নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া...

সরদার আরিফ উদ্দিন

সরদার আরিফ উদ্দিন › বিস্তারিত পোস্টঃ

চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বনাম বিশ্বাসের সংস্কৃতি ও রাজনীতি

০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:০২

আমরা সকলেই কোন না কোন বিশ্বাস দ্বারাই চালিত হই প্রতিনিয়ত। আবার সকল বিশ্বাসেরই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকে তারও কোন প্রমান মেলে না। কিছু কিছু বিশ্বাস তৈরি হয় সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, কিছু বিশ্বাস তৈরি হয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতালব্ধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবার কিছু বিশ্বাস তৈরি হয় অন্যের অভিজ্ঞতা কিংবা বক্তব্যে বিমোহিত হয়ে যাদের ওপর আমাদের আস্থা থাকে। আমাদের প্রতিদিনের প্রতিটি কাজের পাছনেই বিশ্বাস কোন না কোন ভাবে অন্তর্নিহিত থাকে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমরা যা কিছুই করি তার প্রতিটি কাজেরই যুক্তি প্রমান কিংবা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে, এমন আস্থা অর্জনের পরে করি না বরং আমাদের মনোজগতে নানা ধরণের বিশ্বাস-অবিশ্বাস কিংবা আস্থা-অনাস্থার টানাপোড়ন থাকে।যতটা সম্ভব বিচার বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি মাত্র। সে অর্থে বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাসের কোন সার্বজনীন রূপ নেই। পৃথিবীর ৬০০ কোটি মানুষ একই বিশ্বাস ধারন করে না। বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস দুটোই সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন রূপ ধারন করে। আবার বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস দুটোই পরিবর্তনশীল। নুতন নুতন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষের পূর্বের বিশ্বাসগুলো পুরানো হয় এবং পরিবর্তিত রূপ ধারন করে নুতন বিশ্বাসের জন্ম নের। ফলে পূর্বের বিশ্বাস ও তৎসংক্রান্ত আচরণগুলোকে আমরা কুসংস্কার বলে তালিকাভুক্ত করি। মানুষের চাঁদে অবতরন ছিল অবিশ্বস্য, অলৌকিক ব্যাপার। তৎকালীন মানুষের বিশ্বাসের ভিত্তি চাঁদে অবতরন মানুসের পক্ষে অসম্ভব। একপক্ক বিশ্বাস করতেন ‘চাঁদে অবতরন’ সম্ভব অন্যপক্ক বিশ্বাস করতেন কোন না কোনদিন সম্ভব। দুটো ধারাই বিশ্বাস কিন্তু দুটো ধারারই কোন অকাট তথ্য প্রমান কিংবা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল না। সুতরাং বিশ্বাস-অবিশ্বাস কিংবা সংস্কার-কুসংস্কার বিষয়গুলো সব সময় তথ্য প্রমান কিংবা যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর নির্ভর করে না।

বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাসগুলোর সামাজিক স্বীকৃতি কিংবা অস্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা কিংবা বিলীন হয়ে যাওয়া। ফলে যে কোন বিশ্বাসের স্থায়িত্ব, সমাজের ক্ষমতার সম্পর্ক, সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালগিষ্ঠ, তথ্যের আধিপত্য, শ্রেণী সম্পর্কের টানাপোড়ন, অর্থনৈতিক দাপট, সমাজের বিশিষ্টজনদের দৃষ্টিভঙ্গিনির্ভর মতামত ইত্যাদির সাথে সম্পর্কিত।সে অর্থে বিশ্বাসের ভিত্তিমূল হোল অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্তিক। যে গরীব মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের সামর্থ্য নেই তার কাছে ‘পানি পড়ার মাধ্যমে রোগ নিরাময়’ বিশ্বাসের আশ্রয়স্থল আবার সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির নির্বাচনে জয় লাভের প্রত্যাশায় মাজার গমন ভিন্নধারার বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। কালের পরিক্রমায় তথাকথিত আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ঔষধ শিল্পে বিনিয়োগের দাপটে হাজার হাজার বনৌষধি চিকিৎসা পদ্ধতি ও জ্ঞান কুসংস্কার হিসাবে স্বীকৃত।একজন দাই-মা সন্তান প্রসব প্রক্রিয়ায় যত দক্ষতা ও জ্ঞানের পরিচয়ই দেক না কেন তা কুসংস্কার হিসাবেই স্বীকৃত হয়। তার জ্ঞান, দক্ষতা ও গর্ভের সন্তানের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ভবিষ্যৎ বানী আমরা মানতে নারাজ, যতক্ষণ পর্যন্ত একই বক্তব্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত একজন ডাক্তারের মুখ থেকে শুনতে না পাই। একজন রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের শিক্ষকের তাবিজ গ্রহন ও একজন রিকশাচালকের তাবিজ গ্রহনের মধ্যে পার্থক্য আছে। প্রথমটি বিশ্বাস হিসাবে স্বীকৃত ও সমাদৃত কিন্তু পরেরটি কুসংস্কার বলতেই আমরা গর্ববোধ করি বেশি।

