| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |

বাগানবিলাস
গেটের সামনে একটা রিকশা এসে থামল। রহিম সাহেব ভাড়া মিটিয়ে দেয়ার পর রিকশাওয়ালাকে বললেন তার লাগেজটা নিচে নামিয়ে দিতে। গেট ভিতর থেকে বন্ধ। গেটের বাইরে নামফলকে লেখা বাগানবিলাস। কিন্তু কলিংবেল এর কোন সুইচ দেখা যাচ্ছে না। রহিম সাহেব গেটে ঠক ঠক করে আওয়াজ করলেন। ভিতর থেকে কেউ একজন এদিকে আসছে। দরজা খুলতে আহসান সাহেব নিজেই চলে এসেছেন। আহসান সাহেব, রহিম সাহেবের বহু পুরোনো বন্ধু। এটা আহসান সাহেবেরই নিজের বাড়ি। এতদিন ধরে আসতে বললেও আসব আসব করে আর আসা হয় নি রহিম সাহেবের। এখন চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর ভাবলেন, কয়েকদিন বন্ধুর বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম করে আসা যাক।
গেট দিয়ে ঢুকতেই চারপাশে বাগান। সারি সারি বাগানবিলাস ফুলের গাছ। রংবেরঙ বাগানবিলাসে ভরে আছে এই বাংলো। এরই মধ্য দিয়ে ইটে বাঁধানো রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আহসান সাহেব বলছেন, শেষমেশ আসলি? এতদিন পর তোর আসার ফুসরত হল। রহিম সাহেব উত্তরে কিছু বলতে গেলেন কিন্তু তার বন্ধু তাকে থামিয়ে দিলেন। হইছে, এখন আর সাফাই গাইতে হবে না। অনেকক্ষণ জার্নি করে আসছিস, গোছল করে নে। খাওয়ার সময় তোর বিচার হবে। আহসান সাহেবের এই বাংলো প্রায় পনের শতাংশ জায়গার উপর করা। চারদিকে বাগানের মধ্যে ছোট একটা একতলা বাড়ি তার, যেন অতল সমুদ্রের মধ্যে এক টুকরা দ্বীপ। বাড়িটাও আবার আধা-পাকা। চারপাশের সাথে এত সুন্দর মিলে গেছে যে দূর থেকে বাসা বলেও মনে হয় না। রহিম সাহেবকে রুম দেখিয়ে দিয়ে আহসান সাহেব টেবিলে খাবার বাড়তে গিয়েছেন। বহুদিন আগেই তার স্ত্রীবিয়োগ হয়েছে, তাই সব কাজ আহসান সাহেবের একাই করতে হয়।
আহসান সাহেবের রুচি আছে। বাড়ির বাইরে বাগানের মধ্যে ডাইনিং টেবিল তৈরি করেছেন। সারি সারি বাগানবিলাসের মাঝে বড় গাছের গুড়ি কেটে বানানো হয়েছে টেবিল এবং চারটা চেয়ার। এরই মধ্যে গরম ভাতের সাথে আলু-বেগুন ভর্তা, কলমি শাক, বোয়াল মাছের ঝোল খেতে খেতে রহিম সাহেবের মনে হচ্ছে এটা আহসান সাহেবের বাগানবিলাস বাংলো না, বরং স্বপ্নে দেখা কোন রাজবাড়ি। খেতে খেতে আহসান সাহেব বলছেন, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ গ্রামে এই বাংলো করার আসল পরিকল্পনা ছিল তার স্ত্রী সাথীর। সেই এই বাগানবাড়ির দেখভাল করতো এক হাতে। নিঃসন্তান থাকার দুঃখ হয়তো সে ফুল গাছ লাগিয়েই ভুলে থাকতো। কী ছিল না সেই বাগানে? বকুল,টগর, হরেক রঙের জবা-গোলাপ, অলকনন্দা, কাঠগোলাপ, বেলী-জুঁই। কিন্তু সাথী মারা যাওয়ার পর অযত্নে প্রায় সব গাছ মরে গেল। এমনকি বড় বকুল গাছটাও একদিন বাজ পড়ে মরে গেল। এরপর আহসান সাহেব প্রায় নিজের উদ্যোগে আবার বাগানটা দাড় করিয়েছেন। হরেক রঙের বাগানবিলাস গাছ দিয়ে পুরো পনের শতাংশ জায়গা ভরে ফেলেছেন।
