![]() |
![]() |
নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বইঃ১২ ইমামের(আঃ) জীবনী,
অনুবাদকঃমীর আশরাফুল আলম, হুজ্জাতুল ইসলাম সামিউল হক,হুজ্জাতুল ইসলাম মাইনুদ্দিন আহমেদ............
ইমামের কিছু মুজিযাহ ঃ
পুর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে যেমনটি ইঙ্গিত করা হয়েছে; মাসুম ইমামগণ (আ.) ইসমাত ও ইমামতের মত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হওয়ার কারণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও অদৃশ্য লোকের সাথে এক বিশেষ স¤পর্কের অধিকারী ছিলেন। পয়গম্বরগণের (আ.) ন্যায় ইমামগণও (আ.) মুজিযাহ ও কিরামত প্রদর্শন করে থাকেন। দৃষ্টান্ত¯ স্বরূপ মহান ইমামগণের (আ.) জ্ঞান ও খোদায়ী শক্তি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে (আল্লাহর ইচ্ছায়) প্রকাশ লাভ করত। আর তা তাঁদের অনুসারীদের প্রশিক্ষন ও নিশ্চয়তার জন্য এবং ইমামগণের (আ.) সত্যতার দলিল হিসাবে ব্যবহƒত হত। মহান ইমাম হযরত হাদী (আ.) থেকেও অসংখ্য মুজিযাহ ও কিরামত পরিলক্ষিত হয়, যা ইতিহাস ও হাদীস গ্রন্থ সমূহে লিপিবদ্ধ রয়েছে। আর তা বর্ণনা করতে গেলে একটি পৃথক বইয়ের প্রয়োজন। সংক্ষিপ্ততা বজায় রেখে আমরা এখানে তার কিছু নমুনা পেশ করেই তুষ্ট থাকব।
(১) বাল্যকালে ইমামত ও নেতৃত্বের অধিকারী হওয়া ঃ যেমনটি পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে, ইমাম হাদী (আ.) তাঁর মহান পিতার শাহাদাতের পর আট বৎসর বয়সে ইমামতের মহান মসনদে অধিষ্টিত হন। আর এটাই তাঁর মুজিযাহ ও কিরামতের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। কেননা এধরনের মর্যাদা অর্জন করা এবং এই গুরুভার পালন, যা একমাত্র খোদায়ী দান, তা শুধুমাত্র এক বালকের পক্ষেই নয় বরং এক পরিপুর্ণ বিজ্ঞ মানুষের পক্ষেও অসম্ভব। যেহেতু শিয়া ওলামা ও মুহাদ্দিসগণ প্রত্যেক ইমামের (আ.) শাহাদাতের পর বিভিন্ন বিষয় স¤পর্কে জানতে পরবর্তী ইমামের (আ.) শরণাপন্ন হতেন এবং এমনকি কখনো কখনো তাঁকে পরীক্ষাও করতেন। আর আলাভী ও ইমামের (আ.) আত্মীয়দের মধ্যে বিজ্ঞরা, যারা বয়সে ছিলেন প্রবীণ, তারাও ইমামের (আ.) বাড়িতে আসা যাওয়া করতেন। একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমোদন এবং ইমামতের অধিকারী হওয়া ব্যতীত একটি বালকের পক্ষে এই মর্যাদার মসনদে অধিষ্টিত হওয়া এবং সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেয়া ও সকল সমস্যার পরিপূর্ণ নেতৃত্ব দান অসম্ভব। নিঃসন্দেহে একজন সাধারণ লোকও একটি সাধারণ বালককে একজন সচেতন ইমাম বা নেতা থেকে পৃথক করতে পারেন। ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর ক্ষেত্রেও এরূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। আমরা তাঁর জীবনী পর্যালোচনা করতে গিয়ে জানতে পেরেছি যে, ইমামতও নবুয়্যতের ন্যায় আল্লাহ প্রদত্ত বিষয় এবং বয়সের সাথে তার কোন স¤পর্ক নেই।
