নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সুখে আছি, সুখে আছি সখা, আপন মনে।

সখা, নয়নে শুধু জানাবে প্রেম, নীরবে দিবে প্রাণ, রচিয়া ললিতমধুর বাণী আড়ালে গাবে গান। গোপনে তুলিয়া কুসুম গাঁথিয়া রেখে যাবে মালাগাছি। এই ব্লগের©শান্তির দেবদূত।

শান্তির দেবদূত

নিজের কথা কি আর বলবো ...... নিজে সুখী মানুষ, পৃথিবীর সবাই সুখী হওক এই কামনা করি...... কয়লার মধ্যে কালো খুঁজি না, হীরা খুঁজে বেড়াই .......

শান্তির দেবদূত › বিস্তারিত পোস্টঃ

(কল্প গল্প) --- কালের অনিশ্চয়তা - (২/৩ পর্ব)

১৯ শে মে, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:০২


পূর্ববর্তী পর্বের লিংক -- (কল্প গল্প) --- কালের অনিশ্চয়তা - (১/৩ পর্ব)
অধ্যায় চার
স্থান: কানাডা, ইউনিভার্সিটি ব্রিটিশ কলম্বিয়া; সময়: ০২ জুলাই ২১৯০


ছোট ঘরটিতে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলে এলেক্স। দশ দিন হয়ে গেল বাইরের কারও সাথে যোগাযোগ করছে না সে, মেইল বক্স ডিসেবল; কমিউনিকেটর ডিভাইস বন্ধ করে নিজেকে প্রায় অদৃশ্য করে ফেলেছে দুনিয়ার চোখে। মাঝে একবার সুপারভাইজার লোক পাঠিয়ে খবর নিয়েছিল কেন ল্যাবে যাচ্ছে না। অসুস্থতার কথা বলে পার পেয়েছে। গ্যালাক্সিগুলোর মিলিয়ে যাওয়ার ঘটনার সাথে কিছুতেই সময় সমীকরণের সংযোগ ঘটাতে পারছে না সে। আর এই না পারাটাই অস্থির করে তুলছে তাকে; কিন্তু অবচেতন মন তাকে বারংবার সংকেত দিয়ে বলছে এদের ভেতর একটি পারস্পরিক সম্পর্ক অবশ্যই আছে।

সারাদিন সমীকরণের দিকে তাকিয়ে থাকে। কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্সের যতগুলো ডেরিভেশন আছে তার সাথে সময় ভ্রমণের সমীকরণগুলোর ইন্টারেকশন করিয়ে পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন কোণ থেকে। মাঝেমাঝে চোখ বন্ধ করে চিন্তা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কি যেন ভাবে; কখনও কখনও পৃষ্টার পর পৃষ্ঠা লিখে আবার ছিড়ে ফেলে। কাগজে প্রচলন খুব একটা নেই আজকের দুনিয়ায়। এক বান্ডিল কাগজের চেয়ে একটি স্ক্রিন অনেক সস্তায় পাওয়া যায়। তবে গবেষণার কাজে এখনও কাগজের ব্যবহার বহুল জনপ্রিয়। কোন এক গবেষণায় দেখা গেছে হাতে কলমে লিখলে নাকি গবেষণায় দ্রুত অগ্রগতি হয়। আহাম্মক কোথাকার! গবেষণা নিয়ে গবেষণা করে!

ইচ্ছা করছে রাস্তায় বের হয়ে এমন কয়েকটা আহাম্মককে প্যাদানী দিয়ে আসতে। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা জ্ঞানীদের মিলনমেলা, কিন্তু এর বদলে হয়েছে গরুছাগলে হাট। উফ! চিন্তা উল্টা পাল্টা দিকবিদিক ছুটছে; অস্থির হয়ে উঠে এলেক্স। টানা কয়েকদিন ঠিকমতন ঘুম হচ্ছে না। এর ভেতর আরও গোটাপাঁচেক গ্যালাক্সি নেই হয়ে গেছে। এই নিয়ে পনেরটা! চোখের পাতায় ঘুম জড়িয়ে আসছে, তীব্র বেগে মাথা নাড়িয়ে ব্যাটাকে তাড়িয়ে দেয় সে। “আমি ঘুমাব আর এই ফাঁকে একের পর এক গ্যালাক্সি হারিয়ে যাবে? না, ঘুমানো যাবে না কিছুতেই।”, এই বলে নিজেকে প্রবোধ দেয়। ক্লান্তিতে মাথা নুয়ে আসে, আপন মনে কথা বলে “আরে ঘুমের সাথে গ্যালাক্সির চুরি হয়ে যাওয়ার কি সম্পর্ক্য? কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে মন্দ হয় না। টানা আবদ্ধ পরিবেশে থেকে থেকে মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে। নাহ! আমি ঘুমাবো না। উফ! পাগল হয়ে যাচ্ছি!” আর কিছু মনে নেই তার। শুধু কানে এসেছে টেবিলের সাথে মাথা টুস করে ঠুকে যাওয়ার শব্দ।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছে ঠিক ঠাহর করতে পারে না এলেক্স; কপালের সামনের দিকটা ছোট্ট আলুর মতো ফুলে গেছে; কি করে হলো, কখন হলো বুঝতে পারে না। চোখে মুখে পানি দিয়ে আবার সমীকরণ নিয়ে বসে যায়। “নাহ! এভাবে কোনও অগ্রগতি হচ্ছে না। ভাবনার স্রোতকে কিঞ্চিত ভিন্নদিকে প্রবাহিত করতে হবে।” মহাবিশ্ব সৃষ্টির মজার মজার হাইপোথিসিস গুলো হাইপারনেট ঘেটে ঘেটে পড়তে থাকে সে। গ্রীক মিথলজি মতে, ‘দেবতা জিউস কাধে করে পৃথিবীকে বয়ে বেড়াচ্ছেন, আবার সুমেরিয়ান মিথলজি মতে একটি ষাড়ের শিঙ্গের উপর আসন গেড়ে আছে আমাদের পৃথিবী।’ আরও কিছু উদ্ভট থিউরি পড়ে হেসে মন কিছুটা হালকা করে এলেক্স। উনবিংশ শতাব্দির পদার্থবিজ্ঞানী ও সমসাময়িক দার্শনিকরা মহাবিশ্ব নিয়ে চিন্তার জগতে ঝড় তুলার মতো বেশ কতগুলো থিউরির প্রস্তাব করেছিলেন। হলোগ্রাফিক ইউনিভার্স, সিমুলেশন থিউরি, একক ইলেক্ট্রন ইউনিভার্স, মাল্টিভার্স; দ্রুত সেগুলোর উপর চোখ বুলিয়ে বেশ কিছু মজার মজার গাণিতিক হিসাব নিকাশ ও সমীকরণ বুঝার চেষ্টা করে; হঠাৎ একটি থিউরির উপর চোখ আটকে যায় তার।

