| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |

সৌদি আরবের রিয়াদের একটা পাঁচ তারকা হোটেলে আমার চাকরি। চাকরিটা খুব কঠিন কিছু না। প্রতিদিন একটা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার হাতে নিয়ে হোটেলের কার্পেট পরিষ্কার করি। লবি, করিডোর, হলরুম, অতিথিদের বসার জায়গা, সব জায়গার কার্পেট ঝকঝকে রাখা আমার দায়িত্ব।
হোটেলটা এত সুন্দর যে, কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে আমার নিজেরই মনে হয়, আমি বুঝি কোনো রাজপ্রাসাদের ভেতর হাঁটছি। চারদিকে মার্বেলের মেঝে, ছাদের বিশাল ঝাড়বাতি, দেয়ালে আরবি নকশা, সুগন্ধি আতরের গন্ধ আর কাঁচের দরজার ওপারে সারাক্ষণ দামি গাড়ির আসা-যাওয়া।
আর আমি? আমি একটা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার নিয়ে কার্পেটের ওপর ঘুরে বেড়াই। প্রায় পাঁচ মাস ধরে কাজ করছি। এই পাঁচ মাসে একটা বিষয় মনে হয়েছে যে মানুষের পায়ের নিচে থাকা কার্পেট যত দামিই হোক, কেউ তার দিকে তাকায় না। আর যে মানুষটা সেই কার্পেট পরিষ্কার করে, তার দিকেও না। আমি অবশ্য তাতে কষ্ট পাই না। আমার কাছে কাজ মানে তো কাজ।
আমি প্রতিদিন মন দিয়ে পুরো হোটেলের কার্পেট পরিষ্কার করি। কোথাও একটু ধুলো দেখলে আবার ভ্যাকুয়াম চালাই। কার্পেটের ওপর কেউ কফি ফেললে সেটা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত আমার মনে শান্তি হয় না।
কাজের সময় একদিন এক সহকর্মী বলেছিল, আশরাফ, তুমি এত মন দিয়ে কাজ করো কেন? আমি হেসে বলেছিলাম, বেতন তো সবাই পায়। আমি চাই আমার কাজটা সঠিক ভাবে পালন করে তবেই বেতন পেতে, সে হেসেছিল। তারপর একদিন শুনলাম, হোটেলের কোনো কোনো অতিথি খুশি হলে কর্মচারীদের টিপস দেন। আমি মনে মনে হিসাব করলাম। পাঁচ মাসে যদি একেকজন অতিথি দশ রিয়াল করেও দিত, তাহলে তো বেশ কিছু টাকা জমে যেত! কিন্তু আমার ভাগ্যে সেই দশ রিয়ালও জোটেনি। কেউ কোনোদিন টিপস দেয়নি। তবুও আমি কাজ করছি। কারণ বাংলাদেশে আমার স্ত্রী আছে। আর আছে আমার একমাত্র ছেলে। আমার পৃথিবীর সবচেয়ে দামি মানুষ।
সেদিন দুপুরে কাজ করার সময় হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল, দেশের নম্বর। ফোন ধরতেই আমার স্ত্রী কাঁপা গলায় বলল, শুনছো?
আমি সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম কিছু একটা হয়েছে, বললাম কী হয়েছে?
- বাবুর দুই দিন ধরে অনেক জ্বর।
আমার হাতের ভ্যাকুয়াম ক্লিনারটা থেমে গেল। ডাক্তার দেখিয়েছ? ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা ভেজা গলায় বউ বললো টাকা নেই গো। হাতে একদম টাকা নেই।
আমি বললাম, কারও কাছ থেকে ধার নাও।
- কার কাছ থেকে নেব? তোমার আমার কারো আত্মীয়ই টাকা ধার দিয়ে সাহায্য করবে না তুমি তো জানোই। আর তোমার বেতন পেতেও তো এখনও অনেক দেরি।
আমি চুপ করে গেলাম, দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন কারও না কারও জ্বরের খবর আসছে। হাসপাতাল, পরীক্ষা, প্লাটিলেট, রক্ত, এসব শব্দ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আমার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল, আল্লাহ না করুন, আমার ছেলের ডেঙ্গু হয়নি তো? ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে আরো বেশ কয়েক ঘন্টা পার হয়ে গেল, কোন কাজই হলো না, কিছু করার শক্তি পাচ্ছি না ছেলের চিন্তায়, আমি আবার ফোন করলাম, কেউ ধরল না, আরেকবার করলাম, ধরলো না, আমি ফোনটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
সেদিন পাঁচ মাসের মধ্যে প্রথমবার আমার মনে হলো, এই বিশাল পাঁচ তারকা হোটেলের কোনো কার্পেটই আমার কাছে এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমার ছেলেটা অসুস্থ। আর আমি কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে আছি। হোটেলের এক পাশে আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম।
ঠিক তখনই ম্যানেজার এসে হাজির।
