নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

ধুর!

বিকট

হাসান মাহবুব

আমার অপদার্থতাকে মাহাত্ম্য ভেবোনা...

হাসান মাহবুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

গল্প- নীল জবা

১৩ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ১১:৪৩


দিঠি দেখছে লাল রঙ। জানালার ওপাশে। ছলকে ছলকে পড়ছে এক যুবতীর গলা থেকে। তার গলা কাটা হচ্ছে। এই দৃশ্যটি দেখার আগে দিঠি এক কাপ চা খেয়েছিলো। আগুন গরম। এই ওর এক বাজে অভ্যেস। অসময়ে চা খাওয়া। দুপুরবেলা ভাত খাবার পরেই ওর এক কাপ চা না হলে চলে না। সে যদি কোনো কর্পোরেট কর্মবীর হতো, তাহলে একটা কথা ছিলো, কিন্তু যার সময় কাটে বাসায়, সে কেন দুপুরে চা খাবে? এ নিয়ে মার সাথে মিষ্টি বিতন্ডা হয় প্রায়ই। দিঠি আসলে দুপুরের অবসাদটা কাটাতে চায়। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে মুটিয়ে যাচ্ছে খুব। জানালার ওপাশে গোঙানি শোনা যাচ্ছে। পশুর গলা কাটার সময় যতটা শব্দ হয় এখানে ঠিক অতটা হচ্ছে না। পশুদের মুখে কেউ রুমাল চাপা দেয় না। তারা চাইলে চিৎকার করতে পারে যত খুশি। তবে মানুষের গলা কাটার সময় বেশি শব্দ হওয়াটা ভালো দেখায় না। হাজার হোক মানুষ একটি সভ্য এবং মার্জিত প্রাণী। রক্তের শব্দ সুন্দর, শব্দের রঙ ভালো নয়। দিঠি ভাবছে, ওর যদি এই অবেলায় চা খাবার অভ্যেসটা না হতো, তাহলে হয়তো ও এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়তো। তাহলে আর এইসব দৃশ্য আর শব্দের ভেতর ঢুকে যেতে হতো না। সেটা কি ভালো হতো? দিঠি যখন এই দৃশ্যের ভেতর ডুবে যাচ্ছিলো, তখন ওর ঘরে মৃদুসুরে কেউ একজন গাইছিলো, “যাও পাখি বলো, হাওয়া ছলোছলো, আবছায়া জানালার কাঁচ...”
পাখি কোথায়? ঘুঘু পাখি ডাকে না এই মরা পাড়ায়?
জানালার কাঁচ? এই তো! না, না ঝাপসা হওয়া যাবে না। ওখানে লালটা বেশ ঝলমলে, আর স্পষ্ট। এখানে সবকিছু কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে আসছে। এই মেয়ে দরোজা লাগানো আছে তো? এখন যদি তোমার মা ঘরে ঢুকে পড়ে, তাহলে কেমন হবে ব্যাপারটা! দরোজা লাগিয়ে দাও দিঠি, সবার সবকিছু দেখতে নেই।
শব্দটা কমে এসেছে। গোধূলিবেলায় যেমন আলো নিভে আসে, পাখিদের বিদায়ের সুর বাজে, তেমন করে। রক্ত এখন আর ছলকে পড়ছে না, প্রবাহিত হচ্ছে খুব ধীরে। অসহ্য রকম ধীরে। মানুষের শরীরে কতটুকু রক্ত থাকে? মেয়েটির শরীরে যতটুকু রক্ত আছে তা দিয়ে কি পুরো ঘর ভরে যাবে? সেক্ষেত্রে খুনী একটু সমস্যায় পড়ে যাবে। তাকে রক্ত মাড়িয়ে যেতে হবে। সিঁড়ি ভেঙে যে যখন নেমে যাবে গলিপথে তার পদচিহ্ন অনুসরণ করে তাকে খুঁজে বের করা খুব একটু কঠিন কিছু হবে না। তাই এই মুহূর্তে খুনীর উচিত ঘটনাস্থল ত্যাগ করা। পাড়াটা নির্জন। পুরুষেরা কাজে গেছে, নারী এবং শিশুরা ঘুমোচ্ছে। প্রহরীরা ছুটিতে। এই মরা দুপুরে কেউ তার খোঁজ পাবে না। সে চাইলেই চলে যেতে পারে এখন, অথবা কিছুক্ষণ বসেও যেতে পারে। একটা আস্ত প্রাপ্তবয়স্ক গলাকে কেটে ফেলা তো কম পরিশ্রমের ব্যাপার নয়! মেয়েটির কাটা গলার পাশে একটি ছোট্ট টেবিল আছে। প্লাস্টিকের। সেখানে স্বচ্ছ কাঁচের জগ, তাতে টলটলে পানি। ঢাকা শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ভরসা করা যায় না। মেয়েটি পানি ফুটিয়ে রেখেছিলো তো? হত্যাকারীকে দেখে মনে হচ্ছে তার ভীষণ পানির তেষ্টা পেয়েছে। তা পাওয়াই স্বাভাবিক। আচ্ছা সে কি বুঝতে পারছে যে কী ভীষণ বোকামি করছে? জানালা খোলা। এপাশ থেকে সব দেখা যাচ্ছে। এখন সবার হাতে হাতে ক্যামেরা। দিঠির জায়গায় অন্য কেউ হলে নিশ্চয়ই এতক্ষণে ফটাফট ছবি তুলে ফেলতো, অথবা ভিডিও রেকর্ড করতো! তবে দিঠিও কিন্তু আচ্ছা বোকামি করেছে এতক্ষণ। বোকার মত পর্দা ফাঁক করে নিজেকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে হত্যাকারীর পিঙ্গল চোখের দূরবীনে। অপরাধীরা সাক্ষী রাখতে পছন্দ করে না। দেখা যাবে যে রাস্তায় একা পেয়ে পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছে। দিঠির এভাবে ভাবতে ভালো লাগছে না, কিন্তু কী আর করা!