১৯৭৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড ট্রাইওন ‘শূন্য শক্তির মহাবিশ্ব’ এর মডেল প্রস্তাব করেন। তিনি প্রস্তাব করেন, মহাবিশ্ব শূন্যে কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের কারণে সৃষ্টি হয়েছে, মহাবিশ্বের মোট ধনাত্মক শক্তি ও ঋণাত্মক শক্তির যোগফল তাই শূন্য। তৎকালিন জোর্তির্বিদ ও পদার্থিবিজ্ঞানীরা হেসেই উড়িয়ে দেন তার এই থিউরি। পরবর্তিতে এই থিউরি নিয়ে আরও কেউ কাজ করেনি। হঠাৎ এই তত্ত্বের উপর আমার চোখ আটকে যাওয়ার কারণ অবশ্য অন্য। মহাবিশ্বের মোট শক্তি কিংবা ভর শূন্য নয় বরং এর মান 1.09x10^63 কেজি এবং এটি ধ্রুবক; কারণ শক্তির নিত্যতার সূত্রানুসারে শক্তি বা ভরের সৃষ্টি কিংবা বিনাশ নেই। মহাবিষ্ফোরণের ফলে টাইম-স্পেস কন্টিনিউম সৃষ্টির পর থেকে এটি চিরন্তর সত্য। ভয়ংকর গতিতে মাথার ভেতর চিন্তা চলছে এলেক্সের। মনে হচ্ছে গ্যালাক্সিগুলোর গায়েব হয়ে যাওয়ার একটা কারণ কিছুটা অনুমান করতে পেরেছে সে। এখন এই ধারণাকে সমীকরণের মাধ্যমে প্রকাশ করে দেখতে হবে তা কতটুকু সত্য।

পরের পাঁচদিন বেঘোরে কাজ করে এলেক্স, কখন দিন হচ্ছে আর কখন রাত কিছুই ঠাহর করতে পারেনি সে। খাওয়া খাদ্য খেয়েছে কিনা মনে করতে পারছে না। অবশ্যই খেয়েছে, না হলে শরীর চলতো না। তার ঘোর কাটে যখন সমীকরণগুলো পূর্ণাঙ্গরূপ পায়। কয়েকশ পাতার সমীকরণ লিখে ফেলেছে এই পাঁচদিনে। ফলাফলের দিকে তাকিয়ে ভয়ে সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠে এলেক্সের। যদি এই সমীকরণ সঠিক হয়, তবে সে শুধু গ্যালাক্সি গায়েব হয়ে যাওয়ার কারণই বের করেনি, সেইসাথে জামিল মিস্ট্রির সমাধানও করে ফেলেছে।

মহাগণিতজ্ঞ, জামিল চৌধুরীর শেষ ফোনালাপ রহস্যের ব্যাপারে যে দুটি ধারণা বেশি জনপ্রিয়, ভীষণ অবাক হয়ে লক্ষ করে সে এই দুটি মতবাদই সঠিক! এলেক্স এখন জানে জামিল চৌধুরী ‘ভবিষ্যতে মহা’ এই শব্দদুটি দিয়ে কি বুঝাতে চেয়েছিলেন, আর এও জানে কেন শুধু অতীত ভ্রমণের জন্যে টাইম পোর্টাল খোলা যাচ্ছে; ভবিষ্যতের জন্যে খোলা যাচ্ছে না। সমীকরণগুলোর দিকে তাকিয়ে খুশি হওয়ার বদলে প্রচণ্ড হতাশা চেপে বসে এলেক্সের, চিৎকার করে বলতে হচ্ছে করছে “নাহ! এগুলো সব ভুল। এমন হতেই পারে না”। কিন্তু সে জানে গণিত মিথ্যা বলে না, মহাবিশ্ব গণিতের ভাষায় বুনা এক চাদর; সমীকরণ যেখানে তন্তু। “এখানে কোনও ভুল নেই, আমরা নিজেরাই নিজেদের ধ্ব্বংস ডেকে এনেছি।” ভাবে এলেক্স।

বিছানায় ধপ করে পড়ে শরীর এলিয়ে দেয়, একফোটা শক্তি অবশিষ্ট নেই যেন আর। তার ডান হাতে সমাধানের কাগজগুলো ধরা, ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, কিছুতেই চোখের পাতি খোলা রাখতে পারছে না। কতক্ষণ ঘুমিয়েছে ঠিক মনে নেই, নিজের উপর রাগ হচ্ছে তার। যে সময়টুকু ঘুমিয়েছে এর ভেতর হয়তো আরও কতগুলো গ্যালাক্সি হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না, এই সমীকরণগুলো প্রকাশ পেলে বিশ্বজুড়ে ঝড় বয়ে যাবে। এমনও হতে পারে টাইম ট্রাভেল এজেন্সি সকল রিসার্চ গায়েব করে দিতে পারে, তাকেও খুন হয়ে যেতে হতে পারে। এই বিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসা কি আর তার এক কথায় বন্ধ করে দিবে তারা? কখনও না।

গতানুগতিক পদ্ধতিতে পেপার পাবলিশ, সভা-সেমিনার করা; এভাবে আগালে কিছুই হবে না। একটাই সমাধান, সব সমীকরণ আর হিসাব নিকেশগুলো দিয়ে ভিডিও বানিয়ে একযোগে হাইপার নেটে ছেড়ে দিতে হবে। একযোগে সব বিশ্ববিদ্যালয় আর রিসার্চ সেন্টারের কাছে এগুলো পৌঁছে গেলে আর চাপ প্রয়োগ করে এগুলোকে গায়েব করে দিতে পারবে না। অবশ্য একটা দুঃশ্চিন্তা এখনও তাকে বেশ পীড়া দিচ্ছে, প্রায়ই অতিউৎসাহী কিছু তরুন-তরুনীরা ‘জামিল মিস্ট্রির সমাধান করে ফেলেছি’ এমন খবর হাইপার নেটে ছড়িয়ে থাকে, যেগুলো সবগুলোই এ পর্যন্ত মিথ্যা বা ভুল প্রমানিত হয়েছে। এখন এলেক্সকে তেমন কোনও অতিউৎসাহীর কাতারে ফেলে দিলে আর কিছু কিছু করার থাকবে না; কিন্তু এ ছাড়া আর কোনও উপায়ও যে নেই তার!

