নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সুখে আছি, সুখে আছি সখা, আপন মনে।

সখা, নয়নে শুধু জানাবে প্রেম, নীরবে দিবে প্রাণ, রচিয়া ললিতমধুর বাণী আড়ালে গাবে গান। গোপনে তুলিয়া কুসুম গাঁথিয়া রেখে যাবে মালাগাছি। এই ব্লগের©শান্তির দেবদূত।

শান্তির দেবদূত

নিজের কথা কি আর বলবো ...... নিজে সুখী মানুষ, পৃথিবীর সবাই সুখী হওক এই কামনা করি...... কয়লার মধ্যে কালো খুঁজি না, হীরা খুঁজে বেড়াই .......

শান্তির দেবদূত › বিস্তারিত পোস্টঃ

(কল্প গল্প) --- কালের অনিশ্চয়তা - (১/৩ পর্ব)

১৮ ই মে, ২০১৯ রাত ১১:৫২



অধ্যায় এক
স্থান: মেক্সিকোর সিজুলুব হসপিটাল; সময়: বিকাল ৩টা ৪২, ৫ই মে ২০৭৬


হাসপাতালের ছোট্ট কেবিনে একাকী শুয়ে আছে উনিশ বছরের এক তরুন, শূন্য দৃষ্টি ছাদের দিকে স্থির হয়ে আছে। চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে; তরুনের ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি। সময় ফুরিয়ে এসেছে এটি সে ঠিকঠিক বুঝতে পেরেছে। মৃদু হাসিটি আরও বিস্তৃত হয়, কিছুক্ষণ পরে সেটি অট্টহাসিতে রুপ নেয়। একজন নার্স হন্তদন্ত হয়ে কেবিনে প্রবেশ করে। বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, “মিস্টার জামিল, আপনার কি খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে? মাথায় যন্ত্রণা কি খুব বেড়েছে?”

- “মাথার যন্ত্রণা বাড়লে কি কেউ এভাবে অট্টহাসি হাসতে পারে?” নার্সের অবাক চাহনী উপেক্ষা করে জামিল বলে, “সময়! খুব রহস্যময় আর জটিল জিনিস তাই না, মিস?” জবাবের অপেক্ষা না করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পূনরায় বলে, “দেখেন সময় আমার সাথে কিভাবে বিদ্রুপ করছে! আমার হাতে একদম সময় নেই, যেকোনও সময় আমি মারা যেতে পারি। সত্যি বলতে এখনও যে নিঃশ্বাস নিতে পারছি সেটিই একটা বিস্ময়। আর এই অন্তিম মুহূর্তেই কি না আমি সময়ের সূত্রের সমাধান করে ফেললাম! বিষয়টা খুব মজার না?”

“আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না; আপনার কি কিছু লাগবে? মাথায় হাত বুলিয়ে দেই?”

- “কেন? সুদর্শন ছেলে দেখলেই মাথায় হাত বুলাতে ইচ্ছে করে?” নার্সের থতমত চেহারে দেখে হেসে আবার বলে, “আরে, এতো ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন? একটু মজা করলাম। তুমি কি কষ্ট করে প্রফেসর, ড: ইগরকে একটু খবর দিবেন? বলবে ব্যাপারটা অতি জরুরী।”
এক ঘন্টা পর কেবিনে প্রবেশ করেন বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ গণিতবীদদের একজন, প্রফেসর ইগর ভাসিলেভ। বয়স ষাটের কোঠায়, মাথায় চকচকে টাক। একাডেমিক জগতে পাগলা ইগর নামেই বেশি পরিচিত। সহকর্মীরা বেশ সমীহ করে প্রফেসরকে, তাকে নিয়ে গর্বেরও শেষ নেই তাদের। আড়ালে অবশ্য অনেকে আফসোস করে, দুঃখও পায় মনে মনে; গত দশ বছর ধরে গণিতে রাজপুত্র হিসাবে খ্যাত এই প্রফেসর অপবিজ্ঞান বলে স্বীকৃত সময় ভ্রমণের গবেষণা নিয়ে পড়ে আছেন।

প্রফেসর ইগরের মন অসম্ভব খারাপ, কিন্তু মুখ হাসি হাসি করে জামিলের সামনে বসে আছেন। “কি খবর, ইয়াং ম্যান? ডাক্তার বলেছে তুমি খুব দ্রুত উন্নতি করছ। অল্প কদিনের ভেতর বাসায় চলে যেতে পারবে।”

- “স্যার, আমি জানি আমার হাতে সময় নেই; এটা আমি মেনে নিয়েছি। বড়জোর কয়েক সপ্তাহ হাতে আছে। আপনার সময় সমীকরণ প্রজেক্টের কোনও আপডেট আছে কি?

“চলছে। নতুন কাউকে খুঁজছি আমার সহযোগী হিসাবে কাজ করার জন্য; কিন্তু তেমন আগ্রহী কাউকে পাচ্ছি না। আমি এখনও ভেবে পাই না তোমার মতো মেধাবী ছেলে কেনই বা আমার এই গবেষণার যুক্ত হয়েছিলে। সে যাক, তুমি এসব নিয়ে একদম চিন্তা করবে না এখন। আমাকে কি যেন বলবে বলে জরুরী খবর পাঠিয়েছিলে?”

- “আপনি ব্যস্ত হবেন না স্যার। এখন আর সহযোগী নতুন কাউকে পেতে সমস্যা হবে না বেশ রহস্যময় স্বরে বলে জামিল।” একটু থেমে উত্তেজনা প্রশমিত করে শান্ত কণ্ঠে বলে, “আমি সময়ের ভ্রমণের সমীকরনের সমাধান করে ফেলেছি। এখন এই প্রজেক্টে কাজ করার জন্যে অনেকেই আগ্রহী হবে।”

এই মাত্র বলা জামিলের কথাগুলোর অনুধাবন করতে কিছুটা সময় নেন প্রফেসর ইগর। বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন একেবারে, ঘরের ভেতর পিনপত্তন নিস্তব্ধতা নেমে আসে; শুধু দুজন মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ বাতাসে ভাসছে যেন। কিছুক্ষণ পর নিরবতা ভেঙে বলেন, “জামিল, কি বলছ তুমি? কি বলছ?”

মাথার ভেতরটা ছিড়ে যাচ্ছে যেন প্রচণ্ড ব্যথায়। বেশ কসরত করে জামিল বলে, “একটু কষ্ট করে স্ক্রীনটা সেট করে দিবেন স্যার?”

