| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ঘুমিয়ে থাকা একজন মানুষ কখনো কখনো জেগে থাকা একজন মানুষের চেয়ে অনেক বেশি ভালো থাকতে পারে? কথাটা শুনতে অদ্ভুত। কিন্তু বয়স হলে মানুষ অনেক অদ্ভুত কথাই বিশ্বাস করে চিন্তা করে ভালো মনে করে।
আমার নাম অরুণ শেখ। বয়স বাহাত্তর। স্ত্রী মারা গেছে প্রায় এগারো বছর হলো। ছেলে বিদেশে থাকে, মেয়ে থাকে অন্য শহরে। দুজনেই নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তারা খারাপ সন্তান নয়; ফোন করে টাকা পাঠায়, আমার শরীরের খবর নেয়। বছরে দু-একবার এসে কয়েকদিন থেকেও যায়।
তবে তারা সবসময় আমার পাশে থাকে না। খোঁজ নেওয়া আর পাশে থাকা, এই দুটো জিনিসের মধ্যে যে কতখানি তফাত, সেটা বয়স না হলে বোঝা যায় না।
আমার সকাল শুরু হয় পত্রিকা দিয়ে, সাড়ে ছয়টার দিকে ঘুম থেকে উঠি। রান্না করার লোক আসে আটটার দিকে। তার আগে বারান্দায় দাঁড়িয়ে মানিপ্ল্যান্টে পানি দিই। গাছটার বয়স আমার নাতির বয়সের কাছাকাছি। একসময় মীনা নিজে গাছটা লাগিয়েছিল। মীনা আমার স্ত্রী।
এই একটা বাক্য বলতে এখনো আমার কেমন যেন লাগে। ছিল, মীনা ছিল, একসময় আমার স্ত্রী ছিল, এখন সে নেই। মানুষ চলে গেলে তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে ক্রিয়াপদগুলোও বদলে যায়। জীবিত মানুষের জন্য যে শব্দগুলো ব্যবহার করি, মৃত মানুষের জন্য সেগুলো ব্যবহার করা যায় না।
মীনা রান্না করতো, মীনা আমাকে ডাকতো, মীনা আমার সঙ্গে ঝগড়া করতো, মীনা আমাকে ভালোবাসতো। সবকিছুই এখন অতীত। শুধু আমার রাতগুলোর স্বপ্নতে মীনা বর্তমান।
দিনের বেলা আমি তাকে মনে করি না বললেই চলে। মনে পড়ে, কিন্তু জোর করে মনে করার চেষ্টা করি না। সকালে পত্রিকা পড়ি, দুপুরে খাই, বিকেলে চা খাই, মাঝে মাঝে বাজারে যাই। পুরোনো পরিচিত দু-একজনের সঙ্গে দেখা হয়। তারা বসে গল্প করতে চায়। আমি বসি। রাজনীতি, বাজারদর, অসুখ-বিসুখ, দেশের অবস্থা নিয়ে কথা হয়।
তারপর সন্ধ্যা নামে।
আমার বয়সী মানুষরা অনেকে রাতকে ভয় পায়। আমার রাতকে ভয় লাগে না। বরং আমি রাতের জন্য অপেক্ষা করি প্রায়ই। কারণ রাত হলেই আমি আবার আমার পুরোনো জীবনে ফিরে যেতে পারি স্বপ্নে। ঘুমিয়ে পড়লেই দেখি, আমি আবার সেই বাড়িতে আছি। আমাদের পুরোনো বাড়িতে। যে বাড়িতে মীনা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছে। চুলায় ভাত ফুটছে। রান্নাঘর থেকে মশলার গন্ধ আসছে। আমি বসার ঘরে পত্রিকা পড়ছি। ছোট ছেলে ঘরের ভেতর থেকে চিৎকার করে বলছে তার গণিতের খাতা খুঁজে পাচ্ছে না। বড় মেয়ে দৌড়ে এসে পরীক্ষার ফল আমার হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে। আমি সবকিছু দেখি, সবকিছু শুনি। এমনকি পুরোনো দেয়ালঘড়িটার টিকটিক শব্দ পর্যন্ত শুনতে পাই। কখনো বিদ্যুৎ চলে যায়। মীনা মোমবাতি জ্বালায়। সবাই মিলে মেঝেতে বসি, ছেলে গল্প করে, মেয়ে হাসে। মীনা আমাকে বলে,
তুমি ওদের সামনে এত গম্ভীর হয়ে বসে আছ কেন?