“আমার প্রিয় শিক্ষক, সহকর্মী এবং শ্রদ্ধেয় বিজ্ঞানী-গবেষকগন ও বিশ্ববাসি; আপনারা এতোদিনে হয়তো শুনে থাকবেন যে প্রায় তের বিলিয়ন আলোক বর্ষ দূরের প্রায় বিশটা গ্যালক্সি হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে, আমার এই ভিডিও প্রকাশ হওয়ার সময় এই সংখ্যাটি আরও বাড়বে নিশ্চিত। আমি নিশ্চিত করে জানাতে চাই, এই রহস্যের কারণ আমি বের করেছি, আর এটার পেছনে আমাদেরই হাত আছে। আমি আরও বলতে চাই, অতীত ভ্রমণ এজেন্সি আমার এই ভিডিও প্রকাশের পর বেশ নাখোশ হতে পারে, কিন্তু আমি যা বলব সেটি শতভাগ সত্য। আমি কথা বলব বিজ্ঞানের মৌলিক ভাষা, গণিতে দ্বারা। যে ভাষায় লিখিত আমাদের এই প্রিয় মহাবিশ্ব। সবচেয়ে বড় কথা, সময় ভ্রমণের সমীকরণগুলোর ব্যাপারে যার প্রাথমিক ধারণা আছে, তিনি নিজেই আমার সমীকরণগুলোর সাথে মিলিয়ে এই বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখত পারবেন। সমীকরণগুলোর ভিডিও এর শেষ সংযুক্ত আছে, সেখানে যাওয়ার আগে আসুন বিষয়টি সহজ করে বোঝার চেষ্টা করি।”

একটি রুমাল দিয়ে কপালে বিন্দু বিন্দু জমে উঠা ঘাম মুছে আবার বক্তব্য শুরু করে এলেক্স, “আমাদের মহাবিশ্বে যে কোনও সময়ে মোট ভরের পরিমান স্থির। এটি ভর-শক্তির নিত্যতার সূত্র হিসাবে আমরা স্কুল পর্যায়ে পড়ে থাকি। এখন অতীত ভ্রমণের ফলে এই ভরের সম্যতা নষ্ট হচ্ছে। একটি সহজ উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধা হবে আপনাদের।” বলেই টেবিলের উপর দুটি প্লাস্টিকের পাত্রে গুনে গুনে দশটি করে মার্বেল রাখে। একটা নাক বন্ধ হয়ে আছে মনে হচ্ছে; হালকা শব্দ করে টেনে পরিষ্কার করে আবার শুরু করে, “এই দুটি পাত্রেই দশটি করে মার্বেল আছে। পাত্র দুটিকে আমাদের মহাবিশ্বের সময়ের তীরের সাথে তুলনা করে ডান দিকের পাত্রটি বর্তমান আর বাঁ দিকের পাত্রটি অতীত হিসাবে ধরে নেই। তারমনে অতীত ও বর্তমান যেকোনও সময়ে মার্বেলের সংখ্যা সমান। এখন সময় ভ্রমণের যদি বর্তমানের পাত্র থেকে একটি মার্বেল অতীত পাত্রে নিয়ে নেই তাহলে কি হবে? তাহলে অতীত পাত্রে মার্বেল হবে এগারোটি আর বর্তমান পাত্রে হবে নয়টি। এভাবেই সময় ভ্রমণের কারণে ভরের সাম্যতা নষ্ট হচ্ছে। এখন এটাতে ভারসাম্য আনতে হলে কি করতে হবে?”

গলা শুকিয়ে এসেছে; পাশে রাখা বোতল থেকে ঢকঢক করে গলায় ঢেলে আবার বক্তব্য শুরু করে, “এখন সাম্যতা আনার জন্যে, অতীত পাত্র থেকে দুটি মার্বেল তুলে ফেলে দিলাম। সেক্ষেত্রে দুটি পাত্রেই এখন নয়টি করে মার্বেল আছে। যেহেতু বর্তমান পাত্র থেকে একটি মার্বেল অতীতে গিয়েছিল, ভ্রমণ শেষে সেটি আবার বর্তমানে ফিরে আসবে। সেক্ষেত্রে এখন অতীত পাত্র মার্বেল হবে আটটি আর বর্তমানে পাত্র মার্বেলে সংখ্যা বেড়ে হবে দশটি। তাই পূনরায় সাম্যতা নিয়ে আসার জন্যে বর্তমান পাত্র থেকে দুটি মার্বেল তুলে ফেলে দিলাম, এখন দুটি পাত্রেই আটটি করে মার্বেল আছে। সুতরাং দেখতে পাচ্ছি একটি মার্বেলের অতীত ভ্রমণের জন্যে সম্পূর্ন বিশ্বের দুটি মার্বেল গায়েব হয়ে যাচ্ছে।”

