নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

স্রোতের অজানা টানে সমুদ্র বালিয়াড়ি বেয়ে বোহেমিয়ান- গৃহকোন, জীবন যাপন ফেলে চলে যায়। তুমি দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গনে বাঁধতে চাও জোছনা গলে হারিয়ে যায় সুখ । আছড়ে পরা ঘূর্ণিজল মনে বাজায় অচেনা সবুজ দিগন্ত ..

রোকসানা লেইস

প্রকৃতি আমার হৃদয়

রোকসানা লেইস › বিস্তারিত পোস্টঃ

হাওড়া স্টেশনের স্মৃতি

১১ ই মে, ২০২৬ রাত ২:৫৮



মায়ের সাথে স্মৃতির শেষ নেই। আজ মা দিবস উপলক্ষে, মাকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম সেই স্মৃতি নিয়ে কিছু কথা লিখছি।

হাওড়া স্টেশন। মা, সাহস, নিপু, আমি। প্রচণ্ড ভীড়ের ভিতর আমরা হাঁটছি। কালকা ট্রেন ধরে আমরা দিল্লি যাবো। রাত দশটায় ট্রেন। প্রায় তিনদিনের ট্রেন ভ্রমণ শেষে দিল্লি পৌঁছানো হবে। ইচ্ছে ছিল রাজধানী এক্সপ্রেসে যাব। সময় কম লাগে এবং সে সময়ের সবচেয়ে দ্রুতগামী ট্রেন। এইসব গুণের চেয়ে বেশী আগ্রহ ছিল,এত গল্পে রাজধানী এক্সপ্রেসের কথা পড়েছি। রাজধানী এক্সপ্রেসে একবার চড়তেই হবে, এমন একটা ইচ্ছা ছিল। যেমন ইচ্ছা ছিল শহর কলকাতা দেখা। ভিক্টোরিয়া মেমরিয়াল, ইডেন, গাডের্ন, গড়ের মাঠ চৌরঙ্গী, গড়িয়া হাট এসপ্লেন্টে দেখার। ইচ্ছার চেয়ে বেশি দেখার সুযোগ হলো।মন ভরে দেখলাম কলকাতা।
কিন্তু দিল্লি যাওয়ার জন্য টিকেট কাটার জন্য যে সময়ের প্রয়োজন হয় তা ছিল না। হুট করে বেড়িয়ে পরলে যা হয়। তাই কালকা ট্রেনেই যাওয়া হচ্ছে। দিল্লি যাওয়া নিয়ে কথা। দিল্লি, আগ্রা, জয়পুর, আজমির দেখার ইচ্ছা।
সেদিনই সকাল বেলা আমারা চারমূর্তি, কুচবিহার ভ্রমণ শেষে কলকাতায় এসেছি। কাজল চক্রবর্তির বাড়িতে সকালে পৌঁছে স্নান খাওয়া সেরে, বেশ খানিক ঘুমিয়ে উঠে, একটু বিশ্রাম নিয়ে দিল্লি যাওয়ার কাপড় ঢুকিয়ে নতুন করে ব্যাগ গোছানো হলো। আবার হাওড়া স্টেশনের উদ্দেশে রওনা দিয়ে দিলাম। কালকা ট্রেনে দিল্লি রওনা হবো। ট্রেনে থাকতে হবে আড়াইদিন।
কাজলের কড়া নিষেধ এই প্রথমবার ইণ্ডিয়া এসেছো শুধু কলকাতা দেখে যাও। কিন্তু পথে নামার জন্য আমার মন ছটফট করছে। শুধু বাড়ি বসে আর কলকাতা ঘুরে কি সে স্বাধ মিটে। তিনশ বছরের পুরানো শহর কলকাতার উত্তর দক্ষিণ, পূর্ব পশ্চিম অনেকটা দেখা হয়ে গেছে কদিন ঘুরে।
এসেছি যখন যতটা দেখা যায় ইণ্ডিয়ার বিশাল ভৌগলিক অঞ্চলের তার কিছুটা অন্তত এ যাত্রায় দেখে নিই।
প্রায় জোড় করে আমরা বেড়িয়ে পরছি কলকাতার বাইরে। কাজলের নিষেধ অমান্য করে। প্রথমে জলপাইগুড়ি যাওয়াটা মেনে নিলেও দিল্লি যাওয়াটা কিছুতেই নিতে পারছিল না কাজল। এই শীতের সময় সবাই দিল্লি ছেড়ে এদিকে আসে আর তোমরা নতুন এসে ওদিকে যাবে। শীতে টিকতে পারবে না। প্রতি পা ফেলতে গিয়ে বিশাল হোচট খেতে হবে। এমন একটা আশংকা মনে গেঁথে দিলেও। যাওয়ার সিদ্ধান্তে আমি অটল।
