| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
কলিং বেল বাজাবে, না-কি ফোন দেবে? এ ব্যপারটা নিয়ে রায়হান খানিকক্ষণ ভাবলো।কিছুটা সঙ্কোচ আর কিছুটা দ্বিধা কাজ করছিল তার মধ্যে ।একবার তো ভাবলো ফিরেই যাবে। এত দিনের অনভ্যাস,সম্পর্কটাও যখন মৃতপ্রায় ।কি দরকার।যা হয় আরকি, এ ধরনের পরিস্থিতিতে জড়তা কাজ করাই স্বাভাবিক ।
রায়হানের মনের মধ্যে চলা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে হুট করে গেটটা হঠাৎ খুলে গেল।
দরজার ওপাশে সুরাইয়া বেগম।তিনি এক মুহুর্ত থমকে দাঁড়ালেন।তবে অবাক হননি, জানতেন রায়হান আসবে। নিরুত্তাপ গলায় বললেন,
- তুমি চলে এসেছো।ভালোই হল।আমি ভাবছিলাম দেরি হবে হয়তো।রাস্তায় যা জ্যাম।পথে কোন অসুবিধা হয়নি তো?
- না। সব ঠিকই ছিল। সমস্যা হয়নি।
-এতটা পথ এলে.. । আমি তো বেরুচ্ছি। যাবে কি আমার সাথে?
রায়হানের অস্বস্তি এখনও কাটেনি বরং বেড়েছে।কেন জানি মনে হচ্ছে সুরাইয়া বেগম এখনও তাকে মেনে নিতে চাইছেন না শুধু প্রয়োজন বলেই বাধ্য হয়ে স্বাগত জানাচ্ছেন।রায়হান অবশ্য এই মহিলাকে হাড়ে হাড়ে চেনে । আর এটাও তো সত্যি আজ এতগুলো বছর পর সে এ বাড়িতে আগন্তুক ছাড়া অন্য কিছুই নয়। নিতান্ত প্রয়োজন তাই তাকে ডেকে নেওয়া হয়েছে।... ভারি ব্যাগ নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া কি ঠিক হবে?
রায়হান ক্লান্ত স্বরে বলল,
- ব্যাগটা রাখতাম।
- ও, তাহলে ব্যাগ রেখে হাত মুখ ধুয়ে নাও। রিকশায় যেতে যেতে কিছু খেয়ে নিও কি বল? আসলে হাতে সময় নেই। কেউ তো নেই পাশে। কখন কি হয় বলা যায় না।অবস্থা একদমই ভালো না। আমি ঘন্টা দুয়েক আগে ফিরেছি। আসলে হাসপাতালের টয়লেটগুলো আমার সহ্য হয় না।এদিকে....
রায়হান এইসব অপ্রয়োজনীয় কথাগুলো ঠিক শুনছিল না।তার পায়ের যন্ত্রণাটা গত রাত থেকে আবার ফিরে এসেছে। এদিকে মনের উপর চাপ বাড়ছিল। দায়িত্ববোধ থেকেই সে ফিরে এসেছে কাজ শেষে ফিরতে পারলেই সে বাঁচে। কতটা অসুস্থ তার উপর ফিরে যাওয়া নির্ভর করছে।
এত সকালে রাস্তা ফাঁকাই ছিল।রিকশায় ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছাতে মিনিট কুড়ি লাগলো। হঠাৎ করে ক্ষিদে অনুভব হচ্ছে। এ অবস্থায় খাওয়া দাওয়া কি ভালো দেখায়? হাজার হলেও মৃত্যু পথযাত্রী লোকটা তার জন্মদাতা পিতা।
যে প্রশ্নটা আগেই করা উচিত ছিল সেই প্রশ্নটা রায়হান এবার করল,
- আব্বা কেমন আছেন এখন?
- বুঝতে পারছি না। ডাক্তার তেমন আশা দেননি।অনেক টাকা পয়সাও দরকার। হাতে সেভাবে...
- ঠিক কি হয়েছিল। লিফটে উঠতে উঠতে রায়হান জানতে চাইলো।
- গত সন্ধ্যায়। এই সাতটা সাড়ে সাতটা হবে।আমি বাসায় ছিলাম না। রুমকির শাশুড়ী সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম,উনি আমেরিকা যাচ্ছেন ছেলের কাছে।আজই ফ্লাইট ।রুমকির জন্য কিছু কিনেছিলাম, সেগুলোই পৌঁছে দিতে।বাড়ি ফাঁকাই ছিল ।মিলের মিস্ত্রি ভাগ্যিস কি এক কাজে ভেতর গিয়েছিল। তখন দেখে....