- প্রফেসর ইগর জামিলের বুকের উপর ছোট গোল একটি চাকতি রেখে টিপ দিয়ে সুইচ অন করে দেন। জামিলের বুকের এক হাত উপরে একটি আলোর অবয়ব ফুটে উঠে; ভার্চুয়াল রাইটিং স্ক্রীন। দ্রুত হাতে একের পর এক সমীকরন লিখে যাচ্ছে জামিল সেই স্ক্রীনের উপর। কিছুক্ষণ পর বলে, “স্যার, হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার নীতি মোতাবেক সময় ভ্রমণ সম্ভব নয়। কারণ এই নীতি অনুসারে, ‘একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনও কণিকার গতি ও অবস্থান নির্ভুলভাবে মাপা অসম্ভব। আমরা যদি অবস্থান বের করি, তবে গতি অনির্দিষ্ট হয়ে যাবে; আবার যদি গতি বের করি তবে অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে যাবে’। যদি সময় সময় ভ্রমণ সম্ভব হয়, তবে এই অনিশ্চয়তার নীতি ভুল হয়ে যাবে। কারণ, ধরুন আমরা একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনও কণার শুধু বেগ নির্ভুলভাবে পরিমাপ করলাম। তারপর অতীতে গিয়ে ঠিক সেই সময়ে কণিকাটির শুধু অবস্থান বের করলাম। সেই ক্ষেত্রে দুটি ফলাফল সংযুক্ত করলে দেখা যাবে একটি নির্দিষ্ট সময়ে আমরা একটি কণার অবস্থান ও বেগ নির্ভুলভাবে নির্নয় করতে পেরেছি। কিন্তু আমরা জানি হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার নীতি নির্ভুল! তাহলে, উপসংহার হলো, অতীত ভ্রমণ সম্ভব না।”

সম্পূর্ণ বিষয়টি আত্মস্থ করতে কিছুক্ষণ সময় নেন প্রফেসর ইগর। অনিশ্চিত কন্ঠে বলেন, “তার মানে বলতে চাচ্ছ কোয়ান্টাম মেকানিক্স মতে সময় ভ্রমণ সম্ভব নয়?”

- “আপনি ঠিক ধরেছেন। ব্যাপারটা এবার গ্রেন্ডফাদার প্যারাডক্স অনুসারেও ব্যাখ্যা করা যাক। এই প্যারাডক্স মতে, আমি যদি অতীতে গিয়ে আমার দাদাকে মেরে ফেলি, তবে আমার বাবার জন্ম হবে না। আমার বাবা অস্তিত্বহীন হয়ে গেলে আমারও অস্তিত্ব নেই হয়ে যাবে। তাহলে আমি কিভাবে সময় ভ্রমণ যন্ত্রে অতীতে গিয়ে দাদাকে হত্যা করলাম? এটি একটি অমিমাংসিত চক্রের তৈরি করবে।” প্রফেসরের সাথে কথা বলার সময়ও জামিলের হাত থেমে নেই; সে ক্রমাগত ভার্চুয়াল স্ক্রীনে বড় বড় সমীকরণ লিখে যাচ্ছে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মাথার যন্ত্রণা।

“কিন্তু কিছুক্ষণ আগে তুমি বলেছিলে সময় ভ্রমণের সমীকরণের সমাধান করে ফেলেছ?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন প্রফেসর ইগর।

- ততক্ষণে জামিলের টাইপ করা শেষ। স্ক্রীন জুড়ে একের পর এক বিশাল আকারের সমীকরণ। শেষের দিকে একটি সমীকরণকে উজ্জ্বল করে নির্দিষ্ট করে জামিল বলে, “এখন এইখানে দেখেন; এই পঞ্চমাত্রিক ভেক্টর সমীকরণে দেখা যাচ্ছে, ‘সময় ভ্রমণ সম্ভব হবে যদি সম্ভাবনার এই রাশিগুলোর গুনফল হাইজেনবার্গের ধ্রুবকের সাথে এই ধ্রুবকের বর্গমূলের গুনফলের সমান হয়।’ এটিই সময় সমীকরনের সমাধান। দেখেন, এখানে নিকট অতীতের যাওয়া সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। যতো দূরের অতীতে যাওয়া যাবে সফল হওয়ার সম্ভাবনা ততই বেড়ে যাবে। তারমানে, আমরা কেবল মাত্র অতীতের এমন একটি সময়েই যেতে পারবো যেখান থেকে বর্তমানের উপর আর কোনও প্রভাব ফেলা সম্ভব নয়।”

চোখ বড়বড় করে স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে আছেন প্রফেসর ইগর। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে; নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে শুধু বলতে থাকেন, “ওহ! গড। ও গড!” ঈশ্বরে অস্তিত্বে অবিশ্বাসি প্রফেসরের মুখে হঠাৎ এমন ঈশ্বরের ডাক শুনে শুধু মুচকি হাসে জামিল।

অনেকক্ষণ সমীকণগুলোর দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থেকে দ্রুত কতগুলো হিসাবে কষেন প্রফেসর ইগর। এখানে দেখা যাচ্ছে, এক কেজি ভরের একটি বস্তুকে তিন লক্ষ বছর অতীতে পাঠাতে আমাদের প্রায় 8.36 x 10^20 জুল শক্তির প্রয়োজন, বৃহৎ আকারের একশটি এটম বোমার যে শক্তি তার সমান। কিন্তু আমরা যদি ঐ বস্তুটিকেই এক মিলিয়ন বছর অতীতে পাঠাতে চাই সেক্ষেত্রে মাত্র একটি মাঝারি আকারের এটম বোমার পরিমান শক্তি দরকার হবে।

প্রফেসর ইগরের হিসাবে দ্রুত নজর বুলিয়ে জামিল বলে, “ঠিক। কিন্তু একশটি এটম বোমার মিলিত শক্তিকে এক বিন্দুতে নির্দিষ্ট করা এখনকার প্রযুক্তিতে সম্ভব না, কিন্তু একটির ক্ষেত্রে সম্ভব হতে পারে। এ থেকে আরেকটা বিষয় বোঝা যাচ্ছে, আমরা কয়েক মিলিয়ন মিলিয়ন বছর অতীতে গিয়ে প্রাণের বিবর্তনকে কোনওভাবেই প্রভাবিত করতে পারবো না। যদি অতীতে গিয়ে বিবর্তনের যে কোনও একটি পর্যায়কে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেই, তবু দেখা যাবে বাটারফ্লাই ইফেক্টের কারণে বর্তমান অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। যে কোনও ভাবেই বর্তমান অপরিবর্তিত থাকবে।” মাথা ব্যাথা এখন অসহ্য পর্যায়ে চলে এসেছে, হালকা খিচুনির মতো হচ্ছে জামিলের। হঠাৎ লক্ষ করে ডান নাকের ফুটো দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।