আমি বলি, বাচ্চাদের বেশি মাথায় তুললে মানুষ হবে না।
মীনা হেসে বলে, সবসময় ছেলেমেয়েদের মানুষ হবার চিন্তা করতে থাকলে এইরকম পারিবারিক ছোট ছোট আনন্দের মুহুর্ত গুলো হারাবে, একবার জীবন থেকে যে মুহূর্ত যায় তা আর ফিরে আসেনা। মীনায় এই কথাটাও আমি শুনতে পাই, আজও শুনতে পাই এখন এই মুহূর্তে ও শুনতে পাচ্ছি, আফসোস করছি, আমি ঐ মুহূর্তটাকে আর ফিরে না পাওয়ার জন্য তীব্র হাহাকার করছি।
কখনো স্বপ্নে ঈদের সকাল দেখি। আমি নতুন পাঞ্জাবি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। মীনা পেছন থেকে আমার কলার ঠিক করে দিচ্ছে। আমি আয়নায় তার মুখ দেখছি। সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমি তখন জানি না যে সে মারা গেছে। এই কথাটা স্বপ্নের ভেতরে কখনো মনে পড়ে না। সেখানে মৃত্যু বলে কোনো জিনিস নেই। সেখানে মীনা বেঁচে আছে।
আমার ছেলে ছোট, আমার মেয়ে স্কুলে পড়ে। আমার বাড়িতে চারপাশে মানুষের আনাগোনা আছে।
আমি সে বাড়ির স্বামী, আমি বাবা, আমি কারও প্রয়োজন।
তারপর হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়।
ঘর অন্ধকার। বিছানার পাশের টেবিলে একটা পানির গ্লাস। ঘড়িতে তিনটা সাতচল্লিশ। আমি কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকি।
তারপর ধীরে ধীরে মনে পড়ে, মীনা নেই, ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেছে , তারাও এখানে আমার পাশে নেই, সেই বাড়ি ও নেই, সেই জীবনও নেই। আসলে আমি বাস্তবিক অর্থে সম্পুর্ন একা।
আর এই জায়গাটাতেই আমার সমস্যা।স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে বাস্তবে ফিরতে আমার খুব কষ্ট হয়, তবু আমি আবার ঘুমাতে চেষ্টা করি। কারণ আমি জানি, আবার ঘুম এলে হয়তো মীনার কাছে ফিরে যেতে পারব।
আমার পাশের ফ্ল্যাটে তন্ময় নামে একটা ছেলে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ছেলেটা আমাকে খুব পছন্দ করে। কেন করে জানি না। আমার মতো বৃদ্ধ মানুষের মধ্যে এমন কী আছে যে একটা তরুণ ছেলে সন্ধ্যা হলেই এসে দরজায় নক করে, আমার ভালো মন্দ খোঁজ খবর নেয়, কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করে, একদিন বলল,
অরুণ কাকু, আমার সাথে হাঁটতে যাবেন? আমি বললাম,আজ শরীরটা ভালো লাগছে না। কাল যাব।
মিথ্যা বলেছি ওকে, শরীর খারাপ ছিল না, তন্ময় প্রায়ই আসে। চা সাথে করে বানিয়ে নিয়ে এসে আমার সাথে বসে খায়, গল্প করে। একদিন বলল, আপনি সারাদিন একা একা থাকেন কী করে? আমি বললাম, অভ্যাস হয়ে গেছে। ও বলল, অভ্যাস আর ভালো থাকা এক জিনিস না, কাকু।
আমি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, বয়স কম। অনেক কিছুই সে জানে না। কিন্তু কিছু কিছু কথা বয়স দিয়ে জানা যায় না। বেঁচে থেকে জানতে হয়। আমি তাকে কিছু বলিনি। আমি কী করে বলি যে এখন আমি আর একা নই? আমি প্রতিরাতে আমার পরিবারের কাছে যাই আমি মীনার সঙ্গে কথা বলি। আমি আমার ছেলের ছোটবেলার মুখ দেখি। আমার মেয়ের চুলে বেণী করে দিই। আমি আমার নিজের পুরোনো জীবনে আবার বেঁচে উঠি।