হাসপাতালে অদ্ভুত একটা গন্ধ থাকে। রায়হানের সেই গন্ধটা কেন জানি একদমই সহ্য হয় না। নিজের অজান্তে তার নাক মুখ কুঁচকে উঠলো।
(২)
দিন তারিখ মনে নেই তবে রায়হান এই শহরটা ছেড়ে গেছে আজ থেকে প্রায় বছর ত্রিশ আগে । আর ফেরা হয়নি। তবে দিনগুলো তার স্মৃতিতে স্পষ্টই আছে, না মনে থাকার কোন কারণই নেই। সেই দিনগুলোর প্রতিটা মুহুর্ত ছিল চরম অপমান আর লাঞ্ছনার। গোড়া থেকেই তাদের জীবন ছিল অস্বাভাবিক। মায়ের রহস্যময় মৃত্যুর পর তারা দুই ভাই বোন একেবারে পানিতে পড়ার মত অবস্থায় ছিল ।কেউ কোথাও নেই। আত্মীয় স্বজন সব সুখের দিনে থাকে দুঃখের দিনের কেউ না।এই প্রচলিত কথাটাও পরিষ্কার হতে সময় নেয়নি।কি এক রহস্যময় কারণে কেউ ফিরেও তাকায়নি তাদের দুই ভাই বোনের দিকে। আর রুবায়েত হোসেন বরাবরই লাগাম ছাড়া মানুষ। অসামাজিক, বদমেজাজি এবং অহংকারী ।যেমন আচরণে নোংরা তেমন তার ব্যবহারে রুক্ষতা। সাইকো টাইপের লোকটা চিরকাল আত্নঅহংকারী আর অত্যাচারী। চাকরিচ্যুত হবার পর তার আচরণের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছিল ।রায়হানের মায়ের মৃত্যুটা যে স্বাভাবিক মৃত্যু নয় এটা রায়হান ছাড়া আর কে বেশি জানে। ছোট বেলা থেকেই রায়হান দেখে এসেছে বদরাগী রুবাইয়েত হোসেনের নিত্য অত্যাচারের নতুন নতুন ফর্মূলা। এটা ছিল তার রুটিন ওয়ার্ক।
বড় ধরনের ট্রাজেডি হলো রুবায়েত হোসেনের অত্যাচারের কথা কেউ তেমন একটা আমলে নিত না। সেহেতু নালিশ জানানো বৃথা চেষ্টা।
পট পরিবর্তনের পর সংসার সামলানো ঘর গোছানো রান্না বান্না। বাবা ও বোনের যাবতীয় কাজ তদারকি করা। তাদেরকে দেখে রাখা। সব দায়িত্ব অলিখিতভাবে রায়হানের। কাজের কোন অন্ত নেই ।এদিকে সব কাজ নিখুঁত ও পরিপাটি হওয়া চাই। না হলে শুরু হতো অত্যাচার আর লাঞ্ছনা।এত এত কাজের চাপে তার পড়াশোনা বন্ধ হবার উপক্রম। স্কুলের পথ সে ভুলতে বসেছিল। এর মধ্যে রুবায়েত হোসেন ঘরে নতুন বউ নিয়ে হাজির হলেন।নতুন বউ এলেও কাজ ফুরায় না রায়হানের।বউ যেন এক পটের বিবি। তারও নানা অর্ডার।সুরাইয়া বেগম সংসারের কাজকর্ম কিছুই পারেন না।এমতাবস্থায় এক দুপুরে তরকারিতে লবন কম হওয়ার কারণে গরম খুন্তি ছ্যাকা খাওয়ার পর রায়হান সিদ্ধান্ত নিল এ বাড়িতে আর নয়।যে দিকে চোখ যায় সেদিকে চলে যাবে সে। সেদিন কতক্ষণ মেঝেতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল ঠিক মনে নেই তার। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। দেহের কষ্ট তো ছিল মনে কষ্ট ছিল আরও বেশি। এই পৃথিবী এত নিষ্ঠুর কেন?