খুনীদের দেখতে যেমন হবার কথা এ লোকটি ঠিক যেন তেমন নয়। নাদুসনুদুস দেখতে, ঘামে ভিজে জবজব করছে শরীর, হাঁফ ধরা অশক্ত শরীর, চেহারার কোথাও কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য নেই। খুন করার পর কি খুব ক্লান্ত লাগে? সে চলে যাচ্ছে না কেন? বসে আছে বোকার মত। ঢোলা টি শার্টে তাকে আরো বদখত দেখাচ্ছে। আচ্ছা সে কি জানে না কেমন শার্ট পরলে ভালো দেখায়? লোকটা ছুরিটা ছাড়ছে না একবারের জন্যেও হাত থেকে। যেন ওটা তার কত আপন! চোখের কাছে আনলো, বাহ এবার বেশ চমৎকার একটা খুনীসুলভ ক্রুর অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। কেন কাটলে যুবতীর গলা? কেন হাসছো এমন করে? অনেক রাগ জমে ছিলো? কী হয়েছিলো? ক
এখন এই নিঝুম দুপুরে এসব ভাবতে হবে দিঠি কল্পনাও করে নি। সে একটা নরম মনের আদুরে বিড়াল। ভালোবাসে গান শুনতে, চা খেতে, এবং বিশ্রাম নিতে। প্রেম একটা করবে বলে ভাবছে, কিন্তু তেমন ছেলে পাচ্ছে না। কাউকে পছন্দ হচ্ছে না তার। এই কিছুক্ষণ আগে সে যখন চা খাচ্ছিলো, চায়ে চিনি ঠিকঠাক ছিলো কি না পরখ করছিলো তখন থেকে এখন কেমন জাদুমন্ত্রে বদলে গেলো না! কেমন ঘোর ঘোর লাগছে, কেমন যেন আবেশে চোখ মুদে আসছে, এদিকে যাও পাখি গানের কিন্নরকন্ঠী গায়িকা তার কন্ঠের কসরৎ এখনও দেখিয়েই যাচ্ছে।
“আঙ্গুলের কোলে জ্বলে জোনাকি
জলে হারিয়েছি কান-শোনা কি
জানলায় গল্পেরা কোথা মেঘ
যাও মেঘ চোখে রেখো এ-আবেগ”
মেঘ করেছে এখানেও। এখন বর্ষাকাল। এখন বৃষ্টি হয়। আজও বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে। এতে অবশ্য হত্যাকারীর সুবিধে হবে এক দিক দিয়ে। শরীরে এবং পোষাকে লেগে থাকা রক্তের ছাট ধুয়ে ফেলা যাবে। দিঠি ভালো করে লক্ষ্য করলো, নাহ, রক্তের ছিটে তেমন লাগে নি। তাকে দেখে ক্লান্ত মনে হচ্ছে। স্বাভাবিক। মানুষের গলা খুব শক্ত কোন বস্তু না, তবে মানুষের গলা বলে কথা! একটা মানুষের গলা কাটতে হলে নিশ্চয়ই অনেক বড় কোনো কারণ দাঁড় করাতে হয়, নিজের সাথে অনেক যুদ্ধ করতে হয়, প্রস্তুতি নিতে হয়, চাট্টিখানি কথা তো না! সে মনে হয় এখন চলে যাবে। হ্যাঁ, যাওয়াই তো উচিত। এখানে আর বেশিক্ষণ থাকা উচিত না। হয়তো বা সে হিসেব করেই এসেছে যে এসময় কেউ থাকবে না বাসায়, কিন্তু হিসেব ভুল হতে কতক্ষণ! আজকালকার মেয়েদের খুব ইন্টারনেট থেকে পণ্য কেনার বাতিক আছে। দেখা গেলো কোনো হতচ্ছারা হোম ডেলিভারি বয় এসে উপস্থিত, “ম্যাম আপনি একটি হেয়ার ড্রায়ার অর্ডার করেছিলেন”। লোকটা এখন চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যাবার আগে কী মনে করে মৃত মেয়েটির দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। সেই চোখের ভাষা বোঝা গেলো না। রাগ? ক্ষোভ? ক্রোধ? প্রতিশোধ? নাকি এমনিই, ইচ্ছে হলো বলে! যাহ, তা কি হয়! কী আবোল তাবোল ভাবছে সে হত্যাকারী সম্পর্কে! কারো সম্পর্কে না জেনে কোনো সিদ্ধান্তে আসা উচিত না। তার কোনো একটা যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না?

