| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মোগল সম্রাট
মানুষ মানুষের জন্য , জীবন জীবনের জন্য একটু সহানুভুতি কি মানুষ পেতে পারেনা...ও বন্ধু...
প্রতিটি মানুষের ভেতরে একটা পথিক মন ঘুমিয়ে থাকে। কোনো এক ভোরে সে হঠাৎ জেগে ওঠে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ার জন্য। আমার সেই পথিক মন জেগে উঠেছিল সিলেটের ডাকে। চা-বাগানের সবুজ,পাহাড়ি ঝর্ণার গান, আর পাহাড়ী নদী পিয়াইন ও ধলাই নদীর নীলাভ স্বচ্ছ জলের টানে রওনা দিলাম বৃহষ্পতিবার রাত এগারোটায়। শুক্রবার আর শনিবার দুই দিন, অনেকগুলো গন্তব্য ঘুরেছি আর ফিরে আসার পথে পথে মনের ভেতর জমিয়ে রাখলাম অনেক ভ্রমনের স্মৃতি।
প্রথম দিনের গন্তব্য ছিলো লালাখাল, শ্রীপুর চা বাগান ভিউ পয়েন্ট আর জাফলং।
লালাখালের নৌকায় উঠে যতই এগিয়ে গেলাম, মনে হলো কেউ যেন নদীর জলে নীল আর সবুজ রঙ গুলে দিয়েছে। ভারতের চেরাপুঞ্জি থেকে নেমে আসা পানি সারি নদীতে মিশে তৈরি করেছে এই অপার্থিব রঙ। দুই পাশে গাছের ছায়া, মাঝে নৌকা, আর সামনে অসীম সবুজ মনে হলো নগরের সমস্ত কোলাহল থেকে বহু দূরে এসে পড়েছি। লালাখালের বুকে ভাসতে ভাসতে উপলব্ধি হলো কিছু সৌন্দর্য চোখ দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়।
লালাখাল থেকে বেরিয়ে গাড়ি ছুটলো জাফলংয়ের দিকে। এই পথেই পড়বে শ্রীপুর চা-বাগান। পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে যাওয়া পথ, দুই পাশে সারি সারি চা গাছ। শ্রীপুরের চা-বাগানের ভিউ পয়েন্টে পৌঁছে যখন দাঁড়ালাম, মুখ দিয়ে কথা বেরোলো না। সত্যিই অনবদ্য। সামনে যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ। ঢেউ খেলানো পাহাড়ের গায়ে চা গাছের সবুজ গালিচা, দূরে মেঘের সাথে মিশে যাওয়া পাহাড়ের রেখা। শ্রীপুরের এই ভিউ পয়েন্ট যেন একটা প্রাকৃতিক ক্যানভাস যেখানে প্রকৃতি নিজেই তার সেরা চিত্রকর।
জাফলংয়ে এর আগে বহু বছর আগে একবার গেছি। পিয়াইন নদীর বুকে হাজারো পাথর, ওপারে ভারতের ডাউকি। পাহাড়ের গা থেকে নেমে আসা মেঘ মাঝে মাঝে ছুঁয়ে যাচ্ছে জলের বুক। জাফলংয়ের পাথরগুলো শুধু পাথর নয় এগুলো সুদূর পাহাড়ের গল্প বহন করে আনে নদীর স্রোতে। তবে এবার জাফলং গিয়ে দেখি প্রচুর দোকান পাট, খাবারের দোকান আর পর্যটকদের উপচে পড়া ভীড়। বাঙ্গালী নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্ত পরিবার গুলো যে এখন টুরে আসতেছে সেটা চোখে পড়ার মতো।
জাফলং জিরো পয়েন্ট থেকে কলের নৌকা ভাড়া করে পিয়াইন নদী পার হয়ে গেলাম মায়াবী ঝর্ণা দেখতে। গিয়ে দেখি ঝর্ণায় কোন পানি নাই । তবে ভরা বর্ষায় এই ঝর্না দেখে পর্যটকরা মুগ্ধ হবে তাতে কোন সন্দেহ নাই। আমার পরামর্শ থাকবে যারা এদিকে বেড়াতে যাবেন তারা অবশ্যই ভরা বর্ষায় আসবেন তা না হলে উপভোগ করতে পারবেন না এখানকার সৌন্দর্য।
দিনের শেষ গন্তব্য ছিল খাসিয়া জনগোষ্ঠীর পান পুঞ্জি। পাহাড়ের ঢালে সাজানো ছোট ছোট ঘর, পানের বরজ, আর মাতৃতান্ত্রিক এক সমাজের নিজস্ব জীবনধারা। খাসিয়া নারীরা এখানে মূল ভূমিকায়। সম্পদ, পরিচয়, উত্তরাধিকার সব মায়ের সূত্রে। বাংলাদেশের মূলধারার সংস্কৃতি থেকে একদম আলাদা এই জীবন দেখে মনে হলো একটি দেশের ভেতরেও কত বৈচিত্র্য লুকিয়ে থাকে।
সন্ধ্যার আগে ফেরার পথে পিয়াইন নদীতে প্রায় এক ঘন্টা গোসল করলাম। শরীরটা একদম শীতল হয়ে গিয়েছিলো । সে এক আলাদা প্রশান্তি। তবে বিশাল সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে আবারে পুরো শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার। তারপর রাত আটটায় রওনা দিলাম সিলেট শহরের উদ্দেশ্যে।
