| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শাওন আহমাদ
এটা আমার ক্যানভাস। এখানে আমি আমার মনের কোণে উঁকি দেয়া রঙ-বেরঙের কথাগুলোর আঁকিবুঁকি করি।

মাকে ভালোবাসতে কি সত্যিই বিশেষ কোনো দিনের প্রয়োজন আছে? একদমই না। বছরের প্রতিটি দিনই মাকে ভালোবাসার জন্য বিশেষ দিন। এর জন্য আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন নেই।
আজ বিশ্ব মা দিবস। সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে চোখে পড়ছে মাকে নিয়ে নানা আবেগঘন পোস্ট। কেউ মায়ের সঙ্গে সুন্দর ছবি দিচ্ছেন, কেউ দীর্ঘ স্ট্যাটাস লিখে ভালোবাসার কথা জানাচ্ছেন। এসব দেখে আমার বেশ ভালোই লাগে, কিন্তু পরক্ষণেই আমার মনের ভেতর একটা প্রশ্নও খুব জোরালোভাবে উঁকি দেয়। মাকে ভালোবাসার জন্য কি সত্যিই ক্যালেন্ডারের পাতায় নির্দিষ্ট কোনো দিনের প্রয়োজন আছে? যে মানুষটি প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের ভালো রাখার জন্য নিজের জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলেন, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে মাত্র একটি দিন কি যথেষ্ট? আমার কাছে মনে হয়, মায়ের ভালোবাসা হলো নদীর স্রোতের মতো, যা অবিরাম বয়ে চলে। এর কোনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণ হতে পারে না।
আমি যখন আমার চারপাশের মায়েদের দিকে তাকাই, বা নিজের জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা স্মরণ করি, তখন অবাক না হয়ে পারি না। আমাদের জীবনের শুরুর কথাই ভাবুন, আমরা যখন নিজের কথা বলতে পারতাম না, নিজের সামান্যতম প্রয়োজনও কাউকে বোঝাতে পারতাম না, তখন কেবল একজন মানুষই আমাদের চোখের ভাষা পড়ে ফেলতেন। ছোটবেলায় আমাদের একটু জ্বর হলে মায়ের রাতের ঘুম কীভাবে হারাম হয়ে যেত, তা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। সারারাত শিয়রে বসে জলপট্টি দেওয়া, সৃষ্টিকর্তার কাছে দুহাত তুলে সন্তানের সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করা—এসব তাঁর নিত্যদিনের রুটিন হয়ে যেত। অসুখে-বিসুখে পাগলপ্রায় হয়ে রাত-দিন এক করে সেবা করার এই যে অতিমানবিক ক্ষমতা, পৃথিবীর আর কোনো মানুষের মধ্যে কি তা পাওয়া সম্ভব?
সন্তান জন্মের পর মায়েদের পছন্দের খাবার বলে কিছু থাকে না। বাড়িতে ভালো কোনো খাবার এলে বা রান্না হলে, তিনি নিজে না খেয়ে সেটা হাসিমুখে সন্তানের প্লেটে তুলে দেন। মাছের সবচেয়ে বড় টুকরোটি বা মাংসের সবচেয়ে ভালো অংশটি সন্তানের প্লেটে দিয়ে বলেন, “আমার এগুলো খেতে ভালো লাগে না, তুই খা।” আমরাও বোকার মতো সেই কথা বিশ্বাস করে তৃপ্তি করে খেয়ে নিই!
আমরা যখন একটু বড় হই, পড়াশোনা বা কাজের প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে যাই, তখন মায়ের দুশ্চিন্তা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আমি দেখেছি, নিজে দূরে কোথাও গেলে বা রাতে ফিরতে একটু দেরি হলে, মা আর স্থির থাকতে পারতেন না। খাবার না খেয়ে, দরজার দিকে তাকিয়ে রাত জেগে অপেক্ষায় বসে থাকেন। সন্তান ঘরে না ফেরা পর্যন্ত মায়ের বুকের ভেতর যে ঝড় বয়ে যায়, সে ঝড় মা ছাড়া আর কেউ অনুভব করতে পারে না।
কিন্তু এত কিছুর পরও যখন সমাজের দিকে তাকাই, তখন ভীষণ কষ্ট হয়। আমার ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যায় যখন দেখি, যেই মা তাঁর জীবনের সবটুকু আনন্দ, আরাম বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করলেন, সেই সন্তানই বড় হয়ে মাকে ভুলে যাচ্ছে। নতুন বন্ধু, ক্যারিয়ার, নতুন সংসার—সব মিলিয়ে সন্তান যখন নিজের এক বিশাল জগৎ তৈরি করে, তখন সেখানে মায়ের জায়গা হয় না। একসময় যে মা সন্তানের পুরো পৃথিবী ছিলেন, তিনিই হঠাৎ করে সন্তানের চোখে হয়ে যান ‘সেকেলে’ বা ‘ব্যাকডেটেড’। মায়ের সাধারণ কথাগুলোও তখন সন্তানের কাছে বিরক্তিকর মনে হতে থাকে।
সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে যখন দেখি, অধিকাংশ মায়ের শেষ ঠিকানা হয় ‘বৃদ্ধাশ্রম’। যে মা নিজের আরামের বিছানা ছেড়ে দিয়ে সন্তানকে শান্তিতে ঘুম পাড়িয়েছেন, সেই মাকেই বৃদ্ধাশ্রমের শক্ত বিছানায় একাকিত্বের চাদর গায়ে জড়িয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো পার করতে হয়। অশ্রুসজল চোখে জানালার গ্রিল ধরে তাঁরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন, হয়তো ভাবেন—এই বুঝি আমার খোকা-খুকি আমাকে দেখতে এলো! কিন্তু সেই অপেক্ষার প্রহর আর শেষ হয় না।
এর চেয়েও ভয়ংকর বাস্তবতা যখন পত্রিকার পাতায় বা টেলিভিশনের পর্দায় দেখি, তখন রাগে ও ক্ষোভে শরীর কাঁপতে থাকে। সম্পত্তির লোভে মাকে মারধর, খেতে না দেওয়া বা বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার মতো গা শিউরে ওঠা খবরগুলো আমাকে ভাবায়—আমরা আসলে কতটা অমানুষ হয়ে যাচ্ছি! যে মা নিজের রক্ত পানি করে সন্তানকে বড় করেছেন, সেই সন্তানের হাতের আঘাতেই মায়ের শরীর রক্তাক্ত হচ্ছে। এটি শুধুই অপরাধ নয়, আমার চোখে এটি মানবতার চরমতম অবক্ষয়।
