নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আদনান সৈয়দ

আদনান সৈয়দ। জন্ম : ঢাকা। পেশাঃ ফাইনানসিয়াল এনালিষ্ট এবং প্রফেশনাল বিজনেস প্লানার। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এমবিএ। নেশা: লেখালেখি ও সাংবাদিকতা। বর্তমানে বাংলাদেশের একটি প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কর্মরত। মেইল: [email protected]

আদনান সৈয়দ › বিস্তারিত পোস্টঃ

জাম আলু

১৭ ই জুলাই, ২০১২ সকাল ১০:৫৬





জাম আলু ময়মনসিংহ এলাকায় পাওয়া যায়। খুব ছোট ছোট জামের মত লাল। দেখতে অনেকটা ইঁদুরের বাচ্চার মত। অসাধারন স্বাদ! সত্যি বলতে আমার খুব প্রিয় এই আলু। আমার আম্মা সেই খবরটা জানেন। আর জানেন বলেই এবার বাংলাদেশ থেকে নিউইয়র্ক আসার পথে মামার সাথে দুকেজির মত জাম আলু দিয়ে দিলেন। মামা বলে কথা! কাষ্টমস এর চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেকটা উচ্চ মূল্যের জরিমানাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রিয় মামুজান শেষ পর্যন্ত জাম আলু আমার হাতে পৌছে দিলেন।



ইতিমধ্যেই আমার গাড়ির ট্রাঙ্কে সপ্তাহ তিনেক ধরে এই জাম আলু নামক বস্তুটি একটা জুঁতসই জায়গা করে নিয়েছে। তিন সপ্তাহ যাবৎ গাড়ির ট্রাঙ্কে ? সেদিন হঠাৎ আম্মা কথায় কথায় জাম আলুর প্রসংগ তুললেন। ” কিরে তোর প্রিয় জাম আলু কেমন লাগলো?” আমি সত্যি বলতে আলুর কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ মনে হল আরে তাইতো আলুগুলো তো গাড়ির ট্রাঙ্কে? কোন রকম নিজেকে সামলে নিয়ে আমি তোঁতা পাখির মতই মিথ্যে কথা বলে ফেললাম। ” আম্মা, অসাধারন হয়েছে, খুব মজা করে খেয়েছি, ইত্যাদি ইত্যাদি”। জানেনতো, সব প্রবাসীরাই কিন্তু তাদের মা-বাবা দের সাথে অল্প বিস্তর মিথ্যা বলেন। আমিও বললাম। কারন এই নিপাট মিথ্যাটা না বললে আম্মার চোখের কোনে জল চিক চিক করে উঠতো। এবার আলু নিয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ। আহা! এত মজার আলু দিয়ে মাগুর মাছের ঝোল সাথে টমাটো আর ধনে পাতা। ভাবলেই জিভে জল আসে। অনেক হিশেব নিকেশ করে আমারই এক পরিচিত সদজন আতিক ভাই এর দ্বারস্থ হলাম। আতিক ভাই অর্থাৎ আতিক উল্লাহ সম্পর্কে এই সুযোগে দুটো কথা বলতে চাই। অসাধারন একজন ভালো মানুষ বলতে যা বোঝায় তিনি ঠিক তাই। শহুরে তথাকথিত চাকচিক্য উনার গায়ে একেবারেই নেই। কোন ভরং নেই, মেকি-কৃত্তিমতার কোন ছাপ তার গায়ে এখনো লাগে নি। বাড়ি জামালপুর হওয়ায় কথা বলেন খাঁটি জামালপুরের উচ্চারনে। অতি সাদাসিধা ভদ্রলোক বলতে যা বোঝায় তিনি ঠিক তাই। আমার কাছে জাম আলুর কথা শুনে তার চোখের তাড়ায় স্পষ্ট আনন্দের ঝিলিক দেখতে পেলাম। ” আদনান ভাই, আলু গুলা আমার কাছে দিয়া দেইন, আমার বউ এইগুলান আপনার পছন্দমত রান্না বান্না কইরা রাখবো আর আফনে শুধু একটু সময় কইরা আমার বাড়িতে আইসা খায়া যাইবাইন”। আমিতো যেন হাতে আকাশের চাঁদ পেলাম। সেই সাথে চোখ ভরা স্বপ্ন। আহা! কতদিন পর জাম আলু খাবো। আমি আনন্দের সাথে সবকটা আলু আতিক ভাই এর হাতে দিয়েদিলাম।



