| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
এই,সামনে চেকপোস্ট। তাই তো দেখছি। কিন্তু এতো রাতে ফটিকছড়ির এই পাহাড়ি রাস্তায় চেকপোস্ট কেন?ভাস্বর তার স্ত্রী সুধাকে বলল,রাস্তা তো ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করা দেখছি; পুলিশও দেখি দাঁড়ায় আছে। সুধা কী জবাব দিবে ভেবে পেল না। ওইদিকে ভাস্বর চেকপোস্টের আগেই গাড়ি একেবারে থামিয়ে ফেলল। সেখানে একজন পুলিশ দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুঁকছিল, সে জিজ্ঞাসা করলো কই থেকে আসছেন? ঢাকা থেকে। গাড়িতে কী আপনারা কেবল দুই জনই? হ্যাঁ। গাড়ি রাস্তার পাশে সাইড করে রাখেন। ভোরের আলো না ফুটলে আজকে আর যেতে পারবেন না। কেন? কী হয়েছে? ভাস্বর কৌতুহলের সহিত জিজ্ঞাসা করলো সেই পুলিশটিকে। এতো প্রশ্ন কইরেন না তো। বললাম না, আজকে যেতে পারবেন না; খামোখা ঝামেলা কইরেন না;উপর মহলের নির্দেশ। বলে পুলিশটি তার সদ্য শেষ হওয়া বিড়ি শেষ করে আরেকটা ধরাতে গেল। কিন্তু ম্যাচ খুঁজে পেল না। ভাস্বর তার নিজের লাইটার এগিয়ে দিয়ে শুধু বলল এর আগে তো এই রাস্তা এভাবে বন্ধ দেখি নি। কিছু হয়েছে এখানে? বিড়ি ধরাতে পেরে পুলিশটি বোধ হয় ভাস্বরের ওপর সদয় হল। বলল, অনেক কিছু হয়েছে; সে অনেক কাহিনী। শুধু জেনে রাখেন পূর্ণিমার রাতে এই রাস্তা দিয়ে শেষ রাতে চলাচল বন্ধ।
ফটিকছড়ি পার হতে তাদের পরের দিন সন্ধ্যা হয়ে গেল। নাছোড়বান্দা পুলিশ কিছুতেই যেতে দিল না ওদের। ফটিকছড়ি পৌছিয়ে ভাস্বর ফ্রেশ হয়েই তার মিটিং এ চলে গেল। প্রায় প্রতি মাসেই তার নিজের তৈরি “চৌধুরী এন.জি.ও” এর মাসিক মিটিং এ তার আসতে হয়। গত এক বছর ঢাকার কাজের চাপে এদিকে আসা হয় নি; তার ছোট ভাই কিরণই এদিকটা সামলেছে। এতদিন বাদে আসার জন্য আজকে রাতে বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে। সেখানেই ডিনারের পর বসল আড্ডা। ভাস্বর কথায় কথায় তার অফিসের কলিকদের জিজ্ঞাসা করলো যে, এখানকার রাস্তার কাহিনী কী? রাতের বেলা রাস্তা বন্ধ-টন্ধ থাকে নাকি? সবাই প্রশ্ন শুনে প্রথমে কিছুই উত্তর দিল না। কেবল কিরণ বলল তা থাকে বৈকি। কেন কী হয়েছে? জিজ্ঞাসা করলো কিরণ। না, গতকাল রাতে আসার সময় পুলিশ মাঝ রাস্তায় আটকে দিল। বলল সকাল না হলে যেতে দিবে না। কারণ কী জিজ্ঞাসা করলে কিছুতেই উত্তর দিল না। রাতের বেলা তোমরা ভয় পাবে বলেই হয়তো কিছু বলে নি। কী ব্যাপার? তুমি এখানকার চন্দ্রগ্রস্থদের কাহিনী জানো না? না একটু খুলে বলতো।
প্রায় নয় মাস আগের কথা। আমাদের অফিসের করিম ও তার ড্রাইভার ঢাকা থেকে ফটিকছড়ি আসছিল। রাত ১০টার একটু পর সে দেখল সামনে রাস্তার পাশে জটলা। গিয়ে দেখে একটা রিকশা ভ্যানের ধ্বংসাবশেষ আর রাস্তা জুড়ে ছিন্ন-ভিন্ন কাপড় ও বানের জলের মতন রক্ত বয়ে যাচ্ছে যেন রাস্তায়। চারপাশে জড়ো হওয়া লোকজন থেকে শুনা গেল রিকশাটার পিছনের চাকা হুট করে খুলে যাওয়ায় সবাই আচমকা রাস্তায় পড়ে যায়। চোখের নিমিষে পিছন থেকে দ্রুতগামী একটা ট্রাক তাদের পিষে দিয়ে চলে যায়; ব্রেক করার সুযোগ ও সে পায় না। সামনের আরেকটা জটলার কাছে গিয়ে জানতে পারলাম ট্রাক ড্রাইভার গাড়ি থামানোর পর উত্তপ্ত জনতা বলে তাকে জ্যান্ত পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। এরপর থেকেই প্রতি পূর্ণিমার রাতে নাকি গাড়ির ড্রাইভাররা গাড়ি চালানোর সময় হুট করে দেখে সামনে আর রাস্তা নাই; এরপর সকালে তাদের গাড়ির ভিতরেই তাদের প্রাণহীন দেহ দেখতে পাওয়া যায়। শরীরে না আছে কোন আঘাতের চিহ্ন না আছে গাড়ির কোন এক্সিডেন্টের চিহ্ন। শুধু মানুষটার আত্মা শরীর ছেড়ে চলে গেছে। এমনকি তাদের চোখ পর্যন্ত খোলা ছিল। লোকে বলে এসব অপঘাতে মৃত্যু হওয়া প্রেতাত্মার কাজ। পূর্ণিমার রাতে তারা বের হয় বলে তাদের এখানকার লোকেরা চন্দ্রগ্রস্থ বলেও ডাকে। এরকম একটা বা দুইটা না,টানা ৯টা ঘটনা ঘটেছে। আগের নয় মাসের প্রতি পূর্ণিমাতেই এমনটা হয়েছে। ও, তাহলে এই কাহিনী? তাহলে বলছিস এই সব কাহিনী ওই চন্দ্রগ্রস্থ অতৃপ্ত আত্মারা করে বেড়াচ্ছে?ভাস্বরের প্রশ্নে মৃদু উপহাসের ঢং শুনে বুঝা গেল যে এসব কাহিনীর কিছুই সে বিশ্বাস করে নি। এরপর কিছুক্ষণ তাস পিটানোর পর সবাই ঘুমাতে চলে গেল।
দাঁত মেজে কিরণ যখন খাটে উঠতে যাবে তখন হঠাৎ তার মনে একটা খটকা লাগল। এতক্ষণ খেয়াল না করলেও এখন তার মনে প্রশ্ন জাগল যে স্থানীয় প্রশাসনকে এতো করে বলার পরেও সেখানে আজ পর্যন্ত কোন রাতে একজন পুলিশও মোতায়েন করা হয় নি। কেউ সেখানে দ্বায়িত্ব পালন করতে রাজি হয়নি। তাহলে কালকে রাতে সেখানে পুলিশ কী করে এল? তাহলে তার ভাস্বর দাদা এমনটা কেন বলল? দাদা তো ভুল বলার লোক না। কাল সকালে দাদাকে এটা জিজ্ঞাসা করবে ভেবে সে রাতের কিরণ ঘুমিয়ে পড়ল। পরেরদিন সকালে খবরের কাগজে সবাই দেখল, গত পরশু রাতে ফটিকছড়ি মহাসড়কে থেমে থাকা একটা গাড়িতে “চৌধুরী এন.জি.ওর” প্রধান ভাস্বর ও সুধা চৌধুরীর প্রাণহীন দেহ পাওয়া গিয়েছে। মৃত্যুর কারণ এখনো জানা যায় নি।
©somewhere in net ltd.