- আশরাফ! What are you doing? আমি বললাম, Sir... my son is sick. সে সম্ভবত পুরো কথাটা বুঝলো না। তারপর আরবি আর ইংরেজি মিশিয়ে দ্রুত কিছু বলতে লাগল। আমি শুধু কয়েকটা শব্দ বুঝলাম।Today... special guest... Emir... carpet... clean... very clean! আমি মাথা নাড়লাম। বুঝলাম, আজ সৌদি আরবের একজন আমির হোটেলে আসবেন। আমার মন বলছিল, আজ পৃথিবীর কোনো আমিরের জন্য আমার কার্পেট পরিষ্কার করার শক্তি নেই।
কিন্তু চাকরি তো চাকরিই, আমি ধীরে ধীরে হলরুমে গেলাম, হলরুমটা বিশাল। উঁচু ছাদ থেকে ঝুলছে বিশাল ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি। দেয়ালের সোনালি নকশা। চারপাশে আরবীয় সাজসজ্জা। কয়েকজন কর্মচারী এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে। আমি শুধু দাঁড়িয়ে রইলাম।
ভ্যাকুয়াম ক্লিনারটা পাশে পড়ে আছে। আমার কাজ করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই। ঠিক তখন চোখে পড়ল হলরুমের এক কোণে একটা ছোট কাগজ পড়ে আছে। আমি কাগজটা তুলতে নিচু হলাম।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে থেকে একসঙ্গে অনেক মানুষের পায়ের শব্দ শুনলাম। আমি মাথা তুলে তাকালাম। প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ জন মানুষ হলরুমে ঢুকছে। সবার পরনে ঐতিহ্যবাহী সাদা থোব। কারও মাথায় লাল-সাদা কেফিয়াহ, কারও মাথায় সাদা গুতরা। তাদের সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষী, সহকারী আর হোটেলের কর্মকর্তারা। দলের মাঝখানে একজন দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পোশাক আর চলাফেরা দেখেই বোঝা গেল, তিনিই বিশেষ অতিথি।
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম, আমির চারদিকে তাকালেন, তারপর কার্পেটের দিকে তাকালেন। তারপর ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে আরবিতে কিছু বললেন। ম্যানেজার হঠাৎ আমার দিকে তাকাল। আশরাফ! Come here! আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। আমির আমার দিকে তাকালেন, কী যেন বললেন, আমি কিছুই বুঝলাম না। তারপর তিনি তার একজন সহকারীকে কিছু বললেন। সহকারী একটা খাম এনে দিল। আমির নিজে সেই খামটা আমার হাতে তুলে দিলেন। আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। তারপর তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে হাসলেন। আমি শুধু বললাম, Thank you, sir. তিনি আবার কিছু বললেন। আমি এবারও কিছু বুঝলাম না। কিন্তু তাঁর হাসিটা ভালো লাগলো, তিনি ভেতরে চলে গেলেন।
আমি এই সময় খামটা খুলে দেখি, ভেতরে টাকা, ১,০০০ সৌদি রিয়াল। বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ৩২ হাজার টাকার মতো। আমি কিছুক্ষণ টাকার দিকে তাকিয়ে রইলাম। পাঁচ মাসে কেউ আমাকে দশ রিয়াল টিপস দেয়নি। আর আজ, যেদিন আমার ছেলে অসুস্থ, সেদিন একজন আমাকে এক হাজার রিয়াল দিয়ে গেলেন! আমি তখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না কী হয়েছে। এর মধ্যেই হোটেলের মালিক নিজে আমার কাছে এসে দাঁড়ালেন।
তিনি বললেন, Ashraf, the Emir is very happy. আমি তাকিয়ে রইলাম। তিনি বললেন, He noticed the carpet. He asked who keeps the hotel so clean. I told him about you. You have been doing this job sincerely for five months.
তারপর তিনি পকেট থেকে আরেকটা খাম বের করলেন। আমার হাতে দিয়ে বললেন, This is from me.
আমি বললাম, Sir... what is this? তিনি বললেন, 1,000 riyals.
আমি স্তব্ধ, আরও ১,০০০ রিয়াল!! অর্থাৎ মোট ২,০০০ সৌদি রিয়াল। বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ৬৪ হাজার টাকার মতো। আমি টাকা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। মালিক হয়তো ভাবলেন আমি টাকার জন্য কাঁদছি কিন্তু তিনি জানতেন না, আমি টাকার জন্য কাঁদছি না। আমি কাঁদছি কারণ আমার ছেলের জন্য হঠাৎ করে টাকার জোগাড় হয়ে গেছে।
আমি দ্রুত ফোন বের করলাম, দেশে ফোন দিলাম। একবার, দুবার, তৃতীয়বার ফোন ধরল আমার স্ত্রী।
- হ্যালো?