যে কোন বিশ্বাসের উৎস মূলত কোন না কোন অভাববোধ থেকে। অর্থনৈতিক ক্ষমতার অভাব, জ্ঞানের অভাব, তথ্যের অভাব, প্রত্যাশা পুরনের সম্ভাবনার অভাব কিংবা অসীমতার অভাব। পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষই কোন না কোনভাবে অসম্পূর্ণ, ফলে অপূর্ণতার অভাববোধ থেকে প্রত্যেকেই কোন না কোন বিশ্বাস বোধ দ্বারা চালিত হয়। বিশ্বাসবোধহীন কোন মানুষ আদৌ পৃথিবীতে নেই। কোন কিছুতেই বিশ্বাস না থাকা কিংবা আস্থা না থাকা ও একধরণের বিশ্বাসবোধ। আমরা কোন না কোন ধর্মে বিশ্বাস করি অসীমতার অভাববোধ থেকেই। অসীম ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করে আশ্রয় খুঁজি কিংবা ইহজগতে অপূর্ণ কামনা পরজগতে পূরণ করার অভাববোধ থেকেই। একজন চিকিৎসকের কাছে গিয়ে প্রথমেই বিশ্বাস করি তিনি আমার যথার্থ চিকিৎসা করবেন ও সঠিক পরামর্শ দিবেন, শরীর বিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞানের অভাববোধই আমের বিশাসের উৎস। যে কোন ঔষধ সেবনের পূর্বে অবশ্যই বিশ্বাস করি উক্ত ওষুধ আমার রোগ নিরাময়ের জন্য যথেষ্ট। একজন গরীব মানুষের মসজিদের ইমাম থেকে পানি পড়া গ্রহন ও রোগ নিরাময়ের বিশ্বাস অর্থনৈতিক ক্ষমতার অভাব বোধেরই বহিঃপ্রকাশ। আবার একই কাজ ধনী লোকের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অভাব না থাকলেও তথাকথিত আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতি অবিশ্বাস কিংবা চেষ্টার ব্যর্থ ফলাফল। বিশ্বাসগুলো যেহেতু পরিবর্তনশীল তাই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে একই বিশ্বাস প্রতিফলিত নাও হতে পারে। আমার বাবা কিংবা দাদার প্রজন্ম তুলসীপাতা, থানকুনিপাতা, অ্যালভেরা ইত্যাদির মাধ্যমেই চিকিৎসা পদ্দতিতে বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু আমার প্রজন্মে কোম্পানি ও তথাকথিত আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্যের ও যুক্তির মারপ্যাচ আমাকে ভাবতে শিখিয়েছে, আমার বাবা ও দাদা ছিলেন কুসন্সকারাচ্ছন্ন মানুষ। কিন্তু আমি আধুনিক বিজ্ঞান্ মনস্ক মানুষ। মুনাফার রাজনীতি বিশ্বাসের সংস্কৃতিকে বারবারই পরাজিত করার চেষ্টা করে।

