| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে কে বেশি ক্ষমতাবান এদেশে? কার কথায় চলে এদেশ? কে নীতি তৈরী করেন? সে হিসেব কার জানা আছে? আমি জানি এদেশে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে ক্ষমতাবান কেউ নেই, তার কথায় দেশ চলে, তিনি কথা বললেই মিলের চাকা ঘোরে, ছাপাখানায় সংবাদপত্রে গরম খবর বের হয়, সেলিনার ভাঙা পা আবার জোড়া লাগে, তার ইশারায় মন্ত্রী সভায় রদ বদল হয়, মুহূর্তেই যে কোন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শান্ত হয়। তার কথায়ই সেনাবাহিনী বিদ্রোহ ছেড়ে ব্যারাকে ফিরে। মসজিদের জোতা চোর থেকে শুরু করে একপ্রকার বড় বড় চোরেরা তাদের স্বভাব পরিবর্তন করে কেবল তার আদেশে। তিনি কথা বললেই যে কোন কাজে সাথে সাথেই একশ্যান নেওয়া হয়, কর্তা ব্যাক্তিদের টনক নড়ে। কিন্তু বন্ধ হয়না গুম, খুন, হত্যা, চাঁদাবাজি আর দূর্নীতি। তাহলে কি এসব যারা করে তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও বেশি ক্ষমতাবান? হতে পারে।
মরার দেশে আজ মানুষ নেই, চামড়ার আড়ালে আছে শুধু ইষ্কালটান। সমাজে বড় হওয়ার নেই কোন উপকরণ, যে সকল কারনে একটি সভ্য জাতি অসভ্যতে রূপান্তরিত হয় তার মধ্যে অনেকগুলোই আমরা অর্জন করেছি। আপাততেতর জন্য এটা আমাদের সুখবর। প্রত্যেকটা কাজের দুটো ফলাফল থাকে, এই যেমন সূর্যের দুটো গুন একটি আলো, আরেকটি তাপ। সভ্য জাতি থেকে অসভ্য জাতিতে রূপান্তিরত হলেও, সভ্যতার সুনাম হারালেও আমাদের আফসোস করার তেমন কিছু নেই কারণ সভ্য জাতির অনেক কিছু মেনে নেয়া যায়না কিন্তু অসভ্যরা যা করে তা তাদের জন্য মানানসই। সোমালিয়া, কেনিয়া, রুয়ান্ডা, উগান্ডা এসব দেশের দূর্নীতি প্রবণতা ও জীবনযাত্রার মান বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ। এসব দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই শোচনীয়। তাই এরা জলদস্যু, ডাকাত, দূর্নীতিবাজ। এটা বিশ্ব মেনে নিয়েছে কারণ তারা সভ্য নয়। আমরা যদি নিয়মিত ভাবে গুম, খুন, হত্যা, দূর্নীতি, ক্ষমতার দ্বন্ধ চালিয়ে যেতে পারি তাহলে বিশ্ব আর আমাদের দিকে বাঁকা চোখে তাকাবেনা। আমাদের হিউমেন রাইটস্ নিয়ে কোন কথা উঠবে না আর্šÍজাতিক মহলে। কারণ আমাদের সাথে ওই শব্দগুলো ততদিনে এঁটে যাবে। তখন স্বগৌরবেই হোক আর পরগৌরবেই হোক আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব। তবে সেটা সভ্য দেশের সাথে নয়, অসভ্য দেশের সাথে। উন্নত দেশের সাথে নয়, অনুন্নত দেশের সাথে। অতএব আমাদের বর্বর হয়ে ওঠারও একটা সুফল খুঁজে পেলাম। পৃথিবীতে বিখ্যাত না হতে পারি কুখ্যাত তো হতে পারি।
যে সমাজে ন্যায় বিচার নেই সে সমাজে নীতি বাঁচেনা। যে দেশে ভাল মানুষ নেই সে দেশ হয় বর্বর। কবি সুকান্তের কবিতার মত বলতে চাই, ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না/ এই জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ আমার দেশ না/ এই বিস্তৃন্য শশ্মান আমার দেশ না/ এ রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না।’ দেশে আজ কয়েম হয়েছে গুমের রাজতন্ত্র। সাধ হোক আর না হোক, ইচ্ছে হোক আর না হোক গুম হয়ে যেতে পারেন যে কেউ। সকালে ঘুম ভাঙলেই একটি করে গুমের খবর আজকাল বিনোদনের খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বজনদের আহাজারি, ছেলেমেয়ের অশ্রুপাত আমরা হর হামেসাই এঁড়িয়ে যাচ্ছি। একদিকে ঘটনা ঘটে আরেক দিকে তদন্ত, আরেক দিকে সরকারের ব্যবস্থা নেওয়ার শ্রুতি। অথচ দিনের পর দিন পার হয় কিন্তু কোন মামলারই সুরাহ হয় না। না হলো ইলিয়াস আলীর আর না হলো মাজহারুল, সাজেদুল ইসলামের। বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিস কেন্দ্র্রের (আসক) এর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার থেকে নেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট ২৬৮ জনকে অপহরণ করা হয়, এর মধ্যে ৪৩ জনের লাশ পাওয়া যায়। অপহরণের পর ছেড়ে দেওয়া হয় ২৪ জনকে, পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয় ১৪ জনকে। কিন্তু ১৮৭ জনের কোন খোঁজ মেলেনি (তথ্য:প্রথম আলো ০৪ মে,২০১৪)। পুলিশ বাহিনীর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ শাখার তথ্যে ২০১১ সাল থেকে ২০১৪ সালের মার্চ পর্যন্ত গুম হয়েছে ২৮৮৫ জন যার মধ্যে গত তিন মাসেই অপহরণ হয়েছে ১৯৬ জন। র্যাপিড এক্যাশন ব্যাটালিয়ানের আইন ও জনসংযোগ শাখার তথ্যে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে অপহরণ হয়েছে ২৬৪১ জন যাদের মধ্যে ১০৮৭ জনকে উদ্ধার করা হয়। বাকি ১৫৫৪ জনের কোন হদিস নেই।
এই চিত্র আমাদের সোনার বাংলাদেশের। এই সফলতা আমাদের গণতান্ত্রিক সরকারের। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। যারা গুম, অপহরণ আর খুন হয়েছেন তারা আমার, আপনার ভাই-বাবা না হলেও কারো না কারো ভাই, কারো না কারো বাবা। সর্বোপরি তারা এদেশের নাগরিক। তাদের নিরাপত্তা বিধান করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যখন নিজের মুখেই বলে ফেলেন প্রত্যেকের বেড়রুমে নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের কাজ নয়। তখন আর আমাদের কিছুই বলার থাকেনা। প্রত্যেকের ঘরের নিরাপত্তার বিধান যদি না টেকে তাহলে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তার বিধান টিকবে কিসের জোরে। মানুষ গুম হচ্ছে সমান হারে আর গণতন্ত্র গুম হয়েছে সবার আগে। ব্যর্থ রাষ্টে নাগরিক নেই, আছে দাস। এদেশে নাগরিক হাতে গোনা কয়েকজন। যারা সম্মানিত সুশিল সমাজের প্রতিনিধি। তাদেরকে সরকার সেল্টার দেয়, ব্রিফ দেয়, সেফ্টি দেয়। অপকর্মের জন্য পুরষ্কারও দেয়। বিশেষ দিবসে এরা সামনের আসন দখল করে। এদের নিরাপত্তা বিধান করাই সরকারের দায়িত্ব। এদের নিয়ে সরকারের মাথা ব্যথা। আমাকে আর আপনাকে সরকার কেন নিরাপত্তা দিবে? যুক্তি কি? আপনি এক কদুমদু না থাকলে সরকারের কি হবে? কিছুই হবেনা। কিছু হওয়ার যুক্তিও নেই। তাই সরকারের বিভিন্ন মহল বারংবারই বলছে, দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সরকার উদ্বিগ্ন নয়, বিচলিত নয়, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা ইত্যাদি, ইত্যাদি। কারণ নাগরিক হারালে ভয়, গুম হলে চিন্তার বিষয়, কিন্তু দাস মরলে কার কি আসে যায়। এরা কালপিট, রাবিশ অথবা যাচ্ছেতাই। এদের দরকার শুধু ভোটের সময়। আজকাল আবার তাও দরকার হয়না, কারণ কেউ ভোট না দিলেও ভোটে জেতা যায়, ক্ষমতায় এঁটে বসা যায়। তাই নাগরিক হতে হলে, সুশিল হওয়ার বাসনা থাকলে বড় বড় চুরির ফিকির জানতে হবে। সরকারের কাছে প্রিয় ব্যাক্তি হতে চাইলে ধর-মার-খা এই নীতিতে অটল থাকতে হবে। এক হাতে গরীবের সম্পদ লুট করে আরেক হাতে নাম লেখাতে হবে জনসেবায়। গলাবাজি, দলবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিতে পারদর্শী হতে হবে। তবেই বছর ঘুরলে সেরা নাগরিকের পুরষ্কারটি পড়বে আপনার গলায়। মানুষ আপনাকে সুশিল বলে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে প্রণাম করবে। আমরা কি তাই করছি না?