আমি বললাম, বাবু কেমন আছে? ওপাশ থেকে এবার তার গলায় একটু স্বস্তি। জ্বর কিছুটা কমেছে। আমি চোখ বন্ধ করলাম। মনে হলো বুকের ওপর থেকে কয়েক মণ ওজন নেমে গেল।
- তবুও ডাক্তার দেখাতে এখনই নিয়ে যাও।
সে বলল, কিন্তু টাকা?
- টাকা পাঠাচ্ছি।
সে অবাক হয়ে বলল,
- মাসের মাঝখানে টাকা পাবে কোথায়?
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম, তারপর বললাম, আজ একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে।
- কী হয়েছে?
- পাঁচ মাস ধরে আমি এই হোটেলের কার্পেট পরিষ্কার করছি, এই পাঁচ মাসে কেউ কোনোদিন আমাকে টিপস দেয়নি, কিন্তু আজ বাবুর জ্বরের কথা শুনে ঠিকমতো কার্পেট পরিষ্কার করতে পারিনি। বাবুর চিন্তায় আমার মাথাই কাজ করছিল না।আর ঠিক সেই সময়ই... আমার গলা আটকে গেল।
- কী?
আমি চোখ মুছে বললাম, যে কার্পেট আমি পরিষ্কার করতে পারিনি, সেই কার্পেট দেখেই একজন আমির আমাকে এক হাজার রিয়াল দিয়েছে, আর হোটেলের মালিক আরও এক হাজার রিয়াল দিয়েছে।
আমার স্ত্রী এবার কেঁদে ফেলল। আমি হেসে বললাম, মোট দুই হাজার রিয়াল। ওপাশ থেকে শুধু কান্নার শব্দ। আমি বললাম, কাঁদছো কেন?সে বলল, আমি জানি না। মনে হচ্ছে আল্লাহ আমাদের ছেলেটাকে নিজেই টাকা পাঠিয়ে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করে দিলেন। আমি চুপ করে গেলাম। হোটেলের বিশাল কাঁচের জানালার বাইরে তখন রিয়াদের আকাশে সন্ধ্যার আলো নেমে এসেছে। দূরে মসজিদের মিনার।
শহরের রাস্তায় গাড়ির সারি। আর আমি হাতে দুই হাজার রিয়ালের খাম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, আমার মনে হলো, মানুষ কখনো কখনো ভাবে তার পরিশ্রম কেউ দেখছে না, কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে না। কেউ তার মূল্য বুঝছে না। কিন্তু আসলে কোথাও একজন আছেন, যিনি সব দেখছেন। কে কতটা মন দিয়ে কাজ করেছে। কে কতটা কষ্ট চেপে রেখেছে। কে দূর দেশে দাঁড়িয়ে সন্তানের জন্য কেঁদেছে।
সব।
আমি ফোনের ওপাশে স্ত্রীকে বললাম, বাবুকে নিয়ে এখনই ডাক্তার দেখাও। আর ভয় পেও না।
ফোনটা কেটে আমি আবার সেই হলরুমের দিকে তাকালাম। যে কার্পেটটা সেদিন আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে অর্থহীন জিনিস মনে হচ্ছিল, সেই কার্পেটই শেষ পর্যন্ত আমার ছেলের চিকিৎসার টাকা এনে দিল। আমি ধীরে ধীরে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারটা হাতে তুলে নিলাম। তারপর কার্পেট পরিষ্কার করতে শুরু করলাম। আগের মতোই মন দিয়ে। তবে এবার আমার মুখে হাসি ছিল।
কারণ আমি জানতাম, মানুষ তোমার কাজের দিকে না তাকালেও, আল্লাহ তাকিয়ে আছেন। আর রিজিক কখন, কোন দরজা দিয়ে, কার হাত ধরে আসবে... সেটা মানুষ কখনোই আগে থেকে জানে না।
( সমাপ্ত)
২|
২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৪৯
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: রিজিক কখন, কোন দরজা দিয়ে, কার হাত ধরে আসবে...
সেটা মানুষ কখনোই আগে থেকে জানে না।
................................................................................
এটাই সবচেয়ে মূল্যবান কথা ।
নিজের কাজ বা কর্তব্যটুকু দ্বায়িত্বের সাথে করলে
অবশ্যই বরকত পাওয়া যায় ।
২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৫
সামিয়া বলেছেন: হুম বাস্তব,
৩|
২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৭
মাহমুদুর রহমান সুজন বলেছেন: সুন্দর লিখেছেন।
২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:০৬
সামিয়া বলেছেন: থ্যাঙ্ক ইউ
©somewhere in net ltd.
১|
২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৪৭
সামিয়া বলেছেন: বিঃদ্রঃ এক কলিগের জীবনের সত্যি ঘটনার আলোকে লেখা