আমরা শুধু কলকাতায় বেড়াব না। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যাব, আমার এসব পরিকল্পনা জেনে কাজল চক্রবর্তি কিছুতেই আমাদের একা ঘুরতে যেতে দিবে না।
মেয়েদের একা ঘোরা সেফ না। তাও আমি মাকে নিয়ে প্রথমবারের মতন ইন্ডিয়ায় বেড়াতে গিয়েছি।
মাসিমা আর তুমি সাথে একটা বাচ্চা কিছুতেই তোমাদের এভাবে ছাড়তে পারি না। দরদ এবং দায়িত্বপূর্ণ কথা। সব ঠিক আছে আবার আমার ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছাও ঠিক আছে। দেশ থেকে তো আমরা আড়াইজন মা, আমি আর ছেলে চলে এসেছি। আমি আমাদের তিনজনের যাওয়ার মধ্যে কোন সমস্যা দেখছি না। কিন্তু কাজল চক্রবর্তী একটার পর একটা যুক্তি চলতেই থাকলো, আমাদেরকে একা না যেতে দেওয়ার ।
দিল্লিতে ওরা তো বাংলা বলে না, কথা বুঝতে পারবে না। আরো আরো অনেক যুক্তি দিয়েও আমার ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা দমাতে না পেরে, রাজি করালো নিপুকে সাথে নিয়ে যেতে। তাই নিপুকে ডেকে এনে আমাদের সফর সঙ্গী বানিয়ে দিল।
শাহাদৎ হোসেন নিপু তখন উঠতি আবৃত্তিকার বাংলাদেশের। সেই সময় আমরা পাশাপাশি পাড়ায় থাকতাম ঢাকায়। ও শেখ সাহেব বাজারের রাস্তায় আর আমি অজিমপুর ছাপরা মসজিদের কাছে। যখন তখন বাড়ি আসত নিপু। তার চেয়ে বেশি দেখা হতো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। টিএসসি, বাংলা একাডেমি, বিভিন্ন সাহিত্য সংস্কৃতির অনুষ্ঠানে।
সাহাদত হোসেন নিপু তখন কলকাতায় অধ্যায়ন করে। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তো তাকে সাথে নেয়া হলো। টিকেট কাটা থেকে থাকা খাওয়ার খরচ সবটাই আমার উপর দিয়ে গেল। সাথে ক্লাস, কাজ নানা অযুহাতে আমার আনন্দ ভ্রমণটাকে সংক্ষিপ্ত করে দিল নিপু। আমাদের নিজের কোন টাইম লিমিট ছিল না, তাই ঘোরা ফেরার কোন তাড়াহুড়াও ছিল না।
সবই দেখা হয়েছিল তবে বুড়ি ছোঁয়ার মতন হয়ে গেল নিপুর জন্য। এবং কাজল আমাদের কিছুতেই একা যেতে দিবে না জন্য। কিন্তু সাবধানতা কখন কি ঝামেলা হয় কোথায় হারিয়ে যাই। নারীদের একা চলা ফেরা মানসিক ভাবে মেনে নেয়ার অভ্যাস এখনও তেমন হয়নি তখন তো আরো বেশি ছিল না।
অথচ আমি তো সেই কবে থেকেই একা চলে অভ্যস্ত।
তবে সাথে নিয়ে যাওয়া পুরুষ, আমাদেরকে দেখে শুনে নামাবে ট্রেন থেকে, খাবার জোগাড় অর্ডার করবে, ট্যাক্সি ডাকবে হোটেলে যাওয়ার জন্য। বাসের টিকিট কাটবে অন্য শহরে যাওয়ার জন্য। এসব দায়িত্বগুলো ওর উপরে নিশ্চিন্তে ছেড়ে দিয়ে আমি হালকা মনে থাকলাম।