প্রফেসর ইগর সমীকরণগুলো দ্রুত সেভ করে স্ক্রিনটিকে বন্ধ করে স্কিনার চাকতিটি পকেটে পুরে নেন। ডাক্তার আর একজন নার্স দৌড়িয়ে ঘরে ঢুকে। তাদের নির্দেশ মতো কেবিন থেকে বের হয়ে যেতে হয় তাকে। পেছন থেকে জামিল কাতর কণ্ঠে বলে, “আফসোস হচ্ছে, সময় ভ্রমণ নিজের চোখে দেখে যেতে পারলাম না।”

সময় নষ্ট না করে দ্রুত নিজের গবেষণাগারে ফিরে আসেন প্রফেসর। কাজ অনেক সময় কম। একের পর এক হিসাব করে যাচ্ছেন পাগলের মতো, একাগ্রচিত্তে; আর কোনও দিকে তার খেয়াল নেই। এখন পর্যন্ত সব হিসাব ঠিকঠিক মিলে যাচ্ছে, প্রচণ্ড উত্তেজনা অনুভব করছেন। রাত দুইটার দিকে শেষ হয় তার কাজ, এখন সব ডাটা কম্পিউটারে প্রবেশ করিয়ে ফাইনাল সিমুলেশন শুরু করেছেন; দুই ঘণ্টার মতো সময় লাগবে শেষ হতে। হঠাৎ জামিলে কথা মনে পড়তেই হাসপাতালে ফোন করেন। অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন, আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে আছে। মনটা বিষন্নতায় ভার হয়ে যায় ড: ইগরের, আহারে বেচারা নিজের তত্ত্বের পরিনতি দেখে যেতে পারল না।
ভোর চারটার দিকে হঠাৎ জ্ঞান ফিরে জামিলের। চোখ খুলে বেশ কিছুক্ষণ ধরে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে থাকে; সমগ্র ইন্দ্রীয় কেন্দ্রীভূত করে কিছু একটা চিন্তা করছে যেন। একজন নার্সকে ডেকে বলে “জলদি প্রফেসর ইগরকে ফোন দিয়ে আমার সাথে কথা বলিয়ে দেন।”

- “আপনার এ অবস্থায় ফোনে কথা বলে একদম উচিত হবে না, দয়া করে ঘুমানোর চেষ্টা করুন।” ডিউটি নার্স খেকিয়ে বলে।

“প্লিজ, বিষয়টা এতোই জরুরী যে আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। মহা বিপদে পড়তে যাচ্ছি আমরা।” মাথার ভেতর যন্ত্রণা বেড়ে যাচ্ছে জামিলের, “প্লিজ, একদম সময় নেই। আমি শুধু এক মিনিট কথা বলব। বলতে পারেন মৃত্যুর আগে এটাই আমার শেষ ইচ্ছা।”
কিছুটা ইতস্থত করে মোবাইলে কল দিয়া প্রফেসরকে ধরিয়ে দেয় আইসিইউ এর ডিউটিরত নার্সের।

“হ্যালো স্যার, শুনতে পাচ্ছেন? ভবিষ্যতে মহা বিপর্যয় ডেকে আনবে এই সময় সমীকরণ। দয়া করে এগুলো পাবলিশ করবেন না।” শেষ এসে কণ্ঠে কোনও জোর পায় না জামিল; শেষের কথাগুলো অনেকটা আপন মনেই বলে যায় সে।

প্রফেসর ইগর শুধু ‘ভবিষ্যতে মহা’ এই দুটি শব্দ শুনতে পেরেছেন। তারপর তিনি শুধু, “হ্যালো, হ্যালো জামিল? হ্যালো হ্যালো” করে যাচ্ছেন।
হাত থেকে মোবাইলটি পড়ে যায় জামিলের। চোখের কোণে তখনও জলের ধারা।

অধ্যায় দুই
স্থান: ম্যাক্সিকো, সিজুলুব ন্যাসনাল ফরেস্ট; সময়: সকাল ৯ টা, ১০ই মার্চ ২০৮৮


প্রায় একযুগ পার হয়ে গেছে জামিল সময় ভ্রমণের সমীকরণ সমাধান করেছে। আজ সেই সমীকরণের কার্যকারিতা পরখ করা হবে। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন প্রফেসর ইগর। বয়সের ভারে কিঞ্চিত কুঁজো হয়ে আছেন তিনি। সিজুলুব শহরের এই বনের ভেতর কিছু অংশের গাছ কেটে খোলা মাঠের মতো জায়গা করা হয়ছে। এখানেই বসানো হয়েছে পৃথিবীর প্রথম পরীক্ষামূলক সময় ভ্রমণ যন্ত্র।

চারদিক থেকে চারটি ফিউশন রিএক্টর থেকে পচন্ড শক্তিশালি এনার্জি-বিম এক বিন্দুতে মিলিত হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে সেখানে এক বর্গফিটের এর মতো একটি টাইম-পোর্টাল তৈরি হবে। পঞ্চমাত্রা ভেক্টর সমীকরণের চারটি চলককে চারটি এনার্জি-বিম দিয়ে নির্ধারণ করা হবে; পোর্টালটি তৈরি হলে আরেকটি এনার্জি-বিম যেটি সময়ের চলক, সেটিকে নিক্ষেপ করা হবে। এই টাইম এনার্জি-বিম দিয়েই কালের মান নির্ধারণ করা হবে। পাঁচটি এনার্জি-বিমের মিলিত মান হতে হবে, হাইজেনবার্গের ধ্রুবকের সাথে জামিল ধ্রুবকের বর্গমূলের গুনফলের সমান হয়। দুইটি সুপার কম্পিউটার সর্বক্ষণ এই স্থিতাবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে।

