নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি ভেড়ামারা হাই স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষকের ছেলে। অনেকে আমাকে \'স্বপ্নবাজ সৌরভ\' নামে চেনে।

স্বপ্নবাজ সৌরভ

চারটি সিগারেট আর ছয়টি দেশালাইয়ের কাঠি আর বুকে জোঁকের মতো বিঁধে থাকা সূর্য্য লুটের গান।

স্বপ্নবাজ সৌরভ › বিস্তারিত পোস্টঃ

কর্পোরেট কাঠঠোকরা

০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ দুপুর ১২:২৯



রোদের তেজ ক্রমশ বাড়ছে। বাড়ছে গরম। পুরো পরিবেশ আবদ্ধ যেন তপ্ত গোলোকে। বৃষ্টি নেই অনেক দিন। দেখা নেই কালো মেঘের। পুকুরের পানিটুকু চুষে নিচ্ছে জ্বলজ্বলে সূর্য। ছড়িয়ে দিচ্ছে সাদা রোদ। আচ্ছা সূর্য কি নিচে নেমে আসছে দিনে দিনে?
আজ বৃহস্পতিবার। হাফ স্কুল। ভেড়ামারা বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যায়লয়ের গেট পেরিয়ে দাঁড়িয়ে আছি লাল দক্ষিণ কেবিনে ছায়ায়। বড় ক্লাসের দু এক জন লুকিয়ে সিগারেট ফুঁকছে। আমি না দেখার ভান করি। পিঠে ঝোলানো স্কুল ব্যাগ টা গরম হয়ে গেছে। পিঠটা জবজবে ভেজা , লেপ্টে আছে গায়ের সাথে। রেললাইনের ধাতব আর পাথর ভাপ ছড়াচ্ছে আরো বেশি। সূর্যের তেজ দ্বিগুন হয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে , শরীরে বিঁধছে গরম হাওয়া।

আমি গুটি গুটি পা চালায় ,পার হচ্ছি এবড়োথেবড়ো নুড়ি পাথর। কেউ কেউ দু হাত প্রসারিত করে ভারসাম্য বজায় রেখে হেটে যাচ্ছে রেললাইন ধরে। কাল শুক্রবার। ছুটি। তাই আনন্দ হয়তো একটু বেশীই। আমি অবশ্য দুয়েকদিন চেষ্টা করে ছিলাম , দু এক পা হেঁটে নেমে পড়তে হয়েছে। আসলে তাল সামলাতে পারিনা। কেউ কেউ রেললাইনের উপর দশ পয়সা ফেলে ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষন পরেই ডাউন পড়বে ছুটে আসবে হয়তো আন্তঃনগর।

অদূরে কৃষ্ণচূড়া গাছে গনগনে আগুন। রেললাইনের উপর থেকেই দেখা যায়। গাছটা রয়েছে শহীদমিনারে পাশে। ভেড়ামারা হাইস্কুলের শদীদ মিনার। আর একটু বড় হলেই আমি ওই স্কুলে ভর্তি হবো। স্কুলের পাশে পুকুর , ওই পুকুরের পানিতেও নিশ্চয় কৃষচূড়া আগুন লাগাচ্ছে , লাল কমলা আগুনের প্রতিচ্ছবি। আচ্ছা পানিতে কি আগুন লাগে কখনো ?

পানিতে আগুন লাগে কিনা এই মুহূর্তে না জানতে পারলেও বুকের ভেতর ঠান্ডা পানির তৃষ্ণা অনুভব করলাম। আমাদের চল্লিশটা নারিকেল গাছ , সেই গাছের টলটলে ঠান্ডা মিষ্টি পানি তৃষ্ণা বাড়িয়ে দিলো দ্বিগুন। আমাদের জাম গাছটার পাড় ঘেঁষে ছোট্ট পুকুরের ঠান্ডা পানিতে গা ভেজাতে ইচ্ছে হলো খুব। পুকুরে তেলাপিয়া বাচ্চা ছেড়েছে , ছোট ছোট পুঁটির আনাগোনা। ইচ্ছে হলেই ছিপ হাতে বসে পরা যায়। আমি ছোট তাই ছিপটাও ছোট , আমার বড়শিতে শুধু ছোট মাছ ঠোকরায়। যখন বড় হবো , তখন বড়শি ফেলবো ঠিক পুকুরের মাঝখানে,ধরবো বড় বড় রুই আর মৃগেল। গত বছরের ছাড়া মাছ গুলো নিশ্চয় অনেক বড় হয়েছে।

