নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

এই ঈষদোষ্ণ রোদ্দুর মিছিলে স্বাগতম

রোদ্দূর মিছিল

দলছুট এক ইউক্যালিপটাস ছালহীন দেহে মাখে কুয়াশার হিম নিঃসঙ্গ বেদনায়। পাতা ঝরার আর্তনাদে ভেঙ্গে খান খান নিরবতা। ক্যানভাসের বিমূর্ত ছবির মত এলোমেলো আমার অনুভূতিগুলো আঁধারের হাতছানিতে নিমজ্জিত - কিছুটা সময়। অঃতপর- রাত্রির আঁধার ভেঙ্গে চলি শুন্য রাজপথে দূরের চাঁদ আলো ফিরিয়ে নেয় মন হারায় আঁধার মরুতে।

রোদ্দূর মিছিল › বিস্তারিত পোস্টঃ

কুড়ি বছর আগে/রোদ্দুর মিছিল

১২ ই মার্চ, ২০১৮ বিকাল ৫:০৮




সকাল সাড়ে সাতটা। হুড়মুড় করে ঘুম থেকে উঠেই ঝটপট দাঁত মেজে, স্নান সেরে পরিপাটি পোষাক-টোষাক পড়ে ভোঁ দৌড় - একটা রিকশা বা টেম্পোর খোঁজে। উদ্দেশ্য ষোলশহর রেল স্টেশন। সাড়ে আটটার ট্রেনটা কিছুতেই মিস করা যাবেনা। তাহলে সবটাই মাটি। ওই মুড়ির টিন মার্কা বাস গুলোতে চড়ে নানান কিসিমের লোকদের সাথে জুবুথুবু হয়ে কোন রকমে এক কোনায় বসে গোবেচারার মত মুখে কুলুপ এঁটে চুপচাপ ভার্সিটি যেতে কার মন চায়? তার উপর ভাড়া নিয়ে খুনসুটি তো আছেই। জানে স্টুডেন্টদের ভাড়া হাফ, তবুও একটা ঝামেলা না বাঁধালে ব্যাটাদের পেটের ভাত হজম হয়না। প্রতিদিন সেই একই কড়চা। মেয়ে হলে তো কথাই নেই। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী ললনাদের কন্ঠস্বর যতটাই মোলায়েম, ততটাই রুক্ষ ইতর গুলোর ব্যবহার। তার সাথে বোনাস হিসেবে আছে সমগোত্রীয়দের দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে বিশ্রী রকমের খ্যাক খ্যাক করে হাসা। যেন ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়েদেরকে এক চোট দেখে নিতে পারলে রাজ্য জয় করার মত একটা ব্যাপার ঘটে যায়। আর মুটে-মজুর শ্রেণীর যাত্রীগুলোও দায়িত্ব মনে করে বাস কন্ডাক্টরের সাথে দাঁত কেলানো হাসিতে অংশ নেয় (Jealousy বলে যে একটা বিষয় আছে তা মানতেই হয় এদের এহেন ব্যবহারে)। যেন বাস কন্ডাক্টর এদের পরম বন্ধু। অথচ এরাই বেশির ভাগ সময় বাকবিতন্ডায় মেতে উঠে নিজেদের মধ্যে - যার পরিণতি হয় শালা-সম্বন্ধি ডাকা-ডাকি। আর আরও একটু গভীর হলে চ-বাচক শব্দ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। ভার্সিটির ছেলেদের সঙ্গে অবশ্য এসব কন্ডাক্টররা প্রায়শই পেরে উঠেনা। একটু গর্জে উঠলেই কুঁইকুঁই করে সটকে পরে। পিতৃ-প্রদত্ত জানের মায়া কার নেই বলুন?

তো, এতসব ভোগান্তির মধ্য দিয়ে কে যেতে চায়? সুতরাং যে কোন মূল্যেই শাটল ট্রেনটা ধরতে হবে। আর তাছাড়া শাটল ট্রেনের প্রতিটা মূহুর্তই অত্যন্ত মূল্যবান। গান-বাজনা, হই-হুল্লোর, হাহা-হোহো - যেন পড়াশোনা করতে নয়, পিকনিকে যাচ্ছি। ফেরার পথেও ওই একই পিকনিক পিকনিক আমেজ। এর মধ্যেই চলে কারও কারও মন দেয়া-নেয়া, মনোমালিণ্য অথবা মন ভাঙ্গা-ভাঙ্গি। বাজারে সদ্য আসা ব্যান্ডের এ্যালবামের তুমুল তোলপাড় করা গান গুলো থেকে শুরু করে রবীন্দ্র সংগীত, ফোক গান, আধুনিক গান, পুরনো দিনের গান, দেশের গান, ছায়াছবির গান, জীবনমুখী গান, প্যারোডি গান, আঞ্চলিক গান কি না গাওয়া হয় সমস্বরে এই শাটল ট্রেনে? তার সঙ্গে তালে তালে চলে ট্রেনের যত্রতত্র বারি দিয়ে দিয়ে ড্রামের এফেক্ট তৈরী করা। এক্ষেত্রে কারও কারও প্রতিভা তো রীতিমতো প্রেমে পড়ে যাবার মতো। এসব কিছুকে তো আর তুচ্ছ করা যায়না। অতএব ট্রেন মিস করা যাবেনা।