বাস্তব জীবনে আমি বৃদ্ধ, স্বপ্নে আমি বৃদ্ধ নই। স্বপ্নে আমার হাঁটুতে ব্যথা করে না, চোখে চশমা লাগে না। সিঁড়ি ভাঙতে হাঁপিয়ে উঠি না। মীনা আমার হাত ধরে টানে। আমি তার পেছনে পেছনে যাই।
এই বয়সে এসে আমি বুঝেছি, মানুষকে আসলে একাই বাঁচতে হয়, কেউ পাশে থাকে না, থাকতে চাইলেও পারেনা।
আমার দিনগুলো বড়, খুব বড়, একেকটা দুপুর যেন শেষই হতে চায় না। কিন্তু রাত? রাত কেমন করে যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে যায়।
একদিন তন্ময় আমাকে জিজ্ঞেস করল, কাকু, আপনার রাতে ঘুম হয় তো? আমি কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম, তারপর বলেছিলাম, মাঝে মাঝে একটু আধটু হয় মাঝে মাঝে ঘুম হয় না , তবে রাত দিনের থেকে ভালো, রাত অনেক স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে বাস্তবকে ভুলিয়ে দিতে পারে, ও হাসল। সম্ভবত কথাটার মানে বুঝতে পারেনি, বুঝবে না। আমিও ওর বয়সে বুঝতাম না। বয়স হলে মানুষ শুধু স্মৃতি নিয়েই বাঁচে। আর আমার মতো মানুষের ক্ষেত্রে স্মৃতি আর স্বপ্নের মধ্যে পার্থক্যটাও একসময় খুব কমে আসে।
মীনা মারা যাওয়ার আগে আমাকে একবার বলেছিল, আমি না থাকলে তুমি কী করবে?
আমি হেসে বলেছিলাম, আমার আগে তুমি মরবে না। কী অদ্ভুত! জীবন কখনো কখনো মানুষের বলা কথাগুলোকে বিদ্রূপ করে সত্যি করে দেয়। মীনা আমার আগে চলে গেল। আমি রয়ে গেলাম। কেন রয়ে গেলাম, জানি না। সম্ভবত শাস্তি হিসেবে। সম্ভবত পুরস্কার হিসেবে সম্ভবত কোনো কারণই নেই। মানুষ ভাবে সবকিছুর একটা কারণ আছে। আসলে সবকিছুর কারণ থাকে না।
কিছু মানুষ চলে যায়। কিছু মানুষ থেকে যায়। কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরও থেকে যায়। মীনা সেই শেষের মানুষ। তার মৃত্যুর এগারো বছর পরও সে আমার সঙ্গে আছে।
এক রাতে স্বপ্নে দেখলাম, আমরা বাড়ির বারান্দায় বসে আছি, বৃষ্টি হচ্ছে, মীনা চা বানিয়ে এনেছে। আমি কাপ হাতে নিয়ে বসে আছি। সে বলল, তুমি এত চুপ হয়ে আছো কেন?আমি বললাম, এমনিই, সে আবার বলল, বুড়ো হয়ে গেছ তুমি। আমি হাসলাম, বললাম, তুমিও তো।
সে মাথা নাড়ল।বলল, আমি তো হইনি, আমি বুঝতে পারলাম না। তারপর সে আমার দিকে তাকিয়ে এমন একটা হাসি দিল, যেটা আমি বহু বছর আগে দেখেছিলাম।
হঠাৎ আমার মনে হলো, মীনা হয়তো আমাকে কিছু বলতে চাইছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী কিছু বলবে? সে বলল,
আর বেশিদিন একা থাকতে হবে না তোমার। আমি তার হাত ধরতে গেলাম, আলতো করে ধরলাম ও। ঠিক তখনই ঘুম ভেঙে গেল। ভোর হয়ে গেছে। জানালার বাইরে পাখি ডাকছে। আমি বিছানায় বসে অনেকক্ষণ হাতের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, এখনও মীনার হাতের উষ্ণতা আছে তারপর হঠাৎ একটা অদ্ভুত শান্তি আমাকে ঘিরে ধরল। আমি বুঝলাম, মানুষ যাকে হারায়, তাকে সবসময় হারায় না।
কখনো কখনো সে মানুষটার সঙ্গে থাকার অন্য একটা উপায় খুঁজে নেয়।আমিও খুঁজে নিয়েছিলাম।