লোকটা চলে গেছে। দিঠি এখনও তাকিয়ে আছে জানালা দিয়ে। পর্দা মেলে দিয়েছে। এখন বেশ ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে। আহারে মেয়েটা! খারাপই লাগছে তার জন্যে এখন। নাম যেন কি তার? নীলু? সম্ভবত। নীলু, তোমার স্বামীকে তো দেখেছি। সে খুব বাজেভাবে লুঙ্গি পরতো এবং দাঁত খোঁচাতো। সে খামোখা ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়ে থাকতো হয়তো বা আমাকে ভালোমত দেখবে বলে। তোমার সাথে আমার কথা হয় নি কখনও, কথা হলে এ ব্যাপারে অবশ্যই অভিযোগ জানাতাম। তোমাদের কখনও বারান্দায় বসে গল্প করতেও দেখি নি। কী করতে তুমি সারাদিন? রান্নাবান্না? সাজগোজ? ভীনদেশী টিভি সিরিয়ালে মজে থাকতে খুব? এরকম হলে হয় কী জানো, এমন হুট করেই জবাই হয়ে যেতে হয়। এই আমাকে দেখো, আমি ভালো ভালো গান শুনি, কবিতাও পড়ি মাঝেমধ্যে, দুপুরে অল্প ঘুমাই, বেশি ভাবি। আমাকে কে এসে গলা কেটে যাবে বলো? তোমার সাথে আগে কথা হলে ভালো হতো। যে তোমার গলা কেটে গেলো, তার সম্পর্কে কিছু জেনে নিতাম। এখন তো আর জানার উপায় নেই। সে এখন কোথায় গিয়ে পালিয়ে থাকবে কে জানে! উহু, তুমি ভাবছো আমি তার প্রেমে পড়ে গেছি? যে লোক মানুষের গলা কেটে বেড়ায়, আমি তার প্রেমে পড়তে যাবো কোন দুঃখে? তার কাঁধটা মোটেও চওড়া না, হাতের পেশীও সুগঠিত নয়, নীল রঙের শার্টটাও ঢোলা। চুলগুলো সুন্দর নয়। গোঁফটা অবশ্য ভালো। আজকালকার ছেলেরা গোঁফ রাখতে চায় না। আর কেউ রাখলেও তা মানায় না। কিন্তু তোমার হন্তারককে বেশ মানিয়ে গিয়েছিলো কিন্তু। তবে শক্তিশালী এই মানুষটিকেও শেষদিকে বেশ ক্লান্ত আর বিপর্যস্ত দেখাচ্ছিলো। কিছুটা দুঃখিতও হয়তো। এই মেয়ে, সে কি তোমার প্রাক্তন প্রেমিক ছিলো? তাকে ছেড়ে গেলে কেন? আমি হলে কি তাকে ছাড়তাম কখনও? মনে হয় না।
আচ্ছা এখন একটু ঘুমিয়ে নেই, কী বলো? খবরটা ছড়াবে খুব দ্রুত। অনেক ঝক্কি ঝামেলা হবে। সেসব সামলানোর আগে স্নায়ু শীতল রাখতে হবে। এসো ঘুম!