“দেখা যাচ্ছে, এভাবেই একক ভরের অতীত ভ্রমণের কারণে দ্বিগুণ ভরের পদার্থ মহাবিশ্ব থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে। আমি গত কয়েক বছরের অতীর ভ্রমণের ডাটা সংগ্রহ করে দেখেছি, গড়ে প্রতিদিন বিয়াল্লিশ হাজার লোক অতীত ভ্রমণে যায়। সে হিসাবে প্রতিজন যদি গড়ে একশ কেজি ভর নিয়ে অতীতে যায় তাহলে বিয়াল্লিশ লক্ষ কেজি ভরের ভারসাম্যতা বিনষ্ট হচ্ছে। তাই মহাবিশ্ব থেকে চৌরাশি লক্ষ কেজি ভর গায়েব হয়ে যাবে। আর এটি হবে মহাবিশ্বে প্রান্তের কাছাকাছি অঞ্চল থেকে। ব্যাপারটা কেবল এখানেই সীমাবদ্ধ থাকলে কোনও সমস্যা হওয়ার কথা না; কারণ ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বিলিয়ন বিলিয়ন মেট্রিক টন ভরের প্রায় অসীম এই মহাবিশ্বের সাপেক্ষে এমন কয়েক কোটি কেজি ভর গায়েব হয়ে যাওয়া প্রকৃতপক্ষে কোনও ব্যাপার না। এটি ঠিক একটি টেবিল চামচ দিয়ে সমুদ্র সেচার মতো ব্যাপার।

একটু বিরতি নেয় এলেক্স। হালকা কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে বলে, “সমস্যা হলো, দ্বিগুন পরিমান ভরই কেবল গায়েব হচ্ছে না। যেই মুহূর্তে অতীতে পৌছাচ্ছে কোনও ভর, ঠিক সেই সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত ভরের অসামজস্যতার একটি চেইন ইফেক্টের সৃষ্টি হচ্ছে। এই ইফেক্ট একটি মহাজাগতিক ঢেউ এর মতো অতীত থেকে বর্তমানে প্রবাহিত হয়, একে আমি নাম দিয়েছি সময়ের এলেক্স ওয়েভ। সময়ের এই ঢেউ এর ফলে প্রতি প্ল্যাংক সময়ে, ‘জামিল কন্সটেন্টের রুট এর সাথে আলোর বেগের ধ্রুবকের স্কোয়ারের গুণফলের টু দ্যা পাওয়ার ভর’ এই পরিমান ভর নেই হয়ে যাবে মহাবিশ্ব থেকে। সহজ কথায়, আমরা যদি একটি মার্বেলকে এক মিলিয়ন বছর অতীতে পাঠাই তাহলে বর্তমানে একটি গ্রহের সমান ভর শূন্যে মিলিয়ে যাবে। আর যদি এক কোটি বছর অতীতে পাঠাই, তাহলে হয়তো একটি সৌর ভর নেই যাবে। অথবা, একটি আস্ত মানুষ এক মিলিয়ন অতীতে গেল, আর এদিকে একটি সৌরজগত হাওয়া!”

একটু বিরতি নিয়ে কিছুক্ষণ হেঁটে আসে ঘরের বাইরে থেকে। রাত, ক্যাম্পাস প্রায় নিরব, হালকা শীতল বাতাস বইছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে তার; পৃথিবীর জন্যে মায়া হচ্ছে, অসম্ভব মায়া। “কম অত্যাচার করছি এই ভূমির উপর আমরা? তাও কি অসীম ধৈর্য নিয়েই না আমাদের এখনও বুকে আগলে রেখেছে!” আপন মনে ভাবে এলেক্স। দেরি না করে ঘরে ফিরে এসেই আবার ভিডিও নিয়ে বসে যায় সে। “এই গ্যালাক্সিগুলো গায়েব হয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে যেদিন থেকে আমরা অতীত ভ্রমণ শুরু করেছি, কিন্তু আমাদের নজরে এসেছে মাত্র কয়েক সপ্তাহ হলো। হয়তো আরও বিলিয়ন বছর পরে এই ব্যাপারটা ধরতে পেতাম। কিন্তু ইউনিভার্সের ম্যাপ তৈরিতে চারবছর আগে সাব-স্পেস সিগনালিং প্রযুক্তি ব্যবহৃত হওয়ার ব্যাপারটা এখনি ধরতে পেরেছি। আমার হিসাব মতে, যে হারে সময় ভ্রমণ চলছে আমাদের পৃথিবী শূন্যে মিলিয়ে যেতে আর সময় আছে দুই লক্ষ উনিশ হাজার বছর। তবে ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না, এভাবে ক্রমাগত গ্যালাক্সির পর গ্যালাক্সি গায়েব হয়ে গেলে, মহাবিশ্বের গ্রেভেটির ব্যালেন্স নষ্ট হয়ে যাবে, তখন অনেক ধরনের বিপর্যয়ই ঘটতে পারে। আমার ধারণা মহান গণিতবীদ জামিল চৌধুরী এই ব্যাপারটাই মৃত্যুর আগে বলে যেতে চেয়েছিলেন। আমি হয়তো সেই ‘জামিল মিস্ট্রির’সমাধানও করে ফেলেছি।” মনটা খারাপ হয়ে যায় এলেক্সের, স্কুলজীবন থেকে এই মিস্ট্রির সমাধান করার প্রবল ইচ্ছা মাথায় গেথে গিয়েছিল, কিন্তু এটার যে এমন পরিনতি হবে সেটি ঘূণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি সে।

“‘জামিল মিস্ট্রির’সমাধানের পাশাপাশি আমরা কেন ভবিষ্যত ভ্রমণ করতে পারছি না সেটিরও সমাধান করেছি আপাতত ওটা পরের ভিডিওতে তুলে ধরবো। আমাদের এখন এই বিশ্বকে বাঁচানোর জন্যে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা জানি পাস্ট ট্রাভেল এজেন্সিগুলো এখন বিশ্বের সবচেয়ে ধণী ও প্রভাবশালী সংস্থা, অনেক ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব রাস্ট্রের ক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু তাদেরও বুঝতে হবে যদি আমাদের পৃথিবীই না থাকে তবে কাদের দিয়ে চলবে এই পর্যটন বানিজ্য? আমরা সাধারণ জনগনেরও উচিত সব ধরণের সময় ভ্রমণ বর্জন করা। বর্তমানেই কত সুন্দর মনোরম জায়গা আছে ভ্রমণের! কৈ একশ বছর আগেও তো আমাদের পূর্বপুরুষরা সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতেন, তারা কি তাদের সময়কে উপভোগ করেন নি? তাহলে আমরা কেন পারবো না?”