যে কোন বিশ্বাসের উৎস বিবেচনা ছাড়াও স্বীকৃতি দান একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয়। রাষ্ট্র প্রধান, সমাজ প্রধান, জাতি প্রধান কিংবা সমাজের বিশিষ্ট গুণীজনই মুলত যে কোন বিশ্বাসের স্বীকৃতি দানের কিংবা নাকচ করে দেয়ার সত্ত্বাধিকারী যেখানে বিশ্বাস ধারণকারীর কোন মুল্য নেই। সুতরাং সত্ত্বাধিকারী ব্যাক্তিবর্গের মন-মানসিকতা, জ্ঞান, তথ্য ভাণ্ডার, মূল্যবোধ ইত্যাদি সামস্তিক জনগনের বিশ্বাস গ্রহন করা না করার নীতি- নির্ধারক। যে কারনে কোন সমাজে মুসলমান ছেলেদের খতনা ধর্মীয় নীতি কিংবা স্বাস্থ্য পরিচর্যার একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয় আবার কোন সমাজে নারীদের খতনা প্রথাও জায়েজ। স্বাস্থ্য বিজ্ঞান সকল সমাজে একই প্রকার স্বাস্থ্য বার্তা পৌঁছাতে ব্যর্থ, কেননা সমাজের নীতি, বিশ্বাস ও মূল্যবোধগুলো সেখানে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সার্বজনীন স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বলেও কিছু নেই আদতে। সে অর্থে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য প্রচার, নানা ধরনের রোগের নামকরন ও ঔষধ আবিষ্কার সবই মুনাফার রাজনীতি, স্বাস্থ্য রাজনীতি। একটি বিশ্বাস আরেকটি বিশ্বাসের জায়গায় প্রতিস্থাপনের রাজনীতি। কোন সমাজে পরিবার পরিকল্পনা পদ্দতি গ্রহন আধুনিক মানুষের পরিচায়ক আবার কোন সমাজের বিশ্বাস অনুযায়ী পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণযোগ্য নয়।

সমাজের এই বিশ্বাসটুকু ‘অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ ও প্রভাব’ নামক যুক্তির বেড়াজালে পরাজিত করা সম্ভব হলেই পরিবার পরিকল্পনার সমগ্রির বাজার উন্মুক্ত হয় ও মুনাফার গ্যারান্টি পাওয়া যায়। আজকাল আধুনিক বিশ্বে ‘বিয়ে প্রথা’ বিশাশে আঘাত করে বিয়ে বহির্ভূত যৌন মিলন ও প্রগতিশীল মননের পরিচায়ক। ফলে বানিজ্যের দুয়ার উন্মুক্ত হওয়ার অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়। সমাজ ভেদে, সমাজের অভ্যন্তরস্থ বিশ্বাসের ভিন্নতা ভেদে স্বাস্থ্য, রোগ ও চিকিৎসা পদ্দতিতে সার্বজনীনতা না থাকায় বিশ্বাসের পরিবর্তন ও প্রতিস্থাপন ক্রমাগতই জটিল হচ্ছে। যে কারনে শরীরের তাপমাত্রার ভিন্নতা ভেদে ঔষধ সেবন ও চিকিৎসকের পরামর্শও জরুরী হয়, উচ্চ রক্তচাপ, নিম্ন রক্তচাপ, রক্তের সুগারের পরিমান, হার্টবিট সংখ্যা, পালসবিট সংখ্যা ইত্যাদি যাবতীয় সংখ্যার ব্যাবহার করা হয় সার্বজনীনতা এবং পৃথিবীব্যাপী ঔষধ বানিজ্যের সম্প্রসরনের কারণ উপস্থাপন সহজ হয়।

