| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ভূমিকা : আফ্রিকার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন ড. কোয়ামে নক্রুমা। তিনি ঘানার স্বাধীনতা আন্দোলনের স্থপতি । তার দক্ষ নেতৃত্ব ও দূর্বার আন্দোলনে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ঘানার স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয়। নক্রুমা ছিলেন ঘানা প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপাতি। যিনি একাধারার শিক্ষক, লেখক, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ, শাসক ছিলেন। ঘানার স্বাধীনতার ইতিহাসে ড. নাক্রুমার নাম অবিচ্ছেদ্য হয়ে থাকবে।
ড. নক্রুমার প্রাথমিক পরিচয় :
ড. নক্রুমা আইভোরিকোস্টের সীমান্তবর্তী এনজিমা অঞ্চলের এনক্রফুল নাম ক্ষুদ্র গ্রামে ১৯০৯ সালে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পুরো নাম কোয়ামে নক্রুমা। তাঁর খ্রিস্টান নাম দেয়া হয়েছিল ফ্রান্সিস। তার পিতা কফি নগোনলোমা ছিলেন একজন স্বর্ণকার আর মাতা এলিজাবেথ ন্যানিবা ছিলেন দোকানদার। নক্রুমার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় স্থানীয় মিশন স্কুলে। এর পর তিনি আক্রার আচিমোতা কলেজে অধ্যায়ন করেন। তিনি আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ার লিঙ্কন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ ও এম.এ ডিগ্রী লাভ করেন। পরবর্তীকালে নক্রুমা ইংল্যান্ডের স্কুল অব ইকোনোমিক্স থেকে অর্থনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি হেলেনা রিজট ফাথিয়াকে বিয়ে করেন।
#ঘানায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ড. নক্রুমার ভূমিকা :
ঘানায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ড. নক্রুমার ভূমিকা অনস্বীকার্য। নিচে তা আলোচনা কর হলো-
১। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও বিপ্লবের ধারণা প্রদান :
ড. নক্রুমা পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ও সমাজতন্ত্রের দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে ১৯৪৭ সালে ডিসেম্বর মাসে ইংল্যান্ড হতে গোল্ডকোস্টে (ঘানায়) প্রত্যাবর্তন করে। দেশে ফিরে তিনি ইউনাইটেড গোল্ডকোস্ট কনভেনশনের সদস্যসচিব নিযুক্ত হন। তিনি বলেন “গোলকোস্ট বিপ্লবের ফলে গোটা আফ্রিকায় বিশেষত পশ্চিম আফ্রিকায় মুক্তি তরান্বিত হবে।” এই বক্তব্যে ব্রিটিশ শাসন বিরোধিতার স্পষ্ট ইঙ্গিত বিদ্যমান। ব্রিটিশ শাসন বিরোধী প্রচারণা অভিযোগে তাকে গোল্ডকোস্ট কনভেনশন থেকে বহিষ্কার করা হয়।
২। রাজনৈতিক দল গঠন :
ড. নক্রুমা ১৯৪৯ সালে জুন মাসে “কনভেনশন পিপলস পার্টি” ও কমিটি অন ইয়ূথ অর্গানাইজেশন প্রতিষ্ঠা করেন। নক্রুমা ও তার দল দেশের শ্রমিক,কৃষক, যুবক, মহিলা সবার সমর্থন আদায়ে সক্ষম হন।
৩। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বদান :
১৯৪৯ সালে ডিসেম্বর মাসে কাঙ্খিত স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ইতিবাচক কর্মসূচি গ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালে ঔপনিবেশিক সরকারের দমননীতির প্রতিবাদে নক্রুমার দল কনভেনশন পিপলস পার্টির নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয়। রাজধানী আক্রায় বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশে গুলি বর্ষণ করলে ২৯ জন আফ্রিকান নিহত হয়।
৪। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সদর দপ্তরে দাবি পেশঃ
মিছিলে কর্মি হত্যার প্রতিবাদে ড. নক্রুমার ইংল্যান্ডে ঔপনিবেশিক সদর দপ্তরে তার দাবি সম্বলিত পত্র টেলিগ্রাম করেন। তাঁর দাবিগুলো ছিল-
দাবি-১ : অবিলম্বে গভর্ণরকে পদচ্যুত করতে হবে।
দাবি-২ : ঘানায় (গাল্ডকোস্টে) স্বায়ত্বশাসন অবিলম্বে দিতে হবে।
দাবি-৩ : ভবিষ্যৎ ঘানার সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে কমিশন গঠন করতে হবে।