মানুষজনের আচার আচরণ খুব বেশি অনুমানযোগ্য। সন্ধ্যেবেলায় ঠিক যা যা হবার কথা ছিলো তাই হলো। পুলিসের গাড়ি, কান্নার শব্দ, কে কাঁদছে কে জানে! ঢাকা শহরে যে মানুষটি তার পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে তাই জানে না, সেও ক্যামেরার সামনে মুখ গম্ভীর করে ম্লানমুখে কাঁদোকাঁদো স্বরে বলবে, “কারো সাতে-পাঁচে ছিলো না মানুষটা, কে এই সর্বনাশ করলো! আমরা এর বিচার চাই”। হ্যাঁ, বিচার তো ছেলের হাতের মোয়া, যে চাইলেই এসে উপস্থিত হবে তোমার কাছে!
-মা, কী হয়েছে? ওখানটায় এত ভিড় কেন?
-সর্বনাশ হয়েছে! পাশের বিল্ডিংয়ের নতুন ভাড়াটিয়ার ওয়াইফ খুন! জবাই! দিনে দুপুরে এসে গলা কেটে গেছে।
-কী বলো এসব! কোথায় যাচ্ছে আমাদের সমাজ! নাহ, সরকারের এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
দিঠিকে একটু অভিনয় করতে হলো। খামোখা প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে নিজের এবং অন্যের বিপদ বাড়ানোর মানে হয় না। নীল শার্ট, ঝাকড়া চুল, সুগঠিত শরীর…নাহ এখন একটু আদা চা দরকার।
-মা, চা করি?
-হ্যাঁ, করতে পারিস। আমারটায় এলাচ দিস।
যাক, হত্যাকান্ড প্রসঙ্গটা বদলানো গেছে। সত্যিই, অস্বস্তিকর।

দিঠি ভার্সিটি যাবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে। মধ্যবিত্ত ঘরের কাজলচোখের শ্যামলা মেয়েরা ভার্সিটি যাবার জন্যে প্রস্তুত হলে ভারি ভালো লাগে দেখতে। অনেকদিন ছুটি কাটিয়েছে। এখন সকালের মিষ্টি আলোয় বন্ধুদের সাথে আবার দেখা হবার আনন্দে সে ঝলমল করছে। দিঠি ঝলমলে হতে ভালোবাসে। ভার্চুয়াল জগতের ফ্যাকাশে নীল আলো ওকে টানে না। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের বাহারি জগৎ ওর কাছে ম্লান লাগে। দিঠির হাতে এক কাপ গরম চা। তাতে লেবুর সুবাস। দিঠির বাবাও আজকে ওর সাথে যাবে বড় রাস্তা পর্যন্ত। অনেকদিন বাবার সাথে গল্প করা হয় না। ছোটোবেলা থেকেই সে খুব বাবা ন্যাওটা। ছোটবেলার মত বাবার হাত ধরে যেতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু এখন তেমন করলে মানুষজন বাঁকাচোখে তাকাবে। মানুষ এত নোংরা! ছিহ!
-রেডি হয়েছিস দিঠি? চল বেরুই।
বাবা তাগাদা দেন।
-হ্যাঁ বাবা, চলো।
ওরা দুজন হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে গল্প করছে। বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যান্টিন, ছাদের বাগান, ঘুলঘুলিতে বাসা বাঁধা চড়ুই, পুরোনো মানুষজন, ফেলে আসা ঘরদোর, মেট্রোসিটির নাগরিক জটিলতা এবং যাপিত জীবনের নানারকম সুখময় খন্ড। দিঠির বাবা শুভবোধসম্পন্ন এবং সংবেদনশীল মানুষ। তিনি কোনো অসুন্দর প্রসঙ্গ ওঠাতে চান নি। কিন্তু পাশের বাসায় এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেলে মন কিছুটা চঞ্চল হয় বৈ কি! কিছুটা স্খলন তো মেনে নেয়াই যায়!
-কালকে কী একটা ঘটনা ঘটে গেলো, না! ইশ, একদম গলা ফাঁক করে দিয়ে চলে গেলো! কী দোষ করেছিলো সে!
-আহা, বাবা এরকম তো হতেই পারে। এরকম হয়েই থাকে। এত আপসেট হয়ো না তো বাবা।
দিঠির বাবার ভালো লাগলো ব্যাপারটা। দিঠি আর আগের মত ছোট্টটি নেই। বেশ শক্তপোক্ত আর পরিণত হয়ে উঠেছে।

