নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

শৈশব আর কৈশোর কেটেছে রংপুরে; আইএ পাসের পর কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন। পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল. ও পিএইচডি. ডিগ্রি লাভ। বর্তমানে শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত আছি।

অনুপম হাসান

লেখক

অনুপম হাসান › বিস্তারিত পোস্টঃ

প্রবন্ধ : ২ । মহাদেব সাহার ঘরবসতি মহাশূন্যতায়

১৬ ই জুন, ২০০৯ সকাল ৯:০০

প্রতিটি ফুলের সাথে প্রতিটি কাঁটার উপহার

কোথাও দেখি না কিছু আর, শুধু অপার শূন্যতা হাহাকার

এখন আমার পেছনে পেছনে এই হেঁটে যায় কেবল শূন্যতা

পাশে বসে, ভ্রমণসঙ্গী হয়, কাছে কাছে থাকে

শূন্যতাই এখন আমার সঙ্গী, দয়িতা, বান্ধবী, বেলীফুল।

(শূন্যতা আমার সঙ্গী)

.......................................................................................................

ষাটের উত্তাল উত্তুঙ্গ সময়ে মহাদেব সাহা (জ.১৯৪৪) কাব্যযাত্রা শুরু করে গ্রন্থিত হন ১৯৭২ সালে (এই গৃহ এই সন্ন্যাস)। সময়ের রথচক্রে তাঁর জীবনাভিজ্ঞতায় সঞ্চিত হয়েছে আইয়ুব সরকারের সামরিক শাসন (১৯৫৮), আইয়ুবীয় মৌলিক গণতন্ত্রের নিষ্পেষণ (১৯৬২), বাংলাদেশের উত্থান-পর্বের ছয়দফা আন্দোলন (১৯৬৬), ঊনসত্তরের গণ-অভ্যূত্থান এবং একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তাক্ত যন্ত্রণা। এইসব কালিক অভিজ্ঞতার আলোয় গৃহ-সন্ন্যাসের টানাপড়েন চলেছে মহাদেব সাহার কবি-হৃদয়ে; অতঃপর স্বাধীন দেশে পচাত্তরে পুনরায় রক্তাক্ত রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবরুদ্ধ যন্ত্রণা অতিক্রম করে নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে স্নাত কবি মহাদেব সাহা সমাজ-রাজনীতির ডামাডোল থেকে নিজেকে খানিকটা বিযুক্ত করে নিয়ে স্বীয় অস্তিত্বের অšে¦ষণে নিয়োজিত থেকেছেন। প্রেম আর প্রকৃতি তাঁর প্রিয় বিষয় হলেও সমাজ-রাজনীতি এবং জীবন বাস্তবতা উপেক্ষিত হয় নি মহাদেব সাহার কবিতায়। তবে বয়স কবির অভিজ্ঞতায় ক্রমাগত এসে জটলা তৈরি করেছে; তিনি সন্ধান করেছেন এবং উদ্গ্রীব হয়েছেন মানব জীবনের উৎস মুখ আর এর পরিণামের রহস্য উদ্ঘাটনে। বস্তু জাগতিক অভিজ্ঞতায় জীবনের যে অভিধা তার সাথে জাগিত দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে মিশিয়ে জীবন ও জগতের ব্যাখ্যা দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছেন কবি মহাদেব সাহা তাঁর শূন্যতা আমার সঙ্গী (২০০০) কাব্যগ্রন্থে।



বাংলাদেশের কাব্য-জগতে কবিদের কোলহলে অনুপস্থিত মহাদেব সাহা নীরবে-নিভৃতে কাব্যচর্চায় নিমগ্ন থেকেছেন তাঁর দীর্ঘ পাঁচ দশকের কাব্যযাত্রায়। মহাদেব সাহা আত্মনিষ্ঠ ধ্যানী কবি। তিনি যুগের হুজুগে নিজেকে বিলিয়ে না দিয়ে স্বীয় স্টাইল আর কাব্যাদর্শ ধরে রাখেন সন্তর্পণে। সবাই যখন তাঁকে ছাড়িয়ে যায় অথবা ছেড়ে যায় তখনো তিনি নিরহংকারে উচ্চারণ করেন,