(২) আব্বাসীয় খলিফা ওয়াছেকের মৃত্যুর খবর প্রদান ঃ খাইরান ইসবাতী বলেন ঃ ইরাক থেকে মদীনায় গেলাম এবং ইমাম হাদী (আ.)-এর খেদমতে পৌছে ধন্য হলাম। মহান ইমাম (আ.) আমাকে প্রশ্ন করলেন ঃ ওয়াছেকের অবস্থা কেমন? নিবেদন করলাম ঃ আপনার জন্য আমার জীবন উৎসর্গ হোক, ভালই আছে। আর আমি অন্যদের চেয়ে বেশী খবর রাখি কারণ আমি সবেমাত্র ওখান থেকে এসেছি। বললেন ঃ লোকজন বলছে, সে মারা গেছে। যখন একথা বললেন, বুঝতে পারলাম লোকজন বলতে ইমাম (আ.) নিজেকেই বুঝিয়েছেন। অতঃপর বললেন মুতাওয়াক্কিল কি করছিল? ঊললাম ঃ মানবেতর অবস্থায় জেলে ছিল। বললেন ঃ সে খলিফা হবে। অতঃপর বললেন ঃ ইবনে যিয়াত কি করছিল? বললাম ঃ জনগণ তার সাথে আছে এবং হুকুম তারই হুকুম। বললেন ঃ নেতৃত্ব তার জন্য দুর্ভাগ্য জনক। অতঃপর কিছুক্ষণ নিরব থেকে বললেন ঃ আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়ন করা ছাড়া কোন উপায় নেই, হে খাইরান! জেনে রাখ ওয়াছেক মারা গেছে ও তার স্থানে মুতাওয়াক্কিল বসেছে এবং ইবনে যিয়াদকে হত্যাকরা হয়েছে। বললাম ঃ আপনার জন্য জীবন উৎসর্গ হোক, কবে ও কখন এঘটনা ঘটেছে? বললেন ঃ তোমার রওনা হওয়ার ছ’দিন পর। কয়েকদিন না যেতেই মুতাওয়াক্কিলের পাইক আসল এবং ইমাম হাদী (আ.) যা বলেছিলেন তাই বর্ণনা করল।
(৩) তুর্কী ভাষায় কথা বলা ঃ আবু হাশিম জা’ফরী বলেন ঃ যখন ওয়াছেকের সেনাপতি ‘বাগা’, বেদুইনদেরকে ধরার জন্য মদীনা দিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমি মদীনাতে ছিলাম। ইমাম হাদী (আ.) বললেন ঃ চল এ তুর্কীর যুদ্ধ উপকরণ দেখে আসি। বাইরে এ†স দাঁড়ালাম। আর সৈন্যরা আমাদের সামনে দিয়ে চলে গেল। তুর্কী সেনাপতি আসল, ইমাম তার সাথে তুর্কী ভাষায় কিছু কথা বললেন। সে ঘোড়া থেকে নেমে এসে ইমামের (আ.) পবিত্র পা চুম্বন করল। আবু হাশিম বলেন ঃ ঐ তুর্কীকে কসম দিয়ে বললাম ইমাম (আ.) তোমাকে কি বলেছেন। তুর্কী প্রশ্ন করল ঃ এই ব্যক্তি কি পয়গম্বর? বললাম ঃ না। বলল ঃ তিনি আমাকে যে নাম ধরে ডেকেছেন বাল্যকালে তুরষ্কে আমাকে এ নামে সকলেই জানত। আর এ পর্যন্ত আরবের কেউই আমার এ নামটি জানত না।
(৪) হিংস্র প্রাণীদের বিনয় (কাকুতিÑমিনতি) ঃ আহলে সুন্নতের আলেম শেখ সুলাইমান কানদুযী, তার ইয়া নাবী আল মুয়াদ্দাহ নামক গ্রন্থে লিখেছেন ঃ মাসউদী বর্ণনা করেছেন, একদা মুতাওয়াক্কিল তার প্রাসাদ অংগনে তিনটি হিংস্র পশু আনে অতঃপর ইমাম হাদীকে (আ.) দাওয়াত করে। যখনই ইমাম (আ.) প্রাসাদ অংগনে প্রবেশ করলেন, মুতাওয়াক্কিল প্রাসাদের দরজা বন্ধ করার নির্দেশ দিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল হিংস্র পশুগুলো ইমামের চারি পাশে পাইচারী করতে লাগল এবং ইমামের প্রতি বিনয় প্রকাশ করল। আর ইমাম (আ.) জামার আস্তিন দিয়ে তাদের মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। অতঃপর ইমাম উপরে মুতাওয়াক্কিলের কাছে গিয়ে কিছু সময় তার সাথে কথা বলে নীচে নেমে এলেন। যতক্ষণ না ইমাম (আ.) প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন হিংস্র পশুরা পুনরায় তাঁর প্রতি বিনয় প্রকাশ করতে লাগল। পরবর্তীতে মুতাওয়াক্কিল ইমামের (আ.) জন্য এক বিশাল উপঢেŠকন প্রেরণ করেছিল। দরবারীরা মুতাওয়াক্কিলকে বলল ঃ তোমার চাচাত ভাই (ইমাম হাদী (আ.)), (পশুদের সাথে) কেমন আচরন করল তাতো দেখলে, এবার তুমি ঐ রকম কর। বলল ঃ তোমরা আমাকে মারতে চাও! আর বলল এ ঘটনা কাউকে বলনা।
(৫) ইমামের মহত্ব ও ব্যক্তিত্ব ঃ আশতার আলাভী বলেন ঃ আমি ও আমার পিতা মুতাওয়াকি‹লের বাসায় ছিলাম, আমি তখন ছোট্ট। আলে আবু তালিব, আলে আব্বাস এবং আলে জাফরের কিছু লোকজনও সেখানে ছিল। এমনি সময় ইমাম হাদী (আ.) সেখানে প্রবেশ করলেন এবং সকলেই তার সম্মানে উঠে দাঁড়াল। হযরত ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন। উপস্থিত কেউ কেউ একে অপরকে বলতে লাগল ঃ কেন এই যুবকের জন্য উঠে দাঁড়াব, সে না আমাদের চেয়ে অধিক আভিজাত্যের অধিকারী, না আমাদের চেয়ে বয়সে বড়। খোদার শপথ এবার আর তাঁর জন্য উঠে দাঁড়াব না। আবু হাশিম জা’ফরী সেখানে উপস্থিত ছিল এবং বলল ঃ খোদার কসম যখন তাঁকে দেখবে, তখন তাঁর সম্মানে অবনত মস্তকে দাঁড়াতে বাধ্য হবে। কিছুক্ষণ না যেতেই ইমাম হাদী (আ.) মুতাওয়াক্কিলের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁকে দেখে উপস্থিত সকলেই উঠে দাঁড়াল। আবু হাশিম বলল ঃ তোমরা যে বলেছিলে উঠে দাঁড়াবে না? বললঃ আল্লাহর কসম, আমরা নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রন করতে পারিনি এবং নিজের অজান্তে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম।
(৬) অন্তকরণের সংবাদ এবং গৃহীত দোয়া ঃ ইসপাহানে আব্দুর রহমান নামে এক শিয়া ব্যক্তি বাস করতেন। তার কাছে জিজ্ঞাসা করা হল কেন এই শিয়া মাযহাব গ্রহন করেছ এবং কেন ইমাম হাদী (আ.)-এর ইমামতে বিশ্বাস কর? বলল ঃ তার মুজিযাহর কারণেই। ঘটনাটি এরূপ ঃ
আমি একজন ফকির ও অসহায় ব্যক্তি ছিলাম। যেহেতু সাহস ও বাচন ক্ষমতা ছিল, ইস্পাহানের লোকেরা আমাকে এক দলের সাথে ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য মুতাওয়াক্কিলের কাছে পাঠায়। একদা মুতাওয়াক্কিলের ঘরের বাইরে অপেক্ষা করছিলাম, এমন সময় মুতাওয়াক্কিল আলী ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে রেযাকে [ইমাম হাদী (আ.)] ডেকে পাঠায়। আমি উপস্থিত একজনকে প্রশ্ন করলাম যাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে তিনি কে? বলল ঃ তিনি হলেন আলাভী এবং রাফেজিরা তাঁকে ইমাম বলে জানে। আরও বলল ঃ খলিফা হয়ত তাকে হত্যা করার জন্য ডেকে পাঠিয়েছে। বললাম ঃ এই আলাভীকে না দেখা পর্যন্ত আমি এখান থেকে নড়বনা। হঠাৎ দেখতে পেলাম এক নুরানী ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে মুতাওয়াক্কিলের বাড়ির দিকে আসছেন, উপস্থিত জনতা তাঁর সম্মানে রাস্তার দু