ভিডিও তৈরি করা শেষ; বার কয়েক চেক করে ছোটখাট কিছু ইডিট করে ফাইনাল করে ফেলে এলেক্স। এখন এটিকে হাইপারনেটে সব সাইটে একযোগে প্রকাশ করতে হবে, সেই সাথে যতগুলো রিসার্চ ইন্সটিটিউড, ল্যাবরেটরি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সাথে তার যোগাযোগ আছে সবাইকে ইমেইল করতে হবে। লম্বা একটা দম নিয়ে সেন্ড বাটনে ক্লিক করে দেয় সে। বেজে গেল যুদ্ধের দামামা; আর পেছন ফেরার উপায় নেই।


অধ্যায় পাঁচ
স্থান: নিউইয়র্ক; সময়: ১০ই ফেব্রুয়ারী ২১৯১


এলেক্সের আকাঙ্খার চেয়েও বেশি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রায় সবগুলো সংবাদমাধ্যমের মূল আলোচিত বিষয় হচ্ছে বর্তমানের এই জামিল’স মিস্ট্রির সমাধান। যদিও পাস্ট এজেন্সিগুলো এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া দেখায়নি, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে; তবে তাদের বানিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে, শেয়ারে ব্যাপক ধস নেমেছে। যদিও আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে ব্যাপারটা সাময়িক, জনগনের ভেতর প্রাথমিক উত্তেজনা হ্রাস পেলেই তারা নতুন নতুন প্যাকেজ আর লোভনীয় অফার নিয়ে হাজির হবে। অল্প সময়ের ব্যবধানেই তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে ঠিকঠিক ঘুরে দাঁড়াবে, আর পৃথিবীকে নতুন বিপর্যয়ের দিকে কয়েক পা এগিয়ে নিয়ে যাবে। অন্তত কয়েক লক্ষ বছর পরের পৃথিবীর পরিনতির কথা বিবেচনা করে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের এই ব্যবসা তারা বন্ধ করে দিবে, এতোটা মহত্ব তাদের থেকে কেউই আশা করে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে রাতারাতিই যেন এলেক্সের সম্মান বেড়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই প্রফেসর ও গবেষকরা দেখা করতে আসছেন; প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গায় নিমন্ত্রণ রক্ষা করে লেকচার দিয়ে বেড়াচ্ছে। তেমনি এক গেস্ট লেকচারার হিসাবে নিউইউর্কে হাজির হয়। হোটেলে পৌঁছে মাত্রই শাওয়ার নিতে ঢুকবে তখনই দরজায় কে যেন নক করে, গুনে গুনে তিনবার, একই রকমভাবে; মাপা আওয়াজ।

দরজায় সামরিক বাহিনীর পোশাক পড়া একজন কর্নেল রেঙ্কের অফিসার। পেছনে একজন ক্যাপ্টেন আর দুইজন সৈন্য। “মিস্টার এলেক্স নেলসন?” চোখে দিকে তাকিয়ে জবাবের অপেক্ষা না করেই হাতে ধরা একটি নীল রঙের কার্ড তার দিকে এগিয়ে বলে, “আমি কর্নেল ডেনিয়েল টর; এটি প্রেসিডেন্টের একটি নিমন্ত্রণ কার্ড। আপনাকে এক্ষণি আমাদের সাথে আসতে হবে।”

নিশ্চয় জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত অতিজরুরী কোনও বিষয় হবে, আর এটা যে তার সমাধানকৃত জামিল’স মিস্ট্রির সাথে সম্পর্কিত তা বুঝতে বেশি বেগ পেতে হয়নি। দ্রুত তৈরি হয়ে তাদের সাথে গাড়িতে উঠে। পেছনের আসনে মাঝে এলেক্স; দুইপাশে দুইজন সৈন্য, ড্রাইভ করছে ক্যাপ্টেন তার পাশে কর্নেল। রীতিমত বিশেষ প্রহরা দিয়ে তাকে নিয়ে যাচ্ছে তারা। প্রেসিডেন্ট কি এখন নিউইউর্কে? ভাবনাটা মাথায় আসতেই জিজ্ঞেস করে, “আমরা এখন যাচ্ছি কোথায়?”

“একটু পরেই বুঝতে পারবেন।” বলেই চুপ করে যায় কর্নেল ডেনিয়েল; বুঝিয়ে দেয় এই বিষয়ে আর কোনও কথা বলতে আগ্রহী নন তিনি।

কিছুক্ষণ পর গাড়িটি জাতিসংঘ এলাকায় প্রবেশ করে, গেটে কর্নেলের পরিচয় পত্র দেখে স্যালুট দিয়ে ছেড়ে দেয়। দশ মিনিটের ভেতর নিজেকে একটি বদ্ধ ঘরে ভাইস প্রেসিডেন্টের সামনে আবিষ্কার করে এলেক্স। মাননিয় ভাইস প্রেসিডেন্ট সাহেব খুবই তড়িৎকর্মা ব্যক্তি। একমুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বললেন, “মিস্টার এলেক্স, আপনি নিশ্চয় প্রেসিডেন্টের নিমন্ত্রণ পত্র পেয়েছেন; কিছুক্ষণের মধ্যে সিকিউরিটি কাউন্সিলের মেম্বার দেশগুলোকে নিয়ে একটি জরুরী সভা হবে। সেখানে সেসব দেশের ট্রাভেল মিনিস্টার, সিকিউরিটি সেক্রেটারী সহ জাতিসংঘের এম্বাসেডররা উপস্থিত থাকবেন। গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থেই আপনাকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। আপনি জামিল’স মিস্ট্রির যে সমাধান ও গ্যালাক্সিগুলো হারিয়ে যাওয়া নিয়ে যে গাণিতিক মডেল দিয়েছেন সে বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিতে হবে। একটা পরামর্শ দিচ্ছি, উপস্থিত সবাই কিন্তু আপনার মত গণিতজ্ঞ নয়, তাই যথাসম্ভব সহজ করে ব্যাখ্যা করা চেষ্টা করবেন। আরেকটা বিষয় আপনাকে বলে রাখছি, আমাদের সামনে মহাবিপর্যয়। যে করেই হোক আমাদের এই মিটিং এ সবাইকে ঐক্যমতে আসতে হবে।”