আজ তুমিই আমার সঙ্গী, তুমিই আমার শেষ প্রণয়িনী

তুমিই আমার ঘুমের ভেতর সেই একখানি হাত

শূন্যতা আমার সঙ্গী, শূন্যতা আমার তুমি

বুঝি জ্যোৎস্নারাত। (শূনতা আমার সঙ্গী)

মহাদেব সাহা জাগতিক জটলা থেকে এভাবে নিজেকে সরিয়ে নেন নীরব অভিমানে। দীর্ঘ বয়সের অভিজ্ঞানে কবি যেহেতু জেনেছেন মানুষ বড় বেশি স্বার্থপর। নিজেকেই নিয়েই মানুষ সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে আর স্বীয় ভাবনায় ঘরবসতি করে। অর্থাৎ সংসারে কেউ কারো নয়; যে যার মতো নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। ফুলে মধু থাকলে যেমন ভ্রমরের আনাগোনা থাকে, তদ্রƒপ প্রয়োজন থাকা পর্যন্ত ব্যক্তির চারপাশে ভীড় থাকে। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে জগতে মানুষ বড্ড একা ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বার্ধক্যে ব্যক্তির জাগতিক জীবনে অবহেলার অন্ত থাকে না। এইসব দেখে-শুনে তাই কবি বলেন,

সবাই যে যার মতো চলে যায়, একবারও তাকায় না ফিরে

কারো চোখে দেখি না মেঘের ছায়া আর

এখন আমার জন্য শুধু শূন্য চিঠির বাক্স, ধুধু

খালি হাত। (এখন আমার জন্য)

সংসার জীবনের এই নিষ্ঠুরতা কবি মহাদেব সাহার ব্যক্তি অভিজ্ঞতায় সঞ্চিত হয়েছে। তবে এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি সম্ভবত সংসারের সকলকেই হতে হয়। কোন মানুষই জীবন-মরণের মাঝে অবস্থিত জীবনে অবিচ্ছিন্ন সুখ-সগারে ভাসে না। অস্তিত্বশীল মানুষ মাত্রই এক সময় অনুভব করে জীবন নামের মহা এক শূন্যতার ফাঁকি। অবধারিত মৃত্যুর কোলে এক সময় জীবন সমর্পিত হয়। তার আগে বার্ধক্যের কীটের দংশনে আর শূন্যতার হাহাকার ঘিরে ধরে মানব জীবনকে। এই শূন্যতার হাহাকার মহাদেব সাহার শূন্যতা আমার সঙ্গী কাব্যের ছত্রেছত্রে ফুটে উঠেছে।



মহাদেব সাহার শূন্যতা আমার সঙ্গী কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো দুই ধারায় বিভক্ত। এক. জীবন ও জগতের রহস্য সম্পর্কিত; দুই. প্রকৃতি নিষ্ঠ প্রেম বিষয়ক। গ্রন্থের ৩৭টি কবিতা এ দুটো ধারায় বিভক্ত হলেও প্রায় সবগুলো কবিতায় কবির বস্তু জাগতিক জীবন-চেতনার রহস্য বিষয় চিন্তা সুপ্ত আছে। প্রতিবেশ পৃথিবীর শূন্যতায় অস্থির কবিচিত্ত প্রকৃতির রাজ্যে আশ্রয় যাচ্ঞা করেছেন। কারণ, মানুষ যখন মুখ ফিরিয়ে নেয় ব্যক্তির নিকট থেকে তখন প্রকৃতিই ব্যক্তির আশ্রয় দাতা প্রিয়তম প্রকৃতি। উপরন্তু একথাও সত্য যে, মানুষকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করলেও তার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়। এ কাব্যগ্রন্থে প্রেম অর্থে প্রকৃতির কাছে কবির নতজানু প্রার্থনা বোঝানো হয়েছে। শূন্যতা আমার সঙ্গী কাব্যে সমাজ জীবন এবং আর্থ-রাজনীতি থেকে মহাদেব সাহা সম্পূর্ণ নিজেকে বিযুক্ত রেখেছেন। কবি এখানে জীবন আর জগতের মহালীলার অংশীদার হিসেবে অনিবার্য পরিণামসূত্রের সন্ধান করেছেন।