লম্বা করে একটি দম নিলেন প্রফেসর ইগর ভাসিলেভ। একবার চোখ বন্ধ করে সাথেসাথে খুলে তাকালে। তারপাশে বসে আছেন সেনাবাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড, ডিফেন্স সেক্রেটারী, কয়েকজন সিনিয়র বিজ্ঞানী, সরকারী উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কয়েকজন সাংবাদিক। সকলে অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে প্রথম সফল সময় ভ্রমণের পরীক্ষা দেখার জন্যে। প্রচণ্ড অস্থিরতায় ভুগছেন প্রফেসর ইগর, শেষ মুহূর্তে আবার কোনও ঝামেলা না হয়ে যায়। বারবার মনে পড়ছে মৃত্যুর ঠিক আগে তাকে ফোন করেছিলো জামিল; শুধু ‘ভবিষ্যতে মহা’ শব্দদুটি তিনি শুনতে পেয়েছিলেন। সে কি বলতে চেয়েছিলো তা আর জানা সম্ভব নয়, অবশ্য বিশ্বের অনেক মেধাবী গণিতবিদ, পদার্থবিদ এই সমীকরণ নিয়ে পুংখানুপুঙ্খ গবেষণা করেছে, এখনও করে যাচ্ছে; কেউই তেমন ভুল ধরতে পারেনি। কিছুকিছু সমালোচনা যে নেই তা নয়। তেমনটা প্রায় সব থিউরির ব্যাপারেই আছে। সেগুলোর জবাব দেওয়ার জন্যেই তো পরীক্ষা। নাহ, সকল দ্বিধা ঝেড়ে ফেলেন তিনি মন থেকে।

সবকিছু সেট হয়ে গেছে। চট করে সুইচ অন করে দেন প্রফেসর ইগর। সাথেসাথে একটি আলোর ঝলকানিতে চারদিক আলোকিত হয়ে উঠে, চোখে প্রটেক্টর ছিলো বলে কারও কোনও ক্ষতি হয়নি। বিষ্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে যেন সবাই। ঠিকঠিক এক বর্গফিটের মতো ছোট একটি আলোর পোর্টাল তৈরি হয়েছে, যদিও প্রত্যাশা এমনই ছিলো, তারপরেও সভ্যাতার ইতিহাসে প্রথম টাইম-পোর্টাল দেখে হতবাক উপস্থিত সকলে।

প্রফেসর রেকর্ড করার জন্য বললেন “টাইম পোর্টাল তৈরি হয়েছে, এখন টাইম এনার্জি-বিম চালু করা হোক। সময় তিন মিলিয়ন বছর অতীত।”

টাইম এনার্জি-বিমটি আলোর পর্দার মতো দেখতে পোর্টালের উপর পড়তেই হালকা একটু কেঁপে উঠে যেন সেটি। এখন পর্যন্ত সব ঠিক আছে। তিন মিলিয়ন বছর অতীতে যাওয়ার প্রথম পোর্টাল তৈরি হয়েছে বলেই আঙুল নাড়িয়ে কিছু একটা ইঙ্গিত করেন প্রফেসর। মুহূর্তেই একজন বিজ্ঞানী ট্রে হাতে পোর্টালের দিকে এগিয়ে যায়; ট্রে এর উপর পাঁচশ গ্রাম ভরের একটি ইউরেনিয়ামের গোলক। চিমটা দিয়ে ধরে গোলকটি ধীরে ধীরে পোর্টালের ভেতর দিয়ে পার করে দেয়। সাথে সাথে প্রফেসর ইগর এনার্জি-বিমগুলোর সংযোগ বন্ধ করে দেন। ইউরেনিয়ামের গোলকটি অদৃশ্য হয়ে গেছে। উত্তেজনায় ঘেমে উঠেছে যেন সকলে। নিস্তব্ধতা নেমে আছে বনের ভেতর অস্থায়ী পরীক্ষাগারে।

একঘণ্টার বিরতী দিয়ে আবার শুরু হয় পরীক্ষা। এই সময়ের ভেতর সকল যন্ত্রপাতিগুলো পূনরায় পরীক্ষানিড়ীক্ষা করা হয়। সকলের মনে ফুরফুরে একটা ভাব, বুঝতে পারছে পরীক্ষা প্রায় সফল বলা চলে। এবার টাইম-বিম দুই মিলিয়ন বছরে সেট করে পোর্টাল খোলা হয়া। এবারও আগের মতোই পাঁচশ গ্রাম ইউরেনিমের গোলক সেই পোর্টালের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। একই পরীক্ষা এক মিলিয়ন বছর অতীতে সেট করে করা হয়। এবারও ইউরেনিয়ামের গোলকটি গায়েব হয়ে যায়।

সকলের চোখে মুখে তৃপ্তির হাসি, একে একে সবাই প্রফেসর ইগরের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে, তরুন কয়েকজন প্রকৌশলী লাফিয়ে উঠে কিছু খাতা কাগজ শূন্যে ছুঁড়ে মারে। চারদিকে হৈ হৈ রব শুরু হয়েছে। উপস্থিত সাংবাদিকরা ঘিরে ধরেছে প্রফেসরকে। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে শান্ত হতে বলেন। “দেখুন আপাত দৃষ্টিতে পরীক্ষা সফল বলেই মনে হচ্ছে তবে এখনও শেষ ধাপ বাকি আছে।” তিনি কয়েকজনকে দ্রুত কিছু নির্দেশ দিলেন। দেরী না করে কয়েকটি এক্সকাভেটর মাঠে নেমে পড়ে, কয়েকজনের হাতে রেডিওএকটিভ ডিটেক্টার।

ইঞ্চি ইঞ্চি করে মাঠের আনাচে কানাচে অনুসন্ধান করা হচ্ছে; ঘণ্টাখানেকের ভেতর তিনটি ইউরেনিয়ামের গোলক খুঁজে পায় অনুসন্ধানকারী দল। দুইটি প্রায় কাছাকাছিই অবস্থিত ছিল, আরেকটি বেশ দূরে পাওয়া যায়। দ্রুত তিনটি গোলককে ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। প্রফেসর ইগরকে বেশ সন্তুষ্ট মনে হচ্ছে। সাংবাদিকতা বেশ অস্থির হয়ে উঠেছে, পরীক্ষার খুটিনাটি অনেক কিছুই তারা বুঝতে পারছে না। সুযোগের অপেক্ষায় আছে কখন প্রশ্নবানে প্রফেসরকে ঘায়েল করা যাবে। তাদের ব্যাপারটা কিছুটা আঁচ করতে পেরে তিনি হেসে বলেন, “আপনারা অস্থির হবেন না। কিছুক্ষণের ভেতরই পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট হাতে চলে আসবে। তখন আপনাদের সকল প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হবে।”

কয়েকঘণ্টা পর ল্যাবরেটরি থেকে ম্যাটালিক এনালাইসিস রিপোর্ট চলে আসে। হাসিমুখে এবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন প্রফেসর ইগর।

“স্যার, আমরা দেখলাম তিনবার ইউরেনিয়ামের গোলক টাইম পোর্টালের ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া হলো, সাথে সাথে সেটি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। আমাদের একটু সহজ ভাষায় বিষয়টি বুঝিয়ে বলবেন, আসলে কি হয়েছে এখানে?”