রেল লাইন পার হয়ে নেমে গেলাম পিচের রাস্তায়। ভেড়ামারা - কুষ্টিয়ার সড়ক। রাস্তাটা পার হতে হয় খুব সাবধানে।
''আ-শা.... গাঙ শালিকের বাসা।''-- পেছনে কোলাহল শুনতে পাই। এটা নিত্যদিনের ঘটনা। ক্লাসের আশা নামের মেয়েটাকে ক্লাসের ছেলেরা ভেঙাচ্ছে। খুব হাসাহাসি হচ্ছে। আমাকে কেউ ভেঙ্গায় না ! কেউ কিছু বলার আগেই ছলছল করে উঠে চোখ। নিজের নামের সাথে মিলিয়ে ছন্দ খুঁজি ,বিদঘুটে একটা ছন্দ মাথায় আসতেই দ্রুত পা চালাই । ছেলেদের মাথায় ছন্দটা ঢুকলে বিপদ আছে।

সজনী সিনেমা হলের সামনে আমার সেজো চাচা দাঁড়িয়ে আছে। আমি ঠিক মত বাড়ি ফিরছি কিনা দেখার জন্য হলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। আমার সেজো চাচা সজনী সিনেমা হলের ম্যানেজার। - "কিরে কিছু খাবি ?" 'কিছুটা' হল মিরিন্ডা। সেজো চাচা মাঝে মাঝে মিরিন্ডা খাওয়াতো। কাঁচের ছোট বোতলের মিরিন্ডা। সাত টাকা নিত।
- "না। থাক। আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি যাবো।" - '' যা যা.... ছাতা আনিস নি কেন ?।'' সেজো চাচা আর আটকান না।

বাড়ি ফিরছি। কাল শুক্রবার। ছুটি। ছুটি, ফেরা এই শব্দ গুলোতে কেমন যেন আনচান করে মন। কোথায় যেন প্রশান্তি। যখন নাকি বড় হব , অফিস হবে আমার , তখনও কি এমন হবে ? আরো একটু বড় হলেই ভেড়ামারা হাইস্কুলে পড়বো আমি। সেই স্কুলের হেডমাস্টার আমার আব্বা। তখন হাফ প্যান্টের বদলে ফুলপ্যান্ট হবে। বদলে যাবে স্কুলে যাওয়ার রাস্তা। লাল দক্ষিণ কেবিনের ছায়ায় দাঁড়ানো হবে না আর। দুই হাত প্রসারিত করে ছেলেমেয়ের দল রেললাইন ধরে গাঙচিল হয়ে উড়বে কি ? আর আমার সেই মালাইওয়াল ! টাটকা , সরেস গাছে ধরা মালাই। সেই মালাইওয়ালা কি আমার জন্য অপেক্ষা করবে কি বাড়ির সামনে ? ইমরান খান লেখা ব্যাটটার কি হবে? ছোট হয়ে যাবে নিশ্চয়! স্কুল ছুটির পরে সেজো চাচা নিশ্চয় আর দাঁড়িয়ে থাকবেন না সজনী সিনেমা হলের সামনে।
অদ্ভুত সব ভাবনায় অনুভূতি গুলো কালো মেঘ হয়ে দানা বাঁধে মনের কোনো একখানে। ছায়া ফেলে। ঝাপসা হচ্ছে চোখ। কিন্তু আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা নেই, হলুদ রোদ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বৃষ্টির কোনো দেখা নেই।

দশতলা অফিসের শার্সিতে দাঁড়ালেই হলুদ রোদ ঝলকানি দেয় চোখে। চোখ ধাঁধানো হলুদ রোদে খুঁজে ফিরি কবেকার হারিয়ে যাওয়া মালাইয়ালা, পুঁটিমাছ ধরা বড়শি কিংবা ইমরান খান লেখা ক্রিকেট ব্যাট। খুব ইচ্ছে হয় দুহাত প্রসারিত করে রেললাইন ধরে হেঁটে যায় দূর থেকে দূরে। ভাবতে ভাবতে ফিরে আসি ডেস্কে। অনেক কাজ বাকি আছে। আমার সামনে নিরেট অনুভূতিহীন কম্পিউটার। চোখ রাখি হলুদ ডেস্কটপ ব্যাকগ্রউন্ডে, কেমন জানি ঝাপসা লাগে । নিজেকে ইদানিং কাঠঠোকরা মনে হয়। কাজে নিমগ্ন কর্পোরেট কাঠঠোকরা।

কয়েক ঘন্টা পরে ছুটি হবে। বাসায় ফিরবো। বড় হয়েছি অনেক আগে - তবুও "ছুটি" ,"ফেরা "এই শব্দ গুলোতে আজও আনচান করে মন। ড্রয়ারে রাখা নোট বুকটা বের করি। বিক্ষিপ্ত অনুভূতি গুলো সংকলিত করি গুটি গুটি অক্ষরে ।
হয়তো কর্পোরেট কাঠঠোকরারো নিজস্ব একটা জগত আছে ।

মন্তব্য ২৮ টি রেটিং +৬/-০

মন্তব্য (২৮) মন্তব্য লিখুন

১| ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ দুপুর ১২:৩৬

আলমগীর সরকার লিটন বলেছেন: বেশ স্মৃতিময় লেখা ভাল লাগল ভাল থাকবেন সব সময়

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:১৩

স্বপ্নবাজ সৌরভ বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। ভালো থাকবেন।

২| ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ দুপুর ১২:৪১

মোঃ মাইদুল সরকার বলেছেন:
কর্পোরেট কাঠঠোকরাদের নিজস্ব জগৎ আছে..........। ভাললাগলো ।

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:১৪

স্বপ্নবাজ সৌরভ বলেছেন: হমম। সবাই একটা জগৎ থাকে। কর্পোরেট কাঠঠোকরাদের আবেগ থাকে।
ভালো থাকবেন আপনি। অনেক ধন্যবাদ।

৩| ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ দুপুর ১:৩০

হাসান কালবৈশাখী বলেছেন: সুন্দর!