পাশে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে দেখছে। ঐ মহান ব্যক্তির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ হওয়া মাত্রই আমার অন্তরে তাঁর মহব্বত সৃষ্টি হল। তাঁর জন্যে †দায়া করতে থাকলাম যেন আল্লাহপাক তাঁকে মুতাওয়াক্কিলের অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করেন। হযরত জনগণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। আর তাঁর দৃষ্টি ঘোড়ার কেশরের দিকে নিবদ্ধ ছিল এবং ডানে বায়ে কোন ভ্র“ক্ষেপই তাঁর ছিল না। আমি অনবরত তাঁর জন্য দোয়া করছিলাম, যেই আমার কাছে পৌছলেন আমার দিকে পুর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেনঃ আল্লাহ তোমার দোয়া কবুল করেছেন, তিনি তোমাকে দীর্ঘায়ু দান করেছেন এবং তোমার ধন স¤পদ ও সন্তান সন্ততি বৃদ্ধি করেছেন। এটা দেখে আমি কাঁপতে শুরু করলাম এবং বন্ধুদের মধ্যে পড়ে গেলাম। তারা জিজ্ঞাসা করল কি হয়েছে? বললাম সুসংবাদ আছে এবং চুপ রইলাম। ইস্পাহানে ফিরে আসার পর আল্লাহ আমাকে প্রচুর স¤পদ দান করেছেন। বর্তমানে শুধু আমার ঘরে যা স¤পদ আছে তার মুল্যই হাজার হাজার দেরহাম। তাছাড়া বাইরে তো আছেই। বর্তমানে আমি দশটি সন্তানের পিতা এবং আমার বয়স সত্তরেরও অধিক। আমি সেই ব্যক্তির ইমামতে বিশ্বাস করি যিনি আমার অন্তরের খবর রাখেন এবং যার দোয়া আমার জন্য কবুল হয়েছে।
(৭) প্রতিবেশির সমস্যা সমাধান ঃ সামেররাতে ইউনুস নাক্কাশ নামে এক ব্যক্তি ইমামের (আ.) প্রতিবেশি ছিলেন। সে সর্বদা ইমামের নিকট আসত এবং তাঁর খেদমত করত। একদা কাঁপতে কাঁপতে ইমামের কাছে এসে বলল ঃ মাওলা আমি ওসিয়াত করছি সে আপনি আমার পরিবারের দেখাশুনা করবেন। ইমাম (আ.) বললেন ঃ কি হয়েছে? নিবেদন করলাম ঃ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়েছি! তিনি মুচকি হেসে বললেন ঃ কেন? বললাম ঃ মুসা ইবনে বাগা (আব্বাসীয়দের শক্তিশালী সেনাপতী) একটি মুল্যবান পাথর নকশা করার জন্য আমাকে দিয়েছিল। নকশা করতে গিয়ে পাথরটি ভেঙ্গে দু’টুকরা হয়ে গেছে, কালই তাকে বুঝিয়ে দেওয়ারদিন। সে হয় আমাকে হত্যা করবে, নতুবা হাজার দোররা মারবে। ইমাম (আ.) বললেন ঃ নিশ্চিন্তে বাসায় চলে যাও, কাল পর্যন্ত কল্যাণ ছাড়া কিছুই দেখবে না। পরদিন ইউনুস আবারও কাঁপতে কাঁপতে ইমামের (আ.) কাছে এসে বলল ঃ মুসা পাথর নিতে এ†সছে। ইমাম (আ.) বললেন ঃ তার কাছে যাও সুসংবাদ আছে। বললাম ঃ মাওলা তাকে কি বলব? ইমাম হেসে বললেন ঃ তার কাছে যাও, যা বলে তাই শোন; কল্যাণ ছাড়া কিছুই দেখবে না। সে চলে গেল এবং কিছুক্ষণ পর হাঁসতে হাঁসতে ফিরে এসে বলল ঃ হে মাওলা যখন তার কছে গেলাম, বলল আমার ছোট্ট দুই মেয়ে এই পাথর নিয়ে ঝগড়া করছে, সম্ভব হলে পাথরটিকে দু’টুকরা বানাও। এর বিনিময়ে তোমাকে পুরস্কৃত করব। ইমাম (আ.) আল্লাহর প্রশংসা করলেন, অতঃপর ইউনুসকে বললেন ঃ তাকে কি জবাব দিয়েছ? বলেছি সময় দাও দেখি কিভাবে এ সমস্যার সমাধান করা যায়। ইমাম (আ.) বললেন ঃ উত্তম জবাব দিয়েছ।