ভাইস প্রেসিডেন্ট সাহেবের চোখে মুখে ভয়ের স্পষ্ট আভা, এলেক্সকে তা ছুঁয়ে যায়। কিন্তু একটা বিষয় ঠিক বুঝতে পারছে না সে, তাঁকে খুব বেশি বিচলিত মনে হচ্ছে। প্রায় দুই লক্ষ বছর পরের বিপর্যয় নিয়ে এখনই এতোটা বিচলিত হওয়ার কারণ কি হতে পারে? “আমি কি কিছু এড়িয়ে গেছি?” ভাবনাটি মাথায় আসতেই জিজ্ঞেস করে, “মাননিয় ভাইস প্রেসিডেন্ট, আপনাকে খুব বেশি আতঙ্কিত মনে হচ্ছে, এর কি সুনির্দিষ্ট কোনও কারণ আছে? আমার হিসাবে মতে প্রায় দুই লক্ষ বছরের চেয়ে বেশি সময় আমাদের হাতে আছে!”

স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ এলেক্সের দিকে তাকিয়ে থেকে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করেন তিনি, “আপনি বুদ্ধিজীবি ব্যক্তিত্ব, সবকিছু যুক্তি আর সরল চোখে দেখে অভ্যস্থ। আর আমাদের প্রতিনিয়ত হুমকি ও বিপর্যয় নিয়ে চিন্তা করতে হয়। তাই একটি সিস্টেমের ভয়ংকর দিকটি আমাদের কাছে সহজেই ধরা পড়ে। আচ্ছা আপনি তো গাণিতিক সমীকরণ দিয়ে প্রমান করেছেন যে ‘যতো বেশি ভর; যত বেশি অতীতে পাঠানো হবে ততো বেশি ভর আমাদের বর্তমান বিশ্ব থেকে হারিয়ে যাবে।’ এখন কেউ যদি কয়েক বিলিয়ন অতীতের একটি পোর্টাল খুলে সেখান দিয়ে ক্রমাগত ভর পাচার করতে থাকে তাহলে হয়তো কয়েকশ বছরের ভেতরই আমাদের পৃথিবীসহ সম্পূর্ণ সৌরজগত শূন্যে মিলিয়ে যাবে; এই ব্যাপারটা কি ভেবে দেখেছেন? এখন সব দেশের হাতে এই মহাবিশ্ব ধ্বংসের প্রযুক্তি আছে। যে করেই হোক এটাকে ঠেকাতে হবে।”

এলেক্সের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে; মৃদু কণ্ঠে বলে, “কিন্তু মিস্টার ভাইস প্রেসিডেন্ট; সময় সমীকরণের হিসাব মতে, এক থেকে একশ মিলিয়ন বছর পর্যন্ত টাইম পোর্টাল খুলতে যে শক্তি লাগবে সেটি বাস্তবে প্রয়োগ করা সম্ভব কিন্তু বিলিয়ন বছরের পোর্টাল তৈরি করতে হলে একটি প্রায় পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ ভরকে শক্তিতে রুপান্তরিত করতে হবে। সোজা কথায়, পৃথিবীকে ধ্বংস না করে এতো বিশাল পরিমানের শক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।”

“সেটি আমাকে জানিয়েছে আমাদের গবেষকরা। কিন্তু একটি একশ বছরের পোর্টাল খুলে ক্রমাগত ভর পাচার করতে থাকলেও তো প্রায় একই ইফেক্ট পড়বে, তাই না?” চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে এলেক্সের দিকে তাকায় ভাইস প্রেসিডেন্ট।

ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হবার জোগার হয়েছে এলেক্সের। এই প্রথম বুঝতে পারে একটি সুতার উপর ঝুলে আছে মহাবিশ্বের ভাগ্য! এটাও ঠিকঠিক অনুধাবন করতে পারে এটিকে ঠেকানোর কোনও উপায় কারও হাতে নেই। কিছুক্ষণ পর কর্নেল ডেনিয়েল এসে বলেন, “মিস্টার এলেক্স, সবাই অপেক্ষা করছে আপনার জন্যে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বক্তব্য দিয়েছে কিন্তু আজকের বিষয়টা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ; মহাবিশ্বের ভাগ্য যেখানে প্রশ্নবিদ্ধ সেখানে কোনও ভুল গ্রাহ্য করা যাবে না। তবে যতটা ভয় পেয়েছিল ততটা ভীত হওয়ার মত কিছু ঘটেনি। খুব ভালো ভাবেই সম্পূর্ণ বিষয়টি সহজ ভাষায় উপস্থিত পনেরটি দেশের মন্ত্রী ও সেক্রেটারীদের সামনে তুলে ধরে এলেক্স। তারাও সহজেই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছেন বলে মনে হলো।

প্রশ্নত্তোর পর্বে একজন জিজ্ঞেস করলেন, “মিস্টার এলেক্স, সময় ভ্রমণের সমীকরণ সমাধানের পর থেকে অতীত ভ্রমণ সম্ভব হচ্ছে, কিন্তু ভবিষ্যত ভ্রমণ করতে পারছি না কেন? এই বিষয়টা একটু সহজ করে ব্যাখ্যা করবেন কি?”

