| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সাখাওয়াত হোসেন বাবন
আমার পরিচয় একজন ব্লগার, আমি সাহসী, আমি নির্ভীক, আমি আপোষহীন । যা বিশ্বাস করি তাই লিখি তাই বলি ।
চার
তোরাব আলী হাজি বসে আছেন তার বৈঠকখানায় । রাগে তার পুরো শরীর কাপছে । তার পাশের চেয়ারেই বসে আছে সুনীল, সুনীল পোদ্দার। তোরাব আলীর ম্যানেজার কাম পরামর্শদাতা।
আজাহার দাঁড়িয়ে আছে বৈঠকখানার সদর দরজার কাছে দেয়ালে হেলান দিয়ে।তোরাব আলীর রাগের কারণ আজাহার হলেও তিনি আজাহারকে কিছু বলছেন না। যতো রাগ ঝারছেন সুনীলের পোদ্দারের উপর । রাগের সময় মানুষটা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কি বলতে বলেন নিজেই ঠাহর করতে পারেন না৷
তোরাব আলী হাজি সুনীল পোদ্দারকে বকাঝকা করলেও সুনীল সে সব শুনছে বলে মনে হচ্ছে না । সে উঠে গিয়ে বৈঠকখানার পূর্ব পাশের জানালার কাছে বসে কানে রেডিও লাগিলে, "খবর শুনছে।"
এতে তোরাব আলীর রাগ আরো বেড়ে যাচ্ছে । সত্যিই বুঝি তার দাম সর্বত্র কমে যাচ্ছে । সবগুলি মাজেদের মতো বেয়াদপ হলো নাকি । না, এসব মেনে নেওয়া যায় না। মাজেদের কথা না হয় বাদ দিলাম কিন্তু কর্মচারী হয়ে মনিবের কথা শুনবে না; এইডা মেনে নেওয়া যায় না ।
তোরাব আলী তাই সুনীলের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন , "এই কি বলছি তা কি তোর কানে ঢুকছে না ?"
সুনীল এবার রেডিওটা বন্ধ করে,রেডিওটা টেবিলের উপর রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে তোরাব আলীর পাশের চেয়ারে বসলো। তারপর পানের কৌটা থেকে পান বের করে তাতে চুন ,সুপারী আর সামান্য জর্দা দিয়ে তোরাব আলীর হাতে দিতে দিতে বলল, "এতো ক্ষ্যাপলে কি রাজনীতি করা যাইবো কর্তা ? যাইবো না৷ রাজনীতি হইছে মাথা ঠান্ডা রাখনের খেলা । গলা চড়াইলে ফেল মারবেন। তাই মাথাডা ঠান্ডা রাখুন । যা হইবার ছিলো তা হইয়া গেছে । সামনে যেনো এমন আর না হয় সেইডা খেয়াল রাখুম।
তোরাব আলী এবার আরো গরম হয়ে বলে উঠলো; পরেরটা পরে হইবো। আগে ওরে জিজ্ঞাসা কর, মিছিলের মধ্যে ওরে বোমা মারতে কে কইছে ? ওর সাথে তো কথা ছিলো, মিছিলের আশে পাশে এমন ভাবে বোমা মারবো যাতে ভয়ে সবাই পালায় যায়। তা না করে , হারামজাদাটা সরাসরি মিছিলের মধ্যেই বোমা মেরে এসেছে । এখন যদি হাই কমান্ড টের পাইয়া যায় এটা আমার কাজ তা হইলে তো জেলে যাইতে হইবো।"
সুনীল বলল, "এতো ভয় পেলে চলবে না কর্তা । বিষয়টা আমি দেখতাছি। আপনে নাকে তেল দিয়া ঘুমান ।"
"নাকে তেল দিয়া ঘুমামু মানে? সামনে ইলেকশন শেখ সাহেবের এই আসনের প্রতি আলাদা দরদ আছে। এইডা কি তুমি জানো না?