দ্বিতীয় দিনের লিস্টে ছিলো চা বাগান, রাতারগুলের জলাবন আর সাদা পাথরের নদী এবং দরগাহ জিয়ারত
সকালের নাস্তা সেরে রওনা দিলাম আজকের স্পটগুলো ভিজিটের উদ্দেশ্যে। প্রথকেই পৌঁছে গেলাম মালিনীছড়ায়। বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো চা বাগানগুলোর একটি ১৮৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত। দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে এই বাগান চা উৎপাদন করে আসছে। সকালের নরম আলোয় চা পাতায় শিশির জ্বলছে হিরার মতো। দূরে চা শ্রমিকরা ঝুড়ি পিঠে পাতা তুলছেন এই দৃশ্য দেখলে বোঝা যায়, এক কাপ চায়ের পেছনে কত মানুষের পরিশ্রম আর জীবন জড়িয়ে আছে।
পরের গন্তব্য রাতারগুল যাকে বাংলাদেশের আমাজন বলা যেতে পারে। রাতারগুল সম্পর্কে আগে পড়েছিলাম বর্ষায় পানিতে ডুবে যাওয়া এই জলাবন নাকি অন্য এক পৃথিবী। নৌকায় চড়ে ভেতরে ঢুকতেই বুঝলাম, কথাটা অতিরঞ্জন নয়। গাছের শিকড় জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, ডালপালা ছায়া দিচ্ছে নৌকার উপর, পাখির ডাক ছাড়া চারপাশ প্রায় নিঃশব্দ। সূর্যের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে সোনালি রেখায় নেমে আসছে জলে। রাতারগুল আপনাকে চুপ করিয়ে দেবে। ভেতরে ভেতরে একটা গভীর শান্তি নামিয়ে দেবে।
রাতারগুল থেকে রওনা হলাম ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর। পাথরের নদী আর আকাশের দর্পণ। ধলাই নদীর উৎস মুখে সাদা-কালো পাথরের বিস্তার যেন কেউ মেঘ থেকে পাথর বানিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছে। তবে কয়েক মাস আগে সাদা পাথর চুরি হয়ে যাওয়ার পর তেমন আর সাধা পাথর নাই। তবে পানি এতটাই স্বচ্ছ যে নিচের পাথর স্পষ্ট দেখা যায়। ওপারে ভারতের পাহাড়, আকাশ তার ছায়া ফেলেছে জলে। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হলো কিছু জায়গা আছে যেগুলো মানুষকে ছোট করে না, বরং মানুষের মনকে বড় করে দেয়। ভোলাগঞ্জ সেরকম একটা জায়গা।
দুই দিনের ভ্রমণ শেষে ফেরার পথে থামলাম হযরত শাহজালাল (র.)-এর দরগাহয়। সিলেটের এই মহান আধ্যাত্মিক সাধকের স্মৃতি এখনও জীবন্ত এই শহরে। দরগাহর ভেতরে পা রাখতেই মনের মধ্যে একটা স্থিরতা এলো। শত শত বছর ধরে লক্ষ মানুষ এখানে এসেছেন শান্তির খোঁজে। জিয়ারত শেষে বেরিয়ে আসতে আসতে মনে হলো ভ্রমণ শুধু বাইরের জগৎকে দেখা নয়, ভেতরের জগৎকেও চেনার একটা পথ।
শেষ কথা
দুই দিনে সিলেট আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে নীল নদীর রঙ, সবুজ চা বাগানের গন্ধ, পাথরের শীতলতা, জলাবনের নিস্তব্ধতা, আর একটি পুরনো দরগাহর আধ্যাত্মিক স্পর্শ। সিলেট শুধু একটি জেলা নয় এটি একটি অনুভূতি। যারা এখনও যাননি, তাদের বলছি সময় করে একবার যেতে পারেন।
ভ্রমণ করুন, অনুভব করুন আর গল্প তৈরি করুন।
ভ্রমনকালঃ
১১ এবং ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ। শুক্রবার এবং শনিবার।
২৭ এবং ২৮ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
ছবিঃ আমার নিজের মোবাইলে তোলা। (খাসিয়া পল্লী এবং শ্রীপুর চা বাগানের ছবিটা অন্তর্জাল থেকে নেয়া)
১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০
মোগল সম্রাট বলেছেন:
ধন্যবাদ ।
এডিট করে ঠিক করে দিয়েছি।
©somewhere in net ltd.
১|
১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৪
মরুভূমির জলদস্যু বলেছেন:
- একই লেখা একই পোস্টে ২বার হয়ে গেছে বলে, পোস্টটা বিশাল বড় দেখাচ্ছে!!