সেই রাতের পর থেকে আমার স্বপ্নগুলো আরও পরিষ্কার হতে লাগল। আমি বুঝতে পারছিলাম না এগুলো স্বপ্ন। বুঝতে পারছিলাম না যে আমি বৃদ্ধ। বুঝতে পারছিলাম না যে আমার ছেলে বিদেশে থাকে। বুঝতে পারছিলাম না যে মীনা মৃত।
আমি শুধু জানতাম, আমি বাড়িতে আছি। আমার বাড়িতে।আমার পরিবারে। আমার জীবনে।
শেষ কয়েকদিন তন্ময় আমাকে খুব একটা দেখতে পায়নি। একদিন দরজায় এসে অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করেছিল। আমি দরজা খুলিনি। খুলতে চেষ্টা করছিলাম কিন্তু উঠতেই পারিনি, আসলে আমি তখন ঘুমাচ্ছিলাম। স্বপ্ন দেখছিলাম, মীনা রান্নাঘরে, ছেলে পড়ার টেবিলে, মেয়ে আয়নার সামনে চুল আঁচড়াচ্ছে, বাইরে বৃষ্টি। আমি বসে আছি। আমার বয়স তখন কত, জানি না, হয়তো চল্লিশ,হয়তো ত্রিশ, হয়তো কোনো বয়সই নাই।
সেদিন মীনা আমাকে বলল, এখন থেকে তুমি কোথাও যাবে না, আমি বললাম, আচ্ছা, তারপর সে আমার পাশে এসে বসলো। আমি তার হাত ধরলাম। এইবার হাতটা খুব উষ্ণ ছিল, অদ্ভুতভাবে উষ্ণ। অনেক বছর পর মনে হলো, আমি সত্যিই আমার পরিবার কে ফিরে পেয়েছি।।
পরদিন সকালে তন্ময় অনেক ডাকাডাকির পর প্রতিবেশীদের ডেকে আনল, দরজা ভাঙা হলো। আমি তখন বিছানায় শুয়ে ছিলাম। ওরা বলছে দ্রুত এম্বুলেন্স ডাকতে হবে।
অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হল, তন্ময় ছেলেটা আমাকে আকুল হয়ে ডাকছে, আমি সাড়া দিতে পারছি না, আমি তাকাতেও পারছি না, ওরা বলছে আমার মুখ নাকি বেঁকে গিয়েছে, স্ট্রোক হয়েছে আমার।
আমার বালিশের পাশে একটা ছোট ডায়েরি ছিল। শেষ পাতায় আমি কাঁপা হাতে লিখেছিলাম, দিনগুলো শুধু কেটে যায়। তন্ময় ডায়রীটা সাথে এনেছে অনেকক্ষণ ডায়েরিটার দিকে তাকিয়ে আছে, আমার চোখের পাতা বন্ধ। তবু আমি সব দেখতে পাচ্ছি।
আমি এখন কোথায় আছি? অ্যাম্বুলেন্সে নাকি হসপিটালে নাকি আমার পুরোনো বাড়িতে।
মীনা আমার পাশে, ছেলে উঠোনে খেলছে। মেয়ে পরীক্ষার ফল হাতে দৌড়ে আসছে। মোমবাতির আলো জ্বলছে।
বাইরে বৃষ্টি। মীনা আমাকে ডাকছে,আমি এবার আর হয়তো ফিরবো না।
ডায়রীর ভেতরে ছিল মীনার কয়েকটা চিঠি। পুরোনো ছবি। বাচ্চাদের আঁকা কিছু কার্ড, একটা সিনেমার টিকিট। আর কয়েকটা শুকিয়ে যাওয়া শিউলি ফুল, তার নিচে ছোট ছোট করে তারিখ লেখা। আর আমার লেখা কয়েকটা বাক্য।
আজ মীনা প্রথম আমাকে তুমি বলল। আজ মেয়েটা প্রথম হাঁটল, আজ ছেলে আমাকে বাবা বলে ডাকল। আজ মীনা আমার উপর খুব রাগ করেছে। আজ আমরা সবাই মিলে ছাদে রাত জেগে তারা দেখেছি।
সবশেষ পৃষ্ঠায় লিখেছিলাম, আমার জন্য কেঁদো না। আমি বহুদিন ধরে একা ছিলাম।
০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১২
সামিয়া বলেছেন: যে দিন গেছে সেদিন কি আর ফিরিয়ে আনা যায়
©somewhere in net ltd.
১|
০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১১
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: সময় চলে যায়, মানুষ বদলে যায়, কিন্তু সেই মুহূর্তগুলো মনে পড়লে আজও মনে হয়-সবকিছু যেন এই সেদিনের কথা।