“অতীত ভ্রমণের জন্যে পোর্টাল খুলতে পারলেও এখানে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা মিলিয়ন বছর এর চেয়ে কম সময়ের আর একশ মিলিয়ন বছরের বেশি অতীতের পোর্টাল খুলতে পারি না। সহজ করে বললে এই রেঞ্জের বাইরে পোর্টাল খুলার মতো শক্তি এক বিন্দুতে কেন্দ্রিভূত করার মতো প্রযুক্তি এখনও আমাদের হাতে নেই। একই কথা ভবিষ্যত পোর্টালের ক্ষেত্রেও বলা যায়। মিলিয়ন বছরের চেয়ে কম সময়ের ভবিষ্যত পোর্টাল খুলার প্রযুক্তি আমাদের হাতে নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে মিলিয়ন বছর ভবিষ্যতের পোর্টালও খুলা যাচ্ছে না কেন? এর কারণ হয়তো মিলিয়ন বছর পরে আমাদের পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে, তাই সেই সময়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”

আরেকজন সেক্রেটারি বলেন “কিন্তু এখানে একটি বিষয় বুঝতে পারছি না; সময় ভ্রমণের আমরা স্থান স্থির রেখে শুধু সময়ের ভেতর দিয়ে ভ্রমণ করি, তাই একই জায়গার কেবল অতীতে পৌছাই, তারমানে স্থানের কোনও পরিবর্তন হয় না। সেই হিসাবে মিলিয়ন বছর ভবিষ্যতে যদি পৃথিবী বা সৌরজগত ধ্বংস হয়ে গিয়েও থাকে, তাহলেও তো স্থান একই থাকার কথা। আমরা ঠিক এই জায়গার ভবিষ্যতে পৌছুতে পারি, হয়তো পৃথিবী নেই, কিন্তু মহাবিশ্বের স্পেস তো থাকবে!”

কিছুক্ষণ প্রশ্নকর্তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে এলেক্স, এমন বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন একজন আমলার কাছ থেকে আশা করেনি সে। “আপনি খুব সুক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ থেকে প্রশ্নটি করেছেন। ব্যাপারটি বুঝতে হলে আমাদের সময় এর প্রকৃতি ঠিকমত বুঝতে হবে। সময় এর উৎপত্তি হয়েছে মহাবিষ্ফোরণের ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে। ‘এর আগে কি ছিল? কোথায় ছিল? বা কখন ছিল?’ এসবের উত্তর এখনও আমার জানি না। তাই মহাবিশ্বের বাইরে সময়ের অস্তিত্ব নেই। এখন কোনও কারণে আমাদের এই স্পেস বা পৃথিবী যদি মহাবিশ্বের বাইরে চলে যায় সেক্ষেত্রে এই স্পেসে সময়ের অস্তিত্বই থাকবে না। আমার ধারণা মিলিয়ন বছর ভবিষ্যতের পোর্টাল খোলা সম্ভব হচ্ছে না কারণ তখন আমাদের পৃথিবী কাল্পনিক সময়ের ভেতর ঢুকে গেছে, মানে মহাবিশ্বের বাইরে চলে গেছে বা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।”

যদিও মিলিয়ন বছর ভবিষ্যতে কথা বলা হচ্ছে, তবুও রুমের ভেতর মৃদু গুঞ্জন উঠে, সেটি যে ভয়ের তা বুঝতে বেগ পেতে হয়নি তার।

এবার উঠে দাঁড়িয়ে আমেরিকার ডিফেন্স সেক্রেটারি বলেন, “আপনারা এতক্ষণে নিশ্চয় পরিস্থিতির গুরুত্ব ঠিকঠিক অনুধাবন করতে পেরেছেন। পাস্ট ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর সাথে আমরা আলোচনা করেছি, তারাও আমাদের সাথে একমত হয়েছে। তারা একটি নিয়ন্ত্রণের ভেতর দিয়ে পর্যটন ব্যবসা চালিয়ে যাবে যাতে করে পৃথিবী ধ্বংসের সময় দুই লক্ষ বছর থেকে বাড়িয়ে এক মিলিয়ন বছরে উত্তীর্ণ হয়। কিন্তু আমাদের দুঃশ্চিন্তার কারণ অন্য। এখন পৃথিবীর যে কোনও দেশের হাতে, এমন কি অনেকগুলো প্রাইভেট কোম্পানীর হাতেও আমাদের সৌরজগতসহ সম্পূর্ণ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি পর্যন্ত শূন্যে মিলিয়ে দেওয়ার প্রযুক্তি আছে। এটিকে কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের কিছু একটা ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

মিস্টার সেক্রেটারী, “আপনি কি করতে চাচ্ছেন? আমার জানা মতে আমাদের হাতে আর কিছু করার নেই, কোনও বিকল্পও নেই!”

মৃদু হেসে ডিফেন্স সেক্রেটারী বললেন, “আমরা একশ বার বছর পেছনে ‘৫ই মে ২০৭৬’-এ গিয়ে মহান গণিতবীদ জামিল চৌধুরীকে বুঝিয়ে প্রফেসর ইগরকে সময় সমীকরণের সমাধান না জানানোর জন্যে বলতে পারি। আমার ধারণা তিঁনি যদি আর একদিন বেশি বেঁচে থাকতেন তবে নিজেই প্রফেসর ইগরকে বলে যেতেন সময় সমীকরণগুলো প্রকাশ না করার জন্যে। নিশ্চয় তাঁর শেষ ফোন কলের ইতিহাস আপনাদের অজানা নয়?”

এবার বেশ চমকে উঠে এলেক্স, গাণিতিক হিসাবে মতে কোনও ভাবেই একশ বছরের অতীতে গিয়ে ঘটনা প্রবাহ পরিবর্তন সম্ভব নয়। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার নীতি বিরুদ্ধ এই ভ্রমণ, যা জামিল’স সময় সমীকরণের মূলনীতিও। আর এটি গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্সের তৈরি করবে, তাত্ত্বিকভাবে তাই কখনই সেটি সম্ভব নয়। তারপরেও, একশ বছর দূর অতীতে পোর্টাল খোলার মতো এনার্জি একবিন্দুতে কেন্দ্রীভূত করার প্রযুক্তিও এখন মানুষের হাতে নেই। হিসাব মতে সমগ্র পৃথিবীর ভরকে শক্তিতে রুপান্তর করলে একহাজার বছর দূরের টাইম পোর্টাল তৈরি সম্ভব, সেখানে মাত্র একশ বছর? অসম্ভব। কি বলছেন ডিফেন্স সেক্রেটারী? কোনও গোপন প্রযুক্তি কি আয়ত্ব করে বসে আছে সরকার? হালকা কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে সে বলে, “কিন্তু মিস্টার সেক্রেটারী, এটা তো অসম্ভব! কোনও ভাবেই মাত্র একশ বছর পেছনে যাওয়া সম্ভব নয়।”