৫। ড. নক্রুমাকে নির্বাসনে প্রেরণ :
ড. নক্রুমার দাবি অগ্রাহ্য করে ১৯৫০ সালে ফেব্রুযারি মাসে ঘানার গভর্ণর দেশে জরুরী অবস্থা জারি করে এবং ড. নক্রুমা সহ ব্রিটিশ বিরোধী কয়েকজন নেতাকে বন্দী ও নির্বাসন দেয়া হয়। কিন্তু নক্রুমাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে গণঅসন্তোষ আরও প্রবল হয়।
৬। ড. নক্রুমার দাবির আংশিক বাস্তবায়ন
ড. নক্রুমার দাবির প্রেক্ষিতে ঔপনিবেশিক শাসক আফ্রিকানদের সমন্বয়ে সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করে। গভর্ণর পদে রদবদল হয়। গোল্ডকোস্টে নতুন গভর্ণর হয়ে আসেন চার্লস আর্ডেন ক্লার্ক।
৭। গভর্ণরের সাথে সংলাপ:
নতুন গভর্ণর ক্লার্ক নক্রুমাকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিরসনে গভর্ণর তাকে গভর্ণর হাউসে সংলাপের আহবান করেন। এই সংলাপে ড. নকুমা গভর্ণর কর্তৃক ঘানার জনস্বার্থ বিরোধী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
৮। নক্রুমারের কারাবরণ :
১৯৫০ সালে সংলাপ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলে ড. নক্রুমার সারাদেশে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেন। সারকার তাকে গ্রেফতার করে ২ বছরের কারাদন্ড প্রদান করে। এই পরিস্থিতিতে নতুন সংবিধান রচিত হয়।
৯। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ ও কারমুক্তি:
১৯৫১ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে ড. নক্রুমা কারাবন্দি থাকা অবস্থায় গোল্ডকোস্টে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি কারাগারে থেকেই নির্বাচনে অংশগ্রহন করেন। ড. নক্রুমার দল “কনভেনশন পিপলস পার্টি” ৩৮ টি আসনের মধ্যে ৩৪ টি আসন লাভ করে। নির্বাচনের ফলাফলে বিস্মিত হয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাকে কারামুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
১০। প্রথম নির্বাচিত সরকার গঠন :
সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত দল “কনভেনশন পিপলস পার্টি কে ব্রিটিশ সরকার স্বাধীন সরকার গঠনের অনুমতি প্রদান করে। ড. নক্রুমার নেতৃত্বে গোল্ডকোস্ট প্রথম নির্বাচিত সরকার গঠিত হয়। নক্রুমা প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন অব্যহত রাখেন।
১১। গণভোটে নির্বাচিত :
১৯৫৪ সালে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সংবিধান সংশোধন করে গোল্ডকোস্টের সার্বভৌমত্ব দ্রুত ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৫৬ সালে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ গোল্ডকোস্ট ও টগোল্যান্ডের স্বাধীনতা প্রদানের বিষয়ে জনমত যাচাই করতে গণভোট দেয়। এই গণভোটে ড. নক্রমার স্বাধীনতা প্রত্যাশীদের পক্ষে জয়ী হন।
১২। স্বাধীনতা অর্জন :
১৯৫৭ সালে ৬ মার্চ গোল্ডকোস্ট ও টগোল্যান্ড ”ঘানা” নাম ধারণ করে স্বাধীনতা অর্জন করে। এসময় জনগণ ড. নক্রুমাকে ‘ঘানার ঈগল’ ‘ঘানার বিরাট পুরুষ’ ‘ঘানার সিংহ’ প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৬০ সালে ড. নক্রুমা ঘানাকে “রিপাবলিক অব ঘানা” ঘোষণা করেন।
উপসংহার ঃ
ঘানায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও স্বাধীনতা অর্জনে ড. কোয়ামে নক্রুমা এর অবদান বিশ্ব ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৯৬০ সালে তিনি ঘানায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করেন। ক্রমান্বয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন এবং ঘানার স্বাধীনতার মহানায়ক হয়ে উঠেন স্বৈরাচারী শাসক। তার স্বৈরশাসনের অবসানের জন্য সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে ১৯৬৬ সালে। তিনি ১৯৭২ সালে মারা যান।
বিষয় : ইতিহাস (ঔপনিবেশিক আফ্রিকার ইতিহাস)

©somewhere in net ltd.