- “প্রথমে আমরা তিন মিলিয়ন অতীতের একটি টাইম-পোর্টাল খুলি। এর ভেতর ইউরেনিয়ামের গোলকটি প্রবেশ করানোর সাথেসাথে সেটি হারিয়ে যায়। আসলে হারিয়ে যায়নি, সেটি তিনি মিলিয়ন বছর অতীতে চলে গিয়েছে। তারপর একই পরীক্ষা দুই মিলিয়ন ও এক মিলিয়ন বছর অতীতের টাইম-পোর্টালের ক্ষেত্রে করা হয়। আপনারা হয়তো খেয়াল করেছেন প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই জায়গায় টাইম-পোর্টাল তৈরি করা হয়েছিলো। তাই গোলকটি এই একই স্থানের অতীতে চলে গিয়েছে। চিন্তা করে দেখুন, একটি ইউরেনিয়ামের গোলক তিন মিলিয়ন বছর ধরে এই জায়গার পড়ে আছে! এই তিন মিলিয়ন বছরে এটির উপর দিয়ে কত ঝড়ঝাপটা গেছে? এতো লম্বা সময়ে কিছুটা দূরে সরে গেছে এই জায়গা থেকে; সে কারণে আমাদের খুড়াখুড়ি আর রেডিওএকটিভ ডিটেক্টার দিয়ে খুঁজতে হয়েছে। আমাদের ভাগ্য ভালো এই লম্বা সময়ের ব্যবধানে এগুলো হারিয়ে যায়নি। আমাদের কাছে ল্যাবরেটরির মেটালিক এনালাইসিস রিপোর্ট এসেছে, তারা নিশ্চিত করেছে এই তিনটি গোলকই আমাদের পাঠানো। ইউরেনিয়ামের অর্ধায়ু ৭০৪ মিলিয়ন বছর। তারমানে হচ্ছে, এক কেজি ভরের ইউরেনিয়াম ৭০৪ মিলিয়ন বছরে অর্ধেক হয়ে যায়। সেই হিসাবে তিন মিলিয়ন বছরে শতকরা ০.৩, দুই মিলিয়ন বছরে ০.২ ও এক মিলিয়ন বছরে শতকরা ০.১ পরিমান ভয় হারানোর কথা। রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে ঠিকঠিক এই পরিমান ভর গোলক তিনটি হারিয়েছে। এ থেকে প্রমান হয় যে এই গোলকগুলো মিলিয়ন বছর ধরে এই স্থানে ছিল” একটু দম নিয়ে প্রফেসর বুক টানটান করে বলেন, “আমাদের অতীত ভ্রমণ পরীক্ষা সফল।”

“কিন্তু স্যার, এই মিলিয়ন মিলিয়ন বছরে অন্য কোনও কারণেও তো ভর হারাতে পারে এই গোলকগুলো। তাহলে আপনারা ঠিক কি করে নিশ্চিত হলেন এগুলো অতীতের ঠিকঠিক এই সময়েই চলে গিয়েছিল?”

- “আপনারা যে গোলক দেখেছেন সেটি বাহিরের আবরন মাত্র, এর ভেতরে তিনটি ছোট ছোট গোলক রাখা ছিল। আমরা সেই ছোট গোলকের উপরেই মেটালিক এনালাইসিস করেছি।” মুহূর্তক্ষণ বিরতি নিয়ে বলেন, “আমরা এখন মিলিয়ন বছর অতীতে ভ্রমণ করতে পারবো, ভুলের মাত্রা প্লাস মাইনাস দশবছর।”

তারপর একের পর এক প্রশ্ন আসতে থাকে উপস্থিত সাংবাদিক ও সরকারী কর্মকর্তাদের ভেতর থেকে। এর গুরুত্ব সবাই ঠিকঠিক উপলব্ধি করতে পারছে। বুঝতে পারছে অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানীক ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে যাবে অল্প সময়ের ভেতর। কিন্তু যে বিপর্যয়ের সুত্রপাত যে এই সময়কে জয় করার মাধ্যমে শুরু হয়েছে সে বিষয়ে যদি বিন্দু মাত্র ধারণা তাদের থাকতো তবে কি এতো আনন্দিত হতে পারতো?

অধ্যায় তিন
স্থান: কানাডা, ইউনিভার্সিটি ব্রিটিশ কলম্বিয়া; সময়: ২১ই জুন ২১৯০


প্রথম টাইম-পোর্টাল তৈরির পর পার হয়ে গেছে একশত বছর। সভ্যতা জামিলকে মূল্যায়ন করতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেনি। বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে জামিল চৌধুরীর নামে গবেষণাগার আছে, তার জীবনি নিয়ে অনেক গল্প, উপন্যাস ও চলচিত্রও হয়েছে। মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে তার শেষ ফোন কল নিয়ে নানামুখি গল্প চালু আছে। কারও কারও অভিমত, ‘ভবিষ্যতে পৃথিবীর বড় কোনও বিপর্যয়ের কথা বলে প্রফেসর ইগরকে সাবধান করে দিতে চেয়েছিলো জামিল’। আবার কারও কারও ধারণা, ‘সময় সমীকরণ; অতীত ও ভবিষ্যত দুটির ক্ষেত্রেই সমাধান করা হলেও কেন শুধু অতীতেই ভ্রমণ সম্ভব হচ্ছে ভবিষ্যতে যাওয়া যাচ্ছে না’ এই প্রশ্নের সমাধান দিতে চেয়েছিলো। শেষ মুহূর্তের এই রহস্যময় ফোনকল নিয়ে অনেক গবেষণাও হয়েছে, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা গবেষণাপত্র লেখা হয়েছে, নিত্যনতুন থিউরি নিয়ে এসেছে অনেকে; এখনও সভা সেমিনার হচ্ছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ‘জামিল’স মিস্ট্রি’ হিসাবে শতাব্দির অমিমাংসিত রহস্যের তালিকার শীর্ষে এটির অবস্থান।