বন্ধুদের সাথে পুনর্মিলনটা যতটা আনন্দময় হবে বলে ভাবা হয়েছিলো ততটা হলো না। কেমন আছিস, কার সাথে প্রেম করছিস, পরীক্ষার প্রিপারেশন কেমন, মুটিয়ে গেলি কেন, এতসব ভালো ভালো কথার সাথে খুনের প্রসঙ্গটাও যে কেন আসছে! সারা দেশ জেনে গেছে এই খুনের কথা। আর যেন খুন হয় না! সব দোষ ঐ নীল শার্ট পরা সুঠাম চেহারার যুবকের? যার ঢেউ খেলানো চুলে উজ্জ্বলতা আর রুক্ষতা জড়াজড়ি করে থাকে। তার নাকটা বেশ টিকালো। চোখের দৃষ্টি আশ্চর্য নীল। নীল রংটা কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা না? ঘামে ভেজা শার্টটা যখন তার শরীরে লেপ্টে ছিলো, কী সুন্দর দেখা যাচ্ছিলো শরীরের ভাঁজগুলো! যাহ, দিঠি মোটেও শরীরপিয়াসী নয়।
-তোদের বাসার পাশেই এমন একটা ঘটনা ঘটে গেলো, তুই কিছু জানিস না? বিস্তারিত বল না!
সবার খুব আগ্রহ। দিঠির কি দায় পড়েছে বিস্তারিত জানানোর?
-এসব জিজ্ঞেস করিস না তো, খুব সিক লাগে।
দিঠির বন্ধুরা বোঝে ওকে। নরম মনের মেয়ে, সংবেদনশীল। ওকে আর বেশি ঘাঁটানো ঠিক হবে না। প্রিয়তম বন্ধুটি ওর মন ভালো করার জন্যে সুন্দর কিছু বলবে ভাবছিলো, কিন্তু তেমন কিছু না পেয়ে ফুচকা খাওয়ার আহবান জানালো। ফুচকা একটি চমৎকার খাবার। ফুচকা খাবার সময় মানুষ আন্তরিকভাবে কথা বলে, হাসে। দিঠির ভালো লাগে।
-তোর জন্মদিনে একটা চমৎকার নীল শার্ট কিনে দেবো। নীল রং কি তোর ভীষণ প্রিয়? আমারও! সে তার প্রিয় পুরুষবন্ধুকে সহৃদয়তা দেখায়।
-নীল না, আমার প্রিয় রং সবুজ। তবে তুই যেটা দিবি সেটাই নিবো।
এহ, যেটাই দিবো সেটাই নিবে! প্রিয় রং সবুজ! কোথা থেকে এসেছে সবজিপ্রেমিক! দিঠির আর ভালো লাগছে না এখানে। সে সবুজরঙঅন্তপ্রাণ সঙকে গিফটও দেবে না কিছু। সবুজ বড় বেশি কোমল আর ম্যাড়ম্যাড়ে রং। এর মধ্যে কোন দ্যুতি নেই। এহ আবার কেমন তেলতেলে হাসি হাসছে! কিছু করার তো মুরোদ নেই, সারাক্ষণ খালি মেয়েদের পেছনে ছোঁকছোঁক করে ঘোরা, আর কবিতা, পাঞ্জাবি, চিঠি ইত্যাদি অনাকর্ষণীয় বস্তু দিয়ে মেয়েদের মন গলানোর চেষ্টা করা, গেট আ লাইফ ম্যান! দিঠি এসবের মধ্যে নেই। তুমি বাতিল মৌসুমী পুরুষপাখি। দিঠি নীল রং দেখতে ভালোবাসে। জবজবে নীল রং। সে নীলের দ্যুতি দেখতে চায়। তার আর ভালো লাগছে না এখানে। সে বাসায় যাবে। নীলের মধ্যে লালের ফুটকি দেখবে।
-চলি রে!