সংসারে আমরা সকলেই আগন্তুক দু’দিনের মুসাফির মাত্র। এত মায়া, এত ভালবাসা সবকিছু শেষ হয়ে যায় জীবনাবসানে। প্রিয়জন হয়তো দিন কতক মনে রাখে, কারো কারো জন্য শোকসভা হয়; কিন্তু ধীরে ধীরে প্রিয়জনের মন থেকে প্রিয় মানুষটির নাম মুছে যায়, দেয়ালে টানানো ফটোগ্রাফে ধুলোর আস্তরণ জমে। এখানে জোর করে থাকা যায় না; অমোঘ নিয়মের অধীন মানব জীবন। শৈশব-কৈশোর এবং যৌবন পার হয়ে গেলেই জাগতিক বন্ধনগুলো বার্ধক্যে শিথিল হয়ে আসে। পরিণত বয়সে কবি মহাদেব সাহা সম্ভবত এ কারণে মায়া-মমতার দরজাগুলো বন্ধ করে দিতে চেযেছেন স্বেচ্ছায়। এজন্য লিখেছেন,

এবার তাহলে আমি সবকিছু ফেলে চলে যাই

হায় এই স্বপ্নরাজ্য, হায় এই সুখের সংসার, (দূরে ফেলে চলে যাই কবিতা সংসার)

নিযতির পরিহাস মহাদেব সাহা স্বেচ্ছায় মেনে নিয়েছেন। কবির মন চিরকালই বৈরাগ্যে আসক্ত ছিল ‘... বাউল ও বৈরাগীর গান শুনতে শুনতে/ এ গ্রাম থেকে সে গ্রামে চলে’ যেতেন কৈশোরে। এরপর বয়স বেড়েছে বৃক্ষের মতোই সংসারে শিকড়-বাকর, ডালপালা ছড়িয়েছে জীবন। তবে ভেতরে ভেতরে মহাদেব সাহা পুষে চলেছেন চির বৈরাগী মন। সংসার জীবনের সত্য কবি উপলব্ধি করেছেন এভাবে,

কতোদিন ঠিক মনে নেই, কতোদিন এইখানে স্বর্গের দুয়ারে বসে

আমি পাহাড়ের ঘুম ভাঙাতে চেয়েছি

নিঃশব্দ পাথর আমাকে দিয়েছে শুধু হিমশীতলতা, দিয়েছে

শীতের রাত্রি, স্তব্ধ বুক, পাথরের হিম আলিঙ্গন; (কেন যে ঘুম ভাঙাতে চাই পাথর ঘুম)

মহাদেব সাহা কোলহল বিযুক্ত নিভৃতচারী কবি। জীবন যাপনেও নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা কাতর। নৈঃসঙ্গের অন্তরঙ্গতায় কবি-হৃদয় তাই উপলব্ধি করেছে

জন্মেছি নিঃসঙ্গ আমি, সকলেই নিঃসঙ্গ এমন

কিন্তু তাকে সহোদর, ভ্রাতাভগ্নী মিলিত সংসার

আমি যেন কোনো এক সুদূর পথিক দূর বনে (প্রকৃত জন্মের স্মৃতি)

জগত-সংসার এমনই এক প্রপঞ্চ; ভাইবোন, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী আছে বটে কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে কেউ-ই কারো নয়। স্বজন পরিবেষ্টিত সংসার এক মহামায়া ছাড়া কিছুই নয়। মানুষ এই মায়ার জালে বন্দী হয়ে ছট্ফট্ করে সংসারে। সেই সংসার যাতনায় নীলকণ্ঠ কবি মহাদেব সাহা বলেন,