তোরাব আলী তুই থেকে তুমিতে নেমে এসেছেন দেখে , সুনীল হালে পানি পায় । মনে মনে ভাবে মাথা মোটা লোকটার মাথা ঠান্ডা হয়ে এসেছে । এখন পুরো বিষয়টা সহজেই নিজের কন্টোলে নিয়ে নেওয়া যাবে ।
সুনিল একটু ভাবের সাথে বলল, "জানি। তয় ; এইডা নিয়া এখন না ভাবলেও চলবো। এরপর সুনীল একটু ঝাঝের সাথে বলল,"কইলাম তো ব্যাপারটা আমি দেখতাছি। যদি আমার উপর আস্থা না থাকে, তাইলে কন, আমি নিজের রাস্তা মাপি।"
সুনীলের কথায় তোরাব আলী দমে গেলো। সে একবার আজারের দিকে তাকিয়ে তারপর আবার সুনীলের দিকে তাকিয়ে বলল,"ঠিক আছে, যা ভালো বুঝো করো।"
এরপর তোরাব আলী চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে হাতের পানটা মুখে পুড়ে আরাম করে চাবাতে লাগলো।
সনীল এবার দরজার কাছে দাড়িয়ে থাকা আজাহারের দিকে তাকিয়ে বলল,"পুরা ঘটনাটা খুইল্লা ক দেহি ?"
আজহার বলল, "ঘটনা খুইল্লা কওনের কিছু নাই । দ্বিতীয় বোমাটা ছুড়নের সময় একটু জোরে মাইরা দিছিলাম । সেইডা এক্কেবারে মিছিলের মধ্যে গিয়া পরছে ।এইডাই ঘটনা। এইসব কাজে সব সময় হাতের সই ঠিক রাখন যায় না, সুনিল দা ।"
"কেউ মারা যায়নি তো ?" সুনিল ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করে ।
"কইতে পারি না । বোমা মাইরা আর দাড়াই নাই। গলিতে ঢুইকাই দেয়াল টপকে চইল্লা আইছি । তয় ... না মরলেও দুই চাইরডার হাত, পা যে উইড়া গেছে এইটা নিশ্চিত ।"
কথাটা শুনে তোরাব আলী আবার ফুসে উঠে ,"দেখছো , দেখছো ; নোশাখোরটা ক্যামনে কথা ক'য় ?"
তোরাব আলীর কথাটা , আজহারের আত্মসম্মান্র গিয়ে লাগে । সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে , "এতো দমকাইয়েন না কাকা । এই আজহার কারো ধমকে ভয় পায় না। আপনার ধমকেও না । নেশা করি দে্ইখাই বোমা বানাই । বোমা মারি । তা না হইলে এই কাম আমার বংশে কেউ কোনদিন করে নাই । এই বোমা মাইরা মাইরাই যে দেশটা স্বাধীন করছি এই কথাডা ভুইল্লা যায়েন না। "
তোরাব আলী কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায় । সুনীল চট করে উঠে গিয়ে আজহারে হাত ধরে বলে দুপুরে কিছু খেয়েছিস বলে মনে হয় না। চল, আজ তোকে হিটলারের দোকানে গরুর গোস্ত দিয়ে ভাত খাওয়ামু ।
আজহার ঝামটা মেরে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে , "গরুর গোস্ত লাগবো না সুনীল দা। তুমি কইছো দেইখা কামটা লইছিলাম। বাকি টাকাটা দাও কাইটা পড়ি।"
সুনীল একবার তাকায় তোরাব আলীর দিকে । তারপর প্যান্টের পকেট থেকে কচকচে নতুন একটা একশ টাকার নোট বের করে আজহারের হাতে গুজে দিয়ে বলে, "এই নে; নেশা ভান করে শেষ করিস না। বাড়ির জন্য আনাজ পাতি কিনে নিয়ে যা।"
আজাহার টাকাটা হতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে বলে, "নকল না তো ? হুনছি, ভারত থন মালা ১শ,৫শ টাকার নকল নোট দেশে ঢুকছে।"
উত্তরে সুনীল বলল, "নকল হইলে আবার আইসা নিয়া যাস । তখন দুইশো দিমু। এখন লোকজন আসার আগে ভাগ এখান থেকে।" আজহার টাকাটা প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে চলে যেতে উদ্দত হতেই সুনীল পেছন থেকে বলে উঠলো, "শোন, মাজেদ সরর্দারের খোজ খবর রাখবি। উল্টাপাল্টা কিছু শুনলে আমারে জানাতে ভুলবি না। বড় কাজ আছে সামনে।"
আজহার দরজার সামনে দাড়িয়ে কি একটা ভেবে নিয়ে বলল, "তার জন্য এক্সট্রা মাল লাগবো ,সুনীল দা । যা দিলে এতে কাজ হবে না ।" কথাটা বলে একবার তোরাব আলীর মুখের দিকে তাকিয়ে ফের বলে, "এই আজাহার আর কারো লাইগা ফ্রি কাম করবে না।আগে মাল তারপর কাম এইডাই লাস্ট কথা । "
সুনীল হেসে পকেট থেকে আরো একটা একশ টাকার নোট বের করে আজাহারের হাতে দিয়ে বলল ,"টাকা কোন ব্যাপার না । যখন লাগবে এসে নিয়ে যাবি । যা এখন ।"
আজাহার নোটটা নিয়ে তোরাব আলীর দিকে ঘুরে সালাম দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায় ।
আজাহার বের হয়ে যেতেই , তোরাব আলী বলে উঠে , "তুমি কিন্তু ওরে একটু বেশি প্রশ্রয় দিয়া ফেলছো মিয়া । এতোগুলি টাকা দেওয়ার কি দরকার ছিলো ?"