দুপুরে খাবার পর বাগান দিয়ে হাঁটতে বের হল দুই বন্ধু। হাঁটতে গিয়ে রহিম সাহেব খেয়াল করলেন প্রত্যেক বাগানবিলাস গাছে কোন না কোন মানুষের নাম লেখা। কোন গাছে হয়তো লেখা জহির আহমেদ, কোনোটায় সিরাজ খান। ফুলের গাছে মানুষের নাম কেন? কৌতুহল হল রহিম সাহেবের। সে আহসান সাহেবকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি শুধু রহস্য করার ভঙ্গিতে মিটিমিটি হাসলেন; কিন্তু কিছু বললেন না। পুরো বাগান ঘুরতে ঘুরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এল। সব মিলিয়ে বিশটা বাগানবিলাস ফুলের গাছ। মনে হচ্ছে বিশটা গাছ সমান দূরত্ব পর পর বোনা হয়েছে এবং বিশটা গাছের সাথে বিশটা ভিন্ন মানুষের নাম লেখা। ফুল গাছ দেখতে দেখতে যখন রহিম একেবারে বাংলোর দেয়ালের কাছে চলে এসেছে সেখানে দেখতে পেল হলুদ বর্ণের একটা বাগান বিলাস গাছে সাথীর নাম।
সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরতে ফিরতেই শুরু হল বৃষ্টি। আষাঢ় মাসের এই সময় প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যার পর বৃষ্টি হয় এখানে। আহসান সাহেব চা বানিয়ে এনে বাড়ির বারান্দার টেবিলে রাখলেন। এরপর দুই বন্ধু চা-বিস্কুট খেতে খেতে বৃষ্টির শব্দ শুনতে লাগল তাদের বাড়ির টিনের চালে। পুরো বাংলোয় তাদের বারান্দার ত্রিশ ওয়াটের বাল্ব ছাড়া আর অন্য কোন আলো নেই। শুধু মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ ঝলকানিতে পুরো বাগান দিনের আলোর মতন উজ্জ্বল দেখা যাচ্ছে; কিন্তু তাও বাংলাদেশের বর্ষাকালের রোদের মতন মুহূর্তেই উবে যায়। এক সময় আহসান বিড়বিড় করে বলতে লাগল, সাথীরও বৃষ্টির দিনে বারান্দায় বসে এই বাগানের বৃষ্টি দেখার নেশা ছিল। তাই ওর কবরও এই বাগানেই দিয়েছি যেন সারাক্ষণ এই বাগানের বৃষ্টিতে ভিজতে পারে, বৃষ্টির শব্দ শুনতে পারে। “তাহলে সাথী নামের বাগানবিলাস গাছের নিচেই সাথীর কবর?”- জিজ্ঞাসা করল রহিম সাহেব। হ্যাঁ। ওখানেই আমার “সাথী” আরাম করে শুয়ে আছে। তাহলে কী বাকি গাছগুলোর নিচেও ওই নাম লেখা মানুষগুলোর কবর? উত্তরে আহসান সাহেব কিছু না বলে কেতলি থেকে কাপে চা ঢালছিলেন।
মাঝরাতে রহিম সাহেবের হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। তখনো অবিরাম বর্ষণ হচ্ছে। বৃষ্টির ঝম ঝম শব্দের পাশাপাশি মাটি কাটার ঝপ ঝপ শব্দও যেন রহিম সাহেবের কানে আসছে। কৌতুহলবশত তিনি বিছানা থেকে উঠে জানালার পর্দা সরাতে সে বিদ্যুৎ ঝলকানোর আলোতে দেখতে পেল বারান্দার কাছের এক জায়গায় সদ্য মাটি কেটে রাখা হয়েছে। বারান্দা থেকে আসার সময় তা ছিল না। এখন তাহলে কে মাটি কেটে রাখল? বিছানা থেকে নেমে তিনি আহসান সাহেবের রুমের দরজা ধাক্কা দিলেন কিন্তু তিনি বোধ গভীর ঘুমে থাকায় সাড়া দিলেন না। কৌতুহলবশত বারান্দার ওই মাটিকাটার জায়গায় গিয়ে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। সে দেখতে পেল সেখানে প্রায় তিন হাত গর্ত কাটা হয়েছে। তার প্রমাণ হিসেবে পাশে এখনো একটা কোদাল উপস্থিত আছে;আর আছে একটা বাগানবিলাস চারা। সেখানে বাধা রয়েছে একজনের নাম। তার নাম রহিম হাসান।
গেটের সামনে একটা রিকশা এসে থামল। গেটের পাশে নামফলকে লেখা বাগানবিলাস। সাইফুল সাহেব ভাড়া মিটিয়ে রিকশা থেকে নেমে কলিং বেল খুঁজতে লাগলেন। বেল খুঁজে না পেয়ে পরে গেটে ধাক্কা দিল। কিছু সময় বাদে আহসান সাহেব দরজা খুলে দিলেন। সাইফুল সাহেবের ব্যাগ নিজে তুলে নিয়ে বললেন, শেষমেশ তুই আসলি? এতদিন পর তোর আসার ফুসরত হল?
৩০ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ দুপুর ১২:১৯
Barshan Saha বলেছেন: ধন্যবাদ ভাই
©somewhere in net ltd.
১|
৩০ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ সকাল ১০:৩৫
ইসিয়াক বলেছেন: সুন্দর।