পৃথিবীব্যাপী বিতর্কিত ইস্যু হোল ‘ধর্মবিশ্বাস কি রোগ নিরাময়ে সহায়তা করে’? কিংবা যে কোন বিশ্বাসের অংশ হিসেবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন পদ্দতি কিংবা বিশেষ কোন কার্যক্রম রোগ নিরাময়য়ের ক্ষেত্রে কোন উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখে কিনা? স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতে তার কোন স্বীকৃতি কিংবা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে কিনা? যেমন- মাজার জিয়ারত করা,পানি পড়ার মাধ্যমে রোগ নিরাময়ের প্রত্যাশা, তাবিজের ব্যবহার, রোগ শোকের বিপরীতে দান খয়রাত করা, রোগ মুক্তির জন্য ব্যাক্তিগত ও সামস্তিক পর্যায়ে দোয়া মাহফিল, নানা ধর্মের আচার অনুষ্ঠান ইত্যাদি। এ সম্পরকিত মাসিক গনস্বাস্থ্য পত্রিকা (অক্টোবর-নভেম্বর ২০০৭ সংখ্যা) প্রছদ রচনার কিছুটা অংশ দেখা যাক। আধুনি সমাজ বিজ্ঞানের অন্যতম প্রবক্তা এমিল দুরখাইম (Emil Durkhaim) সমর্থন করেছেন যে, ধর্মীয় বিশ্বাস এক ধরনের আঠার ন্যায় কাজ করে- যা সমাজকে নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে। কারণ এতে এমন সব আচার অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা রয়েছে যেগুলো মস্তিস্কের এন্ডরফিন (Endorphin) নিঃসরণে (Secration) ভালো ভূমিকা রাখে। এন্ডরফিন (Endorphin) হচ্ছে দেহের ব্যাথা নিয়ন্ত্রনের প্রাকৃতিক পদ্ধতি। ব্যাথা যখন মামুলি, এন্ডরফিন তখন মোটামুটি নিস্ক্রিয় থাকে। কিন্তু প্রয়োজনে এরা ব্যাপকভাবে মস্তিস্কে ছড়িয়ে পড়ে। এ জন্যই ধার্মিক লোকেরা এত সুখী হয়। তদুপরি এন্ডরফিন অন্যক্রম্য পদ্ধতিকেও (Immune System) যথাযথভাবে কাজে লাগায়।এ কারনে ধার্মিকলোকদের স্বাস্থ্য তুলনামুলকভাবে ভাল থাকে। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে দৈহিকভাবে কষ্টকর কাজের আয়োজন করা হয় জেমন-গান গাওয়া, শরীর আন্দোলিত করা, হাঁটু ভেঙে বসা, পদ্মাসন করা, তসবিহ জপা, এমনকি নিজেকে নিজে চাবুক মারার মতো কষ্টদায়ক কাজ করা ইত্যাদি। ফলে এন্ডরফিন (Endorphin) নির্গত হওয়ার কারনে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভুমিকাকে অস্বীকার করার উপায় নাই। বিশ্বাস আক্ষরিক অর্থে পর্বত সরিয়ে ফেলেনি তবে এর রয়েছে নাটকীয় ক্রিয়া। Maryland East of National Institute of Health-এর গবেষক ডীন হ্যামার (Deen Hammer) বলেন-ব্যাপকভাবে বিশ্বাস হচ্ছে যৌক্তিকতা থেকে উদ্ভুত একটি বিষয়। কোন কিছুতে বিশ্বাস স্থাপন করতে হলে অন্তত অস্পষ্টভাবে হলেও নিজিসটা সম্পর্কে জানতে হবে। এ জন্যই মানুষ বিশ্বাসকে অনুভব করে, চিন্তা করে না। বিশ্বাসের যৌক্তিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া দুস্কর। ঔষধের প্রতি বিশ্বাস গড (ঈশ্বর, ভগবান কিংবা আল্লাহ) এর প্রতি বিশ্বাসের মতো সর্বব্যাপী এবং এর ফল নিয়ন্ত্রণ ও পরিমাপ করা সহজতর হয়। বিষণ্ণতাবিরোধী ঔষধের ৮০ শতাংশ সুফল পাওয়া যায় কারন রোগীরা বিশ্বাস করে এতে কাজ হবে। বিকল্প ঔষধের ক্ষেত্রে (Alternative Medicine) বিশ্বাসের প্রভাব আরও অনেক বেশী। আকুপাংচার চিকিৎসায় শরীরের যে কোন স্থানে সুচ প্রবিষ্ট করালেও ব্যাথা নিরাময় হবে। রোগীদের ওপর ছলউইসধি (Placebo) ব্যবহৃত হয়েছে অসংখ্য জরিপে। শুধু বিশ্বাস কিভাবে রোগ নিরাময় করে, সেটার প্রমাণও পাওয়া গেছে অসংখ্য গবেষণায়। তাহলে পানি পড়া কিংবা তাবিজ-কবজের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও রোগ নিরাময়য়ের প্রত্যাশাকে কুসংস্কার বলি কেন?