(৩)
কাজ থেকে ফিরে রায়হান সাধারণত তার ছেলেকে নিয়ে বসে।সেই সময় রুবি বারান্দায় সেলাই মেশিনে কাজ করে। একজনের আয়ে সংসার চালানো আজকাল সম্ভব হয়ে ওঠে না।সব জিনিসপত্রের যে দাম! তার উপর ভাড়া বাসা। ছেলেটি তার অসম্ভব মেধাবী অন্তত রায়হানের কাছে তাই মনে হয়।সংসারে অভাব থাকলেও সুখের কমতি নেই। দিন কাটছিল ভালোই। এক সন্ধ্যায় মামাতো ভাই জালালের ফোন এলো।কিছু রুটিন কথাবার্তার পর সে জানালো এক ভদ্র মহিলা না-কি তার সাথে কথা বলতে চায়। খুব জরুরী কি দরকার। রায়হান অবশ্য অবাক হয়েছিল।কে এই মহিলা কে জানে। ছেলের বার্ষিক পরীক্ষা সামনে। পড়ানোর অযুহাতে এড়িয়ে যাবে কি-না ভাবছিল সে । ঠিক তখনই ওপাশ থেকে অচেনা কণ্ঠ ভেসে এল।
- আমি তোমার মা। আমাকে চিনছো রায়হান।
হঠাৎ শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল তার। মুখ দেখা না গেলেও কণ্ঠটা চেনা।কেমন যেন ঠান্ডা হিসহিসে। রায়হানের ভাবনা থমকে গিয়েছিল। অনেক কিছু তার মাথায় একসাথে এসে জড়ো হয়েছিল সেই সময়। সম্পর্কের সুতোর টান অস্বীকার করা বড় শক্ত। নিজের শিকড় বলে কথা। কিছুটা বিরতির পর রায়হান বলল
- ও আপনি? কেমন আছেন?
- আছি বাবা এক রকম তুমি আর যোগাযোগ রাখলে না।আমরা যে কী বিপদে। এই বয়সে আমাদের কে দেখবে বল?
কথায় কথা বাড়ানো যায়।রায়হানের ইচ্ছে করছিল না। অন্য প্রসঙ্গে না গিয়ে রায়হান বলল
- কোন সমস্যা?
- সমস্যা না আবার সমস্যা।
- বুঝিনি।
- রুমকি আর আয়ান দু'জনেই বিদেশে।এদিকে বাড়িতে আমরা বুড়ো-বুড়ি একা। তোমার আব্বা অসুস্থ আমার শরীরটাও ভালো না।বোঝই তো বয়স হয়েছে ।ঢাকার মত জায়গায় আমাদের দেখার কেউ নেই বাবা।তুমিও তো আর যোগাযোগ রাখলে না। অনেক খুঁজে খুঁজে তোমার নম্বরটা পেলাম।কত ঝামেলা যে চারপাশে, সেদিন একদল লোক বাড়ি এসে হাজির, জানতে চাইলো আমরা এই বাড়িটা বেচতে চাই কি-না। ষণ্ডা গুন্ডা মার্কার মত লোকগুলোর হাবভাব ছিল বেশ সন্দেহজনক তার উপর তোমার আব্বা প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়ে। কখন যে কি হয়। আমি মেয়ে মানুষ একা। বোঝই তো
- ঠিক আছে সমস্যা হলে জানাবেন আমি আসবো।যদিও রায়হান জানে না সেখানে গিয়ে সে কীভাবে কী করবে।
তারপর থেকে কথা হতো নিয়মিত। হঠাৎ গতরাতে ফোন এলো রুবায়েত হোসেনের হার্ট এ্যাটাক হয়েছে। রায়হান কালক্ষেপণ না করে ছুটে এসেছিল।
(৪)
রায়হানের কি এখন কান্না করা উচিত। সে ঠিক বুঝতে পারছে না। আসলে তার আবেগ কোন কাজ করছে না। সুরাইয়া বেগম ঘরে ভিতরে কোরান শরীর তেলাওয়াত করছেন। পাড়া প্রতিবেশী কয়েকজন বসে আছে উঠানের মত ফাঁকা জায়গাটায়।সুরাইয়া বেগমের এক ভাই বেশ দায়িত্বের সাথে পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন।রায়হানের কাছে পরিবেশটা একদম অচেনা। বাড়ি বয়ে এসে সমবেদনা জানাতে খোঁজ খবর নিতে কেউ কেউ আসছে এবং কিছু সময় থেকে ফিরেও যাচ্ছে।রায়হান কাউকে চেনে না।চেনা পাড়ায় এখন সবাই অচেনা। ত্রিশ বছর দীর্ঘ সময়। অদ্ভুত পরিস্থিতি। তবে এটা ঠিক রুবায়েত সাহেবের শুভাকাঙ্খী তেমন কেউ আর অবশিষ্ট নেই সম্ভবত । অন্তত রায়হানের তাই মনে হয়। বিকেল গড়িয়ে গেছে। তন্ময় আর রুবি কিছু সময় আগে পৌঁছেছে। তন্ময় পুরো বাড়ি ছোটাছুটি করছে।রুবি রান্নাঘরে। তন্ময় মাঝে মাঝে ফিরে এসে উদ্ভট সব প্রশ্ন করছে বাবাকে। প্রশ্নগুলো ঠিক উদ্ভটও নয়।
- আচ্ছা বাবা এটা কি সত্যি সত্যি আমার দাদু বাড়ি?