রোববার এর ফুরফুরে বিকেল। হঠাৎ আতিক ভাই এর কল। ” আদনান ভাই, আজকে সন্ধায় কি আসতে পারবেন?” বেশ বুঝতে পারলাম নিশ্চয়ই জাম আলুর কোন কুল কিনারা হয়ে গেছে বা হচ্ছে।” আমি আমার জোড় সম্মতি জানিয়ে ততক্ষনে সন্ধ্যার সেই লোভনীয় অপেক্ষায় অপেক্ষারত এক যুবক। আতিক ভাই এর বাড়ি আমার বাসা থেকে খুব একটা দুরের পথ না। হাটার পথ বলা চলে। বাড়িতে ঢুকতেই আতিক ভাই এর সদ্য বাংলাদেশ থাকা আসা স্ত্রী সালাম দিলেন। কিছুক্ষন তাদের দুজনের সাথেই গৃহস্থালি বিষয় নিয়ে কথা বার্তা হল। না, বাড়ির ড্রইং রুমে আর বেশিক্ষন আর বসতে হল না। ভেতর থেকে আতিক ভাই এর ডাক। ”আপনি আইবেন সেই জন্য এই সামান্য রান্না বান্না।’ টেবিলে বসে দেখি এক এলাহি কান্ড! জাম আলুর ভর্তা, জামা আলু সিং মাছ দিয়ে অসাধারন এক তরকারি, মৃগেল মাছের ভুনা, গরু মাংস, ডাল ভর্তা, আরো কতকি! এত বেশি খাবারের আইটেম দেখে আমার মত ছন্নছাড়াদের চোখ কপালে উঠারই কথা। খাবার শুরু হল। জানা গেল জাম আলু তাদের দুজনেরই নাকি খুব প্রিয়। আমার শুনে খুব ভালো লাগলো। যাক, আম্মার পাঠানো জাম আলু তা হলে স্বার্থক। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম যে আতিক ভাই এবং তার গুনি বউ দুজনেই প্রায় আমার পাতে এটা ওটা তুলে দিতে ব্যাস্ত। আমি যতই ’না না’ করি তারা যেন ততই বিপুল উৎসাহে মাছের মাথাটা, পেটি টা, আমার পাতে তুলে দিতে আকুল হয়ে উঠেন। তাদের এই আন্তরিক আপ্যায়ন দেখে জাম আলুর কথা সত্যি আমি ভুলেই গেলাম। এই অতিথিপরায়নতা, আপ্যায়ন আমাদের বাঙালি রক্তের এক অনন্য অহংকার। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিতে এই আতিথিয়তা বাঙালির এক গর্বিত সম্পদ। অথচ সেই বাঙালি কতই না বদলে গেছে। ইদানিং বাড়িতে নিমন্ত্রনের ধারাও পাল্টে গেছে। সেদিন বেশ ক্ষ্যাতিমান একজন বন্ধুর বাসায় তার স্ত্রিকে কে বলতে শুনলাম, ” ভাবি, অমুক তারিখে আমার বাসায় আপনাদের দাওয়াত। আপনি কিন্তু এবার ভুনা খিচুরিটা রান্না করে নিয়ে আসবেন।” কি ভয়াবহ কান্ড! দাওয়াত দিয়ে আবার রান্নার আইটেমও সাথে করে নিয়ে আসতে বলে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের এখন সব কিছুই গা সওয়া হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে ভাবি, ”সত্যি, একদিন তাহলে আমরা বাঙালি ছিলাম?”

তবে খুব আশা জাগে এই আতিক ভাই আর তার বউ কে দেখে। দুজনেই খুব সাধারন দুজন মানুষ। নাগরিক দুষিত হাওয়া এখনো এদের গায়ে আচর কাটে নি। এখনো তাদের ভালোবাসায় নাগরিক কৃত্তিমতা বাসা বাঁধেনি। আচ্ছা, আবার কি আমরা বাঙালি হতে পারি না? খুব সাধারন একটা জীবনের ভেতর দিয়ে অসাধারন সব কাজ করা কি খুবই কঠিন, কষ্টসাধ্য? আম্মার পাঠানো জামা আলুর সৌজন্যে এই চরম সত্যটি যেন আবার নতুন করে আবিস্কার করলাম।

মন্তব্য ১৮ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (১৮) মন্তব্য লিখুন

১| ১৭ ই জুলাই, ২০১২ সকাল ১১:২৩

অর্ফিয়াস বলেছেন: আগে জা আলুর গল্প বলি। আমরা ছোটবেলা ময়মনসিংহ ছিলাম। তখন থেকে জাম আলু আর বিরই চালের ভক্ত। ঢাকা আমার পর এ দুটো জিনিষ আর পাইনা। একদিন ফার্মগেটে দেখা পেলাম জাম আলুর। সেই থেক কেনা শুরু। এখন আমার বাজারেই পাওয়া যায়।

১৭ ই জুলাই, ২০১২ বিকাল ৪:৫৪

আদনান সৈয়দ বলেছেন: হুম, এখন মনে হয় সর্বত্রই পাওয়া যায়। নিউইয়র্ক এ পাওয়া যায় না।

২| ১৭ ই জুলাই, ২০১২ সকাল ১১:২৫

নাসরীন খান বলেছেন: অামি নেত্রকোনার মেয়ে ।বুঝতে পারছেন নিশ্চয় জাম অালু ভর্তা খুব পছন্দের ।

১৭ ই জুলাই, ২০১২ বিকাল ৪:৫৫

আদনান সৈয়দ বলেছেন: আহা..আপনি সৌভাগ্যবতী। জাম আলু হাতের মুঠোয়....