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:১৫

স্বপ্নবাজ সৌরভ বলেছেন: অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।

৪| ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ দুপুর ২:০১

জুল ভার্ন বলেছেন: খুব সুন্দর লিখেছেন!

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:১৫

স্বপ্নবাজ সৌরভ বলেছেন: শুভেচ্ছা রইল। ভালো থাকবেন।

৫| ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ দুপুর ২:১৩

মরুভূমির জলদস্যু বলেছেন: ভেড়ামারা স্টিশানে আমি গিয়েছি একবার একজনে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে।

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:১৭

স্বপ্নবাজ সৌরভ বলেছেন: ষ্টেশনে নেমেছিলেন ? নাকি ভেড়ামারা গিয়েছিলেন?

৬| ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ দুপুর ২:৫১

ঠাকুরমাহমুদ বলেছেন:




পেট্রোল অকটেন পানিতে ভাসে তাই পানিতে আগুন লাগানো যায় এবং পানিতে আগুন লাগে। সময় খুব দ্রুত চলে যায় অথচ মনে হয় এই তো সেদিনের কথা মাত্র।

লেখা খুব ভালো হয়েছে। +++

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:১৯

স্বপ্নবাজ সৌরভ বলেছেন: আগুন লাগার ব্যাপারটা বড় হয়ে জেনেছি। কৃষ্ণচূড়ার প্রতিচ্ছবি পানিতে আগুন লাগায় , দেখে সেটাও মনে তো।

৭| ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ বিকাল ৩:২৩

রূপক বিধৌত সাধু বলেছেন: দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না; সেই যে আমার নানান রঙের দিনগুলি।

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:২০

স্বপ্নবাজ সৌরভ বলেছেন: মনের খাঁচায় বন্ধ আটকে থাক। ধন্যবাদ জানাই।

৮| ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ বিকাল ৩:৫৫

কাজী ফাতেমা ছবি বলেছেন: কী সুন্দর লিখেছেন

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:২২

স্বপ্নবাজ সৌরভ বলেছেন: আরো চেষ্টা করবো। ভালো থাকবেন। অনেক ধন্যবাদ।

৯| ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:০০

চতুরঙ্গ বলেছেন: দূর্দান্ত লেখা। অনেক ভাল লাগল। লেখার ধরন টা অসাধারন। ভাল থাকবেন।

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:২৩

স্বপ্নবাজ সৌরভ বলেছেন: আপনিও ভালো থাকবেন। শুভকামনা রইল।

১০| ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:২০

মনিরা সুলতানা বলেছেন: দারুণ আবেশিত লেখা !

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:২৬

স্বপ্নবাজ সৌরভ বলেছেন: বৃষ্টি হচ্ছে কেমন দেখেছেন? শীত নামবে মনে হচ্ছে।
ভালো থাকবেন। শুভেচ্ছা রইল।

১১| ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ রাত ৮:৩৫

রাজীব নুর বলেছেন: সজনী সিনেমা হল তো এখন নেই। কয়েক বছর আগে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ রাত ২:০৪

স্বপ্নবাজ সৌরভ বলেছেন: আমার সেজচাচাও নেই।

১২| ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ রাত ৯:৪৫

নুরুলইসলা০৬০৪ বলেছেন: সুন্দর স্মৃতিচার,সাবলীল লেখা।

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:২৭

স্বপ্নবাজ সৌরভ বলেছেন: সুন্দর মন্তব্যে ভালোবাসা। ভালো থাকবেন।

১৩| ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ৮:৩২

নেওয়াজ আলি বলেছেন: অতীত কখনো দুঃখী করে আবার কখনো সুখী করে

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১০:২৯

স্বপ্নবাজ সৌরভ বলেছেন: ঠিক বলেছেন। আমার শৈশব আমাকে কাঁদায়। ভালো থাকবেন।

১৪| ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ দুপুর ১:২৩

রাজীব নুর বলেছেন: বাংলাদেশে ১২ শ' সিনেমা হল ছিলো। এখন আছে ১১০ টা।

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ বিকাল ৫:৪২

স্বপ্নবাজ সৌরভ বলেছেন: সজনী সিনেমা হলের কথা কোথায় জানলেন,??

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.