বাসায় পুলিস এসেছে। জিজ্ঞাসাবাদ করছে। বাবা-মা ভয়েই অস্থির! এত ভীতু তাঁরা!
-আমরা এসবের কিছু জানি না।
-ঘটনার দিন আপনারা বাসায় ছিলেন?
-আমি আর আমার মেয়ে ছিলাম।
-আপনার মেয়ে কোথায়!
এই যে আমি!
আরেকটু হলেই চিৎকার করে বলেই দিচ্ছিলো আর কী! নিজের ছেলেমানুষীতে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেলো সে।
-হ্যাঁ বলুন, আপনি কি কিছু দেখেছেন?
-আমি কিছু দেখি নি।
-নীলুর সাথে কি আপনার কখনও কথাবার্তা হয়েছে?
-না হয় নি।
-ঠিক আছে। আসলে রুটিন চেকআপের জন্যে আসা। আমরা এখনও কোন ক্লু বের করতে পারছি না ঘটনার। আপনারা যে এতে সম্পৃক্ত নন তা জানি।
-খুনী সম্পর্কে কিছু জানা যায় নি, না?
কন্ঠের উচ্ছ্বাস দিঠিকে বিব্রত করে। একদম ছেলেমানুষী কাজকারবার!


দিঠি শুয়ে আছে। দিঠি নরোম আর কোমল। ওর মুঠোফোনের নীলাঞ্চলে কিছু আদুরে বেড়ালের ভিডিওচিত্র, স্বর্গের ওম মাখা শিশুরা, আনন্দে ঝলমল দম্পতিদের যুগলবন্দি, কারো চাকুরির পদোন্নতির খবর, কেউ হয়তো সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেয়ার আহবান করছে অসহায় কারো জন্যে। আহারে, সবখানে শুধু আনন্দ থাকলে কতই না ভালো হতো! কর্কটরোগে আক্রান্ত মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকা কারো না কারো জন্যে দিঠি প্রায় প্রতিমাসেই কিছু না কিছু আর্থিক সাহায্য করে নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে। এ মাসের টিউশনির টাকাটা পেলে ক্যান্সারে আক্রান্ত এক যুবতীকে অবশ্যই কিছু সাহায্য করবে।
দিঠি স্বাস্থ্য সচেতন এবং প্রযুক্তির কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে অনাগ্রহী। সম্প্রতি ও জেনেছে মোবাইল ফোন এবং সোশাল মিডিয়ায় বেশি সময় কাটানোর কুফল। তাই ও স্ক্রল বন্ধ করে। শুধুমাত্র এজন্যেই কি ওকে স্ক্রল বন্ধ করতে হচ্ছে? নাকি অন্য কারণ আছে? নাহ, অন্য কারণ আর কী থাকবে!
দিঠি এখন গান ছেড়ে দেবে।
তারপর জানালার পাশে দাঁড়াবে।
তারপর তাকাবে ওপাশের ফ্ল্যাটে।
গ্রিলের ফাঁক দিয়ে গাঢ় আবছায়া দেখা যায় ওখানে। আর কিছু না। দিঠি তাকিয়েই থাকে স্থিরচোখে।
“যাও পাখি বলো, হাওয়া ছলোছলো, আবছায়া জানালার কাঁচ...
আবছায়ার গহীনে ঝিলিক দিয়ে ওঠে নীল রং।
ওপাশে নতুন কোন দৃশ্য রচিত হচ্ছে না। খামোখাই তাকিয়ে থাকা অবিরাম শূন্যতার দিকে। পাখিরা পালক ফেলে যায়। খুনীরা ফেলে যায় চিহ্ন। সে কি কোনো চিহ্ন ফেলে যায় নি? কেউ কেন তাকে এখনও ধরতে পারছে না? সে যদি বলে দেয় যে তার পরনে ছিলো গাঢ় নীল রঙের শার্ট, তার চুল ছিলো এলোমেলো আর কোঁকড়া, তার কাঁধ ছিলো গ্রিক দেবতাদের মত সুঠাম, তাহলে কি ওরা তাকে ধরে নিয়ে আসতে পারবে? তাহলে কি সে তাকে আরেকবার দেখতে পারবে?
দিঠি ফোনটা হাতে নেয়। পল্লবী থানার নাম্বারটা যেন কত? ওহো, সে তো নাম্বারই জানে না। এ যুগে যদিও নাম্বার জেনে নেয়াটা খুব সহজ, তবুও আরষ্ট হয়ে ওঠে ওর আঙ্গুল, আরক্ত হয়ে ওঠে গাল। থাক না, এত তাড়াহুড়োর কী আছে!
দিঠি শুয়ে আছে। ওর ঘর অন্ধকার। ভারী পর্দা টাঙিয়ে দেয়া। আকাশটাও আজ মেঘলা আর অন্ধকার। আলো নেই। একটা ডিমলাইট জ্বলছে নিভছে। দিঠির হাতে বেডসুইচ। ডিমলাইটের রঙ নীল।
দিঠিদের বাসায় কেউ নেই। কেউ কি আসবে? কেউ কি আসছে? অসহনীয় আতঙ্ক আর শিহরণ বুকে চেপে দিঠি অপেক্ষা করতে থাকে ক্ষরণের।