সুনীল তোরাব আলীর পাশের চেয়ারে বসতে বসতে বলল , "শুনেন কর্তা , কিছু কিছু ক্ষেত্রে টাকা পয়সার দিকে তাকালে চলে না । চিন্তা করে দেখেন আমার এক কথাও ও নিজে গিয়ে বোমা মেরে এসেছে । এ কাজটা কি অন্য কেউ আপনার জন্য করবে ? করবে না । এদের হাতে রাখলে বিপদের সময় কাজে লাগে ।"
তোরাব আলী বলল, ধরা পরার পরে যদি আমার নাম বলে দেয় তখন তোমারে দেখামু মজা । সুনীল হেসে বলল, "আচ্ছা ঠিক আছে মজা দেখাইয়েন । এখন আমি চললাম ।"
চল্লাম মান ? কোথায় যাচ্ছ ?
সুনীত ততক্ষনে একটা পান বানিয়ে হাত নিয়ে উঠে দাড়িয়েছে ।বানানো পানটা মুখে পুড়ে সে বলল, "যাই একটু, মিটিং এর খোজ খবর নিয়া আসি । শুনেছি শেখ মনি , তোফায়েল, হানিফ সাহেবরাও নাকি আজকের মিটিং এ আসবে। কি বলে শুনে আসি । আমার তো আর দাওয়াত লাগে না । দাওয়াত না দিলেও আমি যেতে পারি ।
সুনীলের কথার খোচাটা তোরাব আলীর বুকে গিয়ে লাগলেও তিনি আহত বাঘের মতো চুপ করে থাকলেন কিছু বললেন না । কারণ তিনি জানেন এ নিয়ে কিছু বলে লাভ নেই । সুনীল তার কর্মচারি হলেও সে তার ভালোটাই চায়।
হিন্দু হয়েও তাকে বাবা বলে ডাকে । শুধু ডাকে না পিতার মতো ভালোও বাসে । তার এসব ছোট খাটো খোচা সহ্য করার অভ্যেস তোরাব আলীর বহু আগেই হয়ে গেছে । নিজের ইজ্জত ঠিক রাখার জন্যই যেনো তিনি সুনীলের দিকে তাকিয়ে বললেন , "হাতি যখন গর্তে পরে তখন চামচিকাও তারে লাত্থি মারে । দিন আসলে তোর এই কথার জবাব দিমু ।"
"সেই আশাতেই রইলাম কর্তা ।"
কথাটা বলে সুনীল আর দাঁড়ায় না । পান মুখে দিয়ে গুনগুন করতে করতে ঘর থেকে বের হয়ে যায় ।
তোরাব আলীর বাড়ির পাশে গোয়াল ঘাট এলাকায় ।
তোরাব আলীর বাসা থেকে বের হয়ে সুনীল হাঁটতে হাঁটতে দোলাই খালের কাছাকাছি আসতেই লোহা লক্করের দোকানগুলোর সামনে ছোট ছোট কয়েটা জটলা দেখতে পায়। দোকানের কর্মচারীরা রাস্তায় বের হয়ে এসে কিছু একটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে । সকলের চোখে মুখে উৎকণ্ঠার ছাপ স্পস্ট ।
সুনীল ধীর পায়ে হেটে জটলার কাছে পানের দোকানের সামনে গিয়ে সিগারেট কেনার বাহানা করে দাঁড়ায় । তার উদ্দেশ্য লোকগুলো কি নিয়ে কথা বলছে তা শোনা।
পানের দোকানদার সুনীলের পরিচিত । সুনীল পানের দোকানের সামনে এগিয়ে যেতেই , দোকানদার বলে উঠে , নমস্কার সুনীল দা । ঘটনা কিছু শুনছেন ? সুনীল কিছুই না জানার মতো একটা ভান করে বলে, না শুনিনি ঘটনা কি; কি শুনবো ?