আমি সব সময় একা ঘুরতে মজা পাই অথবা তেমন সঙ্গীর সাথে যে কোথাও যেতে, খেতে কোন বাঁধা দিবে না। আর খাই খাই, ঘুম, বিশ্রাম নিয়ে কোন ঝামেলা করবে না কোন সময়। ঘুরতে গেলে ঘরের আরাম খুঁজলে চলবে না সব সময়।
হারিয়ে যাব ঘুরতে ঘুরতে অজানায় এটাই আমার ইচ্ছা ঘুরতে বেরুলে। এ্যাডভেঞ্চার করতে হবে।
দীর্ঘ তিনদিন পর্যন্ত ট্রেনের জার্নী। আহা ইন্ডিয়ায় ঘুরে বেড়ানোর সেই দিনগুলোতে কত যে সময় কাটিয়েছি রেলগাড়ির ভিতর চলতে চলতে।
শুনেছিলাম দিল্লিতে এত্ত গরম যে সবাই রাতের বেলা ছাদে খাটিয়ায় শোয়। অথচ কাজল বলছে, অনেক শীত। ঠান্ডায় টিকা যায় না বলে অনেকে তখন দিল্লি থেকে বেরিয়ে পরে। কি জানি এত কিছু নিয়ে ভাবার মতন মনের অবস্থা নেই, সময়ও নেই, শুধু জানি যেতে হবে । দিল্লি আমাকে টানছে। জলপাইগুড়ি পাহাড়ি অঞ্চলে ঘুরে এলাম, তেমন শীত লাগেনি। ওখানে পাহাড়িদের বোনা কিছু শীতবস্ত্র কেনা হয়েছে। যা কলকাতায় পরার প্রয়োজন পরছে না।
সেগুলো বাক্সে ভরে নিলাম, দিল্লির শীত ঠেকানোর জন্য কাজে দিবে। দেশে তো কখনো সোয়েটার পরা লাগে না। চাদর তাও ফ্যাশন করে একপাশে ঝুলিয়ে নিলেই হয় শীতকালে। কি জানি কেমন শীত দিল্লিতে হবে। গিয়েই দেখা যাবে।
ইন্ডিয়ার ট্রেনে ভ্রমণ করতে গিয়ে, নতুন একটা বিষয় জানা হলো টিকেটের নাম্বার এবং যাত্রীর নাম লেখা আছে বগিতে । খুঁজে বের করে সেই বগিতে উঠতে হবে। সেখানে আমাদের নির্ধারিত সিট আছে। অন্য বগিতে চড়লে হবে না।
এমন নিয়ম তখন দেশে দেখিনি। আমরা ট্রেনে চড়তাম। ফার্স্টক্লাস বেশ গদি মোড়ান চকচকে বগি গুলো। সেকেন্ড ক্লাস লম্বাটানা চেয়ার গদি দেয়া থাকত। থার্ড ক্লাস শুধুই টানা বেঞ্চি দেয়া, মলিন বগি গুলো। মলিন জনতা এই বগিতে চড়ত। হুড়োহুড়ি ঠেলা ধাক্কা করে। গাদাগাদি করে যেত এই সব বগিতে করে। আমাদের কখনো এমন বগিতে চড়তে হয়নি। তবে অনেক সময় হুড়োহুড়ি ঠেলা ধাক্কা দিয়ে ট্রেনে উঠে সিট দখল করতে হতো।
আমরা বেশির ভাগ সময় ফার্স্ট ক্লাসে চড়েছি। কখনো হঠাৎ দ্বিতীয় শ্রেণীতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমরা দুই সিটের কোপ রির্জাভ করে, রাতে ঘুমিয়ে মেইল ট্রেনে করে বাড়ি যেতাম, আসতাম। এছাড়াও অনেক রকম ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতা ছিল সে সময়। কিন্তু দেশ ছেড়ে বিদেশের মাটিতে সেবার প্রথম ট্রেনে চড়ছি। তাও ক্রমাগত তিনদিনের সফর। তৃতীয়বারের মতন রেলে চড়ছি। অনেক লম্বা সময়ের পথ চলা এই রেলের যাত্রায়। এবং ভিন্ন ভাষার একটা অঞ্চলে নিয়ে যাবে এই ট্রেন প্রথমবার আমাকে।
ভারতের কোটি মানুষ নাকি ট্রেনেই থাকে। থাকারই কথা। দিল্লি যেতে পারি দিতে হবে প্রায় পনেরশ কিলোমিটার। এক প্রদেশ থেকে আরেক প্রদেশের দূরত্ব যেমন ভৌগলিক বৈচিত্রও তেমন রকমারি। ভাষা সংস্কৃতি সব বদলে যায় স্থান ভেদে।

