| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
প্রাচীন গ্রীসের রাজা ইদিপাসের কাহিনী বহুকাল ধরে প্রচলিত ছিল [আছে]। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে সে যুগের প্রধান গ্রীক নাট্যকার সফোক্লিস ঐ কাহিনীর উপর নির্ভর করে একটা নাটক রচনা করেন। অদ্যাবধি বহু ভাষায় এই নাটক অনূদিত হয়েছে এবং বহু দেশের পেশাদারী রংগালয়ে [বাঙলায় বলিতেছি] অভিনীত হয়েছে। অদ্ভুত এক কারণেই আজ মনে পড়ল নাটকটার কথা, কিছুক্ষন আগে শিবলী ভাইয়ের বাচ্চা বিষয়ক লেখাগুলোতে চোখ বুলিয়ে। সংক্ষেপে নাটকটা সম্পর্কে একটু ধারণা দেই-
ক্ষুদ্র রাজ্য থিবিস। রাজার নাম লাইআস- কেউ কেউ বলেন ক্রেয়ন। পিথাগোরাসেকে নিয়ে দুই না তিন পর্বের একটা অসমাপ্ত লেখা দিয়েছিলাম সেখানে ক্রেয়নের ভিন্ন উল্লেখ ছিলো। সে যাই হোক- সেখানকার রানীর নাম জোকাস্টা। বহুদিন যাবৎ রাজা-রাণী নিঃসন্তান থাকায়, ক্ষুদ্ধ থিবিসরাজ ডেলফিআন অ্যাপোলোর মন্দিরে গিয়ে ষোড়শোপচারে পূজো দিলেন।আর একটি পুত্র সন্তানের কামনা করলেন। কেবল মাত্র একবার মাত্রতো আর পুত্র সন্তান কামনা করে ধর্না দিয়ে বসে থাকলে চলে না- ধর্না দিতে হয় বারে বারে গিয়ে। রাজা তাই করতে লাগলেন, বারে বারে গিয়ে ধর্না দিলেন মন্দিরে গিয়ে। তো অবশেষে দেবতার প্রত্যাদেশ পাওয়া গেল- ‘তোমার প্রার্থনা আমার কর্ণগোচর হয়েছে। অচিরে লাভ করবে তুমি এক রূপবান শক্তিমান পুত্রসন্তান। কিন্তু একদা তুমি পেল্পসের পুত্র অপহরণ করে এনেছিলে। তার ফলে পেলপ্স তোমায় অভিশাপ দিয়েছিলো। স্বর্গরাজ জিউস সেই অভিশাপ পরিপূরণ করবেন। তুমি তোমার সন্তানের হাতে নিহত হবে। সাবধান!!!!’
যথাকালে কথিতমতো একটি পুত্রসন্তান জন্মলাভ করল। লাইআসের আদেশে সদ্যজাত শিশুটিকে প্রসবাগার থেকে টেনে নিয়ে আসা হলো। তার হস্তপদ বিদ্ধ করে ও রজ্জু দ্বার বেঁধে রাজ্যসীমা থেকে দূরে এক তপ্তবালুকাময় জনশূণ্য পার্বত্য মরুভূমিতে ফেলে আসার জন্য রাজা তার এক বিশ্বাসী ভৃত্যের হাতে তার সন্তানকে তুলে দিলেন।
মরুভূমিতে নিয়ে যাওয়ার সময় পথশ্রান্ত হয়ে রাজভৃত্যটি অধিক দুর্বল হয গেল ক্রন্দনরত রাজপুত্রের চিৎকারে। নিকটস্থ এক মেষপালকের কাছে বাচ্চাটিকে হস্তান্তর করে তাকে হত্যা করার অনুরোধ জানিয়ে সেখান থেকে রাজভৃত্যটি আবার রাজ্যাভিমুখে যাত্রা করে। মেষপালকটি সানন্দে এই কাজটা রাজভৃত্যের পরিবর্তে করে দিতে পারবে কিছুমাত্র অর্থের বিনিময়ে এই জাতীয় একটা মৌখিক শর্তের নিমিত্তে রাজি হয়ে যায়।