সময় সমীকরণের সমাধানের দিন থেকে সভ্যতা পা দিয়েছে নতুন এক যুগে; নতুন এই যুগের নাম, ‘পাস্ট ট্রাভেল ইরা’। প্রথম প্রথম কেবল কয়েকটি সমৃদ্ধশালী দেশের এই টাইম পোর্টাল বানানোর সক্ষমতা ছিলো। তারপরের কয়েক যুগ ধরে এই ফিল্ডের উপর প্রচুর বিনিয়োগ ও গবেষণা হওয়ার ফলে প্রযুক্তিগত অনেক উন্নতি সাধিত হয়েছে। আবিষ্কারের পঞ্চাশ বছরের মধ্যে সব দেশের কাছেই একাধিক ‘পাস্ট-ট্রাভেল মেশিন’ চলে আসে। শুধু তাই নয়, অনেক কর্পোরেট কোম্পানীও অত্যাধুনিক মানের এই যন্ত্রের মালিক বনে যায়।

গত কয়েক দশকে বিশ্বের পর্যটন শিল্পের বড় অংশই অতীত ভ্রমণের দখলে চলে গেছে। ভ্রমণের জন্যে সবচেয়ে নিরাপদ ও উত্তেজনাকর হওয়ায়, পাস্ট ট্রাভেল এজেন্সিগুলো আশা করছে এই বছর এটি শতকরা পচানব্বই ভাগে উন্নিত হবে; শতশত ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার। মানুষ এখন আর নদী পাহাড় সমুদ্র দেখতে যায় না, তারা অতীত ভ্রমণে যেতে বেশি আগ্রহী। ‘মধুচন্দ্রিমাটা কোথায় কাটাবে, প্রিয়তমা?’ এর পরিবর্তে এখন জিজ্ঞেস করে, ‘মধুযামিনী কখন কাটাবে, প্রিয়তমা?’ এবার পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলে তোমাকে ডায়নোসরের পিঠে চড়িয়ে আনবো।

বিজ্ঞানের অনেক শাখায় ব্যাপকহারে ব্যবহৃত হচ্ছে এই সময় ভ্রমণ প্রযুক্তি। বিশেষ করে আর্কিওলজি, কোয়ান্টাম মেকানিক্স, জোত্যির্বিদ্যা, উদ্ভিত-প্রাণী বিদ্যা। বিজ্ঞানের মৌলিক এই শাখাগুলো অনেকটা সময় ভ্রমণের উপর নির্ভশীল হয়ে পড়েছে নতুন এই যুগে এসে। গত একশ বছরে সভ্যতার প্রকৃতি পুরাই পাল্টে গেছে, রীতিমত আমূল পরিবর্তন।

তাই স্বাভাবিক ভাবেই সময় ভ্রমণ সমীকরণগুলোর ব্যাপারে এলেক্সের ভেতর একসময় অতিরিক্ত অবসেসন তৈরি হয়। জামিলের অন্তিমশয্যায় অপ্রকাশিত কথাগুলোর রহস্য উদ্দঘাটনের জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। এই রহস্য সমাধানের জন্যে ওয়ার্ল্ড পাস্ট ট্রাভেল এজেন্সি থেকে ঘোষিত লোভনীয় অফারও এই উদগ্রীবতার একটা যোক্তিক কারণ হতে পারে, আর যাই হোক পুষ্কারের টাকাটা নেহায়েত কম তো নয়! ‘অতীত ভ্রমণ করা সম্ভব হচ্ছে কিন্তু ভবিষ্যত ভ্রমণ কেন করা যাচ্ছে না’ এই রহস্য তাকে কুড়েকুড়ে খাচ্ছিলো। টাইম পোর্টালে প্রবেশ করার মুহূর্তেই ঢেউয়ের মতো অনুভূতি কেন হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর বের করার জন্যে দিনের বেশিরভাগ সময়ই এলেক্স সময় সমীকরণের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ধ্যান করে। ঘরের চারদিকে, এমনকি ছাদেও সমীকরণগুলোর বিভিন্ন ডেরিভেশন ও ভিন্ন ভিন্ন সমাধান লিখে রেখেছে; যাতে করে যেদিকেই নজর যাক না কেন শুধু যেন এই সময় সমীকরণগুলোই তার চোখে পড়ে। তার প্রফেসর প্রায়ই তীর্যক খোঁচা দিয়ে বলেন, “পিএইচডি কি এতোই সহজ? চাইলে আর পেয়ে গেলে? এখন তো তোমাদের ধৈর্য্য বলতেই নেই, আমাদের সময় ঘুমিয়েও শান্তি পেতাম না, স্বপ্নেও থিসিস নিয়ে কাজ করতে হতো।”

অবশ্য শুধু পিএইচডি ডিগ্রী পাওয়ার জন্যে এলেক্স এতো শ্রম দিচ্ছে সেটি পুরোপরি সত্যি নয়; বরং এই কাজটিতে সে অনেক আনন্দ পাচ্ছে; ব্যাপারটা তার কাছে অনেকটা চ্যালেঞ্জের মতো দাঁড়িয়েছে। শুরু থেকেই তার কেন যেন মনে হতে থাকে, “সকল প্রশ্নের সমাধান এই সমীকরণগুলোর মধ্যেই নিতীহ আছে।”

প্রতিদিনের মত ভোরে চোখ খুলতেই ছাদের উপর লেখা সমীকরণগুলোর উপর দৃষ্টি যায়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একবার নজর বুলিয়ে নিয়ে বিছানা থেকে উঠে এলেক্স। কিছুক্ষণ পর নিত্যদিনের রূটিনমতো সাইন্সের জগত খবরের কাগজটি খুলে বসে। ডান হাতে হাইপা চালু করতেই, চোখের সামনে একটি ভার্চুয়াল স্ক্রিনে সাইন্সের জগৎ পত্রিকাটি ভেসে উঠে। বিস্তারিত খবর সে পড়ে খুব কম, বেশিভাগ সময় শুধু হেডলাইন দেখেই পরের খবরে চলে যায়। আচমকা জ্যোতিবিজ্ঞান বিভাগের একটি খবরে নজর আটকে যায় তার। “তবে কি নিভে যাচ্ছে গ্যালাক্সি?” - এমন নজরকাড়া শিরনাম এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি তার পক্ষে। দ্রুত সম্পূর্ণ খবরটি পড়ে নেয় সে। “তের বিলিয়ন আলোবৎসর দূরে অবস্থিত পাঁচটি গ্যালাক্সির অস্থিত্ব আর খুঁজে পাচ্ছে না জ্যোর্তিবিদরা। প্রথমে তারা ভেবেছিলো টেলিস্কোপের কোনও গন্ডগোল হতে পারে, কিন্তু কয়েক সপ্তাহ টানা পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিত হয়েছে আসলেই হারিয়ে গেছে গ্যালাক্সিগুলো। তবে ডিপ-স্পেস অবজার্বার সংস্থা প্রতি মুহূর্তে কি হয় সেদিকে নজর রাখছেন।” আরও অনেক তথ্য সংযুক্ত করেছে রিপোর্টার। কয়েকজন জ্যোর্তিরবিজ্ঞানীর মতামতও তুলে ধরেছে।