আমরা চারমূর্তি ট্যাক্সি করে হাওড়া স্টেশনে পৌছে বাক্স প্যাটরা হাতে হাঁটছি প্লাটর্ফম ধরে। অনেকগুলো প্ল্যাটফর্মের কোনটায় ট্রেন আসবে তা জেনে নিয়ে অপেক্ষা করছি সেখানে গিয়ে।
বেশ খানিক সময় অপেক্ষার পর দেখলাম ট্রেন আসছে। স্টেশনে ট্রেন থামার পর যেমন ব্যাস্ততা শুরু হয় তেমনি ব্যাস্ততা হৈ চৈ দ্রুত চলাচল শুরু হলো।
এবার বেশ অন্য রকমের আদব কায়দার ট্রেনে চড়ব বেশ কিছু নিয়ম শেখা হলো। ট্রেনে চড়ার আগেই। অন্যদেশ বলে কথা।
আমরাও যাত্রীদের সাথে দ্রুত হাঁটছি। নিজেদের টিকেটের সংখ্যার বগিটি আগে খুঁজে পেতে হবে। তারপর নাম, তারপর সিটের সংখ্যা।
লম্বা ট্রেনের অনেকটা পেরিয়ে এসেছি। এখনো আমাদের নাম পেলাম না লিস্টে। আরো কতটা হাঁটতে হবে কে জানে। হাঁটতেও অনেক কষ্ট। এতটা কখনো হাঁটিনি। আরো দু তিনটা বগি পেরুনোর পর আমাদের নাম লেখা পেলাম লিষ্টে। স্বপ্নের দিল্লি যাত্রা শুরু হবে এখন।
বগিতে উঠে বসব।
কিন্তু একি, তাকিয়ে দেখি পাশে মা নেই!
হয় তো একটু পিছনে বা ডানে বামে আছেন। কিন্তু না চারপাশ শূন্য। একদম শূন্য। অসংখ্য অচেনা মুখ ঘিরে আছে। নিপু আমি আর সাহস এক সাথেই আছি কিন্তু মা কই। আমাদের সাথে।
মা । মা। মা নেই মা হারিয়ে গেছেন। হাওড়া স্টেশনের সেই প্রচণ্ড ভীড়ের ভিতর মা আমাদের থেকে দল ছুট হয়ে গেছেন। এত বড় স্টেশনে কোথায় খুঁজব মাকে এখন। কেমন এক আতংক ঘিরে ধরল। তারপরও মনে হলো না মাকে খুঁজে পেতে হবে।
ট্রেনে উঠা বাদ দিয়ে, আমরা ছুটছি, মাকে খুঁজে বেরাচ্ছি। বিশাল হাওড়া স্টেশনের এমাথা ওমাথা। এত্ত মানুষ স্রোতের মতন আসছে। আর তার ভীতর আমরা উল্টো পথে হাঁটছি। একবার এপাশ একবার ওপাশ। কোথাও মায়ের চেহারা দেখতে পাই না। কতটা সময় পেরিয়ে গেছে জানি না, মা কে খুঁজে বেরাচ্ছি জনস্রোতের ভিতর।
এবার আমরা ইনর্ফমেশনে গেলাম। ওদের দিয়ে এনাউন্স করালাম। মায়ের নাম দিয়ে। আমরা যেখানে আছি মাকে সেখানে আসতে বললাম। কয়েকবার এনাউন্স করা হলো।
অনেকটা সময় চলে গেছে। খুঁজছি আর মনের ভিতর কত রকমের কথা উঠছে এক সাথে। দিল্লী যাওয়া তোলা থাক। মাকে না পেলে ট্রেনে উঠছি না। ট্রেন ছেড়ে দেয়ারও সময় হয়েছে নিশ্চয়। কিন্তু মাকে যদি খুঁজে না পাই তা হলে কি হবে।
মাকে এভাবে হারিয়ে ফেললে কি চলে। মা কেমন করে বাড়ি ফিরবে। মায়ের কাছে কি কাজলের নাম্বার আছে। এতো বাংলাদেশ না। বা ঢাকা না। মা ঠিকানা ধরে চলে যাবে। এখন কি করব।
এখন কান্না করারও সময় নেই। বুকের ভিতর ভীষণ ফাঁকা।
আমরা ইনর্ফমেশন থেকে ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মের দিকে ট্রেনের দিকে আবার এগুচ্ছি। যাত্রীরা প্রায় সবাই ট্রেনে উঠে গেছে এখন অনেকটা হালকা ভীড়, তবু অনেক মানুষ চারপাশে এদিক ওদিক যাচ্ছে। ট্রেন এখনও ছেড়ে যায়নি। আর কতটা সময় আছে ছেড়ে যাওয়ার তাও জানি না। সেদিকে মনোযোগ নেই। এখন কেবল খুঁজছি মাকে।