(৮) আবুহাশিমের প্রতি দয়া ঃ আবু হাশিম জাফরী বলেনঃ এক সময় খুবই অভাবÑঅনটনে পড়েছিলাম। এমতাবস্থায় ইমামের (আ.) খেদমতে পৌছলে তিনি আমাকে বসতে বললেন। অতঃপর বললেন ঃ হে আবু হাশিম আল্লাহতায়ালা তোমাকে যে অসংখ্য নেয়ামত দান করেছেন, তুমি কি তার একটিরও শুকরিয়া জ্ঞাপন করে শেষ করতে পারবে? আমি চুপ করে রইলাম এবং বুঝতে পারছিলাম না কি বলব! ইমাম (আ.) নিজেই জবাব দিলেনঃ আল্লাহ তোমাকে ঈমান দিয়েছেন এবং তার মাধ্যমে তোমার শরীরকে দোযখ থেকে রক্ষা করেছেন। তিনি তোমাকে সুস্বাস্থ্য দান করেছেন এবং তাঁর আনুগত্যের ক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন। তিনি তোমাকে পরিতৃপ্ত (অল্পে তুষ্টি) করেছেন এবং তার মাধ্যমে তোমার মান সম্মান রক্ষা করেছেন। ইমাম আরো বললেন ঃ হে আবু হাশিম আমি এভাবে শুরু করলাম, কেননা অনুভব করছিলাম তুমি এমন কারো ব্যাপারে অভিযোগ করতে চাও, যিনি তোমাকে অঢেল নেয়ামত দান করেছেন। আমি তোমাকে একশত দিনার প্রদান করার নির্দেশ দিয়েছি, তুমি তা গ্রহন কর।
ইমাম হাদী (আ.)-এর বাণীতে ইমাম পরিচিতি ঃ
আমাদের বার ইমামের প্রত্যেকেই (তাদের পবিত্র নুরের উপর সর্বদা আল্লাহর দরুদ বর্ষিত হোক) কেবলমাত্র উম্মতের নেতা বা ইসলামের আহকাম ও কোরআন বর্ণনা কারীই ছিলেন না। বরং শিয়াদের সামাজিক জীবনে মাসুম ইমামগণ (আ.) হলেন পৃথিবীর বুকে আল্লাহর নুর। সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য সুষ্পষ্ট ও পরিপুর্ণ হুজ্জাত বা দলিল। বিশ্বজগৎ ও সকল অস্তিত্বের কেন্দ্র বিন্দু। সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যে কল্যাণকামী মাধ্যমস্বরূপ। পরিপূর্ণতার উজ্জল দৃষ্টান্ত এবং মানবীয় শ্রেষ্টত্বের ক্ষেত্রে তাঁরা ছিলেন সবার শীর্ষে। সকল কল্যাণ ও মঙ্গলের সমষ্টি। আল্লাহর জ্ঞান ও শক্তির বহিঃপ্রকাশ। ফানাফিল্লাহর পরিপুর্ণ নিদর্শন, সকল প্রকার দোষত্র“টি থেকে মুক্ত, মাসুম। আলমে মালাকুত, ধরিত্রী, অদৃশ্যলোক এবং ফিরিশতাগণের সাথে স¤পর্কিত।
দুনিয়া ও আখিরাতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ স¤পর্কে অবগত। খোদায়ী রহস্যাবলীর ধনভান্ডার এবং আম্বিয়াগণের সকল পরিপুর্ণতার উত্তরাধিকারী। হ্যাঁ, হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের পবিত্র অস্তিত্বই হল, অস্তিত্ব নামক দিক দর্শনের †কন্দ্র বিন্দু। তাঁদের সম্মানিত বেলায়েতের আধিপত্য আম্বিয়া ও রাসূলগণের (আ.) বেলায়াতকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। আর সে মহান কতৃত্বকে তাঁরা ব্যতীত অন্য কেউ উপলব্ধি করতে পারে না। আল্লাহ তাঁর বিশেষ অনুগ্রহে তা রাসূল (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতকে প্রদান করেছেন। কোন লোভীই তাতে লোভাতুর হাত বাড়াতে পারে না...। মাসুম ইমামগণের (আ.) মর্যাদা স¤পর্কে যা কিছু গণনা করা হয়েছে তাদের প্রকৃত ফযিলত এর চেয়ে ঢের বেশী। আর তা কোরআনের অকাট্য ভাষ্য এবং