একদিন যাদের মুখের দিকে চেয়ে পৃথিবীর সমস্ত যাতনা ভুলেছি

পেয়েছি অপার মধু,

ভেবেছি জীবন কেমন মমতামাখা

আজ সেই ঘরের দেয়াল মেঝে, কঠের আসবাব

কী ভয়ঙ্কর শব্দ করে ওঠে (আজ বড় কষ্ট হয়, আজ বড় দুঃখ হয় মনে)

এভাবেই মানব জীবনে সংসারের বন্ধন আল্গা হয়ে যায়; একদিন যে সংসারের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ছিল অস্তিত্ব সেই সংসার ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অতঃপর সব যন্ত্রণার অবসান ঘটে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। আর মৃত্যুর পর দুদিনেই জগত সংসার ভুলে যায় তাকে যে একদিন অপরিহার্য ছিল। কবি মহাদেব সাহা তাই জীবনের পরিণাম খুঁজে বেড়ান আকাশে

শেষ পর্যন্ত কি এই আকাশই মানুষের ঠিকানা?

তাই কি মৃত মানুষের কথা মনে হলে মানুষ

আকাশের দিকে তাকায়? (আকাশ)

মানুষ মাত্রই জানে জীবনের পরিণাম মৃত্যু; আর মৃত্যু মানেই এক মহাশূন্যতা। জগতে মানুষ আনন্দ কোলাহলে এই মহাশূন্যতার অনিবার্য পরিণাম-কথা সাময়িকভাবে ভুলে থাকে। পরিণাম বিস্মৃতিই মানুষের মনে জন্ম দেয় অহংকার, দাম্ভিকতা। মানুষ ভলে যায় ‘এখানে মিলন মানেই বিরহের দিকে পা বাড়ানো’। বস্তুর ধর্ম অনিবার্য সত্য; সেই সত্যকে উপেক্ষা বা অস্বীকার করার উপায় নেই। কবি মহাদেব সাহাও সংসার নামক পাথরের বুকে ফুলে ফোটাতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। এই ব্যর্থতা অনিবার্য ছিল। মানুষ যতোই আকক্সক্ষা করুক না কেন, এই সংসারে টিকে থাকার কিংবা চির অস্তিত্বশীল হওয়ার তা কোনদিনই সম্ভব হবে না। সম্ভবত মানব জন্মের এক অপরিহার্য এবং অন্তর্গত সত্যের নাম হচ্ছে মহাশূন্যতা। কবি এইসব ভয়াবহ সত্য জেনেছেন জীবন মন্থন করে। কবি মহাদেব সাহা সেই শূন্যতার মাঝেই বসতি গেড়েছেন যখন খুশি গুটিয়ে নেবেন স্বীয় আস্তানা।

.......................................................................................................

মন্তব্য ২ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ১৮ ই জুন, ২০০৯ দুপুর ১২:৪৫

তপন বাগচী বলেছেন: মহাদেব সাহা আমারও প্রিয় কবি। তার উপরে আমি গোটা পাঁচেক প্রবন্ধ লিখছি। আপনাকে পাশে পেয়ে সাহস পাচ্ছি। আপনাকে ধন্যবাদ আমার প্রিয় কবিকে নিয়ে লেখার জন্য।

২| ২৭ শে জুন, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:০১

আকাশচুরি বলেছেন: মহাদেব সাহাকে খুব বেশি পাঠ করা হয়ে ওঠেনি। আপনার লেখা পড়ে তাঁর সম্পর্কে কিছুটা হলেও জানা হলো, তাঁকে পাঠের আগ্রহও বাড়লো।

কেমন আছেন হাসান ভাই? সময় পেলে আমার ব্লগে একটা ঢুঁ মেরে এসেন:)

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.