৩| ১৭ ই জুলাই, ২০১২ সকাল ১১:২৯

হেডস্যার বলেছেন:
আগে এই জিনিসের নাম শুনি নাই, প্রথম শুনলাম :||
খাইতে অনেক টেষ্ট নাকি? :P মঞ্চায় খাই। কোথায় পাই বলেন তো?

১৭ ই জুলাই, ২০১২ বিকাল ৪:৫৬

আদনান সৈয়দ বলেছেন: ভাই, সিরিয়াস এক জিনিষ। ময়মনসিং এলাকায় পাওয়া যায়। ঢাকাতেও পেতে পারেন। ছোট ছোট লাল রং এর আলু।

৪| ১৭ ই জুলাই, ২০১২ সকাল ১১:৩০

শিশির সিন্ধু বলেছেন: জাম আলু ভালা পাই....তার চেয়ে ভালা পাইছি আপনের লেখা....আমার জীবনেও আতিক ভাই আর তার বউয়ের মতন অনেক মানুষের ভালোবাসা পাইছি...তাগো খুব আপন মনে হইলো...খাওয়া খাইদ্য নিয়া ভালো লাগার মতন একটা পোস্ট পাইলাম অনেক দিন পরে....

১৭ ই জুলাই, ২০১২ বিকাল ৪:৫৮

আদনান সৈয়দ বলেছেন: শিশির সিন্ধু, লেখাটা ভালো লাগার কারনে অনেক ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।

৫| ১৭ ই জুলাই, ২০১২ সকাল ১১:৩৪

আমার মন বলেছেন: ময়মনসিংহে একসময় আমার দাদা অনেক চাষ করতেন। চমৎকার জাম আলুর ভর্তার স্বাদ। ঢাকাতে প্রায় দিন খাচ্ছি । :-B

১৭ ই জুলাই, ২০১২ বিকাল ৪:৫৯

আদনান সৈয়দ বলেছেন: আপনার সাথে সহমত। তবে আপনার প্রতিদিনের খাওয়া দেখে হিংসা হচ্ছে.....

৬| ১৭ ই জুলাই, ২০১২ সকাল ১১:৪১

মাথা ঠান্ডা বলেছেন: আররে এই আলুর শরিষা তেলে মাখানো র্ভতা আর ঘন ডাল হলে আমার আর কিছুই ভালো লাগেনা । একদিন এই ভিন্ন রকমের আলু মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে দেখে দাড়িয়ে দেখলাম এক ভদ্রলোক কিনছেন জিঙ্গেস করলাম ভাই খেতে কেমন? ভর্তাটা অসাধারন! বললেন। সেই থেকে এর শুরু । তবে সব জায়গায় পাওয়া যায় না, তা্ই সব সময় বাজারে বা ফুটপাতে যেখানেই সবজি বিক্রেতা দেখি জাম আলু আছে কিনা আগে দেখি।

১৭ ই জুলাই, ২০১২ বিকাল ৫:০০

আদনান সৈয়দ বলেছেন: আহা..! শরিষা তেলের সাথে ভর্তা!!! মাথা ঠান্ডা, আপনি এখন মাথা গরম করে দিলেন!! ভালো থাকবেন।

৭| ১৭ ই জুলাই, ২০১২ সকাল ১১:৫৯

আফরিন জাহান বলেছেন: মা আছে তাই পাঠিয়েছে । আমার মা নেই , কে পাঠাবে আমাকে ?

১৭ ই জুলাই, ২০১২ বিকাল ৫:০১

আদনান সৈয়দ বলেছেন: হুম, শুনে খারাপ লাগলো। ...অফরিন জাহান, ভালো থাকবেন।

৮| ১৭ ই জুলাই, ২০১২ দুপুর ১২:০৪

গুমরাজ বলেছেন: আমি ময়মনসিঙ্গা কার কয়ে কেজি লাগবো?

১৭ ই জুলাই, ২০১২ বিকাল ৫:০২

আদনান সৈয়দ বলেছেন: ভাই, যদি চান তো আমার নিউইয়র্ক এর ঠিকানাটা দেই। আপনি যদি মেহেরবানি করে কেজি দুয়েক....

৯| ১৭ ই জুলাই, ২০১২ বিকাল ৫:০৬

হিবিজিবি বলেছেন: মনে করিয়ে দিয়ে কাজটা ভালো করেননি :| ! এখনই ভর্তা খেতে ইচ্ছা করছে কিন্তু আছি তো দেশের বাইরে :| :|


১০| ১৮ ই জুলাই, ২০১২ ভোর ৫:০১

শূন্যের গুনিতক বলেছেন: চট্টগ্রামে থাকি, আপনার দেওয়া বর্ণনার সাথে মিল আছে এরকম আলু আমি বাজারে দেখেছিলাম কিন্তু নিশ্চিৎ না আপনি কি সেই আলুর কথাই বলছেন কিনা। তবে আপনার লিখা পড়ে আমি জাম আলুর প্রতি অনেক আগ্রহ অনুভব করছি; সাধারন আলুর ভর্তা আমার কাছে অসাধারন লাগে, নিশ্চই এটা আরো বেশি অসাধারন হবে। খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে এই জিনিস পাওয়া যায় কিনা। 8-| 8-|

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.