মন্তব্য ১২ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (১২) মন্তব্য লিখুন

১| ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ১২:০৬

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: “আঙ্গুলের কোলে জ্বলে জোনাকি
জলে হারিয়েছি কান-শোনা কি
জানলায় গল্পেরা কোথা মেঘ
যাও মেঘ চোখে রেখো এ-আবেগ”

........................................................................
আমরা আবেগ প্রবন জাতি, তাই আমাদের ভালবাসায়
মান অভিমান আছে ।

১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ১২:০৯

হাসান মাহবুব বলেছেন: আপনি গল্পটা আরেকবার পড়বেন কি?

২| ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ১২:১৫

রাজীব নুর বলেছেন: এখন চুপ করে পরে গেলাম।
মন্তব্য করবো সকালে।

১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ বিকাল ৩:৫৮

হাসান মাহবুব বলেছেন: ঠিক আছে।

৩| ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ সকাল ১০:২২

রাজীব নুর বলেছেন: একটি সাদা পাতার আর্তনাদ,,
অনেকেরই অনুভব হয় খড়া চললে।

১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ বিকাল ৩:৫৮

হাসান মাহবুব বলেছেন: শুভেচ্ছা।

৪| ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ৮:৫৯

ইসিয়াক বলেছেন: আপনা‌কে ধন্যবাদ ও বিজয় দিব‌সের শু‌ভেচ্ছা

১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ১০:২৩

হাসান মাহবুব বলেছেন: ধন্যবাদ।

৫| ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ১০:৫০

এস এম মামুন অর রশীদ বলেছেন: বর্ণনা জোরালো, কাহিনিতে বিদেশী সাইকো-থ্রিলারের ছাপ স্পষ্ট। সিরিয়াস মনস্তাত্ত্বিক গল্পে পরিচিত গানের চরণ গল্পের প্লট দুর্বল করে ফেলে।

১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ১১:২৬

হাসান মাহবুব বলেছেন: আপনার মন্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ। সাইকো থ্রিলার নিয়ে বাংলাদেশে তেমন কাজ করা হয় নি। কিন্তু তার মানে এই না যে বাংলাদেশে এমন ঘটনা ঘটে না, এমন চরিত্র নেই। বিদেশীরা শুরু করেছে, এগিয়ে নিয়েছে, তারা এই জনরার পথিকৃৎ তাই লিখতে গেলে তাদের মত মনে হতে পারে, তবে আমি কাউকে অনুসরণ করে লিখি নি। সিরিয়াস গল্পে হালকা চালের গান দিয়ে একটা কনট্রাস্ট তৈরি করতে চেয়েছি। আমাদের যাপিত জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে, আমাদের দৈনন্দিনে মিশে থাকে পাপ, এজন্যেই হালকা বিষয়াদী নিয়ে আসা।
শুভরাত্রি।

৬| ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ২:০৮

আমি তুমি আমরা বলেছেন: গল্পটা ভাল লেগেছে। যদিও ভেবেছিলাম খুনী হয়ত দিঠিকে দেখেছে, শেষ পর্যন্ত হয়ত সে আসবে দিঠির জন্য। হল না, তবে খারাপ লাগেনি।

৭| ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ সকাল ১০:০১

হাসান মাহবুব বলেছেন: ধন্যবাদ আমি তুমি আমরা। শুভেচ্ছা রইলো।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.