“কে বলল আমরা এখান থেকে মাত্র একশ বছর অতীতে যাব?” কণ্ঠে রহস্যের ছোঁয়া ডিফেন্স সেক্রেটারীর। “আমরা একটি প্রকল্পের প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছি। বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে বিস্তারিত পরে আপনাদের ব্রিফ করবে। তবে সংক্ষেপে যা বলতে পারি, আমরা সাড়ে ছয় কোটি বছর অতীতের একটি পোর্টাল খুলে সেই সময়ে মেক্সিকোর সিজুলুব উপকূলে একটি টাইম ট্রাভেল ল্যাবরেটিরি স্থাপন করবো। তারপর সেই ল্যাব থেকে সাড়ে ছয় কোটির চেয়ে একশ বার বছর কম ভবিষ্যতের একটি টাইপ পোর্টাল খুলে ঠিকঠিক ‘৪ই মে ২০৭৬’-এ গিয়ে উপস্থির হবো। সেখানে মহান গণিতবীদ জামিল চৌধুরীর দেখা পেয়ে গেলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে চিন্তা করুন, জামিল চৌধুরী যদি সময় সমীকরণের সমাধান না করতেন তাহলে আজকে আমাদের এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না। প্রিয় বন্ধুরা, আমরা ইতিহাসের ধারা বদলিয়ে ফেলতে যাচ্ছি।”

“কিন্তু ঠিক সাড়ে ছয় কোটি বছরই কেন? ছয় মিলিয়ন বছর নয় কেন?” একজন মন্ত্রী চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন।

“কারণ নির্দিষ্ট করে কোন একদিনের নির্ভুল সময় ভ্রমণ করতে হলে সাড়ে ছয় কোটি বছরের আগে থেকে না হলে সম্ভব নয়। যদি মিলিয়ন বছর অতীতে গিয়ে মিলিয়ন বছর ভবিষ্যতে যাত্রা করা হয় তবে দশ বছরের প্লাস মাইনাস ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।” কারও অপেক্ষায় না থেকে উত্তরটা এলেক্সই বলে দেয়।

হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই ভীষণ চমকে উঠে এলেক্স। ডিফেন্স সেক্রেটারী সরাসরি একশ বছর অতীতে না গিয়ে ভিন্ন পথে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন, থিউরি অনুসারে এটি সম্ভব! কিন্তু তিনি কি বুঝতে পারছেন এটি কেবল একমুখি ভ্রমণ? যে এই মিশনে যাবে তার আর এই সময়ে ফিরে আসার উপায় নেই? এমন কি তার শূন্যে মিলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও নাকচ করে দেওয়া যায় না!
--------------- দ্বিতীয় পর্বের সমাপ্তি ---------------
------------------- ( চলবে ) ---------------------

মন্তব্য ১০ টি রেটিং +৪/-০

মন্তব্য (১০) মন্তব্য লিখুন

১| ১৯ শে মে, ২০১৯ রাত ৮:০৮

রাজীব নুর বলেছেন: কাহিনী সুন্দর।
সাসপেন্স আছে।

২০ শে মে, ২০১৯ বিকাল ৪:৫১

শান্তির দেবদূত বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ রাজীব ভাই। শুভকামনা রইল।

২| ১৯ শে মে, ২০১৯ রাত ১১:৫৭

মাহমুদুর রহমান বলেছেন: কিছুটা পড়লাম।

২০ শে মে, ২০১৯ বিকাল ৪:৫২

শান্তির দেবদূত বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ। আশা করি শেষ পর্যন্ত পড়ার আগ্রহ পাবেন। শুভকামনা রইল।

৩| ২০ শে মে, ২০১৯ সকাল ১১:৫৯

বিদ্রোহী ভৃগু বলেছেন: ওয়াও!!

দারুন মানে দারুন! কল্প গল্পে একেবারে ডুবে যাওয়ার মতো!
:)

+++++++++

২০ শে মে, ২০১৯ বিকাল ৪:৫৯

শান্তির দেবদূত বলেছেন: অনেক ধন্যাবাদ, প্রিয় বিদ্রোহী ভাই। অনুপ্রেরণা দিতে আপনি সব সময়ই স্বিদ্ধহস্ত। শুভকামনা রইল।

৪| ২০ শে মে, ২০১৯ দুপুর ২:৪৭

কাছের-মানুষ বলেছেন:
প্রথম দুটি পর্ব একটানা পড়ে ফেললাম। দারুন লিখেছেন, প্রথম থেকেই
পাঠক ধরে রাখার ক্ষমতা আপনার আছে।

কি হয় জানার জন্য শেষ পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। ++++

২০ শে মে, ২০১৯ বিকাল ৫:০৪

শান্তির দেবদূত বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ প্রিয় লেখক। আপনার প্রসংশা পেয়ে লেখা স্বার্থক মনে হচ্ছে। আজ রাতেই ইনশাআল্লাহ শেষ পর্ব পোষ করবো। শুভকামনা রইল।

৫| ২৪ শে মে, ২০১৯ রাত ১২:১৯

আর্কিওপটেরিক্স বলেছেন: আপনার লেখার হাত অসাধারণ !

পড়তে গিয়ে বোর হলাম না।

আমিও একসময় সময় নিয়ে আমার কিছু ধারণা ব্লগে পোস্ট করবো :)

সুন্দর লেখার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ :)

২৪ শে মে, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:০৮

শান্তির দেবদূত বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ। সময় নিয়ে আমার মাথায়ও কিছু আইডিয়া আছে, সেগুলো নিয়ে বেশ কয়েকটি সাইন্স ফিকশন লেখার ইচ্ছা আছে। যখনই সময় নিয়ে ভাবি, মাথা হ্যাং হয়ে যায়! কি অপার রহস্যময় একটা ব্যাপার!

আপনার লেখার অপেক্ষায় থাকলাম। আমি ব্লগে তেমন একটা সময় দিতে পারিনা, মোটামুটি ইরেগুলার বলতে পারেন। তাই অনুরোধ থাকবে, যখনই সময় নিয়ে আপনার লেখাগুলো পোষ্ট করবেন, আমাকে জানাতে ভুলবেন না।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.