ছলউইসধি (Placebo)ক্রিয়া হচ্ছে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশ্বাসের জৈবিক প্রভাব। এটা যে একটা বাস্তব ও জোরাল শক্তি সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এক বছরব্যাপী গবেষণায় দেখিয়াছেন, ১৪ জন সুস্থ লোককে ঔষধ খওয়ানোর ফলে তাদেন চোয়াল ব্যাথা হয় এবং পরে সবাইকে ব্যাথা নিরাময়ের ঔষধ দেয়া হয়। বলা হয়, এতে ব্যাথা কমতে পারে আবার নাও কমতে পারে। প্রকৃতপক্ষে ঔষধটি ছিল একটু স্যালাইন পানি কিন্তু স্যালাইন পানি খেয়েই সকলের ব্যাথা ভাল হয়ে যায়। ব্যাথা নিরাময়ের ব্যাপারটি শুধু কাল্পনিক ছিল। গবেষক পজিট্রন এমিশন টমগ্রাফি (PET)ব্যবহার করে দেখতে পান ছলউইসধি ব্যবহারকারী রোগীদের মস্তিস্কে অধিক পরিমাণে এন্ডরফিন (Endorphin) ক্ষরণ হচ্ছে। এই এন্ডরফিন হচ্ছে দেহের প্রাকৃতিক ব্যথানাশক পদার্থ। অসংখ্য গবেষণা ও সাক্ষ্য প্রমানে এ কথার সমর্থন পাওয়া যায় যে, বিশ্বাস একটি সচেতন, যৌক্তিক প্রক্রিয়া। কোন চিকিৎসায় কাজ দিবে কিনা তা চিকিৎসা গ্রহণকারীর বিশ্বাসের ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে। আকুপাংচার নিরাময় শক্তি সম্পর্কে যে সকল মানুষের বিশ্বাস হয় না, আকুপাংচার চিকিৎসায় তাদের কোন উপকার ও হয় না। ফলে আমাদের প্রচলিত পানি পড়া, তাবিজ, হুজুরের দোয়া ইত্যাদি চিকিৎসা পদ্দতি কুসংস্কার ছলউইসধি (Placebo) হিসাবেই মুলত ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানা ধরনের চিকিৎসা পদ্দতিকে আমরা সহজেই কুসংস্কার বলে নাকচ করে দেই, কিন্তু কুসংস্কার হিসেবে প্রমান করার কোন জোরালো যুক্তি থাকে না সব সময়। আমাদের প্রচলিত বিশ্বাস ও সমাজের প্রভাবশালী বিশ্বাসের বহির্ভূত বিধায় অন্য বিশ্বাসগুলো কুসংস্কার আর আমাদের বিশ্বাসগুলো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে বলে আমরা দাবী করি।

