর্শন? উসমানের সাথে আবার দেখা হলে জিতু মিয়া ঠিক করলো, তাকে এই প্রশ্নটা করবে। কিন্তু এরপর আর কখনো উসমানকে দেখা যায় নাই; এমনকি বড় মিয়াকেও না।
২১ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ রাত ১০:১৩
Barshan Saha বলেছেন: ধন্যবাদ ভাই
২|
২১ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ রাত ১১:১৪
রূপম রিজওয়ান বলেছেন: ঝরঝরে বর্ণনা। ভালো লাগলো।++
ব্লগে মিথস্ক্রিয়া বাড়ান,সুচিন্তিত মতামত,মন্তব্য দিন। নইলে প্রথম পাতায় প্রকাশ না হওয়ায় সেফ হবার আগ পর্যন্ত অন্যরা আপনার পোস্টের হদিস পাবে না।
হ্যাপি ব্লগিং।
২২ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:৩৫
Barshan Saha বলেছেন: ধন্যবাদ ভাই। অবশ্যই অন্য লেখা পড়ে মতামত এবং মন্তব্য করব।
©somewhere in net ltd.
১|
২১ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ রাত ৮:৫৯
ইসিয়াক বলেছেন: ব্লগে স্বাগতম।
শুভকামনা রইল।
শুভব্লগিং।