রাসূল ও ইমাম গণের (আ.) নির্ভরযোগ্য বক্তব্য থেকে প্রমাণ যোগ্য। শিয়া মনীষীগণের বিভিন্ন গ্রন্থে তা পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে এ ক্ষুদ্র পরিসরে তার বিশদ বিবরণ ও যুক্তি প্রদর্শন সম্ভব নয়। আমাদের সম্মানিত মাওলা এবং ইমামত নামক আকাশের দশম সুর্য, ইমাম আবুল হাসান হাদী (আ.) আমাদের শিয়াদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে পুরস্কৃত করেছেন। “তিনি যিয়ারতে জামে” নামক এক যিয়ারতে তাঁর গভীর ও অসাধারণ বাণীর মাধ্যমে একক বক্তা হিসাবে খোদায়ী শিক্ষা-দীক্ষার ময়দানে এক ত্বড়িৎ গতি প্রদান করেন। আর তার জ্ঞান সমুদ্রের মুক্তাবৃষ্টি ও অলংকার পূর্ণ বাণী সমূহকে প্রিয়তম ইমামদের প্রকৃত প্রেমিকদের জ্ঞানভান্ডারে উৎসর্গ করেছেন। আমাদের বোধগম্যতার নিকটবর্তী, ইমামের প্রকৃত মর্যাদার প্রকাশক নয়। তিনি এর মাধ্যমে আল্লাহর ফুলবাগের কিছু অংশের সজীবতাকে বর্ণনা করেছেন। আমাদের জীবন তাঁর পদধুলিতে উৎসর্গ হোক, কেননা তিনি আমাদের মত মর্তবাসীদেরকে তাঁর রশ্মি বিকিরণকারী বাণীর মাধ্যমে খোদার মহিমা ও মহত্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। আমরা যারা ঐ মহামানবদের স্বচ্ছ ও সুমিষ্ট পেয়ালা থেকে পান পিপাসূ, তাদেরকে আল্লাহর বেহেশতী হাউজে কাওছারের ফোয়ারার দিকে পরিচালিত করেছেন। যেভাবেই হোক, ইমাম হাদী (আ.) তাঁর এক অনুসারীর অনুরোধে মাসুম ইমামগণের (আ.) যিয়ারতের জন্য কিছু †দায়া শিক্ষা দিয়েছিলেন। ঐমহান ইমামের জীবনী বর্ণনা করব আর পাঠক বৃন্দকে ঐ মহান যিয়ারত থেকে বঞ্চিত করব (যা প্রকৃত পক্ষে ইমাম পরিচিতির এক শিক্ষনীয় সূচীপত্র) তা ঠিক হতে পারে না। খ্যাতনামা অনেক আলেম এই যিয়ারতটিকে একটি উত্তম ও পূর্ণাজ্ঞ যিয়ারত বলে মনে করেছেন। মহামনীষীগণ যেমন ঃ মরহুম শেখ সাদুক (রহঃ) যিনি ৩৮১ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন এই যিয়ারতকে তাঁর “মান লা ইয়াহযারুহুল ফকীহ” এবং “উয়ুনু আখবারুর রিযা” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া শেখ তুসী (রহঃ) যিনি ৪৬০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন, তার “তাহযীবুল আহকাম” নামক গ্রন্থে এ যিয়ারতটির উ†ল−খ করেছেন। সাবলীল ভাষা, সমুন্নত বিষয়বস্তু, প্রজ্ঞা ও জ্ঞান যা এই যিয়ারতের মধ্যে তরঙ্গায়িত হয়েছে,ইত্যাদি সকল কিছুই এ যিয়ারতের মৌলিকত্বের পরিচায়ক এবং খোদায়ী সমুন্নত শিক্ষারই প্রবক্তা। এখন পুনরায় আমাদের মহান ইমাম হযরত হাদী (আ.)-এর †জ্যাতির্ময় রূহের প্রতি দরুদ পাঠ করে এমহান বাণী (যিয়ারতটি ) বর্ণনা করব। প্রত্যাশা এটাই যে পবিত্র ইমামগণের (আ.) অনুসারীরা এই প্রজ্জ্বলিত রত্ন ও শিয়াদের ধনভান্ডারকে যেন উপেক্ষা না করেন। এ মহান ইমামগণের (আ.) যিয়ারতের ক্ষেত্রে যেন এ †জ্যাতির্ময় বাণীগুলোর মাধ্যমে যিয়ারত করেন, †হাক তা তাদের মাযারে গিয়ে, কিংবা দূর থেকে।
চলবে....
©somewhere in net ltd.