-হু
- তাহলে আমরা এখানে থাকি না কেন?
- জানি না।
- দাদুর কি হয়েছিল?
- হার্ট অ্যাটাক।
- আচ্ছা তুমি কি বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলে?
রায়হান মৃদু হাসলো
- তুমি তো খুব দুষ্টু।জানো ভালো ছেলেরা কক্ষনও বাড়ি ছেড়ে পালায় না। আমরা কি এখন থেকে এই বাড়িতে থাকবো?
- জানি না।
অপেক্ষা চলমান। লাশ ফ্রোজেন করে রাখা হয়েছে। রুমকি আসতে পারছে না তবে আয়ান আসছে। আজ রাতে ফ্লাইট । ততক্ষণ অপেক্ষা। রাত বাড়লে ভিড় ভাঙে। রায়হান বুঝতে পারছে এবার হয়তো সুদিন আসবে।একটা মৃত্যু অনেক হিসাব বদলে দেয়। রুবি আর তন্ময়ের ভালো থাকাটাই তার কাছে এখন বড়। আসলে সে কখনওই রুবায়েত হোসেনের মত দায়িত্ব জ্ঞানহীন বাবা বা স্বামী হতে চায় না।
এতসব ভাবনার মাঝে তন্ময় ছুটে এসে জানতে চাইলো
- বাবা তোমার কি কষ্ট হচ্ছে? বুকে ব্যথা করছে। কান্না পাচ্ছে? আমার না তোমাকে না দেখলে বুকে ব্যথা করে। কান্না পায়।
এতক্ষণে রায়হানের চোখ ভিজে উঠলো। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে সে কান্না লুকালো।ছোট্ট একটা চুমু একে দিল তার কপালে। এখন তার একটাই কামনা ছেলেটা ভালো থাকুক। সুস্থ সুন্দর পরিবেশে বেড়ে উঠুক। এটুকুই।
সমাপ্ত
© রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক
২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:২১
ইসিয়াক বলেছেন: আমি ভালো আছি আপু। ডান চোখে ছানি অপারেশন করিয়েছিলাম ১৬ই ডিসেম্বরে। এখন সব ঠিক ঠাক আছে।
২|
২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:২৫
শায়মা বলেছেন: বাপরে!!
চোখে অপারেশন শুনলে আমার কি যে ভয় লাগে। ![]()
২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭
ইসিয়াক বলেছেন: অপারেশন না করিয়ে উপায় ছিল না। কিছুই দেখতে পারছিলাম না ঠিক মত। বাচ্চাদের পড়াতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল। তবে চোখের অপারেশনে ভয়ের কিছু নেই। সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত। শুধু চোখের চামড়ায় একটা ইনজেকশন দেয়।পিঁপড়ার কামড়ের মত হালকা ব্যথা লাগে। তারপর ওকে। দুপুর ১২টায় অপারেশন করার পর দশ মিনিটের মাথায় ইজিবাইকে চেপে বাসায় আসি পরদিন সকাল আটটায় ডাক্তারের কাছে গিয়ে । চেকআপ করার পর ছুটি। কিছু ঔষধ, দুটো ড্রপ আর এক মাস ধরে ছোট ছোট নিয়মকানুন মেনে চললে কোন সমস্যা নেই। আমি তো তিন দিনের মাথায় ছাত্র পড়িয়েছি।বৃত্তি পরীক্ষা ছিল ওদের।
©somewhere in net ltd.
১|
২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:১২
শায়মা বলেছেন: দুঃখ কষ্টের গল্প ভাইয়া ......
তুমি কেমন আছো?