কেয়ামতের আগে পৃথিবীতে দাজ্জালের আগমন হবে। সে পৃথিবীর মানুষকে তার দলে অর্šÍভুক্ত করবে। যে তাকে অস্বীকার করবে তাকেই সে মেরে ফেলবে। আমাদের এই বঙ্গ স্বদেশে বহু রাজনৈতিক কানা দাজ্জালে আর্বিভাব হয়েছে। তারা রাজনৈতিক ক্ষতার নাম ভাঙ্গিয়ে লুট করছে সম্পদ, ভরাট করছে নদী, দেশ বিক্রির পায়তারা মগ্ন। যে তাকে অস্বীকার করছে, যে তার বিরুদ্ধে কথা বলছে তাকেই করা হচ্ছে গুম, তাকেই করা হচ্ছে খুন। তার পেট চিড়ে রেশনের বস্তায় লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে শীতলক্ষ্যায়। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, কাউন্সিলর মাজহারুল ইসলাম, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি ও নারায়াণগঞ্জের কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ সাত খুন কি রাজনৈতিক রোষানল নয়? এই দাজ্জালেরা কোন না কোন রাজনৈতিক দলের লোক, কোন না কোন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় লালিত। বড় ধরণের শক্তি এদের পেছনে কাজ না করলে, বড় ধরণের শক্তি এদের সেল্টার না দিলে, এতগুলো গুমের কোন সুরাহ, এতগুলো হত্যার কোন হদিস, কোন অপরাধীর নাগাল না পাওয়া হয়তো সরকারের স্বদিচ্ছার অভাব নয়তো সরকার নিজেই চায় না এসব খুনিরা বের হয়ে আসুক। কারণ মাঝে মাঝে আবার কেঁচো খুঁজতে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসে। এই ভয়টা তো থাকতেই পারে।
এভাবে একটি সভ্যতা চলতে পারেনা। জাতির সন্তানরা সভ্য হওয়ার উপকরণ পাবে কার কাছ থেকে, কাকে আদর্শ মানবে এদেশের মানুষ? কার হাত ধরে সামনের দিকে এগুবে দেশ? সাম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট চাং হং-উন ফেরি ডুবিতে ২৮৭ জনের মৃত্যুর দায় স্বীকার করে নিয়ে পদত্যাগ করেন, নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালার মাত্র তিনটি মোবাইল ফোন ছাড়া আর কোন সম্পদ নেই, দুনিয়া কাঁপানো ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদি নেজাদ যখন তার দায়িত্ব থেকে অবসর নেন তখন তিনি একটি মাত্র ইস্ক্রটার নিয়ে কার্যালয় থেকে বের হয়ে আসেন, তাও সেটা তার নিজের টাকায় কেনা ছিল। এরাও তো কোন না কোন দেশের প্রেসিডেন্ট, এরাও রাজনীতি করে। অথচ রানা প্লাজা ধসে তেরশ’র অধিক লোক নিহত হল, কেউ বরণ করল পঙ্গুত্ব, কেউ হারাল সংসার কিন্তু এই দায়ে প্রধানমন্ত্রী তো দূরে থাক একজন এমপি, মন্ত্রী, মেম্বার, চেয়ারম্যানও পদত্যাগ করল না। দায় নিলো না কেউ। এ ওকে, ও ওকে দোষ দেয়। তারপর সব ফিনিস। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী গত সংসদের ১৪ জুলাই জানিয়েছেন রানা প্লাজার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রান তহবিলে জমা পড়েছে ১২৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা অথচ এ বছরের রানা প্লাজা ধসের বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস বিফিংএ জানানো হয় রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ত্রান তহবিল থেকে ২২ কোটি ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭২০ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় (তথ্য:প্রথম আলো)। বাকি সব কি তাহলে শুভঙ্করের ফাঁকি?
©somewhere in net ltd.