সম্প্রতি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত ‘অলৌকিক নিম গাছের গোঁড়ায় আগরবাতি-মোমবাতি, মিথাই- সর্বরোগের ঔষধ হিসাবে গাছের রস সংগ্রহে লম্বা লাইন’ শীর্ষক প্রতিবেদন। এ রকম অলৌকিক শাক্তি ও জনগনের বিশ্বাস শীর্ষক প্রতিবেদন প্রায়ই পত্রিকায় প্রকাশ পায়। শুধু বাংলাদেশেই এ ধরনের বিশ্বাসের প্রচলন এমন নয়, এশিয়া মহাদেশে প্রায় প্রতিটি দেশেই বিশ্বাসের সাথে রোগমুক্তি কামনার যোগসূত্র দেখা যায়। এমনকি উন্নত বিশ্ব জাপান, কানাডা ও ল্যাটিন অ্যামেরিকাতেও জনমানুষের রোগমুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বাসের প্রাধান্য দেখা যায়। দকল ক্ষেত্রেই একটি সাধারন প্রশ্ন হল- অলৌকিক শাক্তির সাথে স্বাস্থ্য কিংবা রোগ মুক্তির সম্পর্কই কেন বারবার সম্পর্কযুক্ত হয়? অলৌকিক শক্তির সাথে মানুষের শিক্ষার মান বৃদ্ধি, আয়-বৃদ্ধি, সমাজের অন্যায়-অনাচের রধ, চুরি-ছিনতাই, ডাকাতি প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয়গুলো কেন সম্পর্কযুক্ত হয় না?স্বাস্থ্যের সাথে, রোগ-শোকের সাথে মানুষের জীবন মরণের সমস্যা, মানুষের প্রতিটি মুহূর্ত বেঁচে থাকার প্রশ্ন জড়িত। সরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় যখন মানুষ চিকিৎসা পাতে ব্যর্থ হয় তখন আশাহীন মানুষের একমাত্র ভরসা বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে, অতিমাত্রায় বিনিয়োগহীন সুস্থতা লাভের প্রচেষ্টা। ফলে যত ধরনের অলৌকিক বিশ্বাসের (পানি পড়া, হুজুরের ক্ষমতা, অলৌকিক গাছের রস, পকুরের পানি রোগমুক্তির ক্ষমতা ইত্যাদি) প্রতি মানুষের লম্বা লাইন চোখে পড়ে। সেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে প্রায় ২০০ শতাংশ মানুষই সরকারী হাসপাতালমুখী দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ। সরকারী চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, বেসরকারি চিকিৎসা লাভের অর্থনৈতিক অক্ষমতা মানুষের অলৌকিক শাক্তির ওপর বিশ্বাস স্থাপন হয় সহজেই। তা না হলে এপোলো, ল্যাবএইড কিংবা ইউনাইটেড হাসপাতালগামী কংবা মাদ্রাজ, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা প্রাথির জঙগণকে কেন ওই অলৌকিক নিক গাছের লাইনে দেখা যায় না। অনেকেই নিরক্ষরতাকে অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস স্থাপনের কারন বলে মনে করেন। কিন্তু বাংলাদেশে এখন অসংখ্য নজীর আছে স্বাক্ষর জ্ঞানহীন অসংখ্য ধনী লোক ও সিঙ্গাপুর হাসপাতালে চিকিৎসাপ্রার্থী। তাহলে স্বাক্ষরতা কিংবা নিরক্ষরতার সাথে অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাসের খুব একটা সম্পর্ক নেই। সন্তান লাভে ব্যর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককেও হুজুরের পানি পড়া নিতে দেখা যায়, কেননা টেস্টটিউব বেবি গ্রহন অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সংস্কৃতি গ্রহণযোগ্যতা পায় না। অর্থাৎ যে কোন ধরনের ব্যর্থতা, হতাশা ও সুযোগ না পাওয়া আশাহীন মানুষেরই দ্রুত বিশ্বাস স্থাপন হয় অলৌকিক ক্ষমতার ওপর।যদি বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার আওতাভুক্ত করা যায় এবং জনগণ চিকিৎসার গুনগত মান সম্পর্কে সন্তুষ্টি অর্জন করে তাহলে রাতারাতি সমস্ত অলৌকিক ক্ষমতার লাইন ফাঁকা হয়ে যাবে।