কিন্তু মেষপালকটি রাজভৃত্যকে দেওয়া অনুরোধ আর পালন করে নি। শিশুর প্রকৃত পরিচয় সে জানতে না পারলেও বাচ্চাটির অনিন্দ্যরূপ আর তার স্বাস্থ্যদর্শনে মুগ্ধ হয়ে সে তাকে কোলে করে পার্শ্বস্থ রাজ্য করিন্থরাজ পলিবাসের দরবারে গিয়ে হাজির হয়। পলিবাস ছিলেন অপুত্রক। তিনি তৎক্ষনাত এই শিশুটিকে দত্তকরূপে গ্রহণ করে নেন। আর তার নাম রাখেন ‘ইদিপাস’।
ইদিপাস পলিবাসকে নিজের পিতা ও তৎপত্নীকে তার গর্ভধারণী মা জ্ঞান করে বড় হতে লাগল। বয়ঃপ্রাপ্ত হলে, একদিন দেবমন্দিরে পূজো করতে গিয়ে দৈববাণী শুনতে পেল সে।
-‘সাবধান যুবক! তোমার অদৃষ্টে পিতৃহত্যা ও মাতৃপরিণয় লেখা রয়েছে!’
এই দৈববাণী শুনে ইদিপাস হতভম্ব হয়ে গেল। সে আর ঘরে ফেরত আসলো না, যেখানে তার কথিত বাবা-মা রয়েছে। পাছে এই দৈববাণী সত্যে পরিণত হয়, এই ভয়ে সে করিন্থ ছেড়ে এক নির্জন পার্বত্য প্রদেশাভিমুখে রওনা হলো।
চলতে চলতে এক সংকীর্ণ গিরিসংকটের প্রবেশ মুখে এসে দেখে যে এক সম্ভ্রান্ত-আকৃতির বৃদ্ধ এক রথে উপবেশন করে আছে। তার রথ সমস্ত পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই গিরিসংকট দিয়েই থিবিসে যাওয়ার রাস্তা। সম্পূণ অজ্ঞাতসারে ইদিপাস আপন জন্মভূমির দিকেই পা বাড়িয়েছিলো। বৃদ্ধ এই স্পর্ধিত যুবককে রাস্তা ছেড়ে দিতে সম্মত না হওয়ায় সে তার সাথে সরোষে একটা ঝগড়া বাঁধিয়ে দিলো। ক্ষনপরে ক্রোধান্ধ হয়ে ইদিপাস সেই বৃদ্ধকে আঘাত করলে সেই ঘটনাস্থলে বৃদ্ধ মৃত্যুবরণ করে। যারা একটু অ্যাডভান্স তারা নিশ্চয়ই বুঝে নিয়েছেন- এই বৃদ্ধটি আর কেউ নয়, ইদিপাসের প্রকৃত বাবা- থিবিসরাজ লাইআস।
তারপর ইদিপাস থিবিস নগরের দিকে অগ্রসর হয়ে নগরতোরণের সম্মুখভাগে এসে উপস্থিত হয়। সেই সময় সমগ্র থিবিস এক প্রকান্ড রাক্ষসীর কবলে পড়ে উৎসন্নের পথে যেতে বসেছিলো। এই রাক্ষসীর নাম স্ফিংক্স। তার দেহের উপরিভাগ মানবীর আর বাকী অংশ সিংহীর [এর বর্ণনা আর বেশী না দিলাম, এর অবয়ব সম্পর্কে ধারণা নাই এমন লোক ব্লগে কমই আছে আশা করি]। এর অত্যাচারেই জর্জরিত হয়ে নৃপতি লাইআস গোপনে রাজ্য ছেড়ে পলায়ন করছিলেন-আর সেই পালানোর সময়ই পুত্র ইদিপাসের হাতে তিনি নিহত হন। তো এই স্ফিংক্স দানবী রাজধানী আর রাজপ্রাসাদ অধিকার করে বসে আছে। প্রতিদিন সে এক-একজনকে ডেকে এক অদ্ভুত প্রশ্ন করে। সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে যারা অসমর্থ হয়- তাদেরকেই প্রাণ দিতে হয় স্ফিংক্সের হাতে।
এই প্রশ্নটি বর্তমানে যুগজীর্ণ, সর্বজনপরিজ্ঞাত আর অচল -
কোন জীব প্রভাতে চারি পায়ে, মধ্যাহ্নে দুই পায়ে এবং সন্ধ্যায় তিন পায়ে চলে?