পরের সপ্তাহে একই রকমের আরেকটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এই এক সপ্তাহে আরেকটি গ্যালাক্সি হারিয়ে গেছে। তার পরের সপ্তাহে আরও দুটি নেই হয়ে যায়। যদিও লক্ষ কোটি গ্যালাক্সির ভেতর এমন কয়েকটা হারিয়ে গেলে তেমন কোনও প্রভাব পড়ার কথা না, তবে অভিনব এই ঘটনায় নড়ে চড়ে বসে বিজ্ঞান জগত। তবে কি মহাবিশ্ব ধ্বংসের সানাই বেজে উঠলো?

“এই যে এলেক্স, খবর শুনেছে না কি?”, ল্যাবে ঢুকতেই সুপারভাইজার প্রফেসর মাইকেল গলা ফাটিয়ে বলে উঠেন। জবাবের অপেক্ষায় না থেকে বলেন, “একের পর এক গ্যালাক্সি তো গায়েব হয়ে যাচ্ছে! ভাবা যায়? একেকটা গ্যালাক্সি দশ হাজার আলোকবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত, কোটি কোটি সূর্য! এতো বিশাল ভর নিয়ে একদিন টুপ করে গায়েব হয়ে গেল? এটা কোনও কথা হলো?”

- “স্যার, এখানে মনে হচ্ছে একটু বোঝার ভুল হচ্ছে। যে গ্যালাক্সিগুলো হারিয়ে গেছে; সবগুলোই প্রায় তের বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের। তারমানে হচ্ছে, আমরা যে গ্যালাক্সিগুলোর এই পরিনতি দেখছি তা আসলে তার বিলিয়ন বছর আগের ঘটনা। বর্তমানে এগুলোর কি অবস্থা তা জানার জন্যে আমাদের আরও তের বিলিয়ন বছর অপেক্ষা করতে হবে। অপেক্ষার পালাটি একটু বেশিই লম্বা, কি বলেন স্যার?” চোখের ভাষায় কৌতুক খেলে উঠে এলেক্সের।

“ওহ এলেক্স! তুমি হয়তো জান না মহাবিশ্বের ত্রি-মাত্রিক ম্যাপ অনেক আগেই আমরা তৈরি করেছি। প্রায় সকল গ্যালাক্সিসহ ব্ল্যাকহোল, বিচ্ছিন্ন গ্রহানু, নক্ষত্র সবই এতে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। শত শত বছরে লক্ষলক্ষ বিজ্ঞানীর মিলিত প্রয়াস” লম্বা বিরক্তিকর বক্তৃতা শুনার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করে নেয় এলেক্স মনে মনে। “এক দশক আগে এই ম্যাপিং এর কাজে প্রথমবারের মতো সাব-স্পেস সিগনালিং প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। এই প্রযুক্তি খুব বেশি খরুচে হওয়ায় প্রতি চার বছরে একবার মাত্র এই ম্যাপ আপডেট করা হয়। সাব-স্পেস সিগনালিং প্রযুক্তি হচ্ছে স্পেসকে বাকিয়ে অসীম দূরত্বের দুটি বিন্দুকে কাছাকাছি এনে সুরঙ্গ বানিয়ে এর ভেতর দিয়ে সিগনাল পাস করা। তাই আমরা যে ঘটনা এখন দেখছি সেটি তের বিলিয়ন বছর আগের নয় বরং অতি নিকট অতীতের; বলতে গেলে বর্তমানেরই ঘটনা।”

- ঘটনার গুরুত্ব এবার পুরোপরি উপলব্ধি করতে পারে এলেক্স। ভয় লাগছে কিছুটা তার, তবে এটা ভেবে স্বস্তি বোধ করে যে এই ঘটনা ঘটছে তের বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের কোনও জায়গায়। “স্যার, আপনার কি মনে হয়? কেন কিভাবে ঘটছে এটা? আমাদের কি ভয়ের কোনও কারণ আছে?”

“এখন পর্যন্ত ভয়ের কিছু দেখছি না। এতো দূরের ঘটনা আমাদের উপর প্রভাব পড়তে অনেক সময় লাগার কথা, ততদিনে আমাদের সূর্য্যই হয়তো মরে যাবে। আমিও এখন পর্যন্ত কিছু বুঝতে পারছি না। মহাবিষ্ফোরণের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হওয়া আমাদের এই মহাবিশ্ব এখনও ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে; গ্যালাক্সিগুলো প্রচণ্ড গতিতে একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে প্রতিমুহূর্তে। কিন্তু মহাকর্ষ বলের কারণে এই সম্প্রসারন একসময় না একসময় থেমে যাবে। তারপর শুরু হবে মহা সংকোচন। তখন মহাবিশ্বের সকল ভর-শক্তি আবার এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে সিঙ্গুলারিটি তৈরি করবে। অনেক বলছে এই গ্যালাক্সিগুলো হারিয়ে যাওয়ার কারণ হয়তো মহাসংকোচন শুরু হয়ে গেছে। তবে আমার মতে এটা ভুল ব্যাখ্যা। গ্যালাক্সিগুলো এখনও একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তারমানে সম্প্রসারন এখনও চলছে। বুঝতে পারছিনা এগুলোর গায়েব হওয়ার পেছনে ঠিক কি কারণ থাকতে পারে।” বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে প্রফেসরকে। কপালে ভাজ ফেলে বলেন, “চিন্তা করতে পারছ? কোটি কোটি বিলিয়ন বিলিয়ন মেট্রিকটন ভরের একেকটি গ্যালাক্সি কেমন ভোজভাজির মতো হাওয়া হয়ে গেল? কোনও বিষ্ফোরণের চিহ্ন নেই; নেই কোন বিকিরণের ছিটেফোটাও! স্রেফ যাদু-মন্ত্রের মতো নাই হয়ে গেল যেন!”
ব্রেনের নিউরনের কিছুটা উত্তেজনা অনুভূত হচ্ছিলো এলেক্সের, সুপাভাইজারের শেষ কথায় সেই নিউরনগুলো আচমকা শান্ত হয়ে যায়। এমন হয় যখন তার সমগ্র ইন্দ্রীয় কেবল নির্দিষ্ট কিছুতে কেন্দ্রীভূত হয়। মাথার ভেতর ঝনঝন করছে ‘স্রেফ নাই হয়ে গেল’ বাক্যটি। তার কেন যেন মনে হতে থাকে সময় সমীকরণের সাথে এসবের কোনও একটা সংযোগ আছে। অল্পক্ষণের ভেতর করনীয় স্থির করে ফেলে সে। ডুব দিতে হবে; লম্বা সময়ের জন্যে ডুব দিতে হবে।
--------------------- প্রথম পর্বের সমাপ্তি---------------------
(......................... চলবে ................... )