এবার জটলার লোকগুলো ঘুরে তাকিয়ে সুনীলকে দেখতে পেলে বলে উঠে ,"নমস্কার দাদা " । প্রতি উত্তরে সুনীল ও নমস্কার বলে । সুনিল পানের দোকানদারের দিকে তাকি বলে , "একটা সিগারেট দে তো জামাল । তোরাব আলীর লোক হিসাবে সুনীলের এই এলাকায় আলাদা একটা পরিচিতি আছে । সকলে এক নামে তারে চেনে । কদর করে । মানুষের বিপদে আপদে তোরাব আলীর হয়ে সুনীল ই এগিয়ে যায় । সাধ্য মতো সাহায্য করে ।
দোকানের ছেলেটা সিগারেট বের করে সুনীলের দিকে এগিয়ে দেয় । সুনীল সিগারেটা নিয়ে, সেটা বাম হাতের তালুতে বারকয়েক টোকা দিয়ে । এরপর নাকের কাছে নিয়ে তামাকের গন্ধ শুকে । তারপর মুখে থাকা পানের অবশিষ্ট অংশ থুক করে ফেলে, দোকানের পাশে ঝুলতে থাকা রশি থেকে সিগারেট ধরীয়ে সিগারেট দীর্ঘ একটা টান দিয়ে গভীর ভাবে ধোয়া ছাড়ে । তারপর ফের দোকানের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে , ঘটনা কি রে ?"
সুনীলের নির্লিপ্ততা দেখে পান দোকানদার ছেলেটা একটু দমে গিয়েছিলো । এবার সে তাই দ্বিগুন উৎসাহ নিয়ে বলতে শুরু করলো, "ওই যে মাজেদ সর্দার আছে না ? আরে ওই.... যে সদরঘাটের মাজেদ কুলি । তার মিছিলে আজ বোমা হামলা হইছে বস । চার ,পাঁচজন তো মরছেই । হুনছি মাজেদ কুলিরও নাকি হাসপাতালে ভর্তি হইছে । বাঁচে কিনা বলা যায় না ।"
খবরটা সুনীলের শুনে ভেতরের ভেতরে চমকে উঠে । এতো বড় কান্ড হয়ে যাবে তা সে কল্পনাতেও ভাবতে পারে নাই । সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলে , বলিস কি ? এতো বড় একটা ঘটনা ঘটে গেলো আর আমি জানি না ? তারপর চলে যাবার জন্য ঘুরে দাড়িয়ে কি মনে করে ফিরে তাকিয়ে বলল, দাড়া খবরটা কাকা রে দিয়ে আসি । তারপরেই মুখ থেকে পানের পিক ফেলে, ফের জিজ্ঞাসা করলো , কারা ঘটাইলো এমন ঘটনা ?
সুনীলের প্রশ্ন শুনে পান দোকানদার ছেলেটা দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে বলে, "কারা আবার কুলিদের মধ্যে কত গ্রুপ আছে । তাদের কোন একটায় মারছে হয়তো । কথাটা শুনে সুনীল অনেকটাই নিরভার হয়ে গেলো । মুখে এক চিলতে বক্র হাসি খেলে গেলো । এটা তার মাথায় আগে আসে নাই । সে মনে মনে ঠিক করে ফেললো এটাকেই কাজে লাগাতে হবে । কুলিতে কুলিতে মারামারি খুনাখুনি নতুন কিছু না ।
সুনীল ফের পানের পিক ফেলে সিগারেট টান দিয়ে ধোয়া ছেড়ে ফের প্রশ্ন করে, সমাবেশের কি হবে রে ?
ছেলেটা এবার হেসে বলে ,"সমাবেশ টমাবেশও ফুইটা গেছে । এরপর কেউ আর সমাবেশে আসার সাহস করবো ? আপনিই কন ?
প্রতি উত্তরে সুনীল কিছু বলল না । শুধু মুখে চুকচুক শব্দ করে আফসোস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফলে পানের দাম মিটিয়ে দিয়ে তোরাব আলীর বাড়ির দিকে রওনা হাঁটা দিলো ।
চলবে....
©somewhere in net ltd.