হঠাৎ সাহস, বলে উঠল ঐ যে নানুপা। আমাদের সব গুলো চোখ ঘুরে মায়ের মুখের উপর স্থির হলো। তিনি ধীরে ধীরে হেঁটে আসছেন। আমাদের দেখে চোখ মুখ উৎফুল্ল।
উফ কি শান্তি ! এমন শান্তি সচরাচর পাওয়া যায় না।
কোথায় গিয়েছিল। কি হয়ে ছিল জিজ্ঞেস করার আর সময় নাই। সাথে ধরে নিয়ে ট্রেনের দিকে ছুটলাম সব। এখন ট্রেন যদি চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়, সে কষ্ট সহ্য হবে না। দিল্লি যাওয়া টাওয়া একটু আগেই চুলায় গিয়ে ছিল। তা ফিরে এলাে নতুন উদ্যোমে।
ছুটতে ছুটতে নিজেদের বগিতে উঠে সিট খুঁজে বসে পরলাম।
মিনিট দুইয়ের মধ্যে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন ছুটতে শুরু করল।
আহা শান্তি! একদম পপাত ধরনিতল মূহুর্ত থেকে সব ঠিকঠাক। একটু গুছিয়ে বসে বড় নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ হলো যেন।
সকালে যেদিক থেকে আসলাম এবারে অন্য পথে কলকাতা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি, ট্রেনের গতির সাথে চোখ রাখছি আলো মাখানো শহরে। তারপর হাসাহাসি, আনন্দ হলো মাকে নিয়ে হারিয়ে যাওয়ার জন্য। না পাওয়া গেলে কি হতো বা হতে পরত সে সব আজগুবি ভাবনা নিয়ে হাসি ঠাট্টা।
মা জানাল একবার ছোট ভাই বাড়ি থেকে রাগ করে চলে গিয়েছিল। মাদ্রাজি একলোক ফিল্মের হিরো বানাবে বলে মামাকে নিয়ে চলে গেয়েছিল, বোম্বে। বিশাল অনেক ট্রেন লাইন পার হতে গিয়ে সেই ছোট বালক, সামনে ট্রেন আসছে দেখে শুয়ে পরেছিল রেল লাইনের উপর। ট্রেন চলে যাওয়ার পরে, উঠে দাঁড়িয়ে নিজেকে অক্ষত পেয়ে বাড়ি ফিরার জন্য মন ব্যস্ত হয়েছিল তার। সেই ছোট বয়সে পালিয়ে যাওয়া বালক যখন ফিরে এসেছিল বাড়িতে। আমিও ঠিক পেয়ে যেতাম একটা না একটা উপায়।
কিন্তু তুমি হারালে কি ভাবে।
আসলে এই আমাদের হাঁটতে না পারার অভ্যাসের দোষ। যদিও আমরা আস্তেই হাঁটছিলাম তারপরও আমাদের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে হঠাৎই পিছনে পরে যায় মা এবং ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে ফেলে আমাদের।
তবে বুদ্ধি করে নিজেও তথ্য কেন্দ্রের কাছে চলে গিয়েছিল বলেই আমাদের ঝটপট দেখাটা হয়ে যায়।
এরপর থেকে একদম সঙ্গ ছাড়বে না। বাচ্চার মতন হাত ধরে হাঁটবে বলে দিলাম।
ওয়েস্ট বেঙ্গল প্রদেশের হাওড়া ছাড়িয়ে দূর্গাপুর, ধানবাদ, থেকে উত্তর প্রদেশের আওরঙ্গবাদ,লালগঞ্জ, ফতেপুর কানপুর , আগ্রা হয়ে দিল্লির পথে ছুটেছে, দীর্ঘ লম্বা ট্রেন, আমাদের দীর্ঘ সময়ের ভ্রমণে সাথে নিয়ে।
আগের দিনের জার্নির ধকলের উপর ট্রেনে উঠার আগ মূহুর্তের ঘটনার ধকলে কিছুটা শ্রান্ত হলেও ধানবাদ পৌঁছা পর্যন্ত গল্প করলাম। এরপর শুয়ে পরলাম সিটের বিছানায়। দুরাত এই বিছানায় কাটাতে হবে আমাদের। ট্রেন আমাদের ঘর বাড়ি আগামি আড়াইদিনের জন্য। অলরেডি এই দীর্ঘ সময় ট্রেনে থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমাদের।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.