মন্তব্য ১৩ টি রেটিং +৩/-০

মন্তব্য (১৩) মন্তব্য লিখুন

১| ১৮ ই মে, ২০১৯ রাত ১১:৫৭

শান্তির দেবদূত বলেছেন: তিন পর্বের সাইন্স ফিকশন লিখে শেষ করেছি। তিনদিনে তিনটি পর্ব পোষ্ট করবো। প্রতিদিন এই সময়ে। তেমন একটা রিভিউ করতে পারিনি, বানান ভুল বা তথ্যগত কোনও ভুল থাকলে ধরিয়ে দিলে উপকৃত হবে।

২| ১৯ শে মে, ২০১৯ রাত ১২:১৪

রাজীব নুর বলেছেন: ভালো।
পোষ্ট করুন।
আসলে আমি কল্পকাহিনি বুঝি কম। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র নই।

১৯ শে মে, ২০১৯ রাত ৩:৪৪

শান্তির দেবদূত বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ রাজীব ভাই। কল্পকাহিনী বুঝতে বিজ্ঞানের জটিল জটিল থিউরি বুঝতে হবে বা জানতে হবে তেমনটি নয় কিন্তু। যে থিউরিগুলো এখানে ব্যবহার করেছি চেষ্টা ছিলো সেগুলো সহ ভাষায় তুলে ধরতে। আবার শেষে টিকাও আছে। সেগুলোও যদি বুঝতে অসুবিধা হয়, সেক্ষেত্রে কেবল কাহিনী উপভোগ করলেও আশা করি আনন্দ পাবেন।
শুভকামনা রইল আপনার জন্যে।

৩| ১৯ শে মে, ২০১৯ দুপুর ১২:২৭

নিরবোধ পাঠক বলেছেন: আহ! মনটা ভরে গেল ভাই। এখন পড়বো না। সময় নিয়ে আয়েশ করে পড়তে হবে। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ভাই।

১৯ শে মে, ২০১৯ বিকাল ৩:২১

শান্তির দেবদূত বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ প্রিয় পাঠক। শুভকামনা রইল।

৪| ১৯ শে মে, ২০১৯ বিকাল ৩:১৩

হাসান কালবৈশাখী বলেছেন:
মোটামোটি মান সম্পন্ন লেখা। চালিয়ে যান।
সাইন্স ফিকশন আমার ছোটকাল থেকেই প্রীয়।

১৯ শে মে, ২০১৯ বিকাল ৩:২২

শান্তির দেবদূত বলেছেন: মূল্যবাদ মতামতের জন্যে অনেক ধন্যবাদ। শুভকামনা রইল।

৫| ১৯ শে মে, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:৪১

বিদ্রোহী ভৃগু বলেছেন: ইফতারের পর প্রায় দৌড়ে শেষ করলাম!

অসাধারন!
রহস্য জমে উঠেছে।

তারাবিহর পর বাকী গুলো পড়তে হবে।
আমি যদি বলি আমি আমার শৈশবকে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছি এবং শব্দও শুনতে পেয়েছি !
আপনার কল্প বিজ্ঞান তাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবে? ;) হা হা হা

অনেক দিন পর আপনার সিরিজ পেয়ে মুগ্ধ :)

++++

২০ শে মে, ২০১৯ বিকাল ৪:৪৯

শান্তির দেবদূত বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ, প্রিয় বিদ্রোহী ভাই। আপনার মতামত সবসময় উপভোগ্য।

আপনার শৈশবকে দেখার ও শোনার ব্যাখ্যা আমার কল্পবিজ্ঞান দ্বারা সম্ভব নয়; তবে বাংলা সিনেমার মতো মাথায় জোরা আঘাত পাইলে অতীতের অনেক কিছু চোখেরা সামনে ভাইসা উঠতে দেখেছি। ;) হা হা হা।

৬| ২০ শে মে, ২০১৯ দুপুর ২:০১

সেলিম আনোয়ার বলেছেন: সুন্দর।+

২০ শে মে, ২০১৯ বিকাল ৪:৫০

শান্তির দেবদূত বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ, সেলিম আলোয়ার ভাই। শুভকামনা রইল।

৭| ২৪ শে মে, ২০১৯ রাত ১২:২২

আর্কিওপটেরিক্স বলেছেন: গল্পে বর্ণিত সাইন্স যে কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্সের জটিল সমীকরণে আনেনি, তা ভালো করেছেন। ইন্টারে সাইন্স পড়া যে কেউ সহজেই বুঝবে।

আপনার গল্প বলার ভঙ্গিটা সুন্দর এবং সাবলীল !

চমৎকার লেগেছে :)

২৪ শে মে, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:০১

শান্তির দেবদূত বলেছেন: কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্সের জটিল সমীকরণ আনব কি করে? আমি নিজেই তো বুঝি না! ১৬/১৭ বছর আগে যখন পাতার পর পাতা শ্রোডিঞ্জার ইকুয়েশন, ডিরেক ইকুয়েশন এগুলোর ডেরিভেশন মুখস্ত করেছিলাম তখন যদিও বা কিছুটা বুঝে থাকি, এতো বছর পর সব তো গুলিয়ে খেয়ে ফেলেছি। ফিজিক্সের যে প্রফেসর আমাদের পড়াতেন, তিঁনিও বলেছিলেন যে বিস্তারিত এখনও ভালো মতো বুঝে উঠতে পারেননি। আমার কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্সের দৌড় এই সাইন্স ফিকশন লেখা পর্যন্তই।

অনেক ধন্যবাদ সুন্দর করে ভালো লাগা জানানোর জন্যে। শুভকামনা রইল।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.