কেন এমন হচ্ছে? আমার মনে হয়, এর প্রধান কারণ হলো আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় এবং দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া আত্মকেন্দ্রিকতা। আমরা শিক্ষায় আধুনিক হচ্ছি ঠিকই, কিন্তু মননে দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছি।
এই ভয়াবহ অবক্ষয় থেকে উত্তরণের উপায় আসলে কী? সবকিছু শুধু আইন দিয়ে বা জোর করে সমাধান করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন গোড়া থেকে কাজ করা। সবচেয়ে আগে প্রয়োজন পারিবারিক শিক্ষার প্রসার। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। পরিবারই হলো সবচেয়ে বড় বিদ্যালয়। তাই আজকের বাবা-মায়েরা যদি তাঁদের নিজেদের বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন, তবে শিশুরাও পরিবার থেকে সেই সম্মান ও ভালোবাসার পাঠ শিখবে। এর পাশাপাশি আমাদের মানসিকতারও আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা যতই আধুনিক আর ব্যস্ত হই না কেন, কর্মজীবনের শত ব্যস্ততার মাঝেও মায়ের জন্য প্রতিদিন অন্তত কিছুটা সময় বের করা আমাদের একান্ত দায়িত্ব। তাঁর কথাগুলো একটু মনোযোগ দিয়ে শোনা, শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া—এর চেয়ে বেশি কিছু মায়েদের আসলে চাওয়ার থাকে না।
পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করাটাও সমান জরুরি। আমাদের বুঝতে হবে এবং এই বার্তা সামাজিকভাবে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে যে, বৃদ্ধাশ্রম কোনোভাবেই কোনো সমাধান হতে পারে না, বরং এটি আমাদের সমাজের জন্য একটি বড় কলঙ্ক। যারা পিতা-মাতার সঙ্গে অন্যায় করবে বা তাঁদের প্রতি অবহেলা করবে, তাঁদের সামাজিকভাবে বয়কট করার শক্ত মানসিকতা আমাদের তৈরি করতে হবে।
পিতা-মাতার ভরণপোষণ-সংক্রান্ত যে আইনগুলো আমাদের দেশে আছে, সেগুলো শুধু কাগজে-কলমে থাকলেই চলবে না, বরং এর কঠোর প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। কেউ যদি সম্পত্তির লোভে বা অন্য কোনো কারণে বৃদ্ধ মায়ের ওপর শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করে, তবে তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এমন শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেন ভবিষ্যতে সমাজের আর কোনো সন্তান এমন জঘন্য কাজ করার কথা মাথাতেও আনতে না পারে।
মা দিবস আসুক, তাঁকে আমরা সম্মান জানাই—এতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু আমাদের ভালোবাসা যেন শুধু একটি দিনে, একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে বা কোনো উপহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। মায়ের জন্য আমাদের ভালোবাসা হোক প্রতিদিনের। যদি আপনার মা আপনার সঙ্গেই থাকেন, তবে তাঁর কাছে যান। তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলুন, আপনি তাঁকে কতটা ভালোবাসেন। আর যদি কোনো অভিমানে তাঁকে দূরে সরিয়ে দিয়ে থাকেন বা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে থাকেন, তবে আজই তাঁকে ফিরিয়ে আনুন। যে মা আমাদের প্রথম নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় হাসিমুখে বুকে টেনে নিয়েছিলেন, তাঁর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাঁকে পরম যত্নে আগলে রাখার দায়িত্ব আমাদেরই।
২|
১০ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৩
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: মাকে ভালোবাসতে দিবস লাগে না ।
৩|
১০ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: আজ বিশ্ব মা দিবস।
.............................................
বাবা দিবসের কথা কেউ বলেনা ।
এবটি পরিবারে বাবা ও মা সবার অবদান অপরিহার্য ।
বিদেশে এজন্য সন্তান পালনের ও সন্তানের সহিত আত্নিক
সর্ম্পক গড়ার লক্ষ্যে বাবাকে ও পিতৃত্বকালীন ছুটি মন্জুর করে ।
.....................................................................................
বৃদ্বাশ্রম আমারও পসন্দ নয়, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজন আছে
তাই বৃদ্বাশ্রম গড়ার কালে সেসব নীতিমালা অনুসরন করা আবশ্যক ।
©somewhere in net ltd.
১|
১০ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:২৯
এইচ এন নার্গিস বলেছেন: "মা' একটি আবেগ ময় শব্দ। প্রত্যেক মেয়ে মা হয়। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে সন্মানের সাথে তার নিজের আলাদা একটি স্পেস দরকার ।