পত্রিকায় প্রকাশ বগুরার আলমদিঘি উপজেলার তালশন গ্রামের একটি নীম গাছ চত্তরে আশাহীন মানুষের রোগমুক্তির আশায় ক্রমশই ভিড় বাড়ছে। নীম গাছের শরীর ফেটে বের হতে থাকা মিষ্টি রসকে কেন্দ্র করে অলৌকিক ক্ষমতার প্রতি মানুষের বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। পরিত্র মনে মানত করে গাছের রস পান করলে রোগবালাই ভাল হবে-এমন বিশ্বাসে লোকজন সারাদিন ভিড় করছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা গাছটিকে রোগাক্রান্ত চিহ্নিত করে বলেছেন-ঝরে পড়া রসে কোন ঔষধি গুন নেই কিন্তু তারপরও অলৌকিকত্বে বিশ্বাসীদেরকে ঠেকানো যাচ্ছে না। অলৌকিক গাছটিকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের আচার অনুষ্ঠান পালিত হচ্ছে-প্রতিদিন অন্তত ১০০ প্যাকেত আহরবাতি, সমসংখ্যক মোমবাতি, ৫০ প্যাক ম্যাচ আরে ১০/১৫ কেজি বাতাসা জমা হচ্ছে, গাছের নীচে লালসালু খোলা হয়েছে, পবিত্র জ্ঞান করে গাছের চারদিকে বেড়া দেয়া হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। অন্যদিকে ঘটনাটির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হোল- গাছের শরীর বৃত্তীয় সমস্যার কারনে মাটি থেকে খাবার হিসেবে উঠে আসা রোসগুলো ঝরে পড়ছে।মাটিতে পটাসিয়ামের পরিমান কমে যাওয়ায় গাছটির ক্যাম্বিয়াম সেল দুর্বল হয়ে পরেছে, মাটিতে প্রয়োজন মত সার প্রয়োগ করলেই গাছটি সুস্থ হয়ে উঠবে এবং অলৌকিক ক্ষমতার অবসান ঘটবে। পুরো ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখা জানার পর সকলের বিবেচনাতেই মানুষের হুলুস্থুল কাণ্ডটি মুলত কুসংস্কার, তার পূর্ব পর্যন্ত ঘটনাটি ছিল ব্যাখ্যার অতীত এবং অতি প্রাকৃতিক। সংবাদ প্রতিবেদক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের কাউকেই জিজ্ঞাসা করেনি, তারা উপজেলা সরকারী হাসপাতালে না গিয়ে রোগমুক্তির আশায় এখানে কেন জড় হয়েছে? প্রশ্নটি করা হলে আমার ধারনা, ১০০ শতাংশ মানুষই কোন না কোন তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতেন। অবশেষে আশাহীন এই মানুষদের বিশ্বাসগুলো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ধূলিসাৎ করে আবারো ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাছে, কিন্তু পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা না করেই। ফলে অর্থনীতির প্রাথমিক পাঠের যে সুত্র-চাহিদা ও যোগানের সমন্বয় না হলে প্রোডাক্টের মুল্য বেড়ে যায়, সেই একই কৌশলে শুধু তথাকথিত আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিকে বাদ দিয়ে বাকী সকল চিকিৎসা পদ্ধতিকে (আয়ুর্বেদ, ইউনানি, হোমিওপ্যাথি ইত্যাদি) অবজ্ঞা করেই চাহিদা ও যোগানের সংকট তৈরি করা হচ্ছে। ফলে ডাক্তারদের ফি প্রতি মিনিতে ৫০০ টাকা এবং ঔষধের মুল্য ক্রয় ক্ষমতার বাইরে হলেও মানুষ জমি বিক্রি করে কিংবা চড়া সুদে ঋণের টাকাতেই চিকিৎসা করাবে- এমনটাই স্বাস্থ্য রাজনীতির প্রত্যাশা। আর সে প্রত্যাশা পূরণে আমরা সবাই সচেতন কিংবা অসচেতনভাবেই অবদান রেখে চলেছি।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:৫১

অন্ধবিন্দু বলেছেন:
লিখাটিতে দৃঢ়-যুক্তি ও তথ্য রয়েছে। বিশ্বাস ও বিজ্ঞানের মধ্যে অবিভাজ্য সম্পর্ক রয়েছে। ধনতন্ত্রের ফাটলে পড়ে এই ভারসাম্য ধূসর হোক; তা চাইনে।

মনে হয় আপনি মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছেন বা করছেন ?

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.