ইদিপাস অকুতোভয় স্ফিংক্সের মুখোমুখিহয়ে অনায়াসে তার ধাঁধার জবাব দিয়ে দেয়। স্ফিংক্স পরাস্তহয়ে পূর্বপ্রতিশ্রুতিমতো রাজ্য ছেড়ে সমুদ্রজলে ঝাঁপিয়ে পড়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। থিবিসবাসীর আনন্দ তখন আর ধরে না। তারা তাদের উদ্ধারকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতাপরবশ হয়ে- তাকে সসম্মানে রাজপদে বরণ করে নেয় আর রাজ্যের নিয়মানুসারে বিধবা রাণী জোকাস্টার সাথে মহাসমারোহে তার বিয়ে দিয়ে দেয়।
এইভাবেই দৈববাণীর শেষাংশও সত্য হয়ে যায়।
কিছুকাল সুখে শান্তিতে কাটতে থাকে। মাতাপুত্র পরষ্পর কেউ কাউকে চিনতে পারে না। চিনতে না পারটাই স্বাভাবিক- সেই কবে ছোটবেলায় জন্ম নেওয়ার পরপরই রাজা তার ভৃত্যকে দিয়ে হত্যা করতে পাঠিয়ে দেন আপণ পুত্রকে রাজ্য-সিংহাসন বাচাবার জন্য, সেই থেকে তো আর মা-পুত্রের মধ্যে কোন যোগাযোগ ছিলো না।
তাদের এই সম্পূর্ন দৈবঘটিত কলঙ্কিত দাম্পত্য জীবন যাপনের ফলে দুটি পুত্র ও দুটি কন্যা তাদের ঘরে জন্মলাভ করে। কিন্তু কিছুকাল পরে সেই রাজ্যে এক ভয়াবহ মহামারি দেখা দেয়। দলে দলে দেশের লোকজন সেই তাদের একমাত্র কামনাস্থল দেবস্থানে গিয়ে দৈববাণীর জন্য ধর্না দিয়ে দিন রাত পার করে দিতে থাকে। শেষে দৈববাণীর আদেশ আসে এই রূপ যে, থিবিসরাজ লাইআসের হত্যাকারি আর মাতৃগমণকারী মহাপাতককারী যে ব্যাক্তিটি রাজ্যে আছে, তাকে অনুসন্ধান করে বের করে দিতে পারলে এই সংকট কেটে যাবে। আর যতক্ষন পর্যন্ত একটি লোকও জীবত থাকবে ততক্ষন মহামারী থামবে না। মহাজ্ঞানী ঋষিতুল্য টাইরেসিআস ব্যাকুল প্রজাকুলের অনুরোধে ইদিপাসকে খুঁজে তার জন্মোতিহাস খুঁড়ে বের করলো সেই জীবত ভৃত্যের জবানবন্দী, মেষপালকের জবানবন্দী আর ইদিপাসের কথিত পিতা-মাতার জবানবন্দী থেকে।
সমস্ত রহস্য উদঘাটন হয়ে যাওয়ার পর জন্মাভিশপ্ত, মহাপাতকি, অনুতাপোন্মাদ ইদিপাস নিজের চক্ষু উৎপাটন করে, মৃতকল্প থিবিস রাজ্য আর সিংহাসন পরিত্যাগ করে দূর বনবাসে চলে যায়।
সফোক্লিস সমস্তই বর্ণনা শেষ করেছিলেন- কেবল একজনেরটা বাদ দিয়ে। তিনি হলেন ইদিপাসের মা, জোকাস্টা।
©somewhere in net ltd.