এই যাহ্! ট্রেন তো স্টেশন ছেড়ে দিল। তড়িঘড়ি করে রিকশা থেকে নেমেই দ্রুত আর কাঁপা হাতে পকেটে হাত চালান করে দিলাম। ওয়ালেট হাতড়ে ভাংতি টাকা খুঁজে না পেয়ে গোটা একটা একশ টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত একবার ধীর গতিতে চলতে শুরু করা ট্রেনের দিকে তাকিয়েই আবার রিকশা চালকের দিকে তাকালাম। কিন্তু এ ধরণের পরিস্থিতিতে যা হয় আর কি। ভাংতি নাই। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেই জানতাম অবস্থা বুঝে এরা ভাংতি না থাকার ছল করে। তবুও ছা-পোষা মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে হিসেবে মনের কোনায় ক্ষীণ একটা আশা জীইয়ে রেখেছিলাম - অতগুলো টাকা যদি গচ্চা না দিয়ে পারা যায়। অগত্যা কি আর করা? পুরো টাকাটাই ভাড়া প্লাস তিনগুনেরও বেশী ভাড়ার সমান বকশিস সমেত গছিয়ে দিয়েই ছুটতে হলো। এসব ক্ষেত্রে "পরে অন্য সময় দেব" বলে চলে যাওয়াও যায়না। গরীবের হক বলে কথা । কিছু না কিছু একটা অনর্থ ঘটবেই ঘটবে। একেবারে ডাইরেক্ট এ্যাকশন। হালকার উপর দিয়ে গেলে হবে পরীক্ষায় ফেল করা। আর অভিশাপ তীব্র হলে হবে গার্লফ্রেন্ড ছেড়ে চলে যাবার মত ভয়াবহ বিপর্যয়।

আমি চলমান ট্রেন লক্ষ্য করে ছুটছি, আর আমার কয়েক গজ সামনে দিয়ে ক্রমশ গতি প্রাপ্ত হওয়া ট্রেনের শেষ বগীটা নিতম্বিনী নারীর মতন হেলে-দুলে চলে যাচ্ছে। আমি দৌঁড়োতে দৌঁড়োতেই লক্ষ্য করলাম বগীর প্রায় সবকটা জানালা আর দরজায় এক দঙ্গল উৎসুক ছেলে-মেয়ে আমার প্রায় মিশন ইম্পসিবল ট্রেন চেইজিংয়ের দৃশ্যটা উপভোগ করছে। যেন হলিউডের কোন এ্যাকশন ছবির স্যুটিং চলছে। এর মধ্যে আবার অস্হির প্রকৃতির কিছু মেয়েও আছে, যারা "আল্লাহ্ আল্লাহ্ আল্লাহ্" বলে বিরামহীন তারস্বরে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। আমি তাদের উৎকন্ঠার টানে অথবা অতগুলো টাকার শ্রাদ্ধ করেও ট্রেন ধরতে না পাড়ার মত শকিং ব্যাপারটা এড়াতে উসাইন বোল্টের মত গতি নিয়ে প্রায় উড়তে উড়তে ট্রেনের হাতলটা খপ করে ধরে বসলাম। এবার ট্রেন নিজেই আমাকে হর্স পাওয়ারের মত গতি তুলে দিল। হাতল ধরা অবস্থাতেই আমি ট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে তুমুল ছুটছি। আমার ভাগ্যটা আংশিক রঙ্গীন ছবির মতো। তাই পড়ি পড়ি করেও কিভাবে যেন টুপ করে ট্রেনে উঠে গেলাম।

এত ভিড়ের মধ্যেও বিস্তর এক ফাঁকা জায়গা তৈরী হলো আমার জন্য, যেন গলদঘর্ম আমি "অনেক রক্তাক্ত পথ অতিক্রম করে স্বদেশের সীমানায় এসে থমকে দাঁড়িয়েছি" আর "আমারে দু'দন্ড শান্তি" দিতে একটু আলো-বাতাসের ব্যবস্হা রাখাটা অনেক জরুরী। পেছন ফিরে তাকালাম একটু আগে ছেড়ে আসা রিকশা চালকটার দিকে। তার মুখে ইয়া বড় সাইজের একটা দিগ্বিজয়ীর হাসি। হাসিটা কি আমাকে গ্যাঁড়াকলে ফেলে কৌশলে একটা দাঁও মেরে দেয়াতে, নাকি আমার প্রায় অসম্ভব একটা কাজ সুপারম্যানের মত দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করাতে, সেটা বোঝা গেল না। আমার উচিত তার দিকে কটমট করে "ব্যাটা, তোর কানের নিচে একটা কষে লাগাবো" টাইপের একটা দৃষ্টিতে তাকানো। কিন্তু আমি তা করলাম না। কারণ আমার চোখের দৃষ্টি ততক্ষণে এতসব ভিড়-ভাট্টা ভেদ করে খুঁজে নিল অতি পরিচিত একটা মুখ - যে মুখে এতদিন দেখেছি কেবল শান্ত সবুজের স্নিগ্ধতা আর দৃষ্টিতে ম্যালা মায়াময়তা। আজ সেখানে ভিড় জমিয়েছে অনন্ত কালের উৎকন্ঠারা।

এমনিতেই সে একজন Sober আর Unadventurous টাইপের মেয়ে। কাজেই জানালায় উঁকি দেয়া মেয়েদের মধ্যে যে সে ছিলনা, এটা অনায়াসে বলতে পারি। বরং অন্য মেয়েগুলোর হৈচৈ শুনেই সে ভীষণ উৎকন্ঠিত হয়ে পড়েছে অদেখা এক মানুষের সম্ভাব্য দুর্ঘটনার আশঙ্কা করে। আর এখন যেই দেখলো মানুষটা আর কেউ নয় - আমি, ওর উৎকন্ঠা বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেল। আমার মনে শঙ্কা ছিল সে কি বুঝতে পারে আমার বুকের ভেতরের কি ভীষণ তোলপাড়, যখন তার পাশে থাকি, কথা বলি - ব্যাস, পড়াশোনা আর মামুলী কিছু দৈনন্দিন বিষয়-টিষয় নিয়ে। আর তখন চোখে চোখ পড়লে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে সেও কি কোন কিছু লুকোতে চায়? কিছু কি ধরা পড়ে যাবার ভয়? ওর ভেতরেও কি খেলা করে "ছল-ছলাৎ পাগলী নদীর ঢেউ" আমাকে ঘিরে? ওর এখনকার এই উৎকন্ঠিত মুখটা দেখে আমার সেই শঙ্কার জমাট বরফটা বোধ হয় ধীরে ধীরে গলতে শুরু করলো।

আমি ভিড়-ভাট্টা ঠেলে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। বোকা বোকা একটা চেহারায় আমতা আমতা একটা হাসি হেসে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওর পাশের সীটে বসা ছেলেটি দাঁড়িয়ে আমাকে জায়গা করে দিল, যেন আমাকে এই অবস্থায় বসতে না দিলে বিরাট একটা অপরাধ হয়ে যায়। আমি বসলাম ওর পাশে। আর ও সেই একই রকম উৎকন্ঠিত দৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে থাকলো আমার দিকে। কিছুক্ষণ পর সেই দৃষ্টিতে এসে বাসা বাঁধলো কপট রাগ। কড়া গলায় বলল, "আর কখ্খনো করবে না এমনটা"। শেষ শব্দটি বলতে গিয়ে ওর গলাটা একটু কেঁপে উঠলো কি? আমি নিরেট সুবোধ বালকের মত এক পাশে ঘাড় কাৎ করে সম্মতি জানালাম। একটু দূরে বসা ছেলে-মেয়েদের জটলার মধ্যে কে যেন ভারী মিষ্টি গলায় গাইছে মান্না দে'র গান - "এ তো রাগ নয় গো, এ যে অভিমান"। আমার বুকের উপর এতদিন ধরে চেপে বসে থাকা "To be, or not to be" মার্কা একটা ভারী পাথর টুপ করে পড়ে গেল সকলের অগোচরে। ট্রেন এগিয়ে চলল ক্রমাগত প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে - ঝিক-ঝিক, ঝিক-ঝিক, ঝিক-ঝিক ...........

ছবি: ইন্টারনেট

মন্তব্য ৬ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (৬) মন্তব্য লিখুন

১| ১২ ই মার্চ, ২০১৮ বিকাল ৫:২৩

রাজীব নুর বলেছেন: আপনার পোষ্টটি পড়ে এখন আমার ট্রেনে করে কোঠাও যেতে ইচ্ছা করছে।

১২ ই মার্চ, ২০১৮ বিকাল ৫:৩৪

রোদ্দূর মিছিল বলেছেন: হা হা হা। দার্জিলিংয়ে গিয়ে ঘুরে আসতে পারেন। আঁকাবাঁকা পাহাড় বেয়ে একবার উপড়ে উঠে যাওয়া, আবার নিচে নেমে আসা ট্রেনে চড়তে ভালোই লাগবে। ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য।

২| ১২ ই মার্চ, ২০১৮ বিকাল ৫:৪৬

পদ্ম পুকুর বলেছেন: আপনার লেখা খুবই সাবলীল, লিখছেনও প্রচুর। তাহলে অ্যাদ্দিন কি হইছিল, প্রাইভেটলি বলেনতো...

১২ ই মার্চ, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:৩১

রোদ্দূর মিছিল বলেছেন: তেমন কিছুনা। ১) সময় হচ্ছিলো না, আর ২) খানিকটা একঘেয়ে লাগছিলো।

৩| ১৪ ই মার্চ, ২০১৮ দুপুর ১:১৬

জুনায়েদ বি রাহমান বলেছেন: সেরকম কাহিনী। দারুণ উপস্থাপন।

১৪ ই মার্চ, ২০১৮ বিকাল ৫:১৩

